প্রতিদিনের জীবনে তথ্য খোঁজা থেকে শুরু করে পথের ঠিকানা বের করা, ই-মেইল পাঠানো, গান শোনা কিংবা পৃথিবীর অন্য প্রান্তের কোনও জায়গা ভার্চুয়ালি ঘুরে দেখা ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের কাছে গুগল এখন নিত্যদিনের সঙ্গী। সেই গুগলের প্রযুক্তি-যাত্রা ও মানুষের জীবনে এর প্রভাবকে স্মরণ করার উপলক্ষ হিসেবে পালিত হয় ন্যাশনাল গুগল ডটকম ডে। আজ সেই দিন।
একসময় ইন্টারনেটে প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে পাওয়া এতটা সহজ ছিল না। ওয়েব ডিরেক্টরি ঘেঁটে তথ্য বের করতে হতো। সেই পরিস্থিতি বদলে দেওয়ার লক্ষ্যেই কাজ শুরু করেছিলেন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই গবেষক ল্যারি পেজ ও সের্গেই ব্রিন। ১৯৯৬ সালে তাঁদের গবেষণা প্রকল্প থেকেই গুগলের যাত্রার সূচনা।
তাঁদের তৈরি পেজর্যাঙ্ক পদ্ধতি ওয়েবসাইটের মধ্যে পারস্পরিক সংযোগ বিশ্লেষণ করে কোন পেজ বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝার একটি নতুন উপায় তৈরি করেছিল। প্রকল্পটির প্রথম নাম ছিল ‘ব্যাকরাব’। পরে সেটিই পরিচিত হয় ‘গুগল’ নামে।
‘গুগল’ নামটির পেছনেও রয়েছে একটি মজার গল্প। নামটি এসেছে ‘Googol’ শব্দ থেকে, যা বিশাল একটি সংখ্যাকে বোঝায়। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা বিপুল তথ্যের সঙ্গে নামটির ধারণাগত মিল ছিল।
১৯৯৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ল্যারি পেজ ও সের্গেই ব্রিন google.com ডোমেইনটি নিবন্ধন করেন। এরপর খুব দ্রুতই গুগলের পরিসর বাড়তে থাকে। ক্যালিফোর্নিয়ার মেনলো পার্কে এক বন্ধুর গ্যারেজে শুরু হওয়া উদ্যোগটি একসময় বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
গুগলের কাজ এখন আর শুধু সার্চের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ই-মেইলের জন্য Gmail, পথ খোঁজার জন্য Google Maps, ভিডিও দেখার জন্য YouTube, অনুবাদের জন্য Google Translate, অনলাইন ক্যালেন্ডারসহ নানা সেবা মানুষের দৈনন্দিন কাজকে সহজ করেছে। ২০১৫ সালে গুগলকে Alphabet Inc.-এর অধীনে আনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির করপোরেট কাঠামোতেও বড় পরিবর্তন আসে।
গুগল ডটকম দিবস কীভাবে উদ্যাপন করবেন
দিবসটি পালনের জন্য বড় কোনও আয়োজনের প্রয়োজন নেই। বরং গুগলের ইতিহাস ও প্রযুক্তির পরিবর্তন সম্পর্কে জানার মধ্য দিয়েই শুরু করা যেতে পারে দিনটি। গুগলের পুরোনো লোগো, শুরুর দিকের সার্চ পেজ কিংবা নব্বইয়ের দশকের ইন্টারনেটের চেহারা খুঁজে দেখলে বোঝা যাবে, এত বছরে অনলাইন দুনিয়া কতটা বদলে গেছে।
বন্ধুদের সঙ্গে গুগল ব্যবহার করে অদ্ভুত ও মজার তথ্য খোঁজার প্রতিযোগিতাও করা যায়। পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত জায়গা, বিরল প্রাণী, বিচিত্র খাবার কিংবা ইতিহাসের অজানা ঘটনা—যে যার মতো বিষয় বেছে নিয়ে তথ্য খুঁজবেন। পরে কে সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য পেয়েছেন, তা নিয়ে হতে পারে মজার আড্ডা।
গুগলের বিভিন্ন সেবা ব্যবহার করেও আয়োজন করা যেতে পারে ছোট্ট একটি মিলনমেলার। Google Maps দিয়ে জায়গা ঠিক করা, Google Calendar দিয়ে সময় নির্ধারণ, Google Translate দিয়ে খাবারের নাম বিভিন্ন ভাষায় লেখা কিংবা YouTube-এ অনুষ্ঠানের জন্য গান বাছাই সব মিলিয়ে প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করেই তৈরি হতে পারে একটি মজার আয়োজন।
ঘরে বসে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিতে চাইলে Google Earth-এ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে দেখা যেতে পারে। এমন কোনও জায়গাও বেছে নিতে পারেন, যার নাম উচ্চারণ করাই কঠিন। ওয়েলসের দীর্ঘ নামের শহর Llanfairpwllgwyngyllgogerychwyrndrobwllllantysiliogogogoch-এর (লানভেয়ারপুলগুইঙ্গিলগোগেরিখউর্নড্রোবুল্লান্টিসিলিওগোগোগোখ)মতো জায়গার নাম সঠিকভাবে বলার চেষ্টাও বন্ধুদের মধ্যে মজার প্রতিযোগিতা তৈরি করতে পারে।
সৃজনশীল কিছু করতে চাইলে আয়োজন করা যায় নিজস্ব Google Doodle তৈরির প্রতিযোগিতা। প্রত্যেকে নিজের মতো করে গুগলের লোগোর নতুন নকশা আঁকবেন। কারও ভাবনায় থাকবে বাংলাদেশের উৎসব, কারও নকশায় ফুটে উঠবে প্রযুক্তি, আবার কেউ তৈরি করতে পারেন একেবারেই হাস্যকর কোনও ডুডল। শেষে সেরা নকশাটি বেছে নেওয়া যেতে পারে।
গুগল অ্যাসিস্ট্যান্টকে নিয়েও করা যায় মজার আয়োজন। সাধারণ প্রশ্নের বদলে অদ্ভুত কিংবা কল্পনাপ্রবণ প্রশ্ন করে দেখা যেতে পারে কী উত্তর পাওয়া যায়। বন্ধুদের মধ্যে পালা করে প্রশ্ন করে সবচেয়ে মজার উত্তরটি খুঁজে বের করাও হতে পারে এক ঘণ্টার বিনোদন।
দিনটির স্মৃতি ধরে রাখতে নিজের ভবিষ্যৎ সংস্করণের কাছেও একটি ই-মেইল লেখা যায়। আগামী কয়েক বছরে নিজের জীবন কোথায় দেখতে চান, এখনকার কোন বিষয়গুলো মনে রাখতে চান কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে কী কী অনুমান করছেন—এসব লিখে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য রেখে দিতে পারেন। পরে সেই বার্তা হাতে এলে নিজের পুরোনো ভাবনার সঙ্গে বাস্তবতার তুলনা করাও হবে বেশ মজার অভিজ্ঞতা।
Google Street View ব্যবহার করে আয়োজন করা যেতে পারে আরেকটি খেলা। আগে থেকেই কয়েকটি দৃশ্য ঠিক করে নিতে হবে। যেমন নির্দিষ্ট রঙের গাড়ি, অদ্ভুত কোনও স্থাপনা বা বিশেষ কোনও দৃশ্য। এরপর সবাই মিলে Street View-এ সেগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করবেন। যে সবার আগে নির্ধারিত দৃশ্যগুলো খুঁজে পাবেন, তিনিই বিজয়ী।
রান্নাঘরেও আসতে পারে গুগল ডটকম দিবসের ছোঁয়া। গুগলে খুঁজে বের করুন এমন কোনও অচেনা বা ব্যতিক্রমী রেসিপি, যা আগে কখনও রান্না করেননি। এরপর পরিবারের সদস্য বা বন্ধুদের নিয়ে সেটি তৈরি করে স্বাদ পরীক্ষা করা যেতে পারে। কে সবচেয়ে মজার রেসিপি খুঁজে পেলেন, সেটিও হতে পারে প্রতিযোগিতার বিষয়।
প্রযুক্তি আমাদের জীবনযাত্রাকে কীভাবে বদলে দিয়েছে, সেটি ফিরে দেখারও একটি উপলক্ষ হতে পারে গুগল ডটকম দিবস। একসময় যে তথ্য খুঁজতে বই, পত্রিকা বা পরিচিতজনের সাহায্য নিতে হতো, এখন তার অনেকটাই কয়েক সেকেন্ডে পাওয়া যায়। সেই পরিবর্তনের গল্প মনে করিয়ে দেওয়াই এই দিবসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক।