সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট। সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর উৎসে কর বা অগ্রিম করের হার দ্বিগুণ করে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছে সরকার। ফলে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর নির্ভরশীল লাখো মধ্যবিত্ত পরিবার ও পেনশনভোগী আগের তুলনায় কম অর্থ হাতে পাবেন।
জাতীয় সংসদে উত্থাপিত অর্থবিল-২০২৬ অনুযায়ী, সঞ্চয়পত্রের মুনাফা উত্তোলনের সময় এখন থেকে ১০ শতাংশ হারে অগ্রিম কর কেটে রাখা হবে। এর আগে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর ৫ শতাংশ হারে উৎসে কর কাটা হতো এবং সেটিকেই চূড়ান্ত কর দায় হিসেবে গণ্য করা হতো। নতুন প্রস্তাবে সেই ব্যবস্থা বাতিল করে উৎসে কর্তিত করকে ‘অগ্রিম কর’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
মুনাফা কমে যাবে হাতে পাওয়া অর্থ
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, পরিবার সঞ্চয়পত্রে সাড়ে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বার্ষিক মুনাফার হার বর্তমানে ১১ দশমিক ৯৩ শতাংশ। প্রতি এক লাখ টাকার বিপরীতে একজন বিনিয়োগকারী মাসে মুনাফা পান প্রায় ৯৯৪ টাকা।
এতদিন ৫ শতাংশ কর কাটার পর হাতে থাকত প্রায় ৯৪৫ টাকা। নতুন নিয়ম কার্যকর হলে ১০ শতাংশ কর কেটে নেওয়ার ফলে হাতে পাওয়া অর্থ নেমে আসবে ৯০০ টাকারও নিচে। অর্থাৎ একই বিনিয়োগে মাসিক আয় আরও কমে যাবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীদের বড় অংশই অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, গৃহিণী এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য। তাঁদের অনেকেই নিয়মিত মুনাফার অর্থ দিয়ে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটান। ফলে করের হার বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি তাঁদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর পড়বে।
মধ্যবিত্তের ওপর বাড়বে চাপ
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ মনে করেন, এই সিদ্ধান্ত মধ্যবিত্তের জন্য নতুন চাপ তৈরি করবে।
তিনি বলেন, “দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি বড় অংশ সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর নির্ভরশীল। করের হার দ্বিগুণ হওয়ায় তাঁদের হাতে কম অর্থ যাবে। মূল্যস্ফীতির চাপে এমনিতেই পরিবারগুলোর ব্যয় বেড়েছে। এ অবস্থায় সঞ্চয়পত্রের আয় কমে গেলে তারা আরও সংকটে পড়বে। মধ্যবিত্তকে স্বস্তি দিতে এই অতিরিক্ত কর পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।”
কী পরিবর্তন আনছে অর্থবিল
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, অর্থবিল-২০২৬-এর মাধ্যমে আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৬৩ ধারা সংশোধন করা হয়েছে। সংশোধিত বিধানে উৎসে করকে অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করা হবে এবং এতদিনের চূড়ান্ত কর দায়ের ব্যবস্থা তুলে দেওয়া হবে।
এর ফলে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে ১০ শতাংশ কর কেটে রাখা হলেও বছর শেষে আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় প্রকৃত কর দায়ের সঙ্গে সমন্বয়ের সুযোগ থাকবে। যদি কোনো করদাতার কাছ থেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কর কেটে রাখা হয়, তাহলে তিনি ফেরতের আবেদন করতে পারবেন।
এনবিআর জানিয়েছে, ব্যাংক হিসাব নম্বর উল্লেখ করে আবেদন করলে যাচাই-বাছাই শেষে সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে অতিরিক্ত অর্থ ফেরত দেওয়া হবে।
যারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন
তবে বাস্তবতায় একটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে। সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারী বিপুলসংখ্যক মানুষ করদাতা নন। তাঁদের অনেকের কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) নেই এবং বার্ষিক আয়ও করযোগ্য সীমার মধ্যে পড়ে না। ফলে তাঁরা আয়কর রিটার্নও জমা দেন না।
নতুন ব্যবস্থায় তাদের মুনাফা থেকেও ১০ শতাংশ হারে কর কেটে রাখা হবে। কিন্তু রিটার্ন না দেওয়ার কারণে সেই অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগও কার্যত সীমিত হয়ে যাবে। ফলে এই শ্রেণির বিনিয়োগকারীদের জন্য করের বোঝা স্থায়ীভাবেই বেড়ে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সঞ্চয়পত্রে কারা বিনিয়োগ করেন
বর্তমানে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের আওতায় চার ধরনের সঞ্চয়পত্র চালু রয়েছে। এগুলো হলো— পরিবার সঞ্চয়পত্র, পেনশনার সঞ্চয়পত্র, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র।
পরিবার সঞ্চয়পত্র ছাড়া অন্য সব ধরনের সঞ্চয়পত্রে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান উভয়ই বিনিয়োগ করতে পারে। বর্তমানে বিভিন্ন সঞ্চয়পত্রে মেয়াদভেদে মুনাফার হার ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।
সরকারের অবস্থান কী
সঞ্চয়পত্রে কর বৃদ্ধির বিষয়ে বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করা হলে অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জমান মজুমদার বলেন, “এবারের বাজেটে সঞ্চয়পত্র নিয়ে নতুন কোনো নীতি গ্রহণ করা হয়নি।”
তবে অর্থবিলের প্রস্তাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কর আদায়ের পদ্ধতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে ৫ শতাংশ কর কেটে বিষয়টি সেখানেই শেষ হয়ে যেত। এখন করের হার ১০ শতাংশ করা হয়েছে এবং সেটিকে অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
রাজস্ব বাড়ানো নাকি সঞ্চয়ে নিরুৎসাহ?
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের উদ্দেশ্য হতে পারে কর ব্যবস্থাকে আরও সমন্বিত ও রিটার্নভিত্তিক করা। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায় বাড়ানোরও একটি প্রচেষ্টা রয়েছে। কিন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ব্যাংক আমানতের তুলনায় সঞ্চয়পত্রের ওপর মধ্যবিত্তের নির্ভরতার বাস্তবতায় এই সিদ্ধান্ত সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে।
বিশেষ করে যেসব পেনশনভোগী ও মধ্যবিত্ত পরিবার মাসিক মুনাফার অর্থ দিয়ে সংসার চালান, তাদের জন্য কর বৃদ্ধির এই প্রস্তাব সরাসরি আয় কমিয়ে দেবে। ফলে বাজেটের এই পদক্ষেপ আগামী দিনে সবচেয়ে বেশি আলোচনার বিষয়গুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে।