আজ ২৯ অক্টোবর, বিশ্ব স্ট্রোক দিবস। স্ট্রোক সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে প্রতি বছর এ দিনটি পালন করা হয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য—‘প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ’। ২০০৬ সালে বিশ্ব স্ট্রোক সংস্থা প্রতিষ্ঠার পর থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
স্ট্রোক এমন একটি গুরুতর স্বাস্থ্যসমস্যা, যেখানে মস্তিষ্কের কোনও অংশে রক্ত সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয় অথবা রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ ঘটে। দ্রুত চিকিৎসা না পেলে এতে মৃত্যু কিংবা স্থায়ী পঙ্গুত্বের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ স্ট্রোক। একই সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেও স্ট্রোক ও হৃদরোগে মৃত্যু নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
দেশে স্ট্রোকের ভয়াবহ চিত্র
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ২০ লাখ মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত। তাদের মধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ দীর্ঘমেয়াদি পঙ্গুত্ব নিয়ে বেঁচে আছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ২০২২ সালের একটি জাতীয় জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি এক হাজার মানুষের মধ্যে স্ট্রোকের প্রাদুর্ভাব ১১ দশমিক ৩৯ জন। আক্রান্তদের ৭৫ শতাংশের বেশি ইস্কেমিক স্ট্রোকে ভুগছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভাগভিত্তিক হিসাবে ময়মনসিংহে এ হার বেশি এবং শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে স্ট্রোকের প্রাদুর্ভাব বেশি বলে দাবি করা হয়েছে।
হৃদরোগ ও স্ট্রোকের সম্মিলিত প্রভাব পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে হৃদরোগে ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যা দৈনিক গড়ে প্রায় ৭৭৭ জন। বিশ্বজুড়েও স্ট্রোক মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। বিশ্ব স্ট্রোক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, স্ট্রোকের অধিকাংশ ঝুঁকির কারণ প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
প্রবাসী শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি
দেশের বাইরে কর্মরত বাংলাদেশিদের মধ্যে স্ট্রোক ও হৃদরোগে মৃত্যু নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪ হাজার ৬০ জন প্রবাসী শ্রমিকের মরদেহ দেশে এসেছে। এ হিসাবে দৈনিক গড়ে ১৪ জনের বেশি প্রবাসীর মরদেহ দেশে ফিরেছে। এর মধ্যে সৌদি আরব থেকে এসেছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মরদেহ।
প্রবাসী শ্রমিকদের মৃত্যুর বড় একটি অংশকে নথিপত্রে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ হিসেবে উল্লেখ করা হয় বলে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এসব মৃত্যুর কতটি হৃদরোগ বা স্ট্রোকের কারণে হয়েছে, তা নিশ্চিত করতে নির্ভরযোগ্য ও বিস্তারিত পরিসংখ্যান প্রয়োজন।
চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত গরমে দীর্ঘক্ষণ কাজ করা, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকা, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, ধূমপান ও মানসিক চাপ—এসব কারণে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে প্রবাসী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, বিশ্রামের অভাব এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেসের সহকারী অধ্যাপক ডা. হুমায়ুন কবীর হিমু বলেন, স্ট্রোকের ক্ষেত্রে সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই। অনেক সময় রোগীর পরিবারের সদস্যরা শুরুতে বুঝতে পারেন না যে তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন। কেউ কেউ বাড়িতে অপেক্ষা করেন কিংবা প্রচলিত চিকিৎসার ওপর নির্ভর করেন। এতে কার্যকর চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ কমে যেতে পারে। তাই স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, স্ট্রোকের প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে মুখ বেঁকে যাওয়া, এক হাত বা পা দুর্বল হয়ে পড়া এবং কথা জড়িয়ে যাওয়া। এসব লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে জরুরি বিভাগে যেতে হবে। নিজে থেকে ওষুধ না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা জীবন বাঁচাতে এবং স্থায়ী পঙ্গুত্বের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রতিরোধে সচেতনতা জরুরি
বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ রক্তচাপ স্ট্রোকের অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ। নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ, ধূমপান বর্জন, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং পর্যাপ্ত ঘুম স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।
স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। তাই লক্ষণ শনাক্ত করা, দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো এবং যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করাই হতে পারে জীবন বাঁচানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।