হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহের ডেগ সিলগালা করার ইস্যুতে কথা বলায় সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিউক) চেয়ারম্যান মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদীকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় মঙ্গলবার (২৩ জুন) সন্ধ্যায় সিলেট বিমানবন্দর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তিনি। বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সহিদুর রহমান বিষয়টি বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘সিউক চেয়ারম্যানকে হুমকির বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ ব্যাপারে কয়েস লোদী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ফেসবুকের একাধিক অ্যাকাউন্ট থেকে আমাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। মাজারের ইস্যুতে কথা বলায় এ ধরনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। পাশাপাশি যেসব আইডি থেকে হুমকি দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর লিংক পুলিশ কমিশনারের কাছে পাঠিয়েছি।’
হজরত শাহজালালের মাজারের দানবাক্স ও দানের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে জেলা প্রশাসনের পদক্ষেপ এবং জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের প্রত্যাহারকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। ওই সময় কিছু ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে কয়েস লোদীর একটি বক্তব্যের সমালোচনাও করা হয়। কেউ কেউ উগ্র ভাষায় মন্তব্যও করেছেন এবং হুমকি দিয়েছেন।
মাজারের দানবাক্স জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সিলগালা করার পর প্রতিক্রিয়ায় কয়েস লোদী বিভিন্ন গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘মাজারের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উদ্যোগকে সমর্থন করি। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সঙ্গে নিয়ে কাজটি করা হলে তা আরও সম্মানজনক হতো।’
হজরত শাহজালালের মাজারে থাকা দানের তিনটি ডেগ ১৮ জুন সিলগালা করেছিল জেলা প্রশাসন। এর বদলে জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় দানবাক্স স্থাপন করা হয়েছিল। পরদিন কয়েকটি গণমাধ্যমকে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন কয়েস লোদী। এই বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রকাশের পর থেকেই তাকে সমালোচনা শুরু হয়। হত্যার হুমকির সঙ্গে ওই বিতর্কের কোনও সম্পর্ক রয়েছে কিনা, সে বিষয়ে নিশ্চিত না হলেও সম্ভাবনার কথা উড়িয়ে দেননি কয়েস লোদী।
তিনি বলেন, ‘আমি জানি না কী কারণে এমন হুমকি দেওয়া হচ্ছে। গত কয়েকদিন ধরে আমাকে নিয়ে ফেসবুকে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। কেন বারবার আমাকেই টার্গেট করা হচ্ছে, সেটাও বুঝতে পারছি না। ডিসি নিয়োগ বা প্রত্যাহারের বিষয়টি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ার। অথচ এসব ঘটনার জন্যও আমাকে দায়ী করা হচ্ছে।’
মাজারের আয়-ব্যয়ের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন যে উদ্যোগ নিয়েছিল, তখন নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি শুধু বলেছি, মাজার কর্তৃপক্ষও স্বচ্ছতার পক্ষে। তাদের সঙ্গে আলোচনা করেই কাজটি করা যেতো। আমি ডিসি হলে এভাবেই করতাম। এই মন্তব্য করার পর থেকে হত্যার হুমকি পাচ্ছি। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত ১২ জুন সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার পরিদর্শনে যান। এ সময় তিনি মাজারের আয় ও ব্যয়ের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দেন। এরই অংশ হিসেবে ১৮ জুন মাজারে থাকা আগের দানবাক্স সিলগালা করে নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয়। পাশাপাশি মাজারে মানুষের দানের নগদ অর্থ ও অন্যান্য সামগ্রী রাখার জন্য থাকা ঐতিহাসিক তিনটি দানের ডেগ সিলগালা করা হয়। প্রশাসনের দাবি ছিল, মাজারের অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনার লক্ষ্যেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তবে এ ঘটনায় মাজার-সংশ্লিষ্টদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। তারা প্রশাসনের হস্তক্ষেপের সমালোচনা করেন। এরই মধ্যে গত রবিবার জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। তার প্রত্যাহারের প্রতিবাদে রবিবার ও সোমবার সিলেটে বিক্ষোভ কর্মসূচিও পালিত হয়।
সোমবার দুপুরে মাজারের সিলগালা করা তিনটি ডেগের তালা খুলে দেন সারওয়ার আলম। একইসঙ্গে জেলা প্রশাসনের স্থাপন করা দানবাক্সগুলো খুলে গত চার দিনে জমা হওয়া অর্থ গণনার কাজ শুরুর নির্দেশ দেন। এরপর মাজার প্রাঙ্গণে প্রকাশ্যে দানের টাকা গণনার কার্যক্রম শুরু হয়। গণনা শেষে দেখা গেছে, সিলগালা করা তিনটি ডেগ ও দানবাক্স স্থাপনের চার দিনে মোট ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা জমা পড়েছে। আরও পাওয়া গেছে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কার ও ডলার-পাউন্ড এবং চিঠি।
এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন সিলেট জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত ওয়াকফ পরিদর্শক মো. সজল মিয়া। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চার ঘণ্টাব্যাপী গণনা শেষে আমরা ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা পেয়েছি। পাশাপাশি দানবাক্সে টাকার সঙ্গে সাত আনা স্বর্ণ ও বৈদেশিক মুদ্রাও পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে রিয়াল, ডলার, পাউন্ড এবং স্বর্ণের চেইন, আংটিসহ ছোট ছোট স্বর্ণের টুকরো। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি চিঠিও পেয়েছি।’
মাজারের প্রায় ৭০৭ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সোমবার দুপুর ২টায় জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে প্রকাশ্যে খোলা হয় মাজারের দানবাক্সগুলো। জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পুলিশ প্রশাসন এবং বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের উপস্থিতিতে দানবাক্স সিলগালা করে দরগাহ মসজিদের সামনে গণনার জন্য নেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় টাকা গণনা। গণনার কাজে আধুনিকতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে গণনা মেশিন ব্যবহার করা হয়। মোট ৩৬ জন স্বেচ্ছাসেবক এবং দরগাহ মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা গণনার কাজে সহযোগিতা করেন। পুরো প্রক্রিয়াটি তদারকি করেন জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তা। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রাপ্ত এই অর্থ পরবর্তীতে কীভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা করা হবে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করবে।
জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা ও মাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরাণ (রহ.)-এর মাজারের দীর্ঘদিনের চেনা আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম। তার এই পদক্ষেপের পর দেশজুড়ে যেমন প্রশংসা ও নানামুখী আলোচনার ঝড় ওঠে, তেমনি তৈরি হয় বিতর্কও। এরই মধ্যে রবিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে মো. সারওয়ার আলমকে সিলেটের জেলা প্রশাসকের পদ থেকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসেবে সংযুক্ত করা হয়। মাজারের দানবাক্সে হাত দেওয়ার পরপরই ডিসির এমন আকস্মিক বদলি হয়েছে বলে অনেকে মন্তব্য করেছেন।
সবশেষ সিলেটের মানুষকে বিদায় জানিয়ে বিদায় নিয়েছেন জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম। মঙ্গলবার দুপুরে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে তিনি সিলেটকে বিদায় জানান।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বেসরকারি ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে মঙ্গলবার বিকাল ৩টার ফ্লাইটে সিলেট ছেড়েছেন সারওয়ার আলম। এয়ারলাইন্সের সিলেটের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার সৈয়দ বেলায়েত হোসেন লিমন বাংলা ট্রিবিউনকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।