যুক্তরাজ্যে অভিবাসীদের দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের (আইএলআর) ভবিষ্যৎ নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিবর্তনের বার্তা দিয়ে মঙ্গলবার (২৩ জুন) একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ হাউস অব লর্ডসের জাস্টিস অ্যান্ড হোম অ্যাফেয়ার্স কমিটি এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভিবাসন-সংক্রান্ত নথিপত্রের মারাত্মক ত্রুটি ও তথ্যের ঘাটতির তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে উন্মোচিত হয়েছে যে, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে দেশত্যাগ করা বহু অভিবাসীর কোনও প্রস্থানের তথ্য সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে নেই। ফলে দেশটিতে বর্তমানে ঠিক কতজন অভিবাসী অবস্থান করছেন, তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিতভাবে জানেই না।
যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাসের যোগ্যতা অর্জনের প্রচলিত সময়সীমা ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করার একটি সরকারি পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সর্বদলীয় এই সংসদীয় কমিটি। শুধু তাই নয়, যারা ইতোমধ্যে স্থায়ী বসবাসের উদ্দেশ্যে বৈধভাবে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন, তাদের ক্ষেত্রে এই নিয়মটি পেছনের তারিখ থেকে বা ভূতাপেক্ষভাবে কার্যকর করার সরকারি প্রস্তাবকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে কমিটি। হাউস অব লর্ডসের এই কমিটি সরকারের এমন উদ্যোগকে স্পষ্টতই অন্যায্য এবং বৈষম্যমূলক বলে আখ্যায়িত করেছে।
পার্লামেন্টের এই বিস্তারিত রূপরেখায় দক্ষ কর্মী, কেয়ার ওয়ার্কার এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের ব্রিটিশ সমাজে স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে সাজানোর জন্য বেশ কিছু বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
ভবিষ্যতের জন্য কমিটির প্রধান সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে, পরিবারের যৌথ আয়ের ওপর ভিত্তি করে মূল আবেদনকারীর সঙ্গেই যেন নির্ভরশীল ভিসা ধারীরা একই সময়ে স্থায়ী বসবাসের আবেদন করতে পারেন। এ ছাড়া যে সব শিশুরা অল্প বয়সে যুক্তরাজ্যে এসেছে এবং সেখানেই বড় হয়েছে, তারা ১৮ বছর বয়সে পদার্পণ করলেই যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থায়ী বসবাসের মর্যাদা বা সেটেল্ড স্ট্যাটাস পায়, সেই সুপারিশও করা হয়েছে। একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর বৈষম্য ও শোষণ দূর করতে নির্দিষ্ট কোনও কোম্পানির স্পনসরশিপের সঙ্গে ভিসাকে আটকে না রেখে, সামগ্রিকভাবে একটি নির্দিষ্ট কর্মসংস্থান খাতের সঙ্গে ভিসাকে যুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
নীতিপ্রণেতারা সতর্ক করে বলেছেন, অভিবাসীদের সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকরণের এই কৌশলগুলো বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে তা স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক উত্তেজনা ও বিশৃঙ্খলা বাড়িয়ে তুলতে পারে। উদাহরণ হিসেবে তারা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্টোকপোর্ট ও এপিং-এ ঘটে যাওয়া নাগরিক অসন্তোষের কথা উল্লেখ করে একে স্থানীয় প্রশাসনের সঠিক পরিকল্পনার অভাবের একটি ঐতিহাসিক প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার বর্তমানে অভিবাসন নীতি সংস্কারের এই লড়াইয়ে স্পষ্টতই দুই ভাগে বিভক্ত। জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতারা দাবি তুলেছেন যে, যেকোনো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর তড়িঘড়ি করে প্রতিক্রিয়াশীল নীতি তৈরি করার এই ধারা এবার বন্ধ হওয়া উচিত।
হাউস অব লর্ডসের এই নতুন প্রতিবেদনটি সামনে আসার পর যুক্তরাজ্যের কর্পোরেট খাত এবং আন্তর্জাতিক পেশাদারদের কর্মসংস্থানের আইনি কমপ্লায়েন্স ও স্থায়ী বসবাসের প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। যদিও কমিটির একটি সংখ্যালঘু অংশ দেশের আর্থিক চাপের কথা বিবেচনা করে স্থায়ী বসবাসের সময়সীমা বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছিল, তবে কমিটির সিংহভাগ সদস্য এর তীব্র বিরোধিতা করেন। বিশেষ করে, যারা ইতোমধ্যে স্থায়ী সেটেলমেন্টের পথে রয়েছেন, তাদের অধিকার সুরক্ষায় কমিটি দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে।
এ ছাড়া এই রূপরেখায় নিয়োগকর্তা বা ব্যবসায়ীদের সুরক্ষার কথাও বিবেচনা করা হয়েছে। কোনও অত্যন্ত দক্ষ কর্মী যদি তার খাতের মধ্যে এক কোম্পানি ছেড়ে অন্য কোম্পানিতে চলে যান, তবে নতুন নিয়োগকর্তাকে পূর্বের স্পনসরশিপ খরচের একটি নির্দিষ্ট অংশ ফেরত দেওয়ার নমনীয় ব্যবস্থার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন দক্ষ কর্মীরা কর্মক্ষেত্র পরিবর্তনের স্বাধীনতা পাবেন, অন্যদিকে ব্যবসায়ীরাও আর্থিক ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাবেন।