প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে ০.২ শতাংশ হারে অগ্রিম কর (এটিএ) আরোপের প্রস্তাব প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা। তাদের মতে, দেশের বিপুলসংখ্যক খুচরা বিক্রেতা এখনও কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) ও ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর (বিন)-এর বাইরে থাকায় এই কর বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হবে এবং আনুষ্ঠানিক খাতের ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ বাড়বে।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেটে করের ন্যায্যতা’ শীর্ষক সংলাপে ব্যবসায়ী নেতারা এসব অভিমত তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করে ক্রিশ্চিয়ান এইড।
সংলাপে কামরান টি রহমান বলেন, দেশের অর্থনীতির প্রায় ৮৫ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতনির্ভর। বিপুলসংখ্যক খুচরা বিক্রেতার টিআইএন না থাকায় পণ্য সরবরাহের সময় ০.২ শতাংশ অগ্রিম কর কেটে রাখা হলে তা কার নামে জমা হবে, সে বিষয়ে জটিলতা দেখা দেবে। তিনি বলেন, বিদ্যমান ১ শতাংশ টার্নওভার করের পাশাপাশি নতুন এই অগ্রিম কর আনুষ্ঠানিক খাতের করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত ব্যয় চাপিয়ে দেবে।
মোহাম্মদ হাতেম বলেন, তৈরি পোশাক রফতানির জন্য স্থানীয় বাজার থেকে বিভিন্ন পণ্য ও উপকরণ সংগ্রহ করা হয়। রপ্তানির সময় সরকার কর আদায় করে থাকে। এরপরও খুচরা বিক্রেতাদের ওপর আরোপিত ০.২ শতাংশ কর রপ্তানিকারকদের মাধ্যমে আদায় করা হলে তারা কার্যত কর সংগ্রাহকের ভূমিকায় পরিণত হবেন, যা গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি সাব-কন্ট্রাক্ট বা ঠিকা কাজের ওপর প্রস্তাবিত করেরও বিরোধিতা করেন। তার ভাষ্য, ছোট উদ্যোক্তারা শ্রমিক ধরে রাখতে অনেক সময় সীমিত পরিসরে সাব-কন্ট্রাক্টের কাজ করেন। এ ধরনের কাজের ওপর ৩ থেকে ৫ শতাংশ কর আরোপ করা হলে অনেকে তথ্য গোপন করতে উৎসাহিত হবেন। এ ক্ষেত্রে করহার ১ শতাংশে নির্ধারণের দাবি জানান তিনি।
তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর নীতি সদস্য মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, নিয়মিত করদাতাদের ওপর চাপ না বাড়িয়ে করভিত্তি সম্প্রসারণই সরকারের লক্ষ্য। সে উদ্দেশ্যে পণ্য সরবরাহকারী ও খুচরা বিক্রেতাদের কর ব্যবস্থার আওতায় আনা হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রতি হাজার টাকায় মাত্র ২ টাকা কর কাটা হবে, যার মাধ্যমে বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নেই; বরং সবাইকে কর ব্যবস্থার মধ্যে আনা হচ্ছে।
সংলাপে অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের ওপর কর আরোপের সমালোচনা করেন প্রীতি চক্রবর্তী। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে মেডিকেল কলেজগুলোর করহার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হলেও অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের ওপর করের বোঝা বহাল রাখা হয়েছে, যা ন্যায়সঙ্গত নয়। এসব প্রতিষ্ঠান ব্যাংক ঋণও পায় না।
স্নেহাশীষ বড়ুয়া ব্যক্তিগত আয়করের ৫ শতাংশ স্ল্যাব পুনর্বহালের দাবি জানিয়ে বলেন, এটি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত করদাতাদের জন্য স্বস্তি বয়ে আনতে পারত। একই সঙ্গে করপোরেট করহার বেড়ে কার্যকরভাবে আরও বেশি হয়ে যাওয়ায় মূলধন পাচারের ঝুঁকি এবং নতুন বিনিয়োগে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ করদাতাদের সেবা বাড়াতে উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত ট্যাক্স ক্যাম্প বা কর মেলার আয়োজনের পরামর্শ দেন। অন্যদিকে রিজওয়ান রাহমান বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তি সহজ করার মতো কার্যকর উদ্যোগের প্রতিফলন দেখা যায়নি।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। বক্তারা কর ব্যবস্থায় ন্যায্যতা নিশ্চিত, করদাতার হয়রানি কমানো এবং করভিত্তি সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।