ঢাকাTuesday , 14 July 2026
  1. অন্যান্য
  2. আবহাওয়া
  3. খেলা
  4. চাকরি
  5. জীবনযাপন
  6. তথ্যপ্রযুক্তি
  7. প্রেস রিলিজ
  8. বাণিজ্য
  9. বাংলাদেশ
  10. বিনোদন
  11. বিশ্ব
  12. ভিডিও
  13. মতামত
  14. রাজনীতি
  15. শিক্ষা
আজকের সর্বশেষ সবখবর

স্মৃতির প্রত্নতত্ত্ব ও একটি নাগরিক সভ্যতার রূপান্তর

UttorbongoBD
July 14, 2026 3:15 pm
Link Copied!


বাংলা সাহিত্যে আত্মজৈবনিক স্মৃতিকথার ধারাটি বেশ সমৃদ্ধই বলা চলে। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব বসু, শামসুর রাহমান বা আল মাহমুদের স্মৃতিকথায় আমরা নির্দিষ্ট কালখণ্ডে শহরের রূপান্তর দেখেছি। জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আরিফ এই ধারাতেই যুক্ত করেছেন আশি ও নব্বইয়ের দশকের স্বাধীনতা-উত্তর ঢাকা শহরকে, যা একই সাথে নস্টালজিক এবং বোধহয় খানিকটা রাজনৈতিক।

‘রোদের ঘ্রাণ আর বাতাসের রং: ফেলে আসা শহর ঢাকায় দিনযাপন’ বইটির নামকরণের মধ্যেই এক ধরনের ‘সিনেস্থেসিয়া’ বা ইন্দ্রিয়বিপর্যয় রয়েছে। রোদ তো দেখার জিনিস, কিন্তু লেখক তার ‘ঘ্রাণ’ পাচ্ছেন, আবার বাতাস তো স্পর্শ বা অনুভবের বিষয়, কিন্তু লেখক তাতে ‘রং’ দেখছেন। এই অবচেতন মনস্তত্ত্বই বলে দেয়, লেখক যে ঢাকাকে খুঁজছেন তা আজ আর চাক্ষুষ বাস্তবতায় নেই, তা এখন কেবলই আমাদের পঞ্চেন্দ্রিয়ের স্মৃতিতে বেঁচে আছে। 

সাহিত্যের দৃষ্টিকোণ থেকে বইটিকে বিচার করতে গেলে তিনটি প্রধান দিক উন্মোচিত হয়। প্রথমত, বস্তুগত সংস্কৃতির বিবর্তন। লেখক তার টুকরো টুকরো স্মৃতিকথায় যেসব অনুষঙ্গ এনেছেন—ডাকটিকিট, ভিউকার্ড, মিক্সড ক্যাসেট, ভিসিআর, কমিকস, লিটল ম্যাগাজিন কিংবা সেবা প্রকাশনী। এগুলো কেবল কিছু জড়বস্তু ছিল না। এগুলো ছিল তৎকালীন মধ্যবিত্ত সমাজের মনন ও আবেগের বাহন। ফরাসি চিন্তাবিদ রোলঁ বার্ত তার বিখ্যাত ‘মিথোলজিস’ বইয়ে দেখিয়েছিলেন পুঁজিবাদী সমাজে প্রাত্যহিক খুব সাধারণ বস্তু বা আচরণও কীভাবে মানুষের অবচেতন মনে এক একটা গভীর ‘মিথ’ বা সামাজিক সংকেত হয়ে ওঠে। তিনি ফরাসি গাড়ি, সাবান বা মদের বোতলের ভেতরের লৈঙ্গিক ও শ্রেণিগত প্রতীকী রূপ দেখাতেন। জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আরিফ তার বইয়ে ঠিক এই কাজটিই করেছেন ঢাকার মধ্যবিত্তের প্রেক্ষাপটে। লেখক কোনো তাত্ত্বিক কচকচানি ছাড়াই নেহাত গল্পের ছলে এসব বিষয়কে এমন এক জাদুকরী আলোয় দেখিয়েছেন যে এগুলো আশি ও নব্বইয়ের দশকের বাঙালি মধ্যবিত্তের মননের প্রতীকী ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে।

বইটির দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্থানিক মনস্তত্ত্ব বা ‘সাইকোজিওগ্রাফি’। বইটির নানা চ্যাপ্টারে উঠে এসেছে তৎকালীন ঢাকার পাড়া সংস্কৃতি, বাড়ির ভেতর ছোট একটু আঙিনা, একচিলতে খোলা বারান্দা, পুরানো দিনের চাইনিজ রেস্টুরেন্ট, বিউটিপার্লার, দিগুবাবুর বাজার, পুকুর আর পাড়ার দোকানের কথা—এসবের মধ্য দিয়ে লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক পরিবেশ মানুষের মানসিক গড়ন তৈরি করে। মানুষ যে পরিবেশে বাস করে, যে বাড়িঘর বা গলিতে বড় হয়, তারই একটা গভীর ছাপ তার মনের ওপর পড়ে, সাহিত্যের ভাষায় একেই বলা হয় ‘সাইকোজিওগ্রাফি’ বা স্থানিক মনস্তত্ত্ব। আশি বা নব্বইয়ের দশকের ঢাকার স্থাপত্যে যে একটা ছোট আঙিনা, খোলা ছাদ কিংবা পাড়ার মাঝে একটা চেনা পুকুর থাকত, তা মানুষের ভেতরের সংকীর্ণতাকে দূর করে মনকে এক অদ্ভুত উদারতা দিত; কারণ মানুষ তখন আকাশ দেখতে পেত, মাটির স্পর্শ পেত। এই খোলামেলা ভৌগোলিক পরিবেশেরই অবধারিত ফল ছিল প্রতিবেশীর সাথে সুখে-দুঃখে এক হয়ে মিলেমিশে থাকা, উৎসবে-পার্বণে সুজি বা হালুয়ায় বাটি চালাচালি করা কিংবা শুক্রবার সন্ধ্যায় ড্রইংরুমে পুরো পাড়ার মানুষ মিলে বিটিভির নাটক দেখা। কিন্তু নতুন শতাব্দীর ক্রান্তিলগ্নে এসে যখন এই চেনা পাড়াগুলো বহুতল ফ্ল্যাট বাড়িতে রূপ নিল, যখন আকাশ ঢাকা পড়ল কংক্রিটে আর মানুষের হাতে এলো ইন্টারনেট, তখন শুরু হলো ‘পৃথিবীর সন্ধ্যা’ অর্থাৎ এক মায়াবী যৌথ সভ্যতার অবসান। লেখকের দেখানো এই রূপান্তরকে যখন আমরা সাহিত্যিক চোখে দেখি, তখন বুঝতে পারি লেখকের এই হাহাকার কেবল তার হারিয়ে যাওয়া শৈশবের জন্য কোনো ব্যক্তিগত কান্না নয়; এটি আসলে আধুনিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার এক নির্মম সত্য, যেখানে প্রগতির নামে মানুষকে তার চেনা মাটি, চেনা মানুষ থেকে আলাদা করে এক একটা চারকোনা ফ্ল্যাটের খাঁচায় বন্দি করে ফেলা হয়েছে। মার্ক্সীয় দর্শনে যাকে বলা হয় ‘এলিয়েনেশন’ বা বিচ্ছিন্নতাবোধ; আজকের মেগাসিটির মানুষ কোটি মানুষের ভিড়ে থেকেও যে তীব্র একাকিত্বে ভোগে, পাশের ফ্ল্যাটের মানুষের মরদেহ পচে গেলেও যে টের পায় না, লেখক মূলত সেই আধুনিক নাগরিকের বৈশ্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকটকেই ঢাকার চেনা অলিগলির রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে উন্মোচিত করেছেন। এই বইয়ের প্রতিটি গল্প যেন এক একটা ছোট জানালার মতো, যা দিয়ে আশি-নব্বইয়ের দশকের ঢাকার প্রাত্যহিক জীবনের সুবাস পাওয়া যায়। ‘ইফতার সেহরি আর ক্বাসিদার রমজান’ কিংবা ‘শবেবরাতের দিন-রাত’ গল্পগুলোতে আমরা দেখি এক অলৌকিক সামাজিক মেলবন্ধনের উৎসব। গভীর রাতে হারমোনিয়াম গলায় ঝুলিয়ে গেয়ে ওঠা ক্বাসিদার সুরে সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ তখনো কেউ আবিষ্কার করে উঠতে পারেনি।

আশি বা নব্বইয়ের দশকের ঢাকার চাইনিজ রেস্টুরেন্ট আজকের গ্লোবালাইজড বা অথেনটিক চাইনিজ খাবারের মতো ছিল না, তা ছিল পুরোপুরি ঢাকাইয়া মধ্যবিত্তের রুচি ও সাধ্যের রসে জারিত এক অনন্য ‘দেশি চাইনিজ’ সংস্কৃতির প্রতীক। তখনকার ঢাকার মধ্যবিত্তের জন্য চাইনিজ রেস্টুরেন্টে যাওয়া মানে কেবল খেতে যাওয়া ছিল না, তা ছিল সামাজিক মর্যাদার এক পরম উদ্‌যাপন। গাঢ় লাল বা কালচে কাঠের পার্টিশন দিয়ে ঘেরা আধো-অন্ধকার কেবিনে হালকা আলো-ছায়ার ভেতর ফিসফিসানি গল্প, মডার্ন টকিংসের শেরি শেরি লেডির মৃদুমন্দ সুর আর টেবিলে সার্ভ হওয়া খাবারের সুবাসে তৈরি হতো এক মায়াবী জগৎ। ঢাকাই চাইনিজের সেই বিশেষ সুবাস, সেই মধ্যবিত্তের প্রথম রেস্টুরেন্টে গিয়ে চামচ দিয়ে স্যুপ খাওয়ার অপটু রোমাঞ্চ আর একটি নির্দিষ্ট কালখণ্ডের একচেটিয়া স্বাদ ও গন্ধের যে চেনা ভূগোল, তা আজকের বিশ্বায়নের যুগে চিরতরে হারিয়ে গেছে, যার হাহাকার লেখক এইসব ভৌগোলিক ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য স্মৃতির মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন।

বইটির তৃতীয় অন্যতম দিক হলো এর ভাষাশৈলী ও আখ্যানের বহুমাত্রিকতা। বইটির গদ্য সরল, কিন্তু তার নিচে এক ধরনের চোরাস্রোত আছে। লেখক এখানে প্রথাগত কালানুক্রমিক আত্মজীবনী লেখেননি। তিনি ব্যবহার করেছেন ‘মেমোরি ম্যাপিং’ বা স্মৃতির মানচিত্রায়ণ পদ্ধতি। বইয়ের একেকটি অধ্যায় একেকটি ছোটগল্পের মতো স্বয়ংসম্পূর্ণ কিন্তু সবশেষে সব গল্পই এক মোহনায় এসে মিশেছে। আর সেই মোহনার নাম ‘হারিয়ে যাওয়া ঢাকা’। বিনোদন ও সংস্কৃতির জগতে লেখকের বিচরণ ছিল বহুমাত্রিক; ‘খবরের কাগজ, ম্যাগাজিন আর লিটল ম্যাগ’, ‘এক্সিবিশন, সার্কাস, হাউজি আর পুতুলনাচ’, ‘নাটক, ডিসেম্বরের ছুটি আর লঞ্চ’ কিংবা ‘যাত্রা আর রাতভর গান’ শিরোনামের স্মৃতিকথাগুলোতে সেই সময়ের বৌদ্ধিক মননের পরিচয় মেলে, যেখানে ‘চাঁদের হাট’ কিংবা ‘বিজ্ঞান ক্লাব’ তরুণদের মেধা ও মনন বিকাশের চারণভূমি ছিল। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেই পুরো ঢাকা শহর যেন এক আশ্চর্য জাদুমন্ত্রে থমকে যেত বিটিভির আকর্ষণে। ড্রইংরুমে সবাই একসাথে বসে কোনো নাটক দেখে একই সাথে হাসা বা দুঃখে একসাথে চোখের জল ফেলার যে ‘কালেক্টিভ মেমোরি’ তা পুঁজিবাদী বিচ্ছিন্নতাবোধের বিপরীতে এক অখণ্ড মানবিক সংহতির দলিল। অলস দুপুরে বালিশে বুক দিয়ে কাজীদার ‘মাসুদ রানা’, ‘কুয়াশা’ কিংবা সেবা প্রকাশনীর তীব্র রোমাঞ্চে বুঁদ হওয়ার মায়া আজ হারিয়ে গেছে, যেমন হারিয়ে গেছে ‘ভিউকার্ড’ কিংবা ‘ডাকটিকিট’ জমানোর সেই তুমুল কৈশোরিক হাহাকার। গদ্যের এই সহজ প্রকাশ কিন্তু গভীর বোধের এক পরিশীলিত রূপ দেখতে পাওয়া যায় জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আরিফের প্রকাশভঙ্গিতে। আটাশির বন্যার সেই ভয়াবহ দুর্যোগ আর মায়ের হাতের নরম, মোলায়েম পরোটার সুবাসকে যখন লেখক একই গল্পে তুলে নিয়ে আসেন, তখন প্রথাগত দুর্যোগের ভয়াবহতার চেনা বিবরণী এড়িয়ে আশ্চর্য ‘আবেগীয় সমান্তরালতা’ তৈরির এক অবিশ্বাস্য লেখনী ক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যায়।

তবে এটাও স্বীকার করতে হবে যে, বইটি কোনো কোনো জায়গায় অতি-নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত। লেখক অতীতকে যতটা রোমান্টিক ও নিষ্কলুষ আলোয় দেখিয়েছেন, আধুনিক নগরজীবনের গতি বা প্রযুক্তিকে ততটাই যেন খলনায়ক হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। কিন্তু এই একমুখী প্রবণতাকেও ক্ষমা করে দেওয়া যায়, কারণ লেখকের উদ্দেশ্য কোনো সমাজবৈজ্ঞানিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখা ছিল না; তার উদ্দেশ্য ছিল একটি হারিয়ে যাওয়া শহরের হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানিটা পাঠককে শোনানো।

‘রোদের ঘ্রাণ আর বাতাসের রং’ অবশ্যই বাংলা স্মৃতিকথার জগতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রগতির চাকা আমাদের সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু পেছনে আমরা ফেলে আসছি আমাদের মানবিকতার এক বড়ো অংশ। আর সে কারণেই হয়তো বইটি পড়া শেষ করার পরও পাঠকের মগজে এক অদ্ভুত বিষাদ রয়ে যায়; চেনা কোনো শহরের চেনা অলিগলিতে একলা হেঁটে যাওয়ার মতো এক দীর্ঘমেয়াদি বিষাদ!

প্রকাশক: কথাপ্রকাশ
মুদ্রিত মূল্য: ৬৫০ টাকা





Source link

×

FIFA World Cup Live

FIFA World Cup সরাসরি দেখতে নিচের বাটনে ক্লিক করুন।

📺 লাইভ দেখুন
error: Content is protected !!
🔴 LIVE html