অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, পাহাড়ধস ও বন্যার কারণে গত কয়েকদিন দেশের আবহাওয়া ছিল তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক। তবে বৃষ্টি কমার সঙ্গে সঙ্গে আবারও বাড়ছে রোদের তীব্রতা, তাপমাত্রা ও তাপপ্রবাহের প্রভাব। এমন আবহাওয়ায় ত্বকে দেখা দিতে পারে পিগমেন্টেশন, ব্রণ, প্রদাহ ও সংবেদনশীলতার মতো নানা সমস্যা। তাই গরমের সময়ে বদলে ফেলতে হবে স্কিন কেয়ারের রুটিন।
তাপমাত্রা বাড়লে ত্বকের জন্য প্রয়োজন এমন ময়েশ্চারাইজিং ও আরমদায়ক পণ্য, যা শুধু জ্বালা ও অস্বস্তি কমাবে না, বরং ত্বককে সুস্থ, উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত রাখতেও সাহায্য করবে।
সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া একটি সাক্ষাতকারে গরম আবহাওয়ায় ত্বকের যত্ন নিয়ে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছে মুম্বাইয়ের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আকাঙ্ক্ষা সংঘভি।
তিনি জানান, তাপপ্রবাহের সময় ত্বক পরিবেশগত নানা চাপের মুখে পড়ে। অতিরিক্ত গরম, আর্দ্রতা, অতিবেগুনি রশ্মির সংস্পর্শ, ঘাম জমে থাকা এবং ত্বকে অতিরিক্ত তেল (সিবাম) উৎপাদনের কারণে ত্বকের প্রাকৃতিক সুরক্ষা স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে প্রদাহ তৈরি হয়, পিগমেন্টেশন বাড়তে পারে এবং ব্রণ ও ত্বকের সংবেদনশীলতার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।
অপ্রাভা অ্যাসথেটিকসের প্রতিষ্ঠাতা ডা. আকাঙ্ক্ষা সংঘভির মতে, এমন আবহাওয়ায় ত্বকের যত্নের রুটিন হওয়া উচিত সহজ, হালকা এবং স্কিন ব্যারিয়ারকে শক্তিশালী করার মতো। ত্বকের সমস্যা দ্রুত দূর করতে অতিরিক্ত শক্তিশালী পণ্য ব্যবহারের পরিবর্তে প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ ও ত্বককে সুরক্ষিত রাখার ওপর গুরুত্ব দিতে বলেন তিনি। তিনি বলেন-
তাপপ্রবাহে ত্বকের যত্নে প্রয়োজনীয় পণ্য
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আকাঙ্ক্ষা সংঘভির মতে, ত্বকের ধরন অনুযায়ী সঠিক পণ্য বেছে নেওয়া জরুরি।
স্বাভাবিক ত্বকের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে মৃদু পিএইচ-সমতাযুক্ত ক্লিনজার। তৈলাক্ত ত্বকের জন্য স্যালিসাইলিক অ্যাসিডযুক্ত ক্লিনজার এবং মিশ্র ত্বকের জন্য ল্যাকটিক অ্যাসিডযুক্ত ক্লিনজার উপকারী হতে পারে।
ক্লিনজিংয়ের পর ব্যবহার করা উচিত হালকা ধরনের সিরাম বা ময়েশ্চারাইজার। এরপর জেল-ভিত্তিক ব্রড-স্পেকট্রাম সানস্ক্রিন ব্যবহার করা প্রয়োজন, যা সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে ত্বককে সুরক্ষা দেবে।
তাপপ্রবাহে সাময়িক শীতল ও সতেজ অনুভূতির জন্য ফেস মিস্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এতে থার্মাল ওয়াটার, প্যানথেনল, সেন্টেলা এশিয়াটিকা বা গ্লিসারিনের মতো উপাদান থাকা ভালো। অ্যালকোহলযুক্ত ও অতিরিক্ত সুগন্ধিযুক্ত ফেস মিস্ট ত্বককে শুষ্ক করে দিতে পারে এবং জ্বালাপোড়া বাড়াতে পারে।
শুষ্ক ত্বকের জন্য হায়ালুরোনিক অ্যাসিড ও নিয়াসিনামাইডযুক্ত সিরাম, শুধু টি-জোনে ব্যবহারের জন্য কাওলিন ক্লে স্টিক মাস্ক এবং তেলমুক্ত সানস্ক্রিন ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন ডা. আকাঙ্ক্ষা সংঘভি।
তাপপ্রবাহে সকাল ও রাতের স্কিন কেয়ার রুটিন
গরমের সময় স্কিন কেয়ার রুটিন হওয়া উচিত সহজ এবং ত্বকের প্রাকৃতিক সুরক্ষা স্তর রক্ষাকারী।
সকালের রুটিন:
- মৃদু ক্লিনজার দিয়ে ত্বক পরিষ্কার করা
- হাইড্রেটিং সিরাম ব্যবহার করা
- হালকা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা
- এসপিএফ ৪০ বা তার বেশি মাত্রার সানস্ক্রিন ব্যবহার করা
রাতের রুটিন:
- মেকআপ ব্যবহার করলে ডাবল ক্লিনজিং করা
- পেপটাইডযুক্ত সিরাম দিয়ে ত্বকে হালকা হাইড্রেশন দেওয়া
- সেরামাইড বা প্যানথেনলযুক্ত পণ্য ব্যবহার করে স্কিন ব্যারিয়ার মেরামত করা
তাপপ্রবাহে যেসব উপাদান এড়িয়ে চলবেন
ডা. সংঘভি সতর্ক করে বলেন, তাপপ্রবাহের সময় ত্বকে একসঙ্গে অতিরিক্ত অ্যাকটিভ উপাদানযুক্ত অনেক পণ্য ব্যবহার করলে উপকারের চেয়ে ক্ষতি বেশি হতে পারে।
তার মতে, ঘাম, অতিবেগুনি রশ্মি ও প্রদাহের কারণে এ সময় ত্বকের সুরক্ষা স্তর দুর্বল থাকে। ফলে শক্তিশালী অ্যাকটিভ উপাদান ব্যবহার করলে জ্বালাপোড়া, লালচে ভাব, খোসা ওঠা ও সংবেদনশীলতা বাড়তে পারে।
তাপপ্রবাহের সময় যেসব উপাদান এড়িয়ে চলা উচিত—
- শক্তিশালী রেটিনয়েডস
- উচ্চমাত্রার এএইচএ, যেমন গ্লাইকোলিক অ্যাসিড
- অতিরিক্ত স্যালিসাইলিক অ্যাসিড
- উচ্চ ঘনত্বের বেনজয়েল পারঅক্সাইড
- অতিরিক্ত ঘর্ষণ তৈরি করে এমন এক্সফোলিয়েটিং স্ক্রাব
- একসঙ্গে একাধিক অ্যাকটিভ উপাদানযুক্ত পণ্য
এর পরিবর্তে স্কিন ব্যারিয়ার শক্তিশালী করে এমন উপাদান ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন—
- সেরামাইডস
- প্যানথেনল
- নিয়াসিনামাইড
- সেন্টেলা এশিয়াটিকা
- হায়ালুরোনিক অ্যাসিড
তাপপ্রবাহে কেন বাড়ে ব্রণ
তাপপ্রবাহে ব্রণের সমস্যা বেড়ে যাওয়া খুবই সাধারণ, বিশেষ করে তৈলাক্ত ও ব্রণপ্রবণ ত্বকে। ডা. সংঘভির মতে, অতিরিক্ত ঘাম, ত্বকে তেলের উৎপাদন বৃদ্ধি, ঘর্ষণ, ভারী স্কিন কেয়ার পণ্য, দূষণ এবং দীর্ঘ সময় ধরে সানস্ক্রিন বা মেকআপ ব্যবহার করার কারণে রোমকূপ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে প্রদাহ তৈরি হয়ে ব্রণের সমস্যা বাড়ে।
এ সময় ভারী ক্রিম, অতিরিক্ত তেলযুক্ত সানস্ক্রিন, একাধিক স্তরের মেকআপ এবং রোমকূপ বন্ধ করে দিতে পারে এমন ময়েশ্চারাইজার এড়িয়ে চলা উচিত।
ব্রণ কমাতে করণীয়—
- হালকা ও নন-কমেডোজেনিক পণ্য ব্যবহার করা
- ত্বকের আর্দ্রতা নষ্ট না করে মৃদুভাবে পরিষ্কার করা
- পানিভিত্তিক হাইড্রেশন ব্যবহার করা
- জেল বা হালকা তরল ধরনের সানস্ক্রিন ব্যবহার করা
- নিয়াসিনামাইড ও মৃদু মাত্রার স্যালিসাইলিক অ্যাসিড ব্যবহার করা
- ঘাম ও তেল জমে থাকা নিয়ন্ত্রণে রাখা
নিয়মিত ব্রণের সমস্যা থাকলে অবশ্যই চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
তীব্র গরম, দূষণ ও ঘাম ত্বকের ওপর চাপ তৈরি করলেও সঠিক স্কিন কেয়ার রুটিন ও উপযুক্ত পণ্য ব্যবহারের মাধ্যমে এসব সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। এতে ত্বক ভেতর থেকে সুস্থ ও উজ্জ্বল থাকতে পারে।