সংবিধান সংশোধন ইস্যুতে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি ও প্রধান বিরোধী দল জামায়াতের মধ্যে মতানৈক্যের সুরাহা হয়নি। এরই মধ্যে বিএনপি এ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের দাবি না মেনে বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের পথেই এগোচ্ছে সরকারি দল। তাদের মতে, বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই প্রয়োজনীয় সংশোধন আনতে হবে।
এরই আলোকে গত ১৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের এ বিশেষ কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয়।
তবে বিরোধী দলের সদস্যরা এই কমিটির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন। তাদের অনুপস্থিতিতেই কমিটি গঠনের প্রস্তাবটি পাস হয়। ক্ষমতাসীনদের আলোচনায় বোঝা যায়—ইতোপূর্বে এ বিষয়ে তারা বিরোধী দলকে যথেষ্ট সময় দিয়েছে। কিন্তু তারা তাদের সিদ্ধান্তেই অনড়। তাই সরকার তার লক্ষ্য বাস্তবায়নে সামনে এগিয়ে যেতে চায়। এ কারণে সংশোধন কমিটিতে আগে বিরোধী দলের ৫ সদস্যের নাম প্রস্তাব করলেও তাদের অংশগ্রহণ ছাড়াই কার্যক্রম শুরু করেছেন তারা।
কমিটির সদস্যরা অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে সুপারিশ দেবে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে সংসদে সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনী বিল উত্থাপন হবে।
সরকার পক্ষের এমন অনড় অবস্থানের কারণে প্রশ্ন উঠেছে, একতরফা আলোচনা করে এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর করা সম্ভব? ভবিষ্যতে কি এটি প্রশ্নবিদ্ধ হবে?
পরিস্থিতিকে নানাভাবে বিশ্লেষণ করছেন রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা। জানতে চাইলে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল ক্বাফী (রতন) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকার নির্ধারিত সময় গত ১৫ মার্চ শেষ হয়েছে। তাই এ মুহূর্তে তো সংবিধান সভা করার কোনও সুযোগ নেই। তবে বিএনপি যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন নিয়ে সরকার গঠন করেছে, তাই তারা চাইলে সংসদের ভেতরে-বাইরে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে ও গণভোটের মাধ্যমে তা বাস্তবায়নের দিকে যেতে পারে।’’
বিতর্কের শেষ কোথায়?
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংবিধান সংস্কার নিয়ে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এতে অংশগ্রহণ করেন কমপক্ষে ৩০টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা।
দীর্ঘ আলোচনার পর জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করা হয়। সনদের ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধান-সম্পর্কিত। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে। দলটি নিজেদের ভিন্নমতের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের পক্ষে।
অপরদিকে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-সহ বিরোধী জোট সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে জুলাই সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো হুবহু বাস্তবায়নের পক্ষে। তারা এটিকে সাধারণ সংবিধান সংশোধন নয়, ‘সংবিধান সংস্কার’ বিবেচনা করছে। তবে এ নিয়ে দুপক্ষেই বিতর্কের যেন শেষ হচ্ছে না।
এ বিষয়ে আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সংবিধান সংস্কার না সংশোধন! এ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে, তা সত্যিই দুঃখজনক। নির্বাচনের আগে বিএনপি-জামায়াতসহ আমরা সবাই সংবিধান সংস্কারের কথা বলেছি। বিএনপি এখন ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ না করে ‘সংবিধান সংশোধন কমিটি’ করায় মূলত বিভ্রান্তিটা তৈরি হয়েছে। ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন না করাটা গণভোটের রায়ের সুস্পষ্ট লংঘন বলে আমি মনে করি। ভবিষ্যতে এ নিয়ে যদি কখনও আদালতে প্রশ্ন ওঠে বা নতুন করে সাংবিধানিক বিতর্ক দেখা দেয়, তার দায় বিএনপিকেই নিতে হবে।’’
তিনি বলেন, ‘‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেটা বলেছেন, সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সব কারেকশন করে ওনারা সেটাকে পরে আবার গণভোটে পাস করাবেন। কথা হচ্ছে, তাহলে তো একই রকমই হলো। গণভোটের রায় মেনে সংস্কার পরিষদে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে পরে এটা আবার গণভোটে দিলে সমস্যা কী হতো! অন্তত সরকারি দল ও বিরোধী দলের বিভেদটা এড়ানো যেত।’’ এই জেদাজেদি বিএনপির জন্যই জটিল পরিস্থিতি তৈরি করবে বলে আমার আশঙ্কা, বলেন তিনি।
কমিটির আদ্যোপান্ত
শুরুতে সংবিধান সংশোধন এই কমিটি ১৭ সদস্যের করার প্রস্তাব ছিল। এতে বিরোধী দলকে পাঁচ জনের নাম অন্তর্ভুক্তির কথা ছিল। তবে তারা সংবিধান সংশোধনের বিপক্ষে মত দিয়ে গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানান। এ নিয়ে সংসদে জোরালো বক্তব্য রাখেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। তাছাড়া সংসদের বাইরেও বিভাগীয় পর্যায়ে কর্মসূচি পালন করছে দলটির নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। এ কারণে সংশোধন কমিটিতে নাম দিতে সরকারের আহ্বানে সাড়া দেয়নি।
তাই পাঁচটি পদ আপাতত শূন্য রেখে ১২ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে বিএনপির ৮ সংসদ সদস্যের পাশাপাশি রাখা হয়েছে তাদের শরিক দল গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থ, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নূর এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. অলিউল্লাহকে। যদিও ওয়ালী উল্লাহর এ কমিটিতে থাকা না থাকা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। কারণ তার দল ইসলামী আন্দোলনও সংবিধান সংস্কারের পক্ষে আন্দোলন করছিল। তাছাড়া তিনি এমপি হিসেবে শপথের পাশাপাশি সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিয়েছিলেন। গণমাধ্যমকে তিনি জানান, তাকে না জানিয়েই সেই কমিটিতে রাখা হয়। এ বিষয়ে শিগগিরই নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করবে তার দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
সংসদে দুপক্ষের বাহাস
সর্বশেষ গত ১৩ মে সংবিধান সংশোধন কমিটির নাম প্রকাশ করার পর থেকেই এ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের নেতারা নিজেদের অস্থান ব্যাখ্যা করেন। সরকারি দল সংবিধান সংশোধনের পক্ষে জোরালো বক্তব্য রাখেন।
এর বিরোধী দলের সদস্যরা সংস্কার প্রশ্নে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন। সেদিন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের অঙ্গীকার থেকেই তারা সংসদ সদস্যের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিয়েছেন। তাই সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি অভিযোগ করেন, জনগণের রায়ের অবমাননা করায় আমরা তা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করি। পরে তারা বিরোধী দলের অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেন।
তবে সরকারের অবস্থান তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘‘আগে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধানে সংস্কার পরিষদের বিধান যুক্ত হলে তখন সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। কারণ গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হলেও সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন। আর সেই আলোচনার উপযুক্ত স্থান সংসদের সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি।’’
সামনে কী করবে বিরোধী দল
সংবিধান সংশোধন নিয়ে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিপরীতে নিজেদের দাবি বাস্তবায়নে আগের অবস্থান থেকে একচুলও নড়তে নারাজ প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তাদের অভিযোগ, সরকার গণভোটের রায়কে নিয়ে জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছে। তবে বিরোধী দল জনগণের ন্যায্য অধিকার আদায়ে সংসদের ভেতরে ও বাইরে কঠোর অবস্থানে থাকবে। ইতোমধ্যে তারা ১১ দলীয় ঐক্যের ব্যানারে সারা দেশে নানা কর্মসূচি পালন করছেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সরকার গণরায়কে উপেক্ষা করেছে। যা দেশের মানুষ ভালোভাবে নিচ্ছে না। তার দাবি, অতীতে কখনও সংবিধান সংশোধনের সময় বিশেষ কমিটি করার নজির নেই। কিন্তু এবার কেন হলো, তা আমাদের বোধগম্য নয়।’’ তিনি জানান, আগের কয়েকটি সংশোধনী আদালতে বাতিল হয়েছে। এ জন্য বিরোধী দল সংবিধানের মৌলিক সংস্কার আনার জন্য সংস্কার পরিষদ গঠনের পক্ষে ছিল; কিন্তু সরকার তা মানেনি।
তিনি বলেন, ‘‘দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ হ্যাঁ ভোটের পক্ষে রায় দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও এর পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন।’’
তিনি বলেন, ‘‘সামনে সরকার কী করবে, সেটি তাদের বিষয়। তবে সরকার একতরফা সংবিধান সংশোধন করলে হাইকোর্টে তা নাও টিকতে পারে।’’
তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘‘সরকারের এখনও সময় আছে, তারা আন্তরিক হলে সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নিতে পারে। তবে সরকার না করলে জামায়াতসহ ১১ দল জনগণের দাবি বাস্তবায়নে সক্রিয় থাকবে।’’
কতটা কার্যকর করতে পারবে বিএনপি?
সংবিধান সংস্কার বা সংশোধন নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের বিপরীতমুখী অবস্থানে সংবিধানকে প্রাধান্য দিতে চায় বিএনপি। দলটি মনে করে, জনগণ তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী করেছে।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বিরোধী দল সংবিধানকে অমান্য করে অহেতুক মাঠ গরম করতে চায়। কিন্তু সরকার সঠিক পথেই এগোতে চায়।’’ তিনি বলেন, ‘‘কোনোভাবেই অসাংবিধানিক সিদ্ধান্ত নেবে না। আইন অনুসারে সংবিধান সংশোধন করলে অবশ্যই এটি কার্যকর হওয়া কঠিন কিছু নয়।’’