ঢাকার কফিশপগুলোতে সাধারণত এক কাপ কফির দাম ৩০০, ৪০০, কখনও ৫০০ টাকা। অনেকের কাছেই প্রশ্নটা স্বাভাবিক—এ তো মাত্র এক কাপ কফি! এতে কয়েক চামচ কফি আর একটু দুধ লাগে। তাহলে দাম এত বেশি কেন? আসলে কি তাই? কফিতে আসলে কী কী থাকে? এসব উপকরণের খরচইবা কত?
মোহাম্মদপুরের একটি কফিশপ চালান আহমেদ বাবু। তিনি জানান, এই প্রশ্নটি আসলে যতটা সহজ মনে হয়, উত্তরটি ততটা নয়। কারণ একটি ক্যাফে শুধু কফি বিক্রি করে না; বিক্রি করে তাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, একটি সুন্দর নিরিবিলি পরিবেশ এবং একটি ব্যবসায়িক মডেল। তার অভিজ্ঞতা থেকেই জেনে নেওয়া যাক কফির লাভ-ক্ষতির হিসাব।
কফিতে কি অনেক লাভ?
ধরা যাক, একটি মাঝারি আকারের ক্যাফের এক কাপ ক্যাপাচিনো। এতে সাধারণত ১৮ থেকে ২০ গ্রাম কফি বিন, ১৫০–২০০ মিলিলিটার দুধ এবং অল্প কিছু পানি ব্যবহার হয়।
বর্তমান বাজারদরে একটি ভালো মানের আমদানি করা কফি বিন, দুধ ও অন্যান্য উপকরণ মিলিয়ে সরাসরি খাদ্য উপকরণের খরচ সাধারণত ৫০ থেকে ৯০ টাকার মধ্যে থাকে। অথচ একই কফি ক্যাফেতে বিক্রি হয় ২৫০ থেকে ৪০০ টাকায়।
এখানেই অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, তাহলে কি এক কাপেই ২০০–৩০০ টাকা লাভ? এক কথায় উত্তর হলো, না।
আপনি শুধু কফি কিনছেন না
একটি ভালো কফি বানাতে যে এসপ্রেসো মেশিন ব্যবহার করা হয়, তার দাম কয়েক লাখ থেকে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এর সঙ্গে থাকে পেশাদার গ্রাইন্ডার, ওয়াটার ফিল্টার, রেফ্রিজারেশন, আইস মেশিন, নিয়মিত সার্ভিসিং এবং যন্ত্রপাতির অবচয়।
এরপর আসে বারিস্তার বেতন। একটি মানসম্মত কফি বানানো শুধু বোতাম চাপার কাজ নয়। কফি গ্রাইন্ডের সূক্ষ্মতা, পানির তাপমাত্রা, দুধ ফ্রথ করার কৌশল এবং প্রতিটি কাপে স্বাদের সামঞ্জস্য বজায় রাখতে প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা লাগে। এগুলোর প্রতিটির খরচ শেষ পর্যন্ত যোগ হয় এক কাপ কফির দামে।
এছাড়া ঢাকার অভিজাত এলাকাগুলোতে একটি ভালো ক্যাফের মাসিক ভাড়া কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এর সঙ্গে যোগ হয় বিদ্যুৎ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ, ইন্টারনেট, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, লাইসেন্স, কর এবং কর্মীদের বেতন।
একজন গ্রাহক হয়তো ৩০০ টাকার একটি কফি কিনে দুই ঘণ্টা বসে কাজ করছেন, মিটিং করছেন বা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছেন। এই সময়ে তিনি একটি টেবিল দখল করে রাখছেন, যা অন্য কোনো গ্রাহক ব্যবহার করতে পারছেন না। অর্থাৎ ক্যাফে শুধু কফির দাম নিচ্ছে না; বসার জায়গা, সময় এবং পরিবেশেরও মূল্য নিচ্ছে।
তবে এটা সত্য যে, রেস্টুরেন্ট শিল্পে পানীয় সাধারণত সবচেয়ে বেশি মার্জিনের পণ্যগুলোর একটি। কারণ খাবারের তুলনায় পানীয় তৈরিতে খাদ্য উপকরণের খরচ তুলনামূলক কম হলেও পরিচালন ব্যয়ের বড় অংশ সেখান থেকেই উঠে আসে।
অনেক ক্যাফের ক্ষেত্রে কফির বিক্রি থেকেই ভাড়া ও অন্যান্য স্থায়ী ব্যয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ মেটানো হয়। অন্যদিকে স্যান্ডউইচ, পাস্তা বা বার্গারের মতো খাবারে উপকরণের খরচ তুলনামূলক বেশি।
তাই কফির মূল্য নির্ধারণে শুধু উপকরণের দাম নয়, পুরো ব্যবসার আর্থিক ভারসাম্যও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
তাহলে কি কফি অতিরিক্ত দামে বিক্রি হয়?
সব ক্ষেত্রে তা বলা যায় না। একটি ক্যাফের আয় নির্ভর করে দিনে কতজন গ্রাহক আসে, তারা গড়ে কত টাকা খরচ করেন এবং কতক্ষণ বসে থাকেন—এসব বিষয়ের ওপর। গ্রাহক কমে গেলে একই ভাড়া, একই বেতন এবং একই বিদ্যুৎ বিল বহন করতে হয়। ফলে দাম বাড়ানোর চাপও তৈরি হয়।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক চেইন বা প্রিমিয়াম স্পেশালটি কফি শপগুলো তাদের ব্র্যান্ড, কফি বিনের মান, পরিবেশ এবং সেবার জন্য অতিরিক্ত মূল্য নেয়, যাকে অর্থনীতির ভাষায় ‘প্রিমিয়াম প্রাইসিং’ বলা হয়।
শেষ পর্যন্ত এক কাপ কফির দাম শুধু কফি বিনের দাম নয়। এর মধ্যে থাকে আমদানির খরচ, দুধ, যন্ত্রপাতি, দক্ষ বারিস্তা, ভাড়া, বিদ্যুৎ, কর, ব্র্যান্ড, পরিবেশ এবং গ্রাহকের জন্য তৈরি করা অভিজ্ঞতা।
তাই ৩০০ টাকার একটি কফির মধ্যে হয়তো ৬০ থেকে ৮০ টাকার উপকরণ রয়েছে, কিন্তু বাকি টাকায় একটি ব্যবসা টিকে থাকে। আর সে কারণেই অনেক সময় এক কাপ কফির মূল্য তার উপকরণের দামের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি হলেও তার পুরোটাই যে লাভ, তা বলা যাবে না।