বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর সাংস্কৃতিক ইতিহাসে হুমায়ূন আহমেদ (১৯৪৮-২০১২) কেবলই একজন জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক বা নির্মাতা নন। তিনি নিজেই একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রপঞ্চ। সত্তরের দশক থেকে শুরু করে একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক পর্যন্ত বাংলাদেশের উঠতি মধ্যবিত্ত শ্রেণির মনোজগত গঠনে, তাদের নান্দনিক রুচি নির্ধারণে এবং সর্বোপরি তাদের প্রাত্যহিক ভাষা-কাঠামো নির্মাণে হুমায়ূন আহমেদের টেক্সটসমূহ যে আধিপত্যবাদী ভূমিকা পালন করেছে, তা সমকালীন দক্ষিণ এশীয় পপুলার কালচারের ইতিহাসে বিরল।
কোনো সাহিত্যিকের শিল্পকৃতিকে যখন আমরা অ্যাকাডেমিক ও ডিসকার্সিভ ভাষা-কাঠামো দিয়ে ব্যবচ্ছেদ করতে চাই, তখন প্রথাগত ‘নন্দনতাত্ত্বিক প্রশংসা’ বা ‘ভালো-মন্দের সরল বাইনারি’র বাইরে গিয়ে আমাদের তাকাতে হয়। এই পদ্ধতির মূল চালিকাশক্তি হলো—যেকোনো জনপ্রিয় বয়ানের ভেতরের ক্ষমতা-সম্পর্ককে নগ্ন করা, সরলতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা বুর্জোয়া রাজনীতিকে ডিকনস্ট্রাক্ট করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার সাথে টেক্সটের যে গোপন লেনদেন, তাকে উন্মোচন করা।
হুমায়ূন আহমেদকে এই তাত্ত্বিক ছাঁচে ফেলে বিচার করলে দেখা যায়, তিনি মূলত যুদ্ধোত্তর ক্ষতবিক্ষত, দিশাহীন এবং পুঁজিবাদের প্রাথমিক ধাক্কায় আলোড়িত বাংলাদেশি মধ্যবিত্তের জন্য এক পরম ‘আস্বাদন যোগ্য সান্ত্বনা’ তৈরি করেছিলেন। তার উপন্যাসের আপাত-সহজ বাক্যগঠন, তরল রসবোধ এবং প্রাত্যহিক জীবনের মধ্যবিত্তীয় সংকটগুলো আসলে কোনো শূন্যস্থানে তৈরি হয়নি। এগুলো এক ধরনের সুপরিকল্পিত ‘কালচারাল প্রোডাকশন’, যা তৎকালীন বাজার-অর্থনীতি, প্রকাশনা শিল্পের বিকাশ এবং বুর্জোয়া শ্রেণির রাজনৈতিক নিস্পৃহতার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
হুমায়ূন আহমেদের আত্মপ্রকাশের সময়টি (সত্তরের দশকের প্রথমার্ধ—‘নন্দিত নরকে’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’) রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশের সমাজকাঠামোয় এক বিশাল উল্লম্ফন ও একই সাথে এক ধরনের শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল। ঔপনিবেশিক কাঠামো ভেঙে পড়ার পর যে নতুন জাতিরাষ্ট্রের জন্ম হলো, সেখানে মধ্যবিত্ত শ্রেণিটি রাতারাতি তার সামাজিক অবস্থানের পরিবর্তন দেখতে পায়। গ্রামীণ সামন্ততান্ত্রিক বলয় থেকে ছিটকে এসে ঢাকা শহরকেন্দ্রিক যে নতুন নাগরিক জীবনের পত্তন ঘটছিল, সেখানে এক ধরনের তীব্র অস্তিত্বের সংকট, একাকিত্ব এবং নৈতিক স্খলন দানা বাঁধছিল।
হুমায়ূনের প্রাথমিক টেক্সটগুলোতে আমরা যে যৌথ পরিবারের ভাঙন দেখি, তা মূলত সামন্ততান্ত্রিক মূল্যবোধের সাথে পুঁজিবাদের সংঘাতের প্রথম বয়ান। ‘শঙ্খনীল কারাগার’ উপন্যাসের রাবেয়া, খোকা কিংবা সুলতানা—এরা কেউ কোনো মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডির চরিত্র নয়। এরা হলো অত্যন্ত সাধারণ, সীমিত আয়ের নাগরিক মানুষ, যারা একটি ছোট ফ্ল্যাটের ভেতর নিজেদের গোপন কষ্ট ও সামাজিক গ্লানিকে লুকিয়ে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে। হুমায়ূন এখানে যে ভাষা ব্যবহার করছেন, তা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’ বা ‘খোয়াবনামা’র মতো মহাকাব্যিক ও রাজনৈতিকভাবে ক্ষুরধার নয়। ইলিয়াস যেখানে শ্রেণিকাঠামোর ভেতরে ঢুকে শোষণের অবয়বকে উন্মোচন করেন, হুমায়ূন সেখানে সেই শোষণ বা অর্থনৈতিক সংকটকে এক ধরনের ‘পারিবারিক নিয়তি’ বা ‘ভাগ্যের পরিহাস’ হিসেবে জায়েজ করেন।
তবে সত্তরের দশকের মধ্যভাগে হুমায়ূনের এই বিপুল জনপ্রিয়তার কারণ ছিল—তিনি তৎকালীন উত্তাল, সহিংস এবং সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্বপ্নভঙ্গের রাজনীতি থেকে মধ্যবিত্ত পাঠককে এক ধরনের ‘নিরাপদ দূরত্ব’ বা ‘রাজনৈতিক নিস্পৃহতা’ উপহার দিয়েছিলেন। জাসদের রাজনীতি, নকশাল আন্দোলন, কিংবা রক্ষীবাহিনীর দমনপীড়নের মতো তীব্র রাজনৈতিক বাস্তবতার কোনো সরাসরি প্রতিফলন হুমায়ূনের তৎকালীন ফিকশনে পাওয়া যায় না। তিনি মধ্যবিত্তের চোখকে বাইরের রাস্তা থেকে ঘুরিয়ে ঘরের ভেতরের খাবার টেবিলে নিবদ্ধ করলেন। এই যে রাজনীতির ময়দান থেকে ব্যক্তির মনোযোগ সরিয়ে পারিবারিক আবেগের বৃত্তে বন্দি করা, এটাই হলো হুমায়ূন সাহিত্যের প্রথম এবং প্রধান রাজনৈতিক চাল। তিনি মধ্যবিত্তের অবদমিত ভয় ও নিরাপত্তাহীনতাকে এক ধরনের রোমান্টিক বিষাদে রূপান্তর করলেন, যা পাঠককে সামাজিকভাবে নিষ্ক্রিয় কিন্তু মানসিকভাবে তৃপ্ত রাখে।
হুমায়ূন সাহিত্যের দুটি সমান্তরাল স্তম্ভ হলো ‘হিমু’ এবং ‘মিসির আলি’। এই চরিত্র দুটিকে বাংলা সাহিত্যের প্রথাগত গোয়েন্দা বা ভবঘুরে চরিত্রের চেয়ে অনেক বেশি তাত্ত্বিক গভীরতায় বিচার করা প্রয়োজন। হিমু চরিত্রটির রাজনৈতিক অর্থনীতি বিশ্লেষণ করলে এক অদ্ভুত কূটাভাস বা প্যারাডক্স চোখে পড়ে। হিমু হলুদ পাঞ্জাবি পরে, খালি পায়ে হাঁটে, তার পকেটে কোনো টাকা থাকে না, সে ঘড়ির কাঁধ ধরে চলে না এবং সে লজিককে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অ্যান্টি-লজিক বা অতিলৌকিকতার চর্চা করে। আপাতদৃষ্টে একে মনে হতে পারে পুঁজিতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা, ঘড়ির কাঁটায় বাঁধা করপোরেট দাসত্ব এবং বুর্জোয়া বৈষয়িকতার বিরুদ্ধে এক চরম বিদ্রোহ।
হিমু কিন্তু সমাজের প্রান্তিক বা সাবঅল্টার্ন কেউ নয়। সে কোনো মেথর, কুলি বা কারখানার শ্রমিক নয় যে ক্ষুধার জ্বালায় খালি পায়ে ঘুরছে। হিমু হলো উচ্চ-মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত ঘরের শিক্ষিত সন্তান, যার পেছনে রয়েছে খালাতো ভাইদের প্রাচুর্য, ফুফাতো বোনদের অবদমিত প্রেম এবং ধনী মেসোমশাই বা ধনকুবেরদের পৃষ্ঠপোষকতা। হিমু যখন তখন সমাজের উচ্চবিত্তের ড্রয়িংরুমে ঢুকে যেতে পারে, পুলিশের ডিসি বা বড়ো বড়ো রাজনৈতিক নেতারা তার ‘ভবিষ্যদ্বাণী’ শোনার জন্য অপেক্ষা করে।
সুতরাং, হিমুর এই যাযাবর বৃত্তি আসলে কোনো শ্রেণি-সংগ্রাম বা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ নয়। এটি হচ্ছে বুর্জোয়া সমাজের উদ্বৃত্ত অংশকে ভোগ করে বেঁচে থাকার এক ধরনের বিলাসী প্যারাডক্স।
হিমু তরুণ সমাজকে কোনো কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে প্ররোচিত করে না। সে শেখায়—সমাজ যেমন আছে তেমনই থাক, তুমি শুধু তোমার মনোজগতে খালি পায়ে হেঁটে জ্যোৎস্না গিলে খাও। এটি এক চরম পলায়নবাদ, যা আদতে লেট-ক্যাপিটালিজম বা উত্তর-আধুনিক পুঁজিবাদের জন্য অত্যন্ত নিরাপদ। পুঁজিবাদ এমন ছদ্ম-বিদ্রোহীদের ভালোবাসে, কারণ তারা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন চায় না, বরং ব্যবস্থার ভেতরে থেকে নিজেদের ‘উদ্ভট’ লাইফস্টাইল দিয়ে বিনোদন জোগায়।
হিমুর বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছেন মিসির আলি। তিনি যুক্তিবাদী, বিজ্ঞানের ছাত্র, মানুষের অবচেতন মনকে লজিক দিয়ে ব্যাখ্যা করতে চান। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ মিসির আলির উপন্যাসগুলোতে যে ন্যারেটিভ প্যাটার্ন ব্যবহার করেন, তা গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে। প্রতিটি গল্পেই দেখা যায়, মিসির আলি একটা জটিল, অতিলৌকিক বা মনস্তাত্ত্বিক জট খোলার জন্য বসেন। তিনি যুক্তি সাজান, ফ্রয়েড বা ইয়ুং-এর তত্ত্ব আওড়ান, কিন্তু উপন্যাসের একদম শেষ দৃশ্যে এসে হুমায়ূন এমন একটি মোচড় দেন, যা মিসির আলির সমস্ত লজিককে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। পাঠককে এমন এক জায়গায় এনে দাঁড় করানো হয়, যেখানে লজিক হেরে যায় এবং এক ধরনের ‘অলৌকিক কুহক’ বা ‘রহস্য’ জয়ী হয়।
এই ন্যারেটিভ কৌশলের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কী? এটি আসলে আমাদের সমাজের গভীরে প্রোথিত প্রাক-আধুনিক, কুসংস্কারাচ্ছন্ন এবং সামন্ততান্ত্রিক মনস্তত্ত্বকে এক ধরনের ছদ্ম-বিজ্ঞানমনস্কতার মোড়কে পুনরুৎপাদন করা। মধ্যবিত্ত পাঠক নিজেকে আধুনিক ভাবার জন্য মিসির আলিকে পছন্দ করে, কিন্তু একই সাথে তার অবচেতন মনের যে আদিম অলৌকিক বিশ্বাস, হুমায়ূন সেই বিশ্বাসকে সুড়সুড়ি দিয়ে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি দেন। ফলে, মিসির আলি চরিত্রটি বিজ্ঞানমনস্কতার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে না, তা যুক্তির আড়ালে অযুক্তিকে বৈধতা দেওয়ার একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ফাঁদে পরিণত হয়।
হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যের অন্যতম প্রধান উপাদান হিসেবে সবসময় তাঁর ‘সহজ, সরল ও প্রাঞ্জল ভাষা’র প্রশংসা করা হয়ে থাকে। কিন্তু উত্তর-গঠনবাদী ও বিনির্মাণবাদী তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই ‘সরলতা’র রাজনৈতিক চরিত্রটি উন্মোচন করা অত্যন্ত জরুরি। ভাষা কখনোই নিরপেক্ষ নয়; ভাষা নিজেই একটি ক্ষমতার ক্ষেত্র।
বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাস যদি আমরা দেখি—বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, ওয়ালীউল্লাহ, তারাশঙ্কর থেকে শুরু করে হাসান আজিজুল হক বা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস পর্যন্ত—প্রত্যেকেই ভাষাকে একটি জটিল, স্তর বিন্যস্ত এবং বহুস্বরবিশিষ্ট মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাদের টেক্সটে উপভাষা, ব্রাত্যজনের ভাষা, ক্ষমতার ভাষা এবং শ্রেণির ভাষা একে অপরের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকে।
কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ এসে এই ভাষিক বহু স্বরকে নির্মমভাবে ছেঁটে ফেললেন। তিনি তৈরি করলেন এমন এক স্ট্যান্ডার্ড ‘হুমায়ূনীয় ভাষা’, যা অত্যন্ত লিনিয়ার, মেদহীন এবং ঝরঝরে। তার উপন্যাসের একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, একজন চোর, একজন গৃহিণী, কিংবা একজন খ্যাপাটে তরুণ—সবাই প্রায় একই ধরনের বাক্যগঠনে, একই ধরনের হিউমার বা রসবোধ দিয়ে কথা বলে। এই যে ভাষার ভেতরের শ্রেণিগত ও আঞ্চলিক বৈচিত্র্যকে মুছে দিয়ে তাকে একটি একমুখী বা ‘মনোলজিক’ রূপ দেওয়া, এটাই হলো হুমায়ূনের ভাষিক হেজিমনি।
এই ভাষিক সরলীকরণের পেছনে রয়েছে পুঁজিবাদের একটি সুনির্দিষ্ট তাগিদ—তা হলো ‘দ্রুত ভোগ’ বা ‘ফাস্ট কনজাম্পশন’। পাঠক যাতে কোনো রকম বৌদ্ধিক কসরত বা বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ ছাড়াই টেক্সটটি গিলে ফেলতে পারে, হুমায়ূন সেই ব্যবস্থাটি নিশ্চিত করেছিলেন। তার ভাষা পাঠককে কোনো প্রশ্ন করতে প্ররোচিত করে না, তাকে ভাষার জটিল বুননে থমকে দাঁড়াতে দেয় না; বরং এক ধরনের পিচ্ছিল গতিতে টেক্সটের শেষ পাতায় পৌঁছে দেয়।
এই সহজপাঠ্য ভাষা আসলে সাহিত্যকে এক ধরনের ‘কনজিউমার গুড’ বা ভোগ্যপণ্যে রূপান্তরিত করে। এটি প্রকাশনা শিল্পের বাজারকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় বটে, কিন্তু পাঠকের চিন্তার গভীরতাকে এবং ভাষার যে নিজস্ব সাবভার্সিভ বা নাশকতামূলক ক্ষমতা রয়েছে—যা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার ভিত নড়িয়ে দিতে পারে—তাকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। হুমায়ূনের ভাষা তাই শেষ পর্যন্ত বুর্জোয়া শ্রেণির আসবাবের মতোই মসৃণ ও আরামদায়ক।
হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের নারী চরিত্রদের বিশ্লেষণ করলে নারীবাদী ও উত্তর-উপনিবেশবাদী তত্ত্বের অনেকগুলো অন্ধকার দিক উন্মোচিত হয়। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে হুমায়ূন নারীদের প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল। তার উপন্যাসে বহু বুদ্ধিমতী, রূপবতী এবং তীব্র আবেগি নারী চরিত্রের ছড়াছড়ি। কিন্তু এই চরিত্রগুলোর গভীরের ক্ষমতা-কাঠামোটি কী?
হুমায়ূন সাহিত্যের সবচেয়ে বিখ্যাত নারী চরিত্র সম্ভবত ‘রূপা’। কিন্তু রূপা আসলে কোনো রক্ত-মাংসের মানুষ নয়; সে হলো পুরুষতান্ত্রিক ফ্যান্টাসির এক পরম অবয়ব। রূপা সারাজীবন ধরে হিমুর জন্য অপেক্ষা করে, নীল শাড়ি পরে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকে, হিমুর একটা রহস্যময় ফোনের জন্য বছরের পর বছর কাটিয়ে দেয়। এখানে রূপার নিজস্ব কোনো এজেন্সি বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই। তার জীবন আবর্তিত হয় হিমু নামের এক খ্যাপাটে পুরুষের খেয়ালখুশির ওপর ভিত্তি করে।
হুমায়ূন আহমেদ এখানে নারীর অবদমনকে এক ধরনের ‘রোমান্টিক নান্দনিকতা’ দিয়ে বৈধতা দিচ্ছেন। নারী যে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় কেবলই একজন ‘অপেক্ষমাণ সত্তা’, তাকে হুমায়ূন এমনভাবে মহিমান্বিত করেছেন যে, মধ্যবিত্ত তরুণী পাঠক নিজেই নিজের এই অবদমনকে এক ধরনের সৌভাগ্য বা রোমান্টিক ট্র্যাজেডি হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে। এটি এক ধরনের ‘মিথ্যা চেতনা’ বা ফলস কনশাসনেস তৈরি করে।
গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের ‘ক্যান দ্য সাবঅল্টার্ন স্পিক?’ প্রবন্ধের ধারণাকে যদি আমরা এখানে ধার করি, তবে দেখা যাবে হুমায়ূন সাহিত্যের নারীরা আসলে সাবঅল্টার্ন। তারা কথা বলে বটে, কিন্তু তাদের সেই কথা বলার ভাষা এবং তাদের কামনার সীমাটি আগে থেকেই পুরুষতান্ত্রিক ফ্যান্টাসির ছাঁচ দিয়ে নির্ধারিত থাকে। তারা কখনোই সেই ছাঁচ ভেঙে নিজস্ব কোনো স্বাধীন রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সত্তা হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে না।
বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ও রাজনৈতিক অধ্যায় হলো ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। হুমায়ূন আহমেদ তাঁর উপন্যাস ও চলচ্চিত্রে (যেমন ‘আগুনের পরশমণি’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’) মুক্তিযুদ্ধকে বহুবার হাজির করেছেন।
হুমায়ূনের উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ যখন আসে, তখন তা হয়ে ওঠে একটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি বা মানবিক মেলোড্রামা। ‘আগুনের পরশমণি’র কথাই ধরা যাক। ঢাকা শহরের একটি মধ্যবিত্ত পরিবার, সেখানে একজন গেরিলা যোদ্ধা (বদি) আশ্রয় নেয়। পুরো সিনেমা বা উপন্যাসের ফোকাসটা কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পেছনের দীর্ঘ দুই দশকের রাজনৈতিক লড়াই, শ্রেণি-শোষণ, স্বায়ত্তশাসনের দাবি কিংবা সমাজতান্ত্রিক চেতনার ওপর নয়। মূল ফোকাসটা হলো—কারফিউর মধ্যে ঘরে বসে থাকা, বদির প্রতি রাত্রির অবদমিত রোমান্টিক টান এবং পাকিস্তানি মিলিটারির এক ধরনের অবয়বহীন ভয়।
হুমায়ূন মুক্তিযুদ্ধকে এক ধরনের ‘পবিত্র আদিভৌতিক অভিজ্ঞতা’ বা মেটাফিজিক্যাল এক্সপেরিয়েন্স হিসেবে দেখান। তার উপন্যাসের পাকিস্তানি মিলিটারিরাও প্রায়শই কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের অংশ হিসেবে আসে না, তারা আসে এক ধরনের পরম ‘ভিলেন’ বা দানব হিসেবে।
যখন কোনো রাজনৈতিক লড়াইকে কেবল ‘ভালো বনাম মন্দ’ কিংবা ‘দানব বনাম মানুষ’-এর নৈতিক দ্বন্দ্বে রূপান্তর করা হয়, তখন ইতিহাসের ভেতরের আসল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলো ঢাকা পড়ে যায়। একেই বলে ইতিহাসের বিরাজনীতিকরণ।
হুমায়ূনের ফিকশনে যুদ্ধক্ষেত্রের কৃষিজীবী, সর্বহারা বা আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের (যারা আসলে সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ছিলেন) তেমন কোনো জোরালো উপস্থিতি পাওয়া যায় না। তাঁর প্রধান মুক্তিযোদ্ধারা সাধারণত ঢাকা শহরের শিক্ষিত, পরিচ্ছন্ন এবং রোমান্টিক তরুণ, যারা যুদ্ধের মধ্যেও রবীন্দ্রনাথের গান গায় বা জীবনানন্দ আওড়ায়। এটি আসলে মুক্তিযুদ্ধের একটি পরম ‘বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী’ বয়ান যা বাংলাদেশের উত্তর-স্বাধীনতাকালীন শাসক শ্রেণির বয়ানের সাথে হুবহু মিলে যায়। এটি মধ্যবিত্ত পাঠককে এক ধরনের ‘দেশপ্রেমের সস্তা আবেগ’ বা ক্যাথারসিস দেয়, কিন্তু যুদ্ধের পর যে শ্রেণির বৈষম্য ঘোচেনি, যে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়নি—সেই অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হতে বাধা দেয়।
হুমায়ূন আহমেদকে বুঝতে হলে বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প, বিশেষ করে একুশে বইমেলার যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর, তার সাথে হুমায়ূনের সম্পর্কটা বোঝা দরকার।
আশির দশক থেকে শুরু করে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন বাংলাদেশি প্রকাশনা শিল্পের একক চালিকাশক্তি। তৎকালীন সময়ের বড়ো বড়ো প্রকাশনীগুলো (যেমন অন্যপ্রকাশ, কাকলী, সময় ইত্যাদি) অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকার জন্য এবং ফুলে-ফেঁপে ওঠার জন্য সম্পূর্ণরূপে হুমায়ূনের টেক্সটের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এটি প্রকাশনা জগতে এক ধরনের ‘মনোপলি’ বা একচেটিয়া বাজার তৈরি করেছিল।
এই অর্থনৈতিক মনোপলি সাহিত্যের নান্দনিকতার ওপরও এক ধরনের সেন্সরশিপ আরোপ করে। প্রকাশকরা এমন কোনো বই ছাপাতে বা প্রমোট করতে উৎসাহী হচ্ছিলেন না যা হুমায়ূনীয় ফর্মুলার বাইরে গিয়ে পাঠককে নতুন কোনো তাত্ত্বিক বা রাজনৈতিক চিন্তার খোরাক দেবে। ফলে, হুমায়ূনের জনপ্রিয়তার জোয়ারে বাংলা সাহিত্যের বহু প্রতিভাবান, নিরীক্ষাধর্মী ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন লেখক প্রান্তিক বা অদৃশ্য হয়ে যান।
ফ্রেডরিক জেমসন উত্তর-আধুনিক পুঁজিবাদের যে ‘সাংস্কৃতিক যুক্তি’ দেখিয়েছেন, হুমায়ূন আহমেদ হলেন তার বাংলাদেশি সংস্করণের প্রধান কারিগর। তাঁর বইগুলো আর কেবল পড়ার সামগ্রী রইল না, সেগুলো হয়ে উঠল মধ্যবিত্তের আভিজাত্যের প্রতীক। বইমেলা থেকে হুমায়ূন আহমেদের চার-পাঁচটি নতুন বই কেনা এবং টেবিলে সাজিয়ে রাখাটা নাগরিক লাইফস্টাইলের একটা অংশ হয়ে দাঁড়াল। সাহিত্য যখন এভাবে নিখাদ পণ্যে রূপান্তরিত হয়, তখন তার ভেতরের ‘সাবভার্সিভ স্পিরিট’ বা ক্ষুরধার সামাজিক সমালোচনাটি সম্পূর্ণ ধুয়েমুছে যায়। হুমায়ূন এই বাজারী চাহিদাকে খুব ভালোভাবে বুঝতেন এবং তিনি সচেতনভাবেই একজন দক্ষ কারিগরের মতো প্রতি বছর সেই একই ফর্মুলার পুনরুৎপাদন করে গেছেন।
হুমায়ূন আহমেদ কেবল কথাসাহিত্যিক ছিলেন না, তিনি নাটক ও চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশের ভিজ্যুয়াল কালচারকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিলেন। ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘বহুব্রীহি’, ‘অয়োময়’ বা ‘কোথাও কেউ নেই’-এর মতো টেলিভিশন নাটকগুলো তৎকালীন বিটিভির যুগে এক অভূতপূর্ব সামাজিক আলোড়ন তৈরি করেছিল। কিন্তু এই চাক্ষুষ মাধ্যমগুলোর ভেতরে যে সমাজ-বিশ্লেষণ, তা-ও তাঁর সাহিত্যিক ডিসকোর্সের চেয়ে ভিন্ন কিছু ছিল না।
‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের ‘বাকের ভাই’ চরিত্রটির ফাঁসি হওয়া ঠেকাতে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ যেভাবে রাস্তায় নেমে মিছিল করেছিল, তা সমকালীন সমাজবিজ্ঞানীদের জন্য এক বিরাট গবেষণার বিষয়। তাত্ত্বিক অবস্থান থেকে যদি আমরা এই ঘটনাকে বিশ্লেষণ করি, তবে দেখা যাবে এটি ছিল রাষ্ট্র ও আইনি কাঠামোর ওপর তৎকালীন মানুষের গভীর অনাস্থার এক ধরনের অবচেতন বহিঃপ্রকাশ।
কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ এই গণ-অসন্তোষ বা অবচেতন ক্ষোভকে কোনো রাজনৈতিক রূপ দেননি। বাকের ভাই কোনো বিপ্লবী নেতা ছিলেন না। তার মধ্যে এক ধরনের রবিনহুড সুলভ মানবিকতা ছিল। মানুষ যখন একটি ফিকশনাল চরিত্রের ফাঁসি ঠেকাতে রাস্তায় নামে, অথচ নিজের বাস্তব জীবনের অধিকার হরণ, স্বৈরাচারী শাসন বা অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে নীরব থাকে, তখন বুঝতে হবে সেই সমাজটি গভীর ‘সাংস্কৃতিক বিভ্রমে’ ভুগছে।
হুমায়ূনের ভিজ্যুয়াল টেক্সটগুলো এই বিভ্রমকে আরও ঘনীভূত করেছিল। তিনি সমাজ বাস্তবতার কাঠামোগত সংকটগুলোকে আড়াল করে তাকে খণ্ড খণ্ড পারিবারিক ট্র্যাজেডি বা কান্নার উপাদানে পরিণত করতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন।
হুমায়ূনের নাটকে যখন গ্রাম আসে (যেমন ‘নক্ষত্রের রাত’ বা অন্যান্য একক নাটক), তখন সেই গ্রামগুলো আর গ্রামীণ রাজনীতির জটিল ও শোষক রূপ নিয়ে হাজির হয় না। গ্রাম হয়ে ওঠে এক পরম শান্ত, সবুজ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন অথচ দিনশেষে মায়াময় এক রোমান্টিক স্বর্গ। শহরের মধ্যবিত্ত মানুষ তার যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি দূর করার জন্য হুমায়ূনের নাটকের এই ‘নান্দনিক গ্রাম’কে কনসিউম করত। গ্রামে যে তীব্র শ্রেণি-সংঘাত আছে, জোতদার-ভূমিহীনের যে লড়াই আছে, ধর্মের নামে যে নির্মম ফতোয়াবাজি আছে—সেগুলো হুমায়ূনের ক্যামেরায় এসে এক ধরনের লঘু কৌতুক বা তরল আবেগের চাদরে ঢাকা পড়ে যায়। এটি এক ধরনের ‘আর্বান ফ্যান্টাসি’ যা গ্রামকে কেবলই শহরের মানুষের বিনোদনের ব্যাকড্রপ বা পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করে।
হুমায়ূন আহমেদের শেষ জীবনের ফিকশনগুলোর একটি বড়ো অংশ জুড়ে ছিল ধর্ম, আধ্যাত্মিকতা এবং অতিলৌকিকতা (যেমন ‘হিজল জোড়া’, ‘সবুজ ছাতা’ বা বিভিন্ন হরর ও সায়েন্স ফিকশন)। এই আধ্যাত্মিক রূপান্তরকে অনেকেই তাঁর ব্যক্তিগত বয়সের ফলেই ঘটেছিল বলে মনে করেন, কিন্তু এর পেছনে একটি গভীর সাংস্কৃতিক ও উত্তর-উপনিবেশবাদী রাজনীতি ক্রিয়াশীল ছিল।
বাংলাদেশের সমাজ এক অদ্ভুত দ্বান্দিকতা মধ্য দিয়ে যায়—সে একদিকে আধুনিক পুঁজিতান্ত্রিক সুযোগ-সুবিধা চায়, অন্যদিকে তার ভেতরের প্রাক-আধুনিক ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়। হুমায়ূন আহমেদ এই দুইয়ের মধ্যে এক চমৎকার ‘সেতু’ বা সমন্বয়বাদ তৈরি করেছিলেন।
তিনি বিজ্ঞানকে কখনো সরাসরি অস্বীকার করেননি, কিন্তু বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতাকে পুঁজি করে তিনি সুফিবাদ, মরমি চেতনা এবং অতিলৌকিক ঘটনাকে ফিকশনের মূল উপজীব্য করে তুলেছেন। তাঁর উপন্যাসের পীর, দরবেশ বা সাধকেরা প্রথাগত কট্টরপন্থী ধার্মিক নন; তারা দয়ালু, উদার এবং এক ধরনের মহাজাগতিক রহস্যের বাহক।
এটি আসলে মধ্যবিত্তের ধর্মীয় অপরাধবোধকে প্রশমিত করার একটি কুশলী পদ্ধতি। একজন আধুনিক, কর্পোরেট বা বুর্জোয়া মানুষ যখন হুমায়ূনের এই আধ্যাত্মিক উপন্যাসগুলো পড়ে, তখন সে নিজেকে প্রগতিশীলও ভাবতে পারে, আবার একই সাথে ধর্ম বা রহস্যের প্রতি তার অবচেতন টানকেও তৃপ্ত করতে পারে। এটি ধর্মের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা উগ্র রূপ নয়। এটি হলো ধর্মের একটি ‘নান্দনিক ও পরিচ্ছন্ন সংস্করণ’, যা পুঁজিতান্ত্রিক লাইফস্টাইলের সাথে চমৎকারভাবে খাপ খেয়ে যায়।
হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে যখন সমকালীন বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে আলোচনা হয়, তখন প্রায়শই প্রথাগত নন্দনতাত্ত্বিকরা তাঁর ওপর এক ধরনের নাক-উঁচু ভাব বা অবজ্ঞা প্রদর্শন করেন। তাকে ‘হালকা’, ‘চটুল’ বা ‘বাজারী লেখক’ বলে দেগে দেওয়াটা এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক ফ্যাশনে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু কোনো জনপ্রিয় টেক্সটকে কেবল ‘উচ্চাঙ্গ নন্দনতত্ত্বের’ মাপকাঠি দিয়ে উড়িয়ে দেওয়াটা এক ধরনের শ্রেণিগত অহংকার এবং অলসতা।
হুমায়ূন আহমেদ আসলে বাংলা সাহিত্যের তথাকথিত ‘হাই-কালচার’ বা উচ্চাঙ্গ সংস্কৃতির যে প্রাতিষ্ঠানিক দেয়াল ছিল, তাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিলেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, সাহিত্য কেবল গুটিকয়েক বুদ্ধিজীবীর কফি হাউজের আড্ডার বা সেমিনারের বিষয় নয়; তা আমজনতার প্রাত্যহিক জীবনের অংশ হতে পারে। এই অর্থে তিনি কালচারাল ডেমোক্রেটাইজেশন বা সংস্কৃতির গণতন্ত্রীকরণ করেছিলেন।
কিন্তু এই গণতন্ত্রীকরণের মূল্যটি কী ছিল? মূল্যটি ছিল সাহিত্যের গুণগত মান, ভাষার গভীরতা এবং রাজনৈতিক চেতনার এক ধরনের বিসর্জন। তিনি পাঠককে পড়তে শিখিয়েছেন সত্য, কিন্তু তাদের ‘কী পড়তে হবে’ এবং ‘কীভাবে চিন্তা করতে হবে’—তার একটা অদৃশ্য দেয়ালও তুলে দিয়েছেন।
আজকের বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক মনস্তত্ত্বের দিকে তাকালে হুমায়ূন লিগেসির আসল নেতিবাচক রূপটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। হুমায়ূন আহমেদ যে সরলীকৃত, মেদহীন এবং রাজনৈতিকভাবে নিস্পৃহ সাহিত্যের ধারা প্রবর্তন করেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর সমকালীন তরুণ লেখকদের বড়ো একটি অংশ সেই ধারার অন্ধ ও নিকৃষ্ট অনুকরণ করে চলেছে।
ফলে, বাংলা কথাসাহিত্যে এখন আর কোনো বড়ো ধরনের তাত্ত্বিক নিরীক্ষা, রাজনৈতিক উপন্যাসের জন্ম বা ভাষার নতুন কোনো বাঁক বদল দেখা যাচ্ছে না। সমাজ যে এক তীব্র ফ্যাসিবাদী, করপোরেট এবং ধর্মীয় মেরূকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—সমকালীন পপুলার সাহিত্য সেই বাস্তবতাকে ধারণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হচ্ছে। হুমায়ূন আহমেদ তাঁর অসাধারণ প্রতিভা দিয়ে যে ‘কুহক’ বা মায়াজাল তৈরি করতে পেরেছিলেন, তাঁর অনুকারকরা সেই প্রতিভা ছাড়াই কেবল সেই চটুল ফর্মুলাকে ধরে রেখেছে। এর ফলে সামগ্রিক সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এক ধরনের তীব্র বৌদ্ধিক স্থবিরতা নেমে এসেছে।
হুমায়ূন আহমেদকে কেবলই একজন ‘জনপ্রিয় জাদুকর’ বলে প্রশংসা করা কিংবা কেবলই একজন ‘বাজারী লেখক’ বলে অবজ্ঞা করা—দুটি অবস্থানই সমানভাবে ত্রুটিপূর্ণ এবং তাত্ত্বিকভাবে অগভীর। হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম এবং সবচেয়ে সফল ‘কালচারাল হেজিমোনিক প্রডিউসার’। তিনি যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের দিশাহীন মধ্যবিত্ত শ্রেণির মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতগুলোকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন এবং তাদের সেই শূন্যতাকে পুঁজি করে এক বিশাল টেক্সট-সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন।
তিনি মধ্যবিত্তকে জ্যোৎস্না দেখতে শিখিয়েছেন, বৃষ্টিতে ভিজতে শিখিয়েছেন, পারিবারিক সম্পর্কের ছোট ছোট আনন্দ-বেদনাকে উদযাপন করতে শিখিয়েছেন। কিন্তু এই নান্দনিকতার সমান্তরালে তিনি তাদের রাজনৈতিকভাবে অসচেতন, জেন্ডার-রাজনীতিতে রক্ষণশীল, ইতিহাসের জটিলতা থেকে বিমুখ এবং ভাষার বহুমাত্রিক ঐশ্বর্য থেকে বঞ্চিত রাখতেও এক অবচেতন কিন্তু কাঠামোগত ভূমিকা পালন করেছেন।
তাঁর ফিকশন ও ভিজ্যুয়াল টেক্সটসমূহ শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশি বুর্জোয়া সমাজ ও পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য কোনো বিপদ তৈরি করেনি। সেই ব্যবস্থার একঘেয়েমি দূর করার একটি চমৎকার ‘মনস্তাত্ত্বিক থেরাপি’ হিসেবে কাজ করেছে। হুমায়ূন আহমেদের এই দ্বান্দ্বিক অবস্থান—যেখানে তিনি একই সাথে মুক্তির কুহক এবং শৃঙ্খলের রক্ষক—তা-ই তাঁর শিল্প-সাহিত্যের প্রকৃত তাত্ত্বিক সত্য। এই সত্যকে স্বীকার করেই আমাদের আগামী দিনের সমাজ, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের নতুন ডিসকোর্স নির্মাণ করতে হবে।
আরো পড়ুন: