‘কিছু সিনেমা শুধু গল্প বলে, আর কিছু সিনেমা আমাদের নিজেদের দিকেই তাকাতে বাধ্য করে।’—অ্যাডফার আয়োজনে ‘পায়ের তলায় মাটি নাই’ সিনেমার বিশেষ স্ক্রিনিংয়ে অংশ নিয়ে এমনই মন্তব্য করেছেন মডেল ও অভিনেত্রী মেহজাবীন।
বিশ্বের বিভিন্ন মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসা কুড়ানোর পর গত ৩০ মে ঈদুল আজহা উপলক্ষে আইস্ক্রিনে বিশ্বব্যাপী মুক্তি পায় মোহাম্মদ রব্বী মৃধা পরিচালিত সিনেমাটি। ২০২১ সালে বুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বিশ্ব প্রিমিয়ারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক যাত্রা শুরু করে এটি। এরপর ভারতের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, বেঙ্গালুরু আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, ওসাকা এশিয়ান চলচ্চিত্র উৎসব, নেপাল আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ও লন্ডন ইন্ডিয়ান চলচ্চিত্র উৎসবসহ বিশ্বের বিভিন্ন উৎসবে প্রদর্শিত হয় সিনেমাটি।
দীর্ঘ উৎসবযাত্রায় ‘পায়ের তলায় মাটি নাই’ অর্জন করেছে একাধিক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। জাফনা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে জুরি স্পেশাল মেনশন, নেপাল আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা চলচ্চিত্রের ‘গৌতম বুদ্ধ পুরস্কার’ এবং কলকাতা বিশ্ব চলচ্চিত্র উৎসবে ফিপরেস্কি পুরস্কার জিতে নেয় সিনেমাটি। ২০২৩ সালে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডসেও জমা দেওয়া হয়েছিল এটি।
জলবায়ু পরিবর্তন, সামাজিক সংকট ও মানবিক টানাপোড়েনকে কেন্দ্র করে নির্মিত সিনেমাটির গল্প আবর্তিত হয়েছে সাইফুল নামের এক দরিদ্র অ্যাম্বুলেন্সচালককে ঘিরে। দুই স্ত্রীর সম্পর্ক, দারিদ্র্য, সহিংসতা ও টিকে থাকার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় গল্প।
সিনেমাটি দেখে মেহজাবীনের সবচেয়ে ভালো লেগেছে সাইফুল চরিত্রের নির্মাণ। তিনি লেখেন, ‘সাইফুলকে এখানে নায়ক বা খলনায়ক কোনোটাই বানানো হয়নি। সে খুব সাধারণ একজন মানুষ। কিন্তু তার লোভ, দুর্বলতা আর ভুল সিদ্ধান্তগুলো ধীরে ধীরে তাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে সে মিনা আর তার দ্বিতীয় স্ত্রী দুজনের মাঝেই নিজের জীবন সামলাতে চায়।’
মেহজাবীনের ভাষায়, ‘যেন একসঙ্গে দুই নৌকায় পা রেখে চলতে চায়। কিন্তু জীবন তো এভাবে চলে না। একসময় দুই নৌকাই আলাদা হয়ে যায়। আর তখন সাইফুলের দাঁড়ানোর মতো কোনো জায়গাই থাকে না।’
অভিনেত্রীর কাছে সিনেমার নামের আসল অর্থও এখানেই। তিনি লেখেন, ‘শুধু অর্থনৈতিক বা সামাজিকভাবে নয়, একজন মানুষ যখন নিজের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে মানসিকভাবে, নৈতিকভাবে আর আত্মিকভাবেও দাঁড়ানোর জায়গা হারিয়ে ফেলে, তখনই সত্যি তার পায়ের তলায় মাটি থাকে না।’
সিনেমায় পাশাপাশি দেখানো দুই ধরনের লড়াইও মুগ্ধ করেছে মেহজাবীনকে। তিনি লেখেন, ‘একদিকে মিনা প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে সাইফুল লড়ছে নিজের ভেতরের লোভ, চাওয়া আর দুর্বলতার সঙ্গে। কিন্তু সে নিজের সেই লড়াইয়ে জিততে পারে না।’
অভিনয়শিল্পীদের প্রশংসা করে মেহজাবীন লেখেন, ‘মোস্তফা মনোয়ার সাইফুল চরিত্রটাকে এতটাই স্বাভাবিকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে তাকে অভিনয় করতে দেখছি বলে একবারও মনে হয়নি। প্রিয়ম আর্চি মিনা চরিত্রে এবং দীপান্বিতা মার্টিন সাইফুলের দ্বিতীয় স্ত্রীর চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় করেছেন।’
পরিচালক মোহাম্মদ রব্বী মৃধার উদ্দেশে মেহজাবীন বলেন, ‘এমন সৎ, সংযত আর মানুষের খুব কাছের গল্প আরও বলুন। এই ধরনের সিনেমা শেষ হওয়ার পরও অনেক দিন দর্শকের মনে বেঁচে থাকে।’
অ্যাডফার উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন সিনেমাটির প্রযোজক আবু শাহেদ ইমনও। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ অ্যাডভার্টাইজিং ফিল্মমেকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (অ্যাডফা) কার্যক্রম আমি বেশ কিছুদিন ধরে আগ্রহ নিয়ে অনুসরণ করছি। যদিও এটি মূলত বিজ্ঞাপনচিত্র-সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের সংগঠন, তবু তাদের উদ্যোগের পরিধি কেবল বিজ্ঞাপন নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়। তারা নিয়মিত চলচ্চিত্র, চিত্রনাট্য, নির্মাণশৈলী, বিতরণব্যবস্থা এবং সমকালীন চলচ্চিত্রচর্চা নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা, স্ক্রিনিং ও মতবিনিময়ের আয়োজন করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এমন এক সময়ে, যখন আমাদের মনোযোগ ক্রমেই স্ক্রলিং সংস্কৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে, তখন মানুষকে একসঙ্গে বসিয়ে একটি চলচ্চিত্র দেখা, তা নিয়ে আলোচনা করা, মতভেদ প্রকাশ করা এবং শিল্পকে কেন্দ্র করে একটি সন্ধ্যা কাটানোর সুযোগ তৈরি করা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।’
অ্যাডফার আয়োজনে সিনেমাটির বিশেষ প্রদর্শনীতে পরিচালক মোহাম্মদ রব্বী মৃধা ও অভিনেতা মোস্তফা মনোয়ারের সঙ্গে দর্শকদের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন আবু শাহেদ ইমন। তিনি বলেন, ‘দর্শকদের মতামত, প্রশ্ন ও অনুভূতি আমাদের নতুন করে অনুপ্রাণিত করেছে।’
মেহজাবীনের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘ছবিটি দেখার পর তিনি নিজ উদ্যোগেই সবাইকে ছবিটি নিয়ে লেখার এবং আরও মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান। এমন আন্তরিক সমর্থন একটি ভালো চলচ্চিত্রের জন্য নিঃসন্দেহে উৎসাহব্যঞ্জক।’
বর্তমানে ‘পায়ের তলায় মাটি নাই’ আইস্ক্রিন প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পেয়েছে। যারা এখনো সিনেমাটি দেখেননি, তাদের আইস্ক্রিন অ্যাপে সিনেমাটি দেখার আহ্বান জানিয়েছেন মেহজাবীন। তিনি লেখেন, ‘আমার বিশ্বাস, এই গল্পটা আপনাদেরও ভাবাবে।’