রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তির দেখা মিলছে না। দুই-একটি সবজি ছাড়া প্রায় সব ধরনের সবজির দাম ১০০ টাকার ঘরে। কাঁচামরিচের কেজি উঠেছে ৪০০ টাকায়। সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়েছে মাছ, ডিম ও মুরগির দাম। এর মধ্যেই নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে চালের বাজার। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে পোলাও চালের দাম। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রতি কেজিতে ৫০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে এই চালের দাম। ফলে গ্যাস সংকটের মধ্যে নতুন চাপ পড়েছে সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে।
শনিবার (১ আগস্ট) রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, দেশের বিভিন্ন এলাকায় টানা বৃষ্টি ও বন্যার কারণে অনেক স্থানে সবজি ও মরিচের ক্ষেত তলিয়ে গেছে। একই সঙ্গে বেড়েছে পরিবহন ব্যয়। বর্ষাকালে সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে প্রায় সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী।
মাছের বাজারে ঊর্ধ্বগতি
সপ্তাহের ব্যবধানে অধিকাংশ মাছের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে পাঙাশ ২৫০ টাকা, তেলাপিয়া ২৮০ টাকা, রুই ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা, পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, চিংড়ি ৮০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা, টেংরা ৭০০ টাকা, দেশি কই ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং শোল ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ভেটকি, মৃগেল, বাইম, শিং ও পোয়া মাছের দামও বেড়েছে।
মান ও আকারভেদে ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকায়। সামুদ্রিক মাছও এখন অনেকটাই সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে।
ধুপখোলা বাজারের মাছ বিক্রেতা আনোয়ার হোসেন বলেন, “বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে অনেক ট্রলার সাগরে যেতে পারছে না। বিভিন্ন এলাকা থেকেও মাছের সরবরাহ কমে গেছে। পাইকারি বাজারেই দাম বেড়েছে, যার প্রভাব খুচরা বাজারে পড়েছে।”
ক্রেতা জনি শেখ বলেন, “বাচ্চারা মাছ খেতে চেয়েছিল। কিন্তু বাজারে এসে দেখি দাম অনেক বেশি। সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে কষ্ট করে একটি মাছ কিনলাম। এভাবে দাম বাড়তে থাকলে মাছ-মাংস খাওয়াই কমিয়ে দিতে হবে।”
কাঁচামরিচ ৪০০ টাকা, সবজিতেও আগুন
কাঁচামরিচের বাজারে অস্থিরতা আরও বেড়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে প্রতি কেজি কাঁচামরিচ ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এক সপ্তাহ আগের তুলনায় প্রায় ১০০ টাকা বেশি। খুচরা পর্যায়ে ১০০ গ্রাম ৪০ টাকা এবং ২৫০ গ্রাম ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
দেশি পেঁয়াজও দেড়-দুই সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ১৫ থেকে ২০ টাকা বেড়ে এখন মানভেদে ৫৫ থেকে ৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সবজির বাজারেও নেই স্বস্তি। লম্বা বেগুন ১২০-১৫০ টাকা, গোল বেগুন ১৮০ টাকা, সাদা বেগুন ১৪০ টাকা, করলা ১২০-১৪০ টাকা, বরবটি ১১০-১৩০ টাকা, চিচিঙ্গা ৯০-১০০ টাকা এবং কচুরমুখী ৮০-১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে ধুন্দল ও পটলের দাম কিছুটা কমে ৬০-৮০ টাকায় নেমেছে।
সবজি বিক্রেতা রফিক বলেন, “এখন বিভিন্ন এলাকা থেকে সবজির সরবরাহ কম। বর্ষাকালের কারণে উৎপাদনও কমেছে। মরিচ উৎপাদনকারী এলাকাগুলোতে জলাবদ্ধতায় অনেক গাছ নষ্ট হয়েছে। তাই বাজারে সরবরাহ কমে দাম বেড়েছে।”
রায়সাহেব বাজারের ক্রেতা শ্রীদেবী বিশ্বাস বলেন, “কয়েক ধরনের সবজি কিনতে এসেছিলাম। কিন্তু দাম দেখে শেষ পর্যন্ত একটি সবজি কিনেই ফিরছি। এভাবে দাম বাড়তে থাকলে মধ্যবিত্তের সংসার চালানো আরও কঠিন হবে।”
ডিম-মুরগিতেও বাড়তি চাপ
ডিমের দামও নতুন করে বেড়েছে। ফার্মের মুরগির ডিম এখন প্রতি ডজন ১৪৫ থেকে ১৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগেও একই ডজন ডিমের দাম ছিল ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকা।
এক দিনের ব্যবধানে মুরগির দামও বেড়েছে। ব্রয়লার প্রতি কেজি ১৯০ থেকে ২০০ টাকা এবং সোনালি ৩৪০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আগের দিন ব্রয়লার ছিল ১৮০ টাকা এবং সোনালি ৩৩০ থেকে ৩৪০ টাকা।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী রবিন হাসান বলেন, “মেসে থেকে পড়াশোনা করি। ডিম আর মুরগিই ছিল সবচেয়ে সাশ্রয়ী খাবার। এখন এগুলোর দামও বাড়ছে। সীমিত বাজেটে চলা আমাদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে যাচ্ছে।”
পোলাও চালে সবচেয়ে বড় লাফ
চালের বাজারে মোটা, মাঝারি ও মিনিকেট চালের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও পোলাও চালের বাজারে বড় ধরনের ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে।
বর্তমানে মোটা চাল ৫৮ থেকে ৬৫ টাকা, মাঝারি চাল ৬৮ থেকে ৭৮ টাকা এবং মিনিকেট ও নাজিরশাইল ৮০ থেকে ৯৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
অপরদিকে, কয়েক দিন আগেও ১২০ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হওয়া পোলাও চাল এখন প্রতি কেজি ১৮০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে প্রতি কেজিতে বেড়েছে প্রায় ৬০ টাকা। এটি সাম্প্রতিক সময়ে চালের বাজারে সবচেয়ে বড় মূল্যবৃদ্ধি বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।