ঢাকাSaturday , 12 September 2026
  1. অন্যান্য
  2. আবহাওয়া
  3. খেলা
  4. চাকরি
  5. জীবনযাপন
  6. তথ্যপ্রযুক্তি
  7. প্রেস রিলিজ
  8. বাণিজ্য
  9. বাংলাদেশ
  10. বিনোদন
  11. বিশ্ব
  12. ভিডিও
  13. মতামত
  14. রাজনীতি
  15. শিক্ষা
আজকের সর্বশেষ সবখবর

আত্মজীবনীর পাতায় শ্যামলের অকপট জীবন

UttorbongoBD
August 28, 2026 10:15 am
Link Copied!


শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘এই জীবনের যত মধুর ভুলগুলি’ শুধু একটি আত্মজীবনী নয়। এটি একই সঙ্গে একজন লেখকের ব্যক্তিগত জীবনের দলিল, বাংলা সাহিত্যের একটি সময়ের স্মৃতিচিত্র এবং কলকাতার সামাজিক-সাংস্কৃতিক রূপান্তরের এক জীবন্ত আখ্যান। লেখক নিজের জীবনকে মহিমান্বিত করার বদলে ব্যর্থতা, দারিদ্র্য, অপমান, প্রেম, বন্ধুত্ব, ভুল সিদ্ধান্ত, লেখকজীবনের সংগ্রাম এবং নানা বিব্রতকর অভিজ্ঞতাকে তিনি অকপটে সামনে এনেছেন। ফলে আত্মজীবনীটি কোথাও আত্মপ্রশংসার বয়ান হয়ে ওঠেনি।

বইটির শুরুতেই বেলাল চৌধুরীর ভূমিকা পাঠককে এক আবেগঘন পরিসরে নিয়ে যায়। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে বেলাল চৌধুরীর দীর্ঘ সম্পর্ক, ঢাকা সফর, অসুস্থতা এবং মৃত্যুর স্মৃতি মিলিয়ে ভূমিকার ভেতরেই তৈরি হয়েছে এক ব্যক্তিগত শোকগাথা। বিশেষ করে ‘এই জীবনের যত মধুর ভুলগুলি’ অসমাপ্ত থেকে যাওয়ার প্রসঙ্গটি ভূমিকার আবেগকে আরও তীব্র করে। 

আত্মজীবনী হিসেবে বইটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো শৈশবকে গুরুত্ব দেওয়া। “যারা পকেটে শৈশব নেই, প্রতিভার সাগরে সাঁতড়ানো তার পক্ষে অসম্ভব”—এই বইয়ের অন্যতম কেন্দ্রীয় দর্শন। তার শৈশবের মধ্যে যেমন আনন্দ আছে, তেমনি আছে যুদ্ধ, সামাজিক অস্থিরতা, দেশভাগ এবং পারিবারিক বাস্তবতার চাপ। ফলে ব্যক্তিগত স্মৃতি ধীরে ধীরে বৃহত্তর ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

এখানেই বইটি অন্য অনেক আত্মজীবনী থেকে আলাদা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনস্মৃতি-তে যেমন স্মৃতির সঙ্গে কবির অন্তর্জগৎ, প্রকৃতি ও শিল্পবোধের একটি নান্দনিক সম্পর্ক তৈরি হয়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের আত্মজীবনীতে তেমন সৌন্দর্যচর্চার বদলে জীবনের কাদামাটি বেশি স্পষ্ট। রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিতে শৈশব অনেক সময় এক ধরনের কাব্যিক আলোয় ফিরে আসে। শ্যামলের শৈশব বরং জীবনের বাস্তবতার ধাক্কায় তৈরি। সেখানে অভাব আছে, ভয় আছে, দারিদ্র্য আছে, হাস্যরস আছে। অর্থাৎ একজন স্মৃতিকে নন্দনে রূপ দেন, অন্যজন স্মৃতিকে জীবনের কাঁচা উপাদান হিসেবেই ধরে রাখেন।

আবার সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘দেশে বিদেশে’-এর সঙ্গে তুলনা করলেও বইটির একটি বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়। মুজতবা আলীর লেখায় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ক্রমে ভ্রমণ, মানুষ, সংস্কৃতি ও রসিকতার বৃহৎ জগতে ছড়িয়ে পড়ে। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে বৃহত্তর সমাজের দিকে নিয়ে যান, তবে তার ভূগোল মূলত নিজের সময়, কলকাতা এবং বাংলা সাহিত্যকে ঘিরে। মুজতবার হাস্যরস অনেক সময় পরিস্থিতির বিচিত্রতা থেকে জন্ম নেয়; শ্যামলের হাস্যরসের মধ্যে নিজের ব্যর্থতা ও জীবনের নিষ্ঠুরতার প্রতিও এক ধরনের আত্মবিদ্রূপ আছে।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘অর্ধেক জীবন’-এর সঙ্গেও এই বইয়ের তুলনা প্রাসঙ্গিক। ‘অর্ধেক জীবন’-এ ব্যক্তিগত স্মৃতি, সাহিত্যিক পরিচয়, প্রেম, বন্ধুত্ব ও একটি প্রজন্মের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা একসঙ্গে এসেছে। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের বইতেও একইভাবে ব্যক্তি ও সাহিত্যজগত পাশাপাশি রয়েছে। তবে সুনীলের আত্মজীবনীতে নিজের সাহিত্যিক হয়ে ওঠার একটি ধারাবাহিক ও আত্মসচেতন বয়ান বেশি লক্ষ করা যায়। শ্যামলের ক্ষেত্রে বয়ানটি অনেক বেশি বেপরোয়া। তিনি নিজের ভুল, ব্যর্থতা কিংবা অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা আড়াল করেন না। এই নির্ভীকতাই তার আত্মজীবনীকে আলাদা স্বর দিয়েছে।

বাংলা সাহিত্যের আত্মজীবনীমূলক রচনার আরেক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো লেখক নিজেকে নিজের সময়ের সাক্ষী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের বইয়ে এই সাক্ষীর ভূমিকা অত্যন্ত শক্তিশালী। চদেশভাগ, কলকাতার সামাজিক পরিবর্তন, পেশার পরিবর্তন, সাহিত্যপত্রিকার উত্থান এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ লেখকের সঙ্গে সম্পর্ক—সবকিছু মিলিয়ে বইটি একসময়ের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের বিকল্প দলিল হয়ে ওঠে। 

তবে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় ইতিহাস লেখেন না। তিনি স্মৃতি লেখেন। তাই তার ইতিহাসের ভাষা প্রাতিষ্ঠানিক নয়, ব্যক্তিগত। দেশভাগ তাই তার কাছে রাজনৈতিক মানচিত্রের পরিবর্তন বদলে মানুষের জীবন, পেশা, সম্পর্ক এবং মানসিকতার পরিবর্তন। এই ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গিই বইটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়।

লেখকের নিজের জীবনও ছিল কম নাটকীয় নয়। অর্থকষ্ট, পরীক্ষায় ব্যর্থতা, বিভিন্ন পেশায় কাজ করা, অপমান, মার খাওয়া, প্রেমের ব্যর্থতা—সবকিছুকে তিনি এমনভাবে লিখেছেন, যেন জীবনের কোনো অধ্যায়ই সাহিত্যিকভাবে অযোগ্য নয়। এখানেই তার লেখার শক্তি। সাধারণত আত্মজীবনীতে মানুষ নিজের সাফল্যের দিকে বেশি আলো ফেলতে চান। শ্যামল সেখানে উল্টো পথে হাঁটেন। তিনি ভুলের দিকেই আলো ফেলেন। 

শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের গদ্যের আরেকটি বড় গুণ তার রসবোধ। জীবনের কঠিন ঘটনাগুলোর মধ্যেও তিনি হাসির জায়গা খুঁজে পান। কিন্তু এই হাসি সব সময় নির্মল হাসি নয়। অনেক সময় এর ভেতরে অন্ধকার আছে। অপমানের মধ্যেও হাসি, দারিদ্র্যের মধ্যেও হাসি, ব্যর্থতার মধ্যেও হাসি—ফলে তার রসবোধ এক ধরনের ডার্ক কমেডির আবহ তৈরি করে। পাঠক একই সঙ্গে হাসেন এবং অস্বস্তি অনুভব করেন। এই দ্বৈত অনুভূতি বইটির অন্যতম আকর্ষণ।

‘জীবন রহস্য’ গ্রন্থের প্রসঙ্গও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে জীবন, যৌবন, প্রেম-বিরহ, সামাজিক সম্পর্ক, যৌনতা, অনুরাগ-বিরাগ, শত্রুতা ও লেখালেখি নিয়ে তার অকপট স্বীকারোক্তির কথা বেলাল চৌধুরী উল্লেখ করেছেন। ‘এই জীবনের যত মধুর ভুলগুলি’ সেই জীবনদর্শনেরই আরেক বিস্তৃত প্রকাশ বলে মনে হয়। এখানে ভুল আছে, সংশোধন আছে, আবার একই ভুলের দিকে ফিরে যাওয়াও আছে। 

শ্যামল জটিল ভাষার প্রদর্শনী করেন না। তার গদ্য সহজ, সরাসরি এবং কথোপকথনধর্মী। কোথাও একটি ছোট্ট মন্তব্য পাঠককে দীর্ঘ সময় ভাবায়। কোথাও একটি ব্যক্তিগত স্মৃতি একটি পুরো সময়কে চোখের সামনে হাজির করে।

তবে বইটির একটি বেদনাদায়ক সীমাবদ্ধতাও আছে। ‘এই জীবনের যত মধুর ভুলগুলি’ অসমাপ্ত। ফলে পাঠক এমন একটি জীবনের পূর্ণাঙ্গ পরিণতি পান না, যে জীবনকে লেখক এত অকপটে খুলে ধরেছিলেন। অসমাপ্তির কারণে বইটির প্রতি পাঠকের মমতা আরও বেড়ে যায়। মনে হয়, আরও কিছু কথা শোনা যেত। আরও কিছু মানুষ, ঘটনা, প্রেম, ব্যর্থতা এবং সাহিত্যিক অভিজ্ঞতা হয়তো সামনে আসত। সেই অপূর্ণতা বইটিকে একই সঙ্গে বেদনাময় ও স্মরণীয় করেছে।

সব ভুল কি সত্যিই মধুর? নিশ্চয়ই নয়। কিছু ভুল মানুষকে ভেঙে দেয়। কিছু ভুলের মূল্য দিতে হয় সারাজীবন। কিন্তু সেই ভুলের মধ্য দিয়েই মানুষ নিজের জীবনকে চিনতে শেখে। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় নিজের জীবনের সেই ভুলগুলোকেই সাহিত্যের উপাদানে পরিণত করেছেন। 





Source link

×
📺

LIVE TV

Live Tv দেখতে নিচের বাটনে ক্লিক করুন।

📺 লাইভ দেখুন
error: Content is protected !!
🔴 LIVE html