“তুমি বিশ্বাস ভক্তি নিয়া দেখো চেষ্টা করিয়া
মানুষনি একটু হইতে পারো
মরণের আগে তুমি একবার মরো।”
বাউল সাধক উকিল মুন্সী ইমামতি করতেন। গান ছিল তার রুহের খোরাক। বেতাই নদীর পাশের সেই বাউল-ইমাম তার গানের কথা এবং সুরের মাধ্যমে মানুষের মনে শান্তি, সমতা ও মানবতার বাণী ছড়িয়ে গেছেন। ধর্মীয় জীবনাচার, আধ্যাত্মিক সাধনা ও লোকসংস্কৃতিকে যিনি একসঙ্গে ধারণ করেছিলেন। তার জীবনাচরণে তিনি শরিয়ত ও মারেফতের এক অনন্য মেলবন্ধন তৈরি করেছিলেন। বর্তমানের চরম মৌলবাদ ও সামাজিক বাস্তবতায় বাউলদের অস্তিত্ব যখন তীব্র সংকটে, তখন মরমি শিল্পী উকিল মুন্সীর এই অসাম্প্রদায়িক, সমন্বয়বাদী এবং প্রেমভিত্তিক দর্শন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
এই মরমি সাধক ১৮৫৫ সালের ১১ জুন নেত্রকোণা জেলার খালিয়াজুড়ি উপজেলার নূরপুর বোয়ালীতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরো নাম সৈয়দ আব্দুল হক আকন্দ। তিনি যে কণ্ঠে আজান দিয়েছেন সেই একই কণ্ঠেই সৃষ্টি করেছেন “আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানি রে”, “ভেবেছিলাম রঙে দিন যাবেরে সুজন নাইয়া”—এর মতো অসংখ্য জনপ্রিয় গান। তার আধ্যাত্মবাদের গুরু ছিলেন হবিগঞ্জের রিচি দরবার শরীফের পীর সৈয়দ মোজাফফর আহমদ। শৈশবে তিনি ঘেটুগানে যোগ দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে গজল ও পরিণত বয়স থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি বাউল সাধনায় মগ্ন ছিলেন। চাচার বাড়ি জালালপুর গ্রামে বেড়াতে গিয়ে তিনি প্রেমে পড়েন ধনু নদীর পাড়ের এক গ্রামের মেয়ে হামিদা খাতুনের। এই প্রেম নিয়েই তিনি লিখেছিলেন তার বিখ্যাত গান, “উকিলের মনচোর”। তার চাচা এই প্রেমের কথা জানতে পেরে বাধা দিলে, তিনি জালালপুর গ্রাম থেকে কয়েক মাইল দূরে মোহনগঞ্জের জৈনপুর গ্রামের এক মসজিদে ইমামতি ও মাদ্রাসায় শিক্ষকতার পেশায় নিযুক্ত হন।
ইমামতির পাশাপাশি গান গাওয়ার ফলে গ্রামের কয়েকজন তার নামে নালিশ করেছিলেন নেত্রকোনার প্রখ্যাত আলেম হযরত মওলানা মঞ্জুরুল হক সাহেবের কাছে। মওলানা সাহেব তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তর দেন, “গান হলো আমার রুহের খোরাক”। পরে তিনি মওলানা সাহেবের সামনে একটা গান ধরেন। তার গান শুনে উপস্থিত সবাই হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন। তখন মওলানা সাহেব বলেন উকিল মুন্সীর গান সাধারণ গান না, আমরা যে ওয়াজ করি এই গান ওয়াজের মতোই।
গানের জগতে উকিল মুন্সী একজন বিরহী ডাহুক। তিনি নারী পুরুষের অন্তরের আকুতি, প্রেম, ভালোবাসা, বিরহ গাথা এবং সৃষ্টিকর্তাকে উদ্দেশ্য করে তার বিরহের অনুভূতি প্রকাশ করতেন। জীবদ্দশায় সাধারণ মানুষ তাকে মরমি কবি, বাউল ফকির উকিল মুন্সী, দরদি বাউল উকিল মুন্সী প্রভৃতি নামে ডাকতেন। তিনি স্থানীয়ভাবে ‘বাউল ইমাম’ বলেও পরিচিত ছিলেন। প্রকৃত অর্থে তিনি ছিলেন একজন বিরহী বাউল।
শরীয়তপন্থী লোকজন একবার বাউল গান চর্চার বিরোধিতা করে নেত্রকোণা সদরের বালিতে একটা ধর্ম সভার ডাক দিলে, উকিল মুন্সী চ্যালেঞ্জ করে বসেন যে বাউল সংগীতকে বন্ধ করতে তিনি দেবেন না। যেদিন ধর্মসভা ডাকা হয়েছিল সেইদিনই তার পাশে উনি বাউল গানের আয়োজন করেন। উনার বক্তব্য ছিল, দেখা যাক ধর্ম সভায় কী পরিমাণ লোক হয় আর বাউল গানের আসরে কী পরিমাণ লোক হয়। পরবর্তী সময়ে দেখা গেল ধর্ম সভার চেয়ে অধিক মানুষ বাউল গানের আসরে চলে এসেছিলেন। এমনকি ধর্ম সভার থেকেও মানুষ বাউল গানের আসরে এসেছিলেন। এটা দেখে শরীয়তপন্থী লোকজন এই বাউল সংগীত বন্ধের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।
“ত্রিশ পারা কোরান পড়িয়া
পায় না তারে কেউ খুঁজিয়া
সহজে লও রে বুঝিয়া
বর্জকে চিনো মূল।”
কিংবা
“হাতে বাঁশি মাথে চূড়া এই তো বন্ধের চিন্
নামের মালা গলায় লইয়া সাজলাম দীনহীন রে”
তার গানের সাথে মানুষের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। বর্তমানে আমাদের চারপাশের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বাউল ও মরমি সাধকদের জন্য দিন দিন অত্যন্ত সংকুচিত এবং প্রতিকূল হয়ে উঠছে। গত কয়েক দশকে সমাজ ও রাজনীতিতে যে উগ্র রক্ষণশীলতা ও ধর্মান্ধতার উত্থান ঘটেছে, তার প্রথম আঘাতটি এসেছে বাউল ও মরমি সংস্কৃতির উপর। বাউলদের কাফের বা ধর্মদ্রোহী আখ্যা দেওয়া, তাদের চুল কেটে দেওয়া, আখড়া ভাঙচুর করা এবং লালন উৎসব বা বাউল মেলা বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনা আমরা প্রায়ই দেখছি। লোকসংস্কৃতিকে আজ কেবল ‘বিনোদন’-এর বাণিজ্যিক উপাদান বানিয়ে ফেলা হয়েছে। বাউল গানের পেছনের যে মূল দর্শন ও আধ্যাত্মিক সাধনা, তা বাদ দিয়ে একে শুধুই বিনোদন মাধ্যমের বেড়াজালে আটকে ফেলা হয়েছে। ফলে প্রান্তিক বাউলরা চরম অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বর্তমানের রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থা মানুষকে ধর্মের নামে, দলের নামে, জাতের নামে ক্রমাগত বিভক্ত করা হচ্ছে।
উকিল মুন্সী এই সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যাধির মহৌষধ স্বরূপ। আজ যখন ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়ে সমাজকে বিভক্ত করা হচ্ছে, তখন উকিল মুন্সী যেন এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। তিনি এক হাতে মসজিদের ইমামতি করেছেন, অন্য হাতে পরম মমতায় বেঁধেছেন রাধাকৃষ্ণের বিরহ গাথা। ধর্ম যে মানুষের ভেতর দেয়াল তোলে না, প্রেম ও মিলনের পথ দেখায়, তা উকিল মুন্সীর জীবন ও গান না বুঝলে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। তার এই সমন্বয়বাদী দর্শন আজকের সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ রুখতে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হতে পারে।
“মন চলো যাই আনন্দকাননে
যথায় রাজা প্রজা-দীন-ধনী কোনো ভেদ নাহি মানে।”
তার গানের যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা, তা প্রমাণ করে যে বাংলার মাটির আসল সুরটি আসলে উগ্রতা নয়, বরং মরমি। বাউলদের অস্তিত্ব রক্ষা মানেই বাংলার এই অসাম্প্রদায়িক আত্মাকে রক্ষা করা, আর সেখানে উকিল মুন্সী অন্যতম স্তম্ভ।
এই মরমী সাধক, ১৯৭৮ সালের মাঝামাঝিতে তার স্ত্রী হামিদা খাতুনের মৃত্যুর পরে অসুস্থ হয়ে ১২ ডিসেম্বরে মৃত্যুবরণ করেন। নেত্রকোণার মোহনগঞ্জ উপজেলার তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের জৈনপুরে বেতাই নদীর পারে চিরনিদ্রায় শায়িত হন বাউল ইমাম উকিল মুন্সী। তার মাজার আজও স্থানীয়ভাবে সম্মান ও ভক্তির জায়গা হয়ে আছে। অনেকে এখানে এসে সাধনা করেন। তার এই অসাম্প্রদায়িক সংগীত ও জীবনদর্শন পাল্টে দিয়েছে স্থানীয় মানুষের চিন্তাশক্তি।
বর্তমান সমাজের উগ্রতা, অসহিষ্ণুতা ও মানবিক মূল্যবোধের পতনের অন্ধকার সময়ে উকিল মুন্সীর দর্শন যেন আলোর দিশারি। সমাজ থেকে ঘৃণা দূর করতে ও বাউলদের ওপর চলা অন্যায়ের বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে উকিল মুন্সীর গান ও সমন্বয়বাদী দর্শন আজ যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। তাকে চর্চার মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখার অর্থই হলো বাংলার প্রকৃত অসাম্প্রদায়িক ও উদার চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখা।
যে সমাজ আজ ধর্মের বাহ্যিক আচার ও কৃত্রিম দেয়াল তুলে মানুষকে ক্রমাগত দূরে ঠেলে দিচ্ছে, সেখানে উকিল মুন্সীর জীবন আমাদের শেখায় কীভাবে চরম অনুরাগে সব বিভেদ ভুলে পরমাত্মার সন্ধান করতে হয়। উকিল মুন্সীর ‘সোয়াচান পাখি’র আকুলতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষের আসল পরিচয় তার আত্মিক মুক্তিতে, কোনো সংকীর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক বেড়াজালে নয়।