ঢাকাThursday , 17 September 2026
  1. অন্যান্য
  2. আবহাওয়া
  3. খেলা
  4. চাকরি
  5. জীবনযাপন
  6. তথ্যপ্রযুক্তি
  7. প্রেস রিলিজ
  8. বাণিজ্য
  9. বাংলাদেশ
  10. বিনোদন
  11. বিশ্ব
  12. ভিডিও
  13. মতামত
  14. রাজনীতি
  15. শিক্ষা
আজকের সর্বশেষ সবখবর

মেট্রোরেলের খরচ বাড়ছে, জাপানের ঋণের ফাঁদে পড়বে বাংলাদেশ?


September 17, 2026 10:35 pm
Link Copied!


ঢাকার যানজট কমাতে মেট্রোরেলকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে। দ্রুত, নিরাপদ ও গণপরিবহনের সক্ষমতা বাড়াতে রাজধানীতে একের পর এক মেট্রোরেল লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের খরচ যত বাড়ছে, ততই সামনে আসছে আরেকটি বড় প্রশ্ন—মেট্রোরেলের ঋণ ও পরিচালন ব্যয়ের চাপ শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর কতটা বোঝা তৈরি করবে?

বিশেষ করে জাপানের অর্থায়নে নির্মাণাধীন ও প্রস্তাবিত এমআরটি লাইন-১ এবং এমআরটি লাইন-৫ নর্দান প্রকল্পের ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ার পর প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জাপানি ঋণের সুদের হার বৃদ্ধির বিষয়টি। ফলে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু শুধু মেট্রোরেল হবে কিনা তা নয়—বরং কত টাকায় হবে, সেই টাকা কীভাবে পরিশোধ হবে এবং প্রকল্প থেকে কতটা আর্থিক সুবিধা পাওয়া যাবে—সেটিই বড় প্রশ্ন।

দুই মেট্রোরেলের ব্যয় বেড়েছে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি

২০১৯ সালে অনুমোদনের সময় বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর ও পূর্বাচল পর্যন্ত ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। সংশোধিত হিসাবে এর ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৬১ হাজার ৮৩৩ কোটি টাকা বা ১১৭ শতাংশের বেশি বেড়েছে প্রকল্প ব্যয়।

অন্যদিকে হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার এমআরটি লাইন-৫ নর্দানের মূল ব্যয় ছিল ৪১ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা। সংশোধিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই প্রকল্পেও ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৪৮ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। দুই প্রকল্প মিলিয়ে ২০১৯ সালের প্রায় ৯৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকার ব্যয় এখন দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪ হাজার ২৪৩ কোটি টাকার কাছাকাছি।

অবশ্য সংশোধনের আগে ব্যয় আরও বেশি ‘প্রায় ২ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা’ প্রস্তাব করা হয়েছিল। পর্যালোচনা ও কাটছাঁটের মাধ্যমে প্রায় ৯ হাজার ৭০০ কোটি টাকা কমানো হয়েছে। অর্থাৎ ব্যয় কমানোর চেষ্টা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাতেও দুই প্রকল্পের মোট ব্যয় ২ লাখ কোটি টাকার ওপরে রয়ে গেছে।

একই মেট্রোরেল, অথচ কিলোমিটারে এত পার্থক্য কেন?

ব্যয়ের পার্থক্যটি আরও স্পষ্ট হয় এমআরটি লাইন-৫-এর উত্তর ও দক্ষিণ অংশ তুলনা করলে। হেমায়েতপুর-ভাটারা ২০ কিলোমিটার উত্তর রুটে ব্যয় প্রায় ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে গড় ব্যয় প্রায় ৪ হাজার ৪৯২ কোটি টাকা।

অন্যদিকে গাবতলী-দাশেরকান্দি ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দক্ষিণ রুটে ব্যয় ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা। প্রতি কিলোমিটারে গড় ব্যয় প্রায় ২ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ কিলোমিটার হিসাবে উত্তর রুটের ব্যয় দক্ষিণ রুটের তুলনায় প্রায় ১ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকা বেশি। শতাংশের হিসাবে ব্যবধান প্রায় ৭০ শতাংশ।

তবে দুই প্রকল্পকে সরাসরি এক করে দেখার ক্ষেত্রেও সতর্কতা দরকার। মাটির গভীরতা, স্টেশনের নকশা, ভূমি ও অবকাঠামোগত ঝুঁকি, নির্মাণকাল, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, কর, পরামর্শক ব্যয় এবং প্রকল্পের নকশার পার্থক্য—সবই ব্যয়ে প্রভাব ফেলে। এমআরটি-১-এর ক্ষেত্রে বিস্তারিত সমীক্ষায় কিছু স্টেশন আগের ধারণার চেয়ে বেশি গভীরে নির্মাণের প্রয়োজন হয়েছে বলেও প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবু একই শহরের দুটি মেট্রোরেল প্রকল্পে কিলোমিটারপ্রতি এত বড় পার্থক্য কেন—এই প্রশ্নের জবাব জনসমক্ষে পরিষ্কার হওয়া জরুরি।

জাপানি ঋণ কি সত্যিই সস্তা থাকছে?

মেট্রোরেলের ব্যয়ের সঙ্গে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে ঋণের সুদ। প্রকল্প দুটি যখন নেওয়া হয়েছিল, তখন জাইকার ঋণের সুদ ছিল অত্যন্ত কম—প্রায় শূন্য দশমিক ৬ থেকে শূন্য দশমিক ৯ শতাংশের পর্যায়ে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক সুদহার ও ঋণের শর্ত পরিবর্তনের কারণে জাপানি অর্থায়নের নতুন অংশে সুদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী হার ৩ শতাংশের ওপরে এবং সেপ্টেম্বরের মধ্যে চুক্তি চূড়ান্ত না হলে তা প্রায় ৩ দশমিক ৫০ শতাংশে উঠতে পারে বলে বাংলাদেশকে জানানো হয়েছিল।

এ কারণেই একনেকে প্রকল্প দুটি দ্রুত তোলার অন্যতম যুক্তি ছিল বর্তমান শর্তে ঋণচুক্তি এগিয়ে নেওয়া। পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রীও বলেছেন, সময় পেরিয়ে গেলে সুদের হার আরও বাড়তে পারে। তবে এখানেই প্রশ্ন হচ্ছে—সুদের হার বাড়ার আগে ঋণচুক্তি করা মানেই কি বাংলাদেশ ঋণের ফাঁদে পড়ছে? এর উত্তর সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ নয়।

কারণ ৩ শতাংশের কিছু বেশি সুদ আন্তর্জাতিক দীর্ঘমেয়াদি ঋণের বাজারের তুলনায় একেবারে অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য প্রকৃত ঝুঁকি শুধু সুদের হার নয়। প্রকল্পের মোট ব্যয় কত, ঋণের পরিমাণ কত, কত বছরে তা পরিশোধ করতে হবে, মেট্রোরেল থেকে কত আয় হবে এবং সরকারকে প্রতিবছর কত ভর্তুকি দিতে হবে—এই পুরো হিসাব একসঙ্গে দেখতে হবে।

ঋণের ফাঁদ কোথায় তৈরি হতে পারে?

ঋণের ফাঁদ সাধারণত শুধু ঋণের পরিমাণ দিয়ে তৈরি হয় না। একটি প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক ও আর্থিক সুফল যদি ঋণের বোঝা সামলানোর জন্য যথেষ্ট না হয়, তখন সরকারি বাজেটের ওপর চাপ বাড়তে থাকে।

মেট্রোরেলের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এমআরটি-৬-এর ব্যয় শুরুতে নির্ধারিত অঙ্কের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর ঋণের কিস্তি, পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুৎ ও বেতনসহ অন্যান্য ব্যয় সামলাতে সরকারের সহায়তা প্রয়োজন হচ্ছে—এমন বাস্তবতা সামনে এসেছে।

ফলে নতুন দুটি প্রকল্পের ক্ষেত্রেও শুধু যাত্রী বাড়বে, যানজট কমবে, সময় বাঁচবে—এই সুবিধাগুলো হিসাব করলেই হবে না। হিসাব করতে হবে একজন যাত্রীর কাছ থেকে পাওয়া আয় বনাম ওই যাত্রীর জন্য অবকাঠামো নির্মাণ ও পরিচালনায় রাষ্ট্রের ব্যয়।

বিশেষ করে এমআরটি-১-এর ব্যয় যখন ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকার ওপরে, তখন প্রকল্পটি কত যাত্রী বহন করবে এবং সেই যাত্রীদের কাছ থেকে কত রাজস্ব আসবে—এটি নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন।

জাপানি অর্থায়নের সঙ্গে আরেকটি প্রশ্ন, ঠিকাদারি কাঠামো

মেট্রোরেল প্রকল্পে শুধু ঋণের সুদ নয়, প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ঠিকাদারি ও ক্রয় প্রক্রিয়াও আলোচনায় এসেছে। সরকারি কর্মকর্তাদের একটি অংশের বক্তব্য, জাইকার অর্থায়ন কাঠামোয় নির্দিষ্ট প্রযুক্তি, কারিগরি সক্ষমতা ও ঠিকাদারি শর্তের কারণে প্রতিযোগিতার পরিসর সীমিত হতে পারে। এর ফলে কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা কনসোর্টিয়ামের মধ্যেই দরপত্র সীমাবদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এমআরটি-১ ও এমআরটি-৫ নর্দানের কিছু দরপত্রে প্রাক্কলনের তুলনায় অত্যন্ত বেশি দর প্রস্তাব আসার পর বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে।

অন্যদিকে দক্ষিণ রুটের মেট্রোরেল প্রকল্পে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়ন রয়েছে। ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার এই প্রকল্পের ব্যয় ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা, যা উত্তর রুটের তুলনায় কিলোমিটারপ্রতি অনেক কম।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে—ভবিষ্যৎ মেট্রোরেল প্রকল্পে অর্থায়নের উৎস বাছাইয়ের পাশাপাশি উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তির যৌক্তিকতা এবং আন্তর্জাতিক বাজার দরের সঙ্গে নির্মাণ ব্যয়ের তুলনা বাধ্যতামূলক করা দরকার।

তাহলে বাংলাদেশের সামনে করণীয় কী?

প্রথমত, প্রতিটি মেট্রোরেল প্রকল্পের জন্য আলাদা করে লাইফ-সাইকেল কস্ট প্রকাশ করা দরকার। অর্থাৎ শুধু নির্মাণ ব্যয় নয়—ঋণের সুদ, কিস্তি, রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুৎ, কর্মী, যন্ত্রাংশ এবং পুনর্বাসনসহ ৩০-৪০ বছরের মোট ব্যয় কত হবে, সেটি জনগণের সামনে আনতে হবে।

দ্বিতীয়ত, প্রকল্পের সম্ভাব্য আয়ও একইভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন। প্রতিদিন কত যাত্রী হবে, গড়ে কত ভাড়া পাওয়া যাবে, বার্ষিক আয় কত এবং ভর্তুকি ছাড়া পরিচালনা সম্ভব কিনা—এসব তথ্য থাকা উচিত।

তৃতীয়ত, জাপান বা অন্য কোনও উন্নয়ন সহযোগীর ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু কম সুদ দেখলেই হবে না। ঋণের সঙ্গে যুক্ত ক্রয়শর্ত, প্রযুক্তি, ঠিকাদারি কাঠামো ও প্রতিযোগিতার সুযোগও বিবেচনায় নিতে হবে।

চতুর্থত, স্থানীয় প্রকৌশলী ও নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। দীর্ঘমেয়াদে প্রতিটি মেট্রোরেলের প্রযুক্তি ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিদেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থাকলে খরচ কমানোর সুযোগ সীমিত থাকবে।

জাপানের ঋণের ফাঁদ, নাকি ব্যয়বহুল উন্নয়ন প্রকল্প?

এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য দিয়ে মেট্রোরেল প্রকল্পকে সরাসরি ‘জাপানি ঋণের ফাঁদ’ বলা অর্থনৈতিকভাবে অতি সরলীকরণ হবে। কারণ জাইকার অর্থায়নের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো দীর্ঘমেয়াদি ঋণ এবং ঐতিহাসিকভাবে তুলনামূলক কম সুদ। তবে বর্তমান বাস্তবতা বদলেছে। সুদের হার বেড়েছে, প্রকল্প ব্যয় দ্বিগুণের বেশি হয়েছে এবং সরকারের নিজস্ব অর্থায়নের প্রয়োজনও বাড়ছে।

অতএব, আসল ঝুঁকি কোনও একটি দেশের ঋণ নেওয়ায় নয়; বরং অতিরিক্ত ব্যয়ে অবকাঠামো নির্মাণ, সীমিত প্রতিযোগিতা, বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি, সুদের হার বৃদ্ধি এবং প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত আয় না আসা—এই সবগুলো ঝুঁকি একসঙ্গে তৈরি হওয়ায়।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘মেট্রোরেলের যে দুটি প্রকল্পের ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে যাচ্ছে, সেসব প্রকল্প থেকে দেশের অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত কতটা লাভবান হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শুধু নির্মাণ শেষ করাই যথেষ্ট নয়; প্রকল্পের ব্যয়ের তুলনায় এর অর্থনৈতিক সুফল কতটা পাওয়া যাচ্ছে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।’’

তিনি বলেন, ‘‘পরিকল্পনা অনুযায়ী বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা না গেলে তা অর্থনীতির জন্য বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে প্রকল্পের সময় ও ব্যয় দুটোই যদি বাড়তে থাকে, তাহলে একদিকে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ বাড়বে, অন্যদিকে প্রকল্পের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতাও প্রশ্নের মুখে পড়বে।’’

জাইকার ঋণে মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে উল্লেখ করে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘‘এই ঋণের অর্থও শেষ পর্যন্ত পরিশোধ করতে হবে। তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো মেট্রোরেল প্রকল্প থেকে যে আয় ও অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে, তা দিয়ে এই ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা প্রকল্পটির আছে কিনা। প্রকল্পের ব্যয় যদি প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি হয়, অথচ সেই অনুপাতে আয় বা অর্থনৈতিক সুবিধা না বাড়ে, তাহলে ঋণের কিস্তি ও অন্যান্য ব্যয়ের চাপ সরকারের ওপর পড়তে পারে।’’

তিনি বলেন, ‘‘প্রকল্পে কীভাবে অর্থায়ন করা হচ্ছে এবং অর্থায়নের শর্তগুলো কতটা স্বচ্ছ ও যৌক্তিক, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ জাইকার অর্থায়নের সঙ্গে কিছু নির্দিষ্ট শর্ত থাকে, সেগুলোও বাংলাদেশকে মানতে হয়। এসব শর্তের কারণে যদি প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় বা সংশ্লিষ্ট ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত সেই অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা জনগণের ওপর পড়ার আশঙ্কা থাকে।’’

ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘‘যত টাকা খরচ করে মেট্রোরেল নির্মাণ করা হচ্ছে, তার তুলনায় যদি প্রত্যাশিত বেনিফিট বা অর্থনৈতিক সুফল না আসে, তাহলে প্রকল্পটি আর্থিকভাবে টেকসই হবে না। তখন বাড়তি খরচ মেটাতে ভাড়া বাড়ানো, সরকারি ভর্তুকি বাড়ানো কিংবা বাজেট থেকে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন হতে পারে। এর যেকোনও একটি পথ বেছে নিতে হলে শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষ বা সরকারের অর্থের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘প্রকল্প বাস্তবায়নে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারলেও ঝুঁকি বাড়বে। কারণ সময় যত বাড়বে, ততই নির্মাণ ব্যয়, পরামর্শক ব্যয়, ঋণের সুদ এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট খরচ বাড়তে পারে। একপর্যায়ে প্রকল্পের ব্যয় এতটাই বেড়ে যেতে পারে যে এর নেতিবাচক প্রভাব শুধু প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।’’

তার মতে, তাই মেট্রোরেল প্রকল্পের ঝুঁকি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু জাইকার ঋণের সুদের হার কত—এটি দেখলে হবে না। মোট প্রকল্প ব্যয়, বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ, ঋণের কিস্তি ও সুদ, সরকারের নিজস্ব অর্থায়নের সক্ষমতা, প্রকল্প থেকে সম্ভাব্য আয় এবং দীর্ঘমেয়াদে এর অর্থনৈতিক সুফল— সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘‘মেট্রোরেল ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু সেই সুফল পেতে গিয়ে যদি প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং ঋণ পরিশোধ ও পরিচালন ব্যয়ের চাপ সামলাতে সরকারকে দীর্ঘদিন ভর্তুকি দিতে হয়, তাহলে প্রকল্পটির অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।’’

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় যেভাবে বাড়ছে, তা অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। তবে শুধু জাপানি ঋণ গ্রহণের কারণেই বাংলাদেশ ‘ঋণের ফাঁদে’ পড়বে—এমনটি বলা  ঠিক হবে না। কারণ পুরোনো ঋণের সুদহার তুলনামূলক কম হলেও নতুন ঋণের সুদহার ও কিছু ক্রয়শর্ত আগের তুলনায় কঠিন হচ্ছে। ফলে বড় প্রকল্পে নতুন করে ঋণ নেওয়ার আগে এর অর্থনৈতিক কার্যকারিতা, দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতা, বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি এবং ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি।’’

উল্লেখ্য, মেট্রোরেল ঢাকার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিয়ে প্রশ্নের চেয়ে এখন বড় প্রশ্ন হলো, এটি কতটা আর্থিকভাবে টেকসইভাবে নির্মাণ ও পরিচালনা করা যাবে।

কারণ ঋণ নিয়ে অবকাঠামো বানানো সমস্যা নয়, যদি সেই অবকাঠামো দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা বাড়ায় এবং রাষ্ট্র ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে। কিন্তু প্রকল্পের ব্যয় যদি ক্রমেই বাড়তে থাকে আর আয় ও অর্থনৈতিক সুফল সেই হারে না বাড়ে, তখন মেট্রোরেলের সুবিধা পেলেও এর আর্থিক বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করতে হবে দেশের করদাতাদের।

সুতরাং, মেট্রোরেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন—‘জাপানের ঋণ নেবো কিনা’ নয়; বরং ‘কত টাকার ঋণ নেবো, কী শর্তে নেবো এবং সেই ঋণের প্রতিটি টাকা কতটা অর্থনৈতিক সুফল তৈরি করবে’, এই হিসাব।





Source link

×
📺

LIVE TV

Live Tv দেখতে নিচের বাটনে ক্লিক করুন।

📺 লাইভ দেখুন
error: Content is protected !!
🔴 LIVE html