এবার কুড়িগ্রাম সদরের ঘোগাদহ ইউনিয়নে এক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার ওপর হামলা করেছেন বিক্ষুব্ধ কৃষকরা। এতে মাথায় ও নাকে আঘাত পেয়ে আহত হয়েছেন ওই কৃষি কর্মকর্তা। রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে ঘোগাদহ ইউনিয়ন পরিষদের কাছে ডিলারের গুদামের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
কয়েকজন পুলিশ সদস্যের উপস্থিতিতে এ ঘটনা ঘটে। দৌড়ে স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে আশ্রয় নেন ওই কৃষি কর্মকর্তা। খবর পেয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি অফিসার এবং সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। পরে অপেক্ষমান কৃষকদের মাঝে গুদামে থাকা সার বিতরণ করা হয়।
এদিকে নির্ধারিত সময়ে গুদাম খুলে সার বিতরণ না করায় ‘মেসার্স অলিল মোল্লা’ নামক প্রতিষ্ঠানের মালিক অলিল মোল্লাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে কৃষি বিভাগ। তবে এ ব্যাপারে ওই ডিলারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
হামলার শিকার কৃষি কর্মকর্তার নাম মামুন অর রশিদ। তিনি গত এক মাস আগে ওই ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ব্লক সুপারভাইজার (বিএস) হিসেবে দায়িত্ব পান। হামলায় বিএস মামুন মাথা ও পিঠে আঘাত পেয়েছেন। এ সময় তার চশমার গ্লাস ভেঙে গিয়ে নাগের কাছে কেটে যায় বলে জানিয়েছেন তিনি।
মামুন অর রশিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইউনিয়নের দায়িত্বে থাকা মেসার্স অলিল মোল্লা নামে সার ডিলারের গুদামে আজ সকাল থেকে ১২০ বস্তা সার বিতরণ করার কথা ছিল। কিন্তু ডিলার নির্ধারিত সময়ে গুদাম খোলেননি। সকাল থেকে কৃষকরা গুদামের সামনে ভিড় করতে থাকেন। আমি ডিলারকে বারবার ফোন করলেও গুদাম খোলেননি। এর মধ্যে অপেক্ষায় থাকা কৃষকরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। দুপুর ১২টার দিকে কিছু কৃষক আকস্মিক আমাকে ডিলার ভেবে তেড়ে আসেন। কিছু বুঝে ওঠার আগে হামলা করে পেটান।’
এই কৃষি কর্মকর্তা বলেন, ‘আমি ওই ইউনিয়নে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত। সবাইকে চিনি না। হামলায় আমার পিঠে ও মাথায় আঘাত পেয়েছি। চশমা ভেঙে নাক কেটে গেছে। ঘটনাস্থলে পুলিশ থাকলেও তারা আমাকে উদ্ধারে এগিয়ে আসেননি। স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর সহায়তায় তার বাড়িতে আশ্রয় নিই। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ঘোগাদহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ে ডিলার গুদাম না খোলায় কৃষকরা উত্তেজিত হয়ে ব্লক সুপারভাইজারের ওপর হামলা করেছেন। ইউনিয়নে সারের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু যে পরিমাণ কৃষক সারের জন্য আসছেন, তা সন্দেহজনক। ভিড়ে অন্য পক্ষ প্রবেশ করে উসকানি দিয়েছে কিনা, তা দেখা দরকার। ব্লক সুপারভাইজারদের সঙ্গে কৃষকদের পরিচিতি ও যোগাযোগ না থাকায় কৃষকের বাইরের লোকজন সুযোগ নিয়েছেন।’
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাহিদা আফরীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ওই ডিলারকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হচ্ছে। জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটিকে অনুলিপি দেওয়া হবে। তারা পরবর্তী ব্যবস্থা নেবেন। কৃষি কর্মকর্তার ওপর হামলাকারীদের ভিডিও দেখে শনাক্ত করার চেষ্টা হচ্ছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কৃষকদের সারের চাহিদার প্রশ্নে কৃষি কর্মকর্তা নাহিদা আফরীন বলেন, ‘আমনে এখন সারের প্রয়োজন নেই। বন্যা না হওয়ায় নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে বিলম্বে কিছু আমন চাষ হয়েছে। কৃষকদের কিছু সারের চাহিদা রয়েছে। সেজন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কৃষকদের সঙ্গে কিছু সাধারণ মানুষও সার নিতে জড়ো হচ্ছেন। যাদের ১০ কেজি সারের দরকার তারাও ১ বস্তা দাবি করছেন। ফলে বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে।’
এ ব্যাপারে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শত শত মানুষ ছিল। পুলিশ ছিল তিন জন। এজন্য কৃষি কর্মকর্তাকে রক্ষা করতে পারেনি পুলিশ। এ ব্যাপারে কৃষি বিভাগ থেকে অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এর আগে ৭ সেপ্টেম্বর সকালে রৌমারী উপজেলার সদর ইউনিয়নের রৌমারী মহিলা কলেজপাড়া এলাকায় মেসার্স মিতা-হাসান এন্টারপ্রাইজ নামের ডিলারের গুদামের বেড়া ও দরজা ভেঙে শতাধিক বস্তা সার নিয়ে গেছেন বিক্ষুব্ধ কৃষকরা।
একইভাবে গত ২৩ আগস্ট ভূরুঙ্গামারীতে ডিলারের গুদামের দরজা ভেঙে ১৯৭ বস্তা ইউরিয়া সার নিয়ে গেছেন কৃষকেরা। সারের কৃত্রিম সংকট এবং অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির অভিযোগে এসব সার নিয়ে যান তারা। ওই দিন দুপুরের দিকে উপজেলার শিলখুড়ি ইউনিয়নের ধলডাঙ্গা বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।