“পৃথিবীতে অনেক মহামূল্য উপহার আছে, তার মধ্যে সামান্য চিঠিখানি কম জিনিস নয়।…আমরা মানুষকে দেখে যতটা লাভ করি, তার সঙ্গে কথাবার্তা কয়ে চিঠিপত্র দ্বারা তার চেয়ে আরও একটা বেশি কিছু পেয়ে থাকি।” ছিন্নপত্র গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই উপলব্ধি চিঠিপত্রের গুরুত্বকে এক নতুন অর্থ দেয়। মানুষের বহিরঙ্গ জীবনের আড়ালে যে ব্যক্তিমানস, তার আশা-নিরাশা, আনন্দ-বেদনা, সংগ্রাম ও স্বপ্ন লুকিয়ে থাকে, চিঠিপত্র সেই অন্দরমহলের দরজা খুলে দেয় অবলীলায়। সাহিত্যিক, সমাজসংস্কারক ও নারী জাগরণের অগ্রদূত সুফিয়া কামালের জীবন ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কেও সবচেয়ে আন্তরিক পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর লেখা এবং তাঁকে লেখা চিঠিপত্রগুলোতে।
সাহিত্যের জগতে সুফিয়া কামাল একজন কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক; ইতিহাসের পাতায় একজন সমাজকর্মী, বিপ্লবী ও নারী জাগরণের অগ্রদূত। কিন্তু ব্যক্তি সুফিয়া কামালকে জানা যায় তাঁর চিঠিপত্রে। এসব চিঠিতে ধরা পড়েছে তাঁর আত্মসংগ্রাম, হতাশা, স্বপ্ন, ভালোবাসা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পথ নির্মাণের দৃঢ় সংকল্প।
রক্ষণশীল মুসলিম সমাজে ১৯১১ সালে ২০ জুন জন্মগ্রহণ করেন সুফিয়া কামাল। পর্দাপ্রথা ও সামাজিক বিধিনিষেধে আবদ্ধ পরিবেশে বেড়ে উঠার কারণে তিনি শৈশবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পাননি। তাই তাঁর প্রতিবন্ধকতা ছিল একবিংশ শতাব্দীর যে-কোনো নারীর প্রতিবন্ধকতার তুলনায় আরো জটিল। সেসব চড়াই উতরাই পার হতে গিয়ে সুফিয়া কামালের মনের ব্যাকুলতা অনুমান করা যায় ১৯২৯ সালে সওগাত পত্রিকায় সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনকে লিখা একটি চিঠিতে। সেখানে তিনি লিখেছেন, “আমি আমার কাজ করে যাবো নীরবে, নিঃশব্দে। আমি পথের কাঁটা সরিয়ে যাব-এর পর যারা আসবে যেন কাঁটা না ফোটে তাদের পায়ে, তারা যেন কণ্টকবিদ্ধ পদে পিছিয়ে পিছিয়ে না পড়ে। ওইটুকু আমি করবো আমার যতটুকু শক্তি আছে তা দিয়ে।” সমাজের প্রতি কবির আত্মপ্রত্যয় ও দায়বদ্ধতা প্রকাশ পায় এই বক্তব্যে।
পশ্চাৎপদ সমাজে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের প্রতিবাদে যেমন প্রতিবাদে ফেটে পড়েছেন কবি সুফিয়া কামাল, কখনো আবার অভিমানে গুমরে উঠেছেন। ১৯৩৭ সালে একটি পত্রে আবুল ফজলকে লিখেছেন “কবিতাগুলোর কোনো কপি আমার কাছে নেই, তাঁর কাছেও নেই, পুরাতন সওগাত থেকে বেছে নিতে হবে, তার ভার কে নেয়? তা ছাড়া টাকা আমার নেই, অন্য কোনো প্রকাশকের সঙ্গেও জানাশোনা নেই, কেউ যে বেছে নিয়ে একটা বই বের করবেন সে রকম লোকও আমার নেই। রাধারাণী দেবীও আমাকে অনুযোগ করেছিলেন এ বিষয়ে, বলেছিলেন মুসলিম সমাজে কি কেউ এমন নেই যে, আপনার কবিতার বই বের করে? এর উত্তর আমি দিতে পারিনি। কারুর কাছে এ অনুরোধও আমি জানাতে পারিনি, কাজেই কবিতার বই বের করার আশা আর করি না।” পরবর্তীকালে ১৯৩৮ সালে কবি বেনজীর আহমদ নিজ খরচায় ‘কেয়ার কাঁটা ও সাঁঝের মায়া’ প্রকাশের দায়িত্ব নিয়েছিলেন এবং লেখক-সম্মানীর ব্যবস্থাও করেছিলেন।
১৯৩২ সালে স্বামী নেহাল হোসেনের মৃত্যু সুফিয়া কামালের জীবনে এক গভীর সংকট বয়ে আনে। তখন তাঁদের কন্যার বয়স মাত্র ছয় বছর। স্বামীর অকালপ্রয়াণে সংসারের দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে তাঁর কাঁধে এসে পড়ে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও সনদের অভাব সত্ত্বেও নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে তিনি কলকাতা কর্পোরেশনের একটি স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি গ্রহণ করেন। কিন্তু জীবনের এই কঠিন অধ্যায় তাঁকে সমাজ ও সাহিত্য থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। সংগ্রামের পাশাপাশি কখনো কখনো তিনি গভীর হতাশা ও মানসিক ক্লান্তিরও শিকার হয়েছেন। সেই অন্তর্দহন তাঁর সাহিত্যকর্মে তেমনভাবে প্রতিফলিত না হলেও ব্যক্তিগত চিঠিপত্রে তার স্পষ্ট সাক্ষ্য পাওয়া যায়। ১৯৩৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর মাহবুব আলমকে এক চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, “অদৃষ্টের উপর রাগ করে লোকে বিষ খায়…কিন্তু মান-অভিমান করে নিজেকে যে কত রূপে বঞ্চিত করেছি ও করছি তার ইয়ত্তা নেই…যদি আমি কিছু নাই লিখতে পারি? কেন মনে হচ্ছে এইবার লেখা আমার শেষ হয়ে এলো।” এই কথাগুলোতে ব্যক্তিগত বেদনা, সংশয় ও লেখিকার মানসিক অবস্থার প্রতিফলন ঘটেছে।
কাজী নজরুল ইসলাম নিজ আগ্রহে দেখা করেছিলেন সুফিয়া কামালের সঙ্গে। তারপর থেকে তাঁদের মধ্যে স্নেহের সম্পর্ক তৈরি হয়। নজরুলের প্রতি সুফিয়া কামালের স্নেহের পরিচয় পাওয়া যায় ১৯২৮ সালে মোহম্মদ নাসীরউদ্দীনকে লিখা একটিতে চিঠিতে। নজরুলের উপর হামলার খবর জানতে পেরে সুফিয়া কামাল দুঃখ ও আশঙ্কা প্রকাশ করে নাসীরউদ্দীনকে লিখেছেন, “আপনাকেই শুধু এ বিষয়ে অনুরোধ করতে পারি, আপনি ওকে দেখবেন। ওর মা হয়ে বোন হয়ে আমি আপনাকে অনুরোধ করছি। হতভাগাটাকে পথ থেকে এনে স্নেহ দিয়ে ওকে বাঁধুন। এ দুরন্ত শাসনে শায়েস্তা হবেই না।” একই চিঠিতে সমাজের শিক্ষিতদের নির্লিপ্ততা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন “শিক্ষিত সম্প্রদায়ের এক শ্রেণির লোক আমাদের সমাজে আছেন বটে কিন্তু তাঁরা শুধু অহং-ই। এরা নিজের অঙ্গে একটু আঘাত পেলে উঁহুঁ করবেন কিন্তু সমাজ কিংবা জাতীয় কোনো কাজে এদের কোনো টান নেই, এটা আপনি ভালোই জানেন।”
কাজী নজরুল ইসলাম শুধু সুফিয়া কামালের প্রতিভার স্বীকৃতিই দেননি, কঠিন সময়ে তাঁকে সাহস ও প্রেরণাও জুগিয়েছিলেন। তাঁদের পরিচয়ের সূত্র ছিল কবিতা। পত্রিকায় সুফিয়া কামালের কবিতা পড়ে নজরুল মুগ্ধ হন এবং তাঁকে চিঠি লিখে উৎসাহিত করেন। প্রশংসাসূচক সেই চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, “মুসলিম মেয়ে এরকম একটা কবিতা লিখেছে, এটা প্রশংসার কথা।” পরবর্তীকালে তাঁদের মধ্যে গভীর স্নেহ ও শ্রদ্ধার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রাখতে নজরুল তাঁকে অনুপ্রাণিত করে লিখেছিলেন, “আমি কলকাতায় আছি। তুমি সেখানে সওগাত পত্রিকায় লেখা পাঠাও। কোনো অসুবিধা হবে না।” শুধু তাই নয়, সুফিয়া কামালের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাঁঝের মায়া’-এর ভূমিকা লিখে নজরুল তাঁর সাহিত্যিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। আবুল আহসানের সাথে সাক্ষাৎকারে নজরুলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সুফিয়া কামাল এসকল ঘটনার বর্ণনা দেন। নজরুলের অকুণ্ঠ সমর্থন ও উৎসাহ সুফিয়া কামালের সাহিত্যজীবনের অগ্রযাত্রায় এক বিশেষ প্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে।
শুধু নজরুলই নন, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও সুফিয়া কামালের অসামান্য প্রতিভার স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন উপলক্ষ্যে সুফিয়া কামাল একটি কবিতা রচনা করে তাঁর কাছে পাঠান। কবিতাটি পড়ে রবীন্দ্রনাথ গভীরভাবে মুগ্ধ হন এবং চিঠির মাধ্যমে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন। সেই চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, “তোমার কবিত্ব আমাকে বিস্মিত করে, বাংলা সাহিত্যে তোমার স্থান ঊর্ধ্বে ও ধ্রুব তোমার প্রতিষ্ঠা।” বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবির এই অকুণ্ঠ প্রশংসা ছিল সুফিয়া কামালের সাহিত্যিক প্রতিভার এক বিরল ও তাৎপর্যপূর্ণ স্বীকৃতি। পরবর্তীকালে তাঁদের মধ্যে একাধিকবার পত্রালাপ হয়। ১৯২৯ সালে জানুয়ারি মাসের শুরর দিকে সুফিয়া কামাল নিমন্ত্রণ জানিয়ে রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লিখেন। সেই বছরই উত্তরে রবীন্দ্রনাথ নিজের শারীরিক ‘হর্ত্তাল’-এর কারণে নিমন্ত্রণ গ্রহণ করতে পারেননি। তবে উক্ত চিঠিতে তিনি ঠাট্টা করে লিখেন, “তমি রেঁধে খাওয়াতে চেয়েছ সেই কথাটি আমি এই দূরে থেকেও মনে রাখব। তুমি ভুলবে বলে আশঙ্কা করছি।” আবার ১৯৩৭ সালে রোগাক্রান্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রোগমুক্তি চেয়ে চিঠি লিখেন সুফিয়া কামাল। সেই চিঠির সাথে তিনি তাঁর প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থটিও পাঠান। ‘শ্রীচরণেষু’ সম্বোধন করে উক্ত চিঠিটিতে তিনি লিখেন, “আপনার রোগমুক্তির পর একবার গিয়ে আপনাকে দেখতে অত্যন্ত ইচ্ছা ছিল। কিন্তু আপনার বিশ্রামে ব্যাঘাত ঘটাতেও ইচ্ছা করল না। সমস্ত অন্তর দিয়ে আপনার দীর্ঘায়ু প্রার্থনা করি। আমার প্রথম ছাপা বই, আপনাকে একখানা পাঠালুম। আপনার আশির্ব্বাদসদৃ চাই।”
সুফিয়া কামালের চিঠিপত্র পাঠ করলে তাঁর ব্যক্তিত্বের এক বহুমাত্রিক রূপ আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়। এসব চিঠিতে যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন, আবুল ফজল প্রমুখ প্রথিতযশা সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে তাঁর আন্তরিক সম্পর্কের পরিচয় মেলে, তেমনি ধরা পড়ে তাঁর জীবনের নানা চড়াই-উতরাই, সংগ্রাম, হতাশা ও সাফল্যের ইতিহাস। একজন নারী হিসেবে সামাজিক প্রতিবন্ধকতা, পারিবারিক সংকট এবং আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও তিনি যে দৃঢ়তা, আত্মবিশ্বাস ও অধ্যবসায়ের সঙ্গে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তার অকৃত্রিম সাক্ষ্য বহন করে তাঁর এইসব চিঠিপত্র।
তথ্যসূত্র:
সুফিয়া কামাল অন্তরঙ্গ আত্মভাষ্য—আবুল আহসান চৌধুরী, প্রথমা প্রকাশন, ২০১১, ঢাকা।
রবীন্দ্রনাথ ও মুসলমান সমাজ—ভূঁইয়া ইকবাল, প্রথমা প্রকাশন, ২০১০, ঢাকা