ঢাকাWednesday , 24 June 2026
  1. অন্যান্য
  2. আবহাওয়া
  3. খেলা
  4. চাকরি
  5. জীবনযাপন
  6. তথ্যপ্রযুক্তি
  7. প্রেস রিলিজ
  8. বাণিজ্য
  9. বাংলাদেশ
  10. বিনোদন
  11. বিশ্ব
  12. ভিডিও
  13. মতামত
  14. রাজনীতি
  15. শিক্ষা
আজকের সর্বশেষ সবখবর

চৈত্রে ফোটা জবা ফুল

UttorbongoBD
June 24, 2026 1:05 am
Link Copied!


কেউ বিশ্বাস করবে না, তাই কখনো কাউকে বলার কথা ভাবিনি। আমার স্মৃতি খুব প্রখর। যোনি চিরে বের হতেই বাতাসের ঝাপটায় সর্বাঙ্গে কেঁপে ওঠার মুহূর্তটা আমার মনে আছে। চির-অন্ধকার থেকে সাময়িক মুক্তি, চোখ মেলে দেখি সামনে এক বিশালকায় বৃত্ত।

ঘাঘট নদীর এক স্যাঁতসেঁতে পরিত্যক্ত ঘাটে চুপচাপ শুয়ে ছিল মা। তীব্র জ্যোৎস্নায় চারপাশ ঢেকে গিয়েছিল গাঢ় ছায়ায়, ঝিঁঝিপোকার ডাক ছাপিয়ে বহুদূরের এক মন্দির থেকে ভেসে আসছিল ঢাকঢোলের ক্ষয়িষ্ণু আওয়াজ। পাশেই হাঁটু গেড়ে বসে ছিল প্রবল বিশ্বস্ত এক নারী, গগনবিদারী আর্তনাদগুলো গোপন করতে সে চেপে ধরেছিল প্রসূতির মুখ; আর ব্যথায় মোচড়াতে থাকা সেই শীর্ণকায় শরীরের অন্ধকার গহ্বরে শুয়ে আমি তখন আওড়াচ্ছিলাম আমার পূর্বজন্মের শোক। প্রসবের পরমুহূর্তেই চোখ খুলে দেখি আদিগন্ত আকাশের মাঝে গোলাকার হলুদ চাঁদ, মনে পড়ে যায়, এইতো দু’দিন আগেই চার গোরখোদক আমাকে দাফন করলো, তালে তালে দুলে দুলে কবর খুঁড়লো। কিন্তু পাশে নুয়ে থাকা অসার ক্ষীণদেহী শরীরটা দেখতে পেয়েই পূর্বজন্মের সমস্ত শোক ভুলে যাই আমি। আলিঙ্গন করে নেই বর্তমানকে, ঘুণে ধরা চাঁদকে, ভরা জোয়ারের নদীকে আর আমার সদ্য মৃতা মাকে।

বৃত্ত দেখে জেগে ওঠা বোধ আমার, বৃত্তেই বাঁধা পড়লো জীবন। দিনগুলো আবদ্ধ হলো কালের পুনরাবৃত্তিতে। সেই অদৃশ্য বাঁধের উপস্থিতি বুঝতে পেরে আমার অবচেতন বারবার হারিয়ে যেতে চাইতো ভিড়ে। অতঃপর আমাকে পথে ফেরাতো চিত্রাদি, জন্ম-পরমুহূর্তেই শব থেকে নাড়ি ছিঁড়ে ঘাঘটের জল ছুঁইয়ে পাপমুক্ত করে নিয়েছিল যে আমাকে। নয় বছর বয়সে একবার দুজনে যাই শুক্রবারের হাটে। ভিড়ের শেষ মাথায় বসা কুলফির দোকানটায় চোখ পড়ে যখন, চিত্রাদি তখন হাঁটু গেড়ে মাংস যাচাই করতে ব্যস্ত। বায়না করতেই দু’টাকা হাতে ধরায় দিয়ে বলে, ‘জলদি কিনে আন, মাথা ধরেছে, এখন ফিরবো।’ আমি এক দৌড়ে দুইটা কুলফি কিনে আনি, এরপর ফিরে এসে কোথাও খুঁজে পাই না পরিচিত মুখ। ভিড়ের মাঝে ঝাপসা চোখে দিগ্‌বিদিক দৌড়াতে থাকি, হারায় যাওয়ার ভয়ে নয়, চিত্রাদিকে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করানোর অনুতাপে। হঠাৎ পেছন থেকে টেনে ধরে কেউ, রুক্ষ স্পর্শেই বুঝি চিত্রাদি… দ্রুত পায়ে হেঁটে রিকশায় তুলে নেয় সে আমাকে। হুড তুলে দিতেই নিমিষে চারদিক অন্ধকার করে নামে ঝুম বৃষ্টি। বোধ করি চিত্রাদি জাদু জানে, তাই প্রতিবার ঠিক সময়ে তুলে দেয় আবরণ। বিদ্যুতের চমকে ভয়ে আঁকড়ে ধরি তার হাত, মুহূর্তে চোখের পর্দায় ঝিলিক দেয় অতীত- এ তো সেই মায়াবিনী, প্রকৃতি বশের বিদ্যা যার নখদর্পণে, ঘাঘটের জল শাসন করে সে-ই তো অতলে তলিয়ে যাওয়া থেকে বাঁচালো আমাকে। গভীর রাতে মাতৃগর্ভের স্মৃতিকাতরতায় যখনই আর্তনাদ করে উঠতাম, সে আমায় শক্ত করে বুকে টেনে নিতো। কখনো সুর করে শোনাতো ঘাঘটের জলে সমাধিস্থ তার নামহীন সখীর গল্প…দুনিয়াবি কাজ শেষে কীভাবে নিমগ্ন চিত্তে দুপায়ে ঘুঙুর পরে মন্দিরের চাতালে সে নেচে যেতো ঝমঝম ঝমঝম। শক্ত করে দু’চোখ বুজে কান পাতলে আমি শুনতে পেতাম অতীত ফুঁড়ে ভেসে আসা সেই ঝংকার। সেইসব শব্দময় রাত আর মেঘে ঢাকা দুপুর, যতবার এ ভূমির তাপ আমাকে নাড়ির টানে জর্জরিত করেছে, চিত্রাদি এসে আমাকে ছুঁয়ে দিয়েছে, স্মরণ করিয়েছে আমার জন্মরাত, চন্দ্রাচ্ছন্ন নদীর পাড় আর ঘাঘটের বুকে আমার মায়ের মৃত্যুর তাৎপর্য। আর সম্বোহিত আমি পুনরায় আলিঙ্গন করে নিয়েছি জীবনকে, আমার বর্তমানকে।

তবে জীবন আমায় প্রতি-আলিঙ্গন করেনি। আমি থেকে যাই গতজন্মের উদ্বৃত্ত, বর্তমানের কোলে এক অনাদরি অনাথ। বুঝি জন্মলগ্নেই ভাগ্যদৃষ্ট হয়েছিল আমার, প্রবল আকর্ষণে নিজের দিকে ঘাঘটের জল টেনে নেওয়া সেই চাঁদ ছিল আমারই প্রতিবিম্ব, সেই পূর্ণিমা আমার জীবনীশক্তি আর আসন্ন কৃষ্ণপক্ষ আমার যাত্রা। চিত্রাদিকে ছেড়ে ঢাকা আসি যখন, আমার রুহ কি একবারও আমায় এই উলটো পথের যাত্রা নিয়ে সাবধান করেনি? যে প্রাচীন বৃত্তে সহস্র বছর ধরে পাক খেয়ে যাচ্ছি তার চরিত্র সম্পর্কে আগাম বার্তা দেয়নি?

জন্মস্থান জুড়ে ছড়িয়ে ছিল আমার পূর্বনারীর আর্তনাদ। স্বল্প পড়াশোনায় তাই কোনোরকম একটা চাকরি জুটিয়ে চলে এসেছিলাম ঢাকায়। শহুরে বৈচিত্র্যহীন যাপনে দ্রুতই অভ্যস্ত হয়ে পড়ি। মাপা মাপা পদক্ষেপ, শরীরজুড়ে ক্লান্তি… এইতো ধ্রুব। তবে একদিন স্বাভাবিকতায় চ্যুতি ঘটে। ভিড়ের মাঝে চোখে পড়ে পরিচিত এক মুখ, ফিরে দেখি আমার গতজন্মের প্রেমিক।

সে এক ভীষণ ত্রৈধবিন্দু, যখন অতীত জড়িয়ে পড়ে বর্তমানে, সমাপ্তি তার সমস্ত অস্তিত্ব হারায় আর পাতাল ফুঁড়ে বেড়িয়ে আসে রক্ত হিম করা অসহায়ত্ব। চোখে ধরা পড়া যে স্বল্প জ্ঞানের সাথে আমাদের সম্পৃক্ততা, সেটুকু দিয়ে কীভাবে বোঝাবো তাকে আমি, সে আমার কত আপনজন! কী নামে ডেকে স্মরণ করাবো, সহস্রবছর আগের এক প্রবল খরায় আমরা দুজনে মন্ত্রবলে বৃষ্টি নামিয়েছি, অতঃপর নিয়তি লঙ্ঘনের পাপে দেবীর অভিশাপে পুড়ে মরেছি। বুঝি, কতকিছুই যত্নে মনে রেখেছি জন্মান্তরে, অথচ সেসব কিছুই ছিল কত অপ্রয়োজনীয়।

অসহায়ত্বের অবসান ঘটে দ্রুতই। আমাদের দুজনের প্রায়ই দেখা হয়ে যেতে থাকে, যেখানে আমাদের দেখা হওয়ার কথা না। কখনো বাসে, আধো আলো অন্ধকারে ঘামে ভিজে বাড়ি ফেরার পথে আমরা দেখতাম দুজনকে, সম্পূর্ণ অচেনা, তবুও নেমে কী এক টানে হেঁটে যেতাম পাশাপাশি কিছুদূর।

চোখাচোখি, কিছু খুচরো কথা, জরুরি আদান-প্রদান, এরপর যখন অজ্ঞানতার ভার তাকেও পোড়াতে থাকে, আমরা সিদ্ধান্ত নেই, দেখা হলেই নিজেদের সম্পর্কে অপরকে একটা করে তথ্য দেবো দুজনে। এভাবে আমি একে একে জানতে পারি ওর নাম এখন নীল, বাড়ি নওগাঁ, কাজ করে এক ওয়াশিং কারখানায়। নিজেদের খুঁজে পাওয়ার মতো খুব দরকারি তথ্য তো আমরা কখনো দেইনি, তবুও আমাদের বারবার দেখা হয়ে যেতো, কখনো ফুটপাতের দোকানগুলোতে, কখনোবা কাজ শেষে ফেরার পথে রাস্তার মৃদু আলোয়। এমনি একদিন, দোতলা বাসের সিঁড়িতে ওকে বসে থাকতে দেখি। সেদিনের মতো নিজের সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার মুহূর্ত এলে আমি জানাই, আজ ভোররাতে আমি আমাদের দুজনকে স্বপ্নে দেখেছি।

সেদিন এরপর বাস থেকে নেমে আমরা হাঁটতে হাঁটতে চলে যাই কামরাঙ্গীরচরে। নির্জন একটা আন্ডার কন্সট্রাকশন বিল্ডিং খুঁজে বের করে তার দোতলায় উঠে মেতে উঠি প্রেমে। চারিদিকে অন্ধকার; ভাঙা ইট-সিমেন্ট গলে ঠিকরে পড়ে চাঁদের আলোর মাঝে দুজনকে আঁকড়ে ধরে এক হয়ে বসে থাকি দুজনে। অন্ধকারে শুধু জ্বলজ্বল করতে থাকে ওর ক্লান্ত দু’জোড়া চোখ, বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে সেখানে গনগনে আগুনের মাঝে নৃত্যরত মৃত্যু দেখা যায়। সেই আগুন যেন আলেয়ার আলো, তার ওঠানামায় আমি সম্মোহিত হয়ে পড়ি। নীল আমাকে ছুঁতে থাকে। আমি শরীরজুড়ে অনুভব করি ওর দু’হাত ভর্তি ক্ষত, এবড়োখেবড়ো জখমি শরীর। দীর্ঘ চুম্বনের পর দৃষ্টিবিনিময়, নীল খুঁজে পায় আমার চোখের সাদা অংশে ভাসতে থাকা লাল তিল। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে তা একসময় পরিণত হয় অঙ্কুরিত গাছে, প্রবল ঢেউয়ের চাপে সমস্ত জীবনীশক্তি দিয়ে মাটি ফুঁড়ে বেড়িয়ে আসে সেটা। নীল আমার চোখে চুমু দেয়। দুজনের অস্থির হৃদয় শান্ত হয় বহুকাল পর। কালের চক্রে আমরা একে অপরের পরিপূরক, দুজন মিলেই পূরণ করি সহস্র বছর পুরোনো প্রাচীন এক বৃত্ত। একসাথে ইবাদত করে যাবার জন্যই আমাদের বারবার জন্ম।

খুব বেশি দেখা হতো না আমাদের। হয়তো দশদিন বা কখনো পনেরো দিন পর পর। দেখা হলে হেঁটে হেঁটে খুঁজে নিতাম কোনো আন্ডার কন্সট্রাকশন বিল্ডিং বা পরিত্যক্ত রেললাইন অথবা অন্ধকার উদ্যান। একসাথে ঘুমিয়েও কাটাতাম কখনো। নিজেদের শরীর স্পর্শ করে করে পরস্পরকে চেনা-ই ছিল আমাদের একমাত্র কাজ। শেষ রাতে কখনো আমি ঘুমের ঘোরে বিড়বিড় করে যেতাম আমার বাড়ির কথা, কীভাবে সবার অগোচরে আমাকে বড় করে চিত্রাদি। মায়ের নাম নেওয়া সে ভূমিতে মানা, ঘরের কোণে তাই মাটি খুঁড়ে আমরা লুকিয়ে ফেলেছিলাম তার ঘুঙুর।  নীল অবশ্য কখনোই ঘুমাতো না। কখনো ঘুম ভেঙে গেলে দেখতাম পাশে পিঠ সোজা করে বসে আছে চুপচাপ, ডাকলে বলতো ওর কখনো ঘুম আসে না, শুধু ঘুমের ভান করে স্বপ্ন দেখে। স্পর্শ করতে গেলে অনুভব করতাম উত্তাল হৃৎস্পন্দন, শরীর জুড়ে গভীর হয়ে আসা ক্ষত, ঘন হয়ে আসা আগুনের শিখায় ঢেকে পড়া চোখ।

হঠাৎ বহুদিনের ব্যবধান হয়ে যায়, আমাদের আর দেখা হয় না। পরিচিত জায়গাগুলোতে খুঁজে না পেয়ে এরপর দিনের পর দিন একা গিয়ে বসে থাকতাম আমাদের প্রথম দেখা হয়না সেই আন্ডারকন্সট্রাক্টেড বিল্ডিংটার কাছে। ভাবতাম হয়তো আমাকে খুঁজে চলে আসবে সে। আমি আঁচ করতাম, নীলের বিপদ হয়েছে, ওর চোখে দেখা মৃত্যু আমাকে তাড়িয়ে বেড়াতো। ওর খোঁজে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর ঢাকা শহর ঘুরতে থাকি আমি। তবে দ্রুতই বেশ অসুস্থ হয়ে যাই, বুঝতে পারি, আমার শরীরে জেগে উঠছে এক নতুন প্রাণ। নীলকে খোঁজার সমস্ত চেষ্টা যখন বিফলে যায়, আমি বুঝি চিত্রাদিই ভরসা। সেই আমাকে পথে ফেরাতে পারে।

বাড়ি ফিরে আসি বহুদিন পর। ঘাঘট এখন শুকিয়ে গেছে। মন্দিরের পেছনের জঙ্গল কেটে গড়ে উঠেছে অলিগলি, বাড়ি, সেখানেই এক অন্ধকার কোণে ঘর পেয়েছে চিত্রাদি। ফিরে এসে চিনে নিতে কষ্টই হয় বেশ, দেখি চিত্রাদির শরীর জুড়ে বসন্তের লালচে ক্ষত, হাত-পা শুকিয়ে দেখতে হয়ে গেছে ঠিক শেষ বসন্তের শিমুল গাছ৷ আমি ওকে জড়িয়ে ধরি, বোধহয় বেশিদিন পাবো না আর দ্রুতই সমস্ত শরীর জুড়ে গজিয়ে উঠবে পাতা। সে রাতে পাশাপাশি চুপচাপ শুয়ে চিত্রাদি জানায় কীভাবে আমরা আবারও হয়ে গেছি উদ্‌বাস্তু কারণ দেবোত্তর জমি চলে গেছে সব দখলে। কিন্তু মনে কোনো দু:খ রাখা উচিত নয় কারণ ঘাঘটের অভিশাপে ছারখার হয়ে গেছে আমার নামহীন বাপ। চিত্রাদি হাসতে থাকে খলবল, যেন প্রাচীন ঘাঘটের স্রোত, যেই স্রোত রাতের অন্ধকারে গিলে খায় আমার বাবার বাড়ির ধ্বংসাবশেষটাও। শুনতে শুনতে চিত্রাদির গায়ের দাগগুলো গুনতে থাকি আমি। কতকিছু হয়ে গেলো, শরীরভরা কতগুলো ক্ষত নিয়ে বেঁচে আছে চিত্রাদি। কী উদ্দেশ্য এই নদীরূপী-শিমুলরূপী নারীর? হাজারের পর গোনা বন্ধ করি আমি, তখন ভোর, চিত্রাদি এবার আমাকে শোনায় এক রাজকুমারীর গল্প, কামরাঙ্গীরচরের নাম হয়েছিল যেই নারীর নামে।

“…বহুদিন আগে, বুড়িগঙ্গার চরে বাস করতো এক অপূর্ব সুন্দরী মেয়ে কামরাঙ্গী। কিন্তু একদিন নৌকাডুবিতে তার মৃত্যু হয়। কামরাঙ্গীকে হারিয়ে তার প্রেমিক হয়ে পরে পাগলপ্রায়। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ‘হায় কামরাঙ্গী’, ‘হায় কামরাঙ্গী’ বলে গগনবিদারী চিৎকার করতে করতে সে দৌড়াতে থাকে দিগ্‌বিদিক। বুড়িগঙ্গার চারদিকে কেবল উত্তাল ঢেউ, কোথাও নেই কামরাঙ্গী—এ দৃশ্য আর নিতে না পেরে যুবক ঝাপ দেয় বুড়িগঙ্গার জলে।

এরপর? সেই জলরাশিতে হারিয়ে গিয়ে সে কী খুঁজে পেয়েছিল কামরাঙ্গীকে?…” চিত্রাদির ঘোরলাগা কণ্ঠস্বর, আমাকে মনে করিয়ে দেয় আমার জন্মরাত। নদীই আমার ঠিকানা, সেখানেই পাবো আমি যা খুঁজছি।

ঢাকায় ফিরে আসি আমি। রাত-দিন ঘুরে ফিরি বুড়িগঙ্গার আশপাশ। কতদিন পার হয়ে যায়, আর হিসেব থাকে না। যেন সময়ের আগে আর পিছে  ঘুরপাক খেয়ে যাই আমি; কাঙ্ক্ষিত দিন-ক্ষণটা খুঁজে পেতে। একদিন এভাবেই বৃত্তের আবর্তে ঘুরে ঘুরে, খুঁজে পাই সেই মহেন্দ্র ক্ষণ- দেখি, ঘুটঘুটে কালো জলে ভেসে আসছে সারি সারি দেহ। একইরকম দেখতে তারা, সবারই শরীর ভর্তি ক্ষত, মাথার চুল ছেঁটে ফেলা, নগ্ন শরীর, গায়ে ইউনিফর্ম। নিচু হয়ে মৃতচোখগুলোর দিকে তাকালেই ভ্রম হয়, সকলেই দেখতে অবিকল নীলের মতো, এরমাঝে আমার নীল কই? অদূরে এক ওয়াশিং গার্মেন্টস, বুঝি নীলরা সকলে সেখানকারই কর্মী। তাদের রক্তশূন্য শরীর আমাকে মনে করিয়ে দেয় ১৯ বছর আগের এক স্মৃতি, ঘাঘটের জলে ভেসে যাওয়া আমার মৃত মায়ের মুখ। আমার নামহীন বাবার দেওয়া ধুতুরা ফুলের বিষে মায়ের সঙ্গে আমারও মরে যাওয়ার কথা ছিল বহু আগেই। তবুও বেঁচে যাই আমি; যতটুকু সময় মাতৃগর্ভে থাকার কথা ছিল, তার অর্ধাংশেই জন্ম হয়ে যায় আমার।

বাবাকে তো দেখিনি আর, দূর থেকে দেখেছি শুধু তার বিশাল ঘর— বাবুবাড়ি। নানান কর্মযজ্ঞে ভরপুর এক দালানঘর, মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত মা ছিলো সেখানকারই অদৃশ্য এক পরিচারিকা। সে  দৃশ্যমান হতো কেবল গভীর রাতে, ঘুঙুর পায়ে, মন্দিরের চাতালে। মায়ের সেই ঘুঙ্ঘুরজোড়াই আমার জন্মপাপ, বাবুবাড়িতে আমাদের নাম নেওয়াও ছিলো মানা। এখন এখানে এই বুড়িগঙ্গার তীরে বসে মনে হয়, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই কারখানাটাই সেই বাবুবাড়ি, যার ভেতরে বসে আছে আমার বাবা। তাকে আমি কখনো দেখিনি, কিন্তু সে আমার পরিচিত, এতটাই গভীর পরিচয় আমাদের, যতটা হলে তাকে ধ্বংস করে ফেলতে ইচ্ছা হয়।

আর অদূরে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা এই কারখানাটা, আজ প্রথম দেখেও অচেনা নয় আমার। নীলের চোখে তাকিয়ে আমি দেখেছি, এই কারখানা ভরা বিশাল সব যন্ত্র, প্রতিদিন হাজারো কাপড় গিলে নিয়ে উগরে দেয় তারা। আর সেই ওগরানো কাপড়ে আকিবুকি করে যায় আমার নীল, লেজার আলোয় ক্ষতবিক্ষত দুই হাতে।

এই কারখানাও ঠিক আমার নামহীন বাপের মতোই, আমার বহুদিনের পরিচিত, নীলের চোখের দিকে তাকালেই আমি দেখতে পেতাম এর ঘরগুলো, এই ইউনিফর্ম, এই লেজার রশ্মি,চিৎকার,আগুন…

প্রতিশোধই ছিল চিত্রাদির জীবনভর উদ্দেশ্য, নীলেরও তো তাই। যেই আক্রোশে আমার বাবার বাড়িটা ছারখার করে দিয়েছে ঘাঘটের স্রোত, নীলও তো সেই আক্রোশেই জেগে থাকত রাতের পর রাত। একই ঘটনার চক্রে পাক খেয়ে যাচ্ছি আমি, তা এতদিনেও বুঝিনি—কীভাবে!

আমি শবগুলো ছুঁতে থাকি, মাঝের তরতাজা একটা দেহে হাত রাখতেই বুঝি, এইতো আমার নীল। সঙ্গে সঙ্গে বাকিরা ফিরে পায় তাদের বাস্তব মুখাবয়ব। নীলকে বুকে তুলে নিয়ে আমি খুঁজতে থাকি পালানোর পথ। কিছুদূর যেতেই দেখি নদীর মাঝে ভাসতে থাকা নৌকা, মাঝি তার লাল কাপড়ে মুখ ঢাকা এক মেয়ে। যমুনায় যাবে নাকি বলতেই তুলে নেয় আমাদের সে। যেতে হবে বহুদূর, দেরি করি না আমি।

নৌকায় ভাসতে ভাসতে আমরা পৌঁছে যাই যমুনায়। সেখানে সমাধিস্থ করি নীলকে। যেভাবে মা ভেসে গিয়েছিল ঘাঘটে সেভাবেই নীলকে আপন করে নেয় যমুনার জল। এরপর ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দেই নৌকার গলুইতে। জল ছেড়েছে আমার, আমিও এখন যমুনায় তৈরি হওয়া এক ছোট নদী। অন্ধকারে মাঝির দিকে তাকাই আমি,দেখি তার মুখ থেকে সরে গেছে লাল আবরণ সেখানে অন্ধকার এক গহ্বর। নিবিড় মনে সে নৌকা চালাচ্ছে। তাকে বললাম, ‘ঘাঘটে নেবে আমাকে?’ সে মাথা নাড়ালো, শব্দ পাই ঝমঝম ঝমঝম। যে মৃতা নারীর গল্প শুনে শুনে বেঁচে ছিলাম এতদিন, বুঝি সে-ই আমার পাশে। তাকে ছুঁতে ইচ্ছা করে খুব। পারি না, একই নৌকায় তবু বহুদূরে সে। অন্তত নিশ্চিন্ত হই, জানি সে আমাকে পৌঁছে দেবে গন্তব্যে।

প্রচণ্ড ব্যথায় চিৎকার করতে করতে যখন জেগে যাই তখন মাঝরাত। পাশ ফিরে দেখি, দেখতে পাই, যমুনার পরিচিত পাড়ে, যেখানে এসে শুকিয়ে গিয়েছে ঘাঘট, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে একটা শুকনো গাছ; কিংবা এক নারী… চিত্রাদি। প্রবল পূর্ণিমা ঠেলে নৌকা ঘাটে ফেরে, সেখানে জন্ম নেয় আমার সন্তান। চিত্রাদি বুকে তুলে নেয় তাকে, যমুনার জল ছুঁইয়ে করে নেয় পাপমুক্ত। ভাটির টানে দূরে সরে যেতে থাকে নৌকা, সেই সাথে আমি, আর ঘুঙুর পড়া কালো নারী। এবার প্রবল জ্যোৎস্না আমাকে নিয়ে যায় আমার জন্মরাতে, মন্দির থেকে ভেসে আসে ঢাকঢোলের শব্দ, আর আমার পায়ে সেই পুঁতে রাখা ঘুঙুর। দেখি, বৈঠা হাতে লাল কাপড়ের মেয়েটি আর নেই, বৈঠাও আর নেই। আমি বৃত্ত পূরণ করে মিলে গেছি তার সাথে, এখন তার মতোই ভেসে যাচ্ছি নিরুদ্দেশ। শেষ মুহূর্তে পিছে ফিরে তাকাই, ঘাটে শুয়ে আছে আমার কন্যা, দূর থেকেও ওর দুচোখে আগুনে নৃত্যরত মৃত্যু দেখা যায়, নিশ্চিন্ত হই আমি। নীলের অসমাপ্ত বৃত্ত পূরণ করবে আমাদের সন্তান। নৌকা বহুদূর চলে গেলে ফিরে চাই আবারও, দেখি, ঘাটে শুধু ফুলে ফুলে ছেয়ে যাওয়া এক শিমুল গাছ, জ্যোৎস্নার আলোয় জ্বলজ্বল করছে যার ফুলগুলো।





Source link

×

FIFA World Cup Live

FIFA World Cup সরাসরি দেখতে নিচের বাটনে ক্লিক করুন।

📺 লাইভ দেখুন
error: Content is protected !!
🔴 LIVE html