তীব্র দাবদাহের পর হঠাৎ ভারী বৃষ্টিপাত ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়া, জিকা ও ওয়েস্ট নাইল জ্বরের মতো মশাবাহিত বা ভেক্টর-বাহিত রোগের ঝুঁকি নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার এই আকস্মিক পরিবর্তন বিভিন্ন ভাইরাস জন্মানোর জন্য একটি অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
ভেক্টর-বাহিত রোগগুলো মূলত রোগজীবাণু বা প্যাথোজেনের মাধ্যমে ছড়ায়, যা কোনও সংক্রমিত প্রাণী থেকে ভেক্টর (যেমন: মশা বা উকুন)-এর মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে। বিশ্বজুড়ে সব ধরণের সংক্রামক রোগের ১৭ শতাংশেরই বেশি এই ভেক্টর-বাহিত রোগ, যার কারণে প্রতি বছর পৃথিবীতে ৭ লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা ও বৃষ্টির ধরনের এই বদল রোগ ছড়ানোর প্রক্রিয়াকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে।
ভারতের কৈলাশ দীপক হাসপাতালের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. রজত কান্ত জৈন জানান, রোগবাহী মশা ও অন্যান্য ভেক্টরের জীবনচক্রের ওপর তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাত সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। তিনি বলেন, দাবদাহের সময় উচ্চ তাপমাত্রা মশার বংশবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে। গরম আবহাওয়া মশার ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ মশা হওয়ার সময়কে কমিয়ে দেয় এবং মশার শরীরের ভেতরে ভাইরাস ও পরজীবীর প্রতিলিপি তৈরির গতি বাড়িয়ে দেয়। ফলে মশাগুলো খুব দ্রুত সংক্রমণ ছড়াতে সক্ষম হয়ে ওঠে।
ডা. রজত আরও বলেন, দীর্ঘদিন গরম থাকার পর যখন ভারী বৃষ্টি নামে, তখন ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। বৃষ্টির পানি বিভিন্ন গর্ত, ড্রেন, পাত্র এবং ফেলে দেওয়া টায়ারে জমে মশার অসংখ্য প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি করে। শুষ্ক আবহাওয়ায় টিকে থাকা মশার সুপ্ত ডিমগুলো পানির সংস্পর্শে আসামাত্রই দ্রুত ফুটে বের হয়। এর ফলে বৃষ্টির কয়েক দিন বা সপ্তাহের মধ্যেই মশার জনসংখ্যায় এক ধরণের বিস্ফোরণ ঘটে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গরম ও আর্দ্রতার এই মিশ্রণ মূলত ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া এবং জিকার প্রধান বাহক এডিস এজিপ্টি ও এডিস অ্যালবোপিকটাস মশার জন্য বিশেষভাবে অনুকূল। উচ্চ তাপমাত্রা মশার সক্রিয়তা এবং কামড়ানোর প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়, আর বৃষ্টি নিশ্চিত করে তাদের প্রজনন আবাসের নিরবচ্ছিন্ন জোগান।
জলবায়ু গবেষকদের সূত্র ধরে ডা. জৈন জনস্বাস্থ্যের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের এই ব্যাপক প্রভাবের কথা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, দাবদাহ, ভারী বৃষ্টি ও বন্যার মতো চরম আবহাওয়ার কারণে এই রোগগুলো এখন নতুন নতুন অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে।
এই প্রাদুর্ভাব রোধে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বাড়ির চারপাশের জমে থাকা পানি দূর করা, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, মশানিরোধক ব্যবহার এবং বৃষ্টির পর রোগ নজরদারি জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছেন। ডা. জৈন জোর দিয়ে বলেন, মশার সংখ্যা এত দ্রুত বাড়ে যে সাধারণ মানুষ ঝুঁকিটি পুরোপুরি বোঝার আগেই প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ে; তাই শুরুতেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
সূত্র: উইয়ন নিউজ