কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন শুধু প্রযুক্তিপ্রেমীদের হাতিয়ার নয়, চাকরিপ্রার্থীদের কাছেও এটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। চ্যাটজিপিটি, জেমিনি, কোপাইলট কিংবা বিভিন্ন এআই রিজিউমে বিল্ডার ব্যবহার করে কয়েক মিনিটের মধ্যেই পেশাদার মানের জীবনবৃত্তান্ত (সিভি) তৈরি করা সম্ভব। এতে সময় বাঁচে, ভাষাগত ভুল কমে এবং সিভিকে আরও পরিপাটি করে উপস্থাপন করা যায়।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই ব্যবহার করলেই ভালো সিভি তৈরি হবে, এমন ধারণা ঠিক নয়। বরং এআই-এর তৈরি লেখা যাচাই না করে সরাসরি ব্যবহার করলে চাকরির আবেদন দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। অনেক নিয়োগদাতা অতিরিক্ত সাধারণ, যান্ত্রিক বা অস্পষ্ট ভাষার সিভি সহজেই আলাদা করতে পারেন। এছাড়া বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে না মিললে ইন্টারভিউতেও বিপাকে পড়তে হতে পারে।
চাকরির আবেদনে এআই ব্যবহার করতে চাইলে নিচের পাঁচটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি।
১. এআই-কে সহকারী হিসেবে ব্যবহার করুন, বিকল্প হিসেবে নয়
এআই খুব দ্রুত একটি খসড়া সিভি তৈরি করতে পারে। কিন্তু সেটিই চূড়ান্ত সংস্করণ হওয়া উচিত নয়। আপনার শিক্ষা, কাজের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং অর্জনের বাস্তব তথ্য যোগ করে নিজের ভাষায় সম্পাদনা করা জরুরি।
যে সিভিতে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, নির্দিষ্ট কাজের উদাহরণ এবং পরিমাপযোগ্য অর্জন থাকে, সেটি নিয়োগদাতার কাছে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। এআই-এর তৈরি সাধারণ বাক্য হুবহু ব্যবহার করলে অনেক আবেদনপত্র একরকম দেখাতে পারে।
২. কখনোই ভুল বা বাড়িয়ে লেখা তথ্য যোগ করবেন না
এআই কখনো কখনো এমন দক্ষতা, অভিজ্ঞতা বা অর্জনের কথা লিখে দিতে পারে, যা আপনার বাস্তব জীবনের সঙ্গে মেলে না। অনেকেই না পড়েই সেই তথ্য সিভিতে রেখে দেন।
এটি বড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে। ইন্টারভিউ বোর্ডে সেই অভিজ্ঞতা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে উত্তর দিতে না পারলে আপনার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই সিভি জমা দেওয়ার আগে প্রতিটি লাইন নিজে পড়ে নিশ্চিত করুন, সব তথ্য সত্য এবং প্রমাণযোগ্য।
৩. প্রতিটি চাকরির জন্য সিভি আলাদাভাবে সাজান
একটি সিভি সব প্রতিষ্ঠানের জন্য সমান কার্যকর হয় না। এআই ব্যবহার করে চাকরির বিজ্ঞপ্তি বিশ্লেষণ করা এবং সেই অনুযায়ী প্রাসঙ্গিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরা যেতে পারে।
তবে শুধু কীওয়ার্ড যোগ করলেই হবে না। সেগুলো আপনার বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলতে হবে। পরিচ্ছন্ন ফরম্যাট, সঠিক শিরোনাম এবং প্রাসঙ্গিক তথ্য এটিএস (অ্যাপ্লিকান্ট ট্র্যাকিং সিস্টেম) ও নিয়োগকারী উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
৪. ভাষা যেন স্বাভাবিক ও মানবিক থাকে
অনেক এআই তৈরি সিভিতে একই ধরনের শব্দ, অতিরিক্ত জটিল বাক্য এবং প্রচলিত করপোরেট শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। এতে সিভি পড়ে মনে হতে পারে এটি ব্যক্তিগত নয়, বরং একটি টেমপ্লেট থেকে তৈরি।
তাই সম্পাদনার সময় নিজের ভাষা ব্যবহার করুন। প্রয়োজনে ছোট বাক্যে লিখুন, অপ্রয়োজনীয় বিশেষণ বাদ দিন এবং বাস্তব কাজের উদাহরণ যুক্ত করুন। এতে সিভি আরও বিশ্বাসযোগ্য হবে।
৫. জমা দেওয়ার আগে শেষবার নিজেই যাচাই করুন
এআই বানান ও ব্যাকরণ ঠিক করতে পারলেও শতভাগ নির্ভুল নয়। তাই সিভি পাঠানোর আগে নাম, ফোন নম্বর, ই-মেইল, চাকরির সময়কাল, প্রতিষ্ঠানের নাম এবং অন্যান্য তথ্য ভালোভাবে মিলিয়ে নিন।
প্রয়োজনে কোনো বন্ধু, শিক্ষক বা অভিজ্ঞ সহকর্মীকে সিভি পড়তে দিন। একজন মানুষের দৃষ্টিতে ধরা পড়া ছোট একটি ভুলও আপনার আবেদনকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
শেষ কথা
এআই চাকরিপ্রার্থীদের জন্য একটি কার্যকর সহকারী হতে পারে, কিন্তু এটি কখনোই আপনার অভিজ্ঞতা, দক্ষতা বা ব্যক্তিত্বের বিকল্প নয়। একটি ভালো সিভি সেইটিই, যেখানে প্রযুক্তির সুবিধা এবং নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঠিক সমন্বয় থাকে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, এআই ব্যবহার করুন সময় বাঁচাতে এবং লেখার মান উন্নত করতে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, সম্পাদনা এবং তথ্য যাচাই সবসময় নিজের হাতে রাখুন। সেটিই চাকরির আবেদনে আপনাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলতে পারে।