পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পোশাক শিল্প গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে। নতুন করে আরও চারটি তৈরি পোশাক (আরএমজি) কারখানা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত লিড (লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এভায়রনমেন্টাল ডিজাইন) সনদ অর্জন করেছে। এর ফলে দেশে লিড সনদপ্রাপ্ত পোশাক কারখানার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯০টিতে। এর মধ্যে ১২৫টি প্লাটিনাম, ১৪৫টি গোল্ড এবং বাকিগুলো সিলভার ও সার্টিফায়েড পর্যায়ের।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিশ্বের সর্বোচ্চ স্কোরপ্রাপ্ত শীর্ষ ১০০টি লিড সনদধারী কারখানার মধ্যে এখন বাংলাদেশের ৫৩টি কারখানা রয়েছে। বিশ্বের অন্য কোনও দেশের তুলনায় এটি একটি অনন্য অর্জন, যা টেকসই শিল্পায়নে বাংলাদেশের নেতৃত্বেরই প্রতিফলন। বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
নতুন চার কারখানার স্বীকৃতি
নতুন করে লিড সনদ পাওয়া চারটি কারখানার মধ্যে দুটি প্লাটিনাম, একটি গোল্ড এবং একটি সিলভার পর্যায়ের স্বীকৃতি অর্জন করেছে।
চট্টগ্রামের উত্তর নাসিরাবাদ শিল্প এলাকায় অবস্থিত ক্যানভাস গার্মেন্টস প্রাইভেট লিমিটেড LEED O+M: Existing Buildings v4.1 রেটিং ব্যবস্থায় ৯০ পয়েন্ট অর্জন করে প্লাটিনাম সনদ পেয়েছে। গাজীপুরের চয়দানায় অবস্থিত ম্যাট্রিক্স সোয়েটার্স লিমিটেড একই রেটিং ব্যবস্থায় ৮৮ পয়েন্ট অর্জন করে প্লাটিনাম সনদ লাভ করেছে। এদিকে গাজীপুরের কালিয়াকৈরের করিম টেক্সটাইলস লিমিটেড ৭৩ পয়েন্ট অর্জন করে গোল্ড এবং ঢাকার ধামরাইয়ের করিম টেক্স লিমিটেড ৫৩ পয়েন্ট নিয়ে সিলভার সনদ অর্জন করেছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই স্বীকৃতি?
লিড সনদ বিশ্বের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পরিবেশবান্ধব ভবন ও শিল্প কারখানার স্বীকৃতিগুলোর একটি। জ্বালানি সাশ্রয়, পানির দক্ষ ব্যবহার, কার্বন নিঃসরণ কমানো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের ব্যবহার, কর্মপরিবেশ এবং টেকসই অবকাঠামো— এসব সূচকে নির্ধারিত মান পূরণ করেই একটি কারখানা এই সনদ অর্জন করে।
বর্তমানে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বড় বড় ফ্যাশন ব্র্যান্ড পরিবেশবান্ধব কারখানাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ফলে লিড সনদ শুধু একটি সম্মানজনক স্বীকৃতিই নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার।
উৎপাদনের পাশাপাশি টেকসই শিল্পেও নেতৃত্ব
বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক দেশ। গত এক দশকে শুধু রফতানির পরিমাণ বাড়ানোর দিকেই নয়, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে দেশের উদ্যোক্তারা।
সবুজ কারখানায় বিনিয়োগের ফলে বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার কমছে, উৎপাদন ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে হ্রাস পাচ্ছে এবং কার্বন নিঃসরণও কমানো সম্ভব হচ্ছে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থাও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে বৈশ্বিক বাজারে টেকসই উৎপাদন আর অতিরিক্ত সুবিধা নয়; এটি ক্রেতাদের অন্যতম প্রধান শর্তে পরিণত হয়েছে। সেই বাস্তবতায় বাংলাদেশের এই অগ্রগতি ভবিষ্যতের রপ্তানি বাজার ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘‘নতুন চারটি লিড সনদপ্রাপ্ত কারখানার সংযোজন বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য অত্যন্ত গৌরবের। এখন দেশে ২৯০টি লিড সনদপ্রাপ্ত পোশাক কারখানা রয়েছে, যার মধ্যে ১২৫টি প্লাটিনাম এবং ১৪৫টি গোল্ড। বিশ্বের সর্বোচ্চ স্কোরপ্রাপ্ত শীর্ষ ১০০টি লিড সনদধারী কারখানার মধ্যে বাংলাদেশের ৫৩টির অবস্থান প্রমাণ করে, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন শুধু প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য চান না, তারা উৎপাদন প্রক্রিয়াও পরিবেশবান্ধব ও দায়িত্বশীল হতে হবে— এমন প্রত্যাশা করেন। বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা সেই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের সফলভাবে খাপ খাইয়ে নিয়েছেন। সবুজ কারখানায় বিনিয়োগের ফলে জ্বালানি ও পানির দক্ষ ব্যবহার বাড়ছে, কার্বন নিঃসরণ কমছে এবং শ্রমিকদের জন্য আরও নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত হচ্ছে।’’
মহিউদ্দিন রুবেল আরও বলেন, ‘‘এই অর্জন ধরে রাখতে শুধু বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়, মাঝারি ও ছোট কারখানাগুলোকেও সবুজ রূপান্তরের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলেই বাংলাদেশের পোশাক শিল্প বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারবে এবং টেকসই উৎপাদনে বিশ্বের রোল মডেল হিসেবে নিজেদের অবস্থান দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে সক্ষম হবে।’’
বিশ্বের শীর্ষ তালিকায় বাংলাদেশের আধিপত্য
বিশ্বের সর্বোচ্চ স্কোরপ্রাপ্ত শীর্ষ ১০০টি লিড সনদধারী কারখানার মধ্যে বাংলাদেশের ৫৩টির অবস্থান দেশের সক্ষমতার একটি বড় প্রমাণ। শুধু সংখ্যায় নয়, সর্বোচ্চ স্কোর অর্জনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের একাধিক কারখানা ধারাবাহিকভাবে বিশ্বসেরাদের তালিকায় স্থান করে নিচ্ছে। এটি প্রমাণ করে, দেশের উদ্যোক্তারা এখন শুধু কম খরচে উৎপাদনের প্রতিযোগিতায় নেই; বরং পরিবেশ সংরক্ষণ, জ্বালানি দক্ষতা এবং টেকসই শিল্প ব্যবস্থাপনাকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন।
সামনে সুযোগ, তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়
বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণ কমানো, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের ওপর জোর বাড়ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন পরিবেশগত নীতিমালা, কার্বন-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর সরবরাহ শৃঙ্খলে টেকসই উৎপাদনের বাধ্যবাধকতা বাংলাদেশের জন্য যেমন নতুন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি প্রতিযোগিতাও বাড়াচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু লিড সনদের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন, শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন, পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং গবেষণা ও উদ্ভাবনে আরও বিনিয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি পোশাক কারখানাগুলোকেও সবুজ রূপান্তরের আওতায় আনতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক বার্তা
বিশ্ববাজারে পোশাক রফতানিতে প্রতিযোগিতা দিন দিন বাড়ছে। ভিয়েতনাম, ভারত, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোও টেকসই শিল্পে দ্রুত বিনিয়োগ করছে। এমন বাস্তবতায় নতুন চারটি লিড সনদ বাংলাদেশের জন্য শুধু আরেকটি পরিসংখ্যানগত অর্জন নয়; এটি আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের গ্রহণযোগ্যতা, ব্র্যান্ড ইমেজ এবং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হওয়ার একটি ইতিবাচক বার্তা।
সবুজ শিল্পায়নে ধারাবাহিক এই অগ্রগতি ধরে রাখতে পারলে ভবিষ্যতে আরও উচ্চমূল্যের ক্রয়াদেশ আকর্ষণ, বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর আস্থা বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনে বাংলাদেশকে বিশ্বের রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ তৈরি হবে।