বিগত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চরম ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা কারচুপি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মূখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তাই তিনি এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে না হলে রাজপথ ‘ভয়াবহ তপ্ত’ হয়ে উঠবে।’’
সোমবার (১৮ মে) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচনি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (ইটিআই) ভবনে রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসির (আরএফইডি) নবনির্বাচিত কমিটির অভিষেক ও বিদায়ী কমিটির সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ নির্বাচন কমিশনের অন্য সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী অভিযোগ করে বলেন, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা কারচুপি হয়েছে। ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ মাধ্যমে কক্সবাজারের হামিদুর রহমান আজাদকে পরাজিত করা হয়। একইভাবে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনেও প্রভাব খাটানো হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তিনি বলেন, অনেকে নির্বাচন নিয়ে ইতিবাচক কথা বললেও বাস্তবে এটি ছিল পুরোপুরি একটি ‘ইঞ্জিনিয়ারড নির্বাচন’।
তিনি আরও বলেন, এ বক্তব্যে অনেকেই অসন্তুষ্ট হতে পারেন, কারণ অনুষ্ঠানে প্রধান নির্বাচন কমিশনারও উপস্থিত রয়েছেন। তবে ভবিষ্যতে আরেকটি গণ-অভ্যুত্থান হলে নির্বাচন কমিশনকে গোড়া থেকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নির্বাচনে দ্বিমুখী নীতির অভিযোগ তুলে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, একজন প্রার্থী হিসেবে তিনি নির্বাচন কমিশনের আচরণে অসঙ্গতি দেখেছেন। তার দাবি, এক আসনে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল ব্যালটের নির্ধারিত বক্সের বাইরে সিল পড়লে তা গণনা হবে না, আবার অন্য আসনে একই ধরনের ভোট গণনার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, নির্বাচনের দিন বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রশাসনের কিছু অংশ প্রকাশ্যভাবে নির্বাচন প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে, যা দেশবাসী দেখেছে। এসব বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলকেও অবহিত করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে নাসীরুদ্দীন বলেন, তিনি এসব ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী এবং ভবিষ্যতে এ পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে বলে তিনি আশা করেন।
ঋণখেলাপিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার সমালোচনা করে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ব্যক্তিগত সহানুভূতি বা আবেগের জায়গা থেকে সংবিধান ও নীতিমালা লঙ্ঘনের সুযোগ নেই। তিনি অভিযোগ করেন, ঋণখেলাপিদের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তে দ্বৈত মানদণ্ড দেখা গেছে, যা গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশনের সামনে ঋণখেলাপিদের নিয়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা দেশের গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য বিব্রতকর। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও যদি একই ধরনের কর্মকাণ্ড বা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, তাহলে রাজপথের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
এসময় আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, নির্বাচনের সময় বড় ধরনের সংঘর্ষ এড়াতেই তিনি সংযম দেখিয়েছিলেন। তার দাবি, চাইলে তিনি আরও বড় জনসমাগম ঘটাতে পারতেন, যা রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারতো। তবে প্রাণহানির আশঙ্কা থেকেই তিনি পিছু হটেন।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অতীতের চেয়েও খারাপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে এনসিপি শক্তভাবে প্রতিবাদ করবে। তিনি বলেন, দলটি সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই দেশের জন্য কাজ করছে এবং নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকলেও সাংবিধানিক দায়িত্বের জায়গা থেকে তাদের জবাবদিহির আওতায় রাখা হবে।
তিনি আরও বলেন, তিনি ব্যক্তিগত অবস্থান থেকে নয়, এনসিপির প্রতিনিধি হিসেবেই বক্তব্য দিচ্ছেন এবং দল যে রাজনৈতিক বিশ্বাস ধারণ করে, তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করার আহ্বান জানিয়ে তিনি হুঁশিয়ারি দেন, নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে রাজপথ আবারও ‘ভয়াবহ তপ্ত’ হয়ে উঠতে পারে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন, অন্য চার নির্বাচন কমিশনার ও জাতীয় সংসদের হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম, ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টারের (বিজেসি) ফাহিম আহমেদ ও বিবিসি মিডিয়া একশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর মো. আল মামুন প্রমুখ।