জাতীয় সংসদের ৩৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্যদের প্রতিনিধিত্ব থাকলেও কোনও কমিটির সভাপতির পদ তাদের দেওয়া হয়নি। একমাত্র সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়েছে বিরোধী দলের সদস্য সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে। ফলে সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ থাকলেও সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে সংসদীয় নজরদারি ও জবাবদিহি কতটা কার্যকর হবে, সেই প্রশ্ন উঠেছে।
জাতীয় সংসদের বর্তমান ত্রয়োদশ সংসদে মোট ৫০টি সংসদীয় কমিটি রয়েছে। এর মধ্যে ৩৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি এবং ১১টি বিষয়ভিত্তিক কমিটি। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) আরও চারটি কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে ৫০টি কমিটির গঠন সম্পন্ন হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংসদীয় কমিটির ভূমিকা শুধু আইন প্রণয়ন বা নিয়মিত বৈঠকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সরকারের কাজ, ব্যয় ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের ওপর সংসদীয় নজরদারি এবং নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও এসব কমিটির অন্যতম দায়িত্ব। আর এই জায়গাতেই কমিটির সভাপতি পদে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আইন প্রণয়নের পাশাপাশি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হলো সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ যাতে একে অন্যের ওপর নজরদারি ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে পারে, সেজন্য এসব কমিটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, বিশেষ করে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটিসহ গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটিগুলোর সভাপতির দায়িত্বে বিরোধী দলের সদস্যরা থাকলে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পথ সুগম হয়। কারণ, সরকারি দলের সদস্যরা সরকারের অবস্থানকেই সমর্থন করবেন; এমন একটি বাস্তবতা রয়েছে।
৩৯ কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব
চিফ হুইপ হুইপ নূরুল ইসলাম মনির দেওয়া হিসাবে, ৩৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির ২২টিতে বিরোধী দলের তিন জন করে সদস্য রাখা হয়েছে। বাকি ১৭টি কমিটিতে দুই জন করে বিরোধী দলের সদস্য রয়েছেন। মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলোতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব ২৬ শতাংশের কিছু বেশি বলেও জানান তিনি।
বিরোধী দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল, গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে তাদের কম সদস্য এবং তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে বেশি সদস্য রাখা হয়েছে। এই অভিযোগের জবাবে চিফ হুইপ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটির নাম উল্লেখ করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, ‘আইন ও বিচার ও সংসদ বিষয়ক স্থায়ী কমিটি; এটা কি ফালতু? অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে তিন জন দিয়েছি। এটা কি গুরুত্বহীন? বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে দিয়েছি তিন জন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় দিয়েছি তিন জন, শিল্প মন্ত্রণালয় দিয়েছি তিন জন, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় দিয়েছি তিন জন, ধর্ম মন্ত্রণালয় দিয়েছি তিন জন, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় দিয়েছি তিন জন, রেলপথ দিয়েছি তিন জন, মহিলা ও শিশুবিষয়ক দিয়েছি তিন জন, খাদ্য মন্ত্রণালয় দিয়েছি তিন জন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় দিয়েছি তিন জন এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয় দিয়েছি তিন জন।’
তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিরোধী দলের তিন জন করে সদস্য থাকা কমিটিগুলোর মধ্যে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক, অর্থ, বাণিজ্য, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক, শিল্প, ডাক ও টেলিযোগাযোগ, ধর্ম, শ্রম ও কর্মসংস্থান, রেলপথ, মহিলা ও শিশু বিষয়ক, খাদ্য, সমাজকল্যাণ এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিও রয়েছে।
সভাপতি পদে বিরোধী দলের একজন
বিরোধী দল থেকে স্থায়ী কমিটির সভাপতি করার নজির নিয়ে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিগত দিনে কোনও প্রিসিডেন্ট (পূর্ব-নজির) নেই যে এই ৫৪ বছরে বিরোধী দল থেকে কোনও সভাপতির পদ দেওয়া হয়েছে। একটা মাত্র প্রিসিডেন্ট আছে। সেটা আমরা দিয়েছি, যা জিয়াউর রহমান সাহেব (প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান) শুরু করেছিলেন। সেটা হলো পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি।’
সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি সবচেয়ে পাওয়ারফুল। সরকারের টাকা খরচ হওয়ার ব্যাপারে এই কমিটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কমিটি। আমরা আব্দুল্লাহ সাহেবকে (আব্দুল্লাহ তাহের) সভাপতি করেছি এই কমিটির।’
সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সংসদে সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি বিরোধীদলের সদস্য সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। গত বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) এই কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকও তার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
অন্যদিকে ৩৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির কোনওটির সভাপতির পদ বিরোধী দলের সদস্যকে দেওয়া হয়নি। গত ১০ সেপ্টেম্বর শেষ চারটি কমিটি গঠনের পরও এই অবস্থার পরিবর্তন হয়নি।
কমিটিতে মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও হুইপরা
কমিটি গঠনে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও হুইপদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সাধারণত সংসদ সদস্য হলে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের নিজ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়, এর বাইরে কোনও কমিটিতে তাদের রাখা হয় না। কিন্তু সম্প্রতি গঠিত কমিটিগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মন্ত্রী পদমর্যাদার প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও চিফ হুইপ এবং প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদাধারী জাতীয় সংসদের সরকারদলীয় পাঁচ জন হুইপকে মোট সাতটি সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে।
তারা হলেন, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপনকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত, চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনিকে সরকারি প্রতিষ্ঠান-সম্পর্কিত, হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপুকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত, হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুলকে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত, হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত, হুইপ আখতারুজ্জামান মিয়াকে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত এবং হুইপ জি কে গউছকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে।
অন্যদিকে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহ আলমকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার কমিটি গঠন শেষ হলে এ নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, নির্বাহী বিভাগ জবাবদিহি করবে আইনসভার কাছে। নির্বাহী বিভাগ যদি নিজেই কমিটির সভাপতি হয়, তাহলে কার কাছে জবাবদিহি করবে? তিনি বলেন, ‘এটিকে সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল চেতনার আলোকে দেখা উচিত’।
বিরোধী দলের আপত্তি
জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় দলের মুখপাত্র ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সংখ্যা তো ঠিকই আছে। উনি বলছেন ২৬ শতাংশ দিচ্ছেন। কিন্তু কোথায় দিচ্ছেন, সেটা দেখতে হবে। আপনি পার্বত্য চট্টগ্রামে আমাদের চার জন দিয়েছেন; এটা গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়। কিন্তু তিস্তার পাড়ের রায়হান সিরাজীকে তো সেখানে দিয়ে আমাদের কোনও লাভ নেই।’
তিনি বলেন, ‘আমরা একটা কার্যকর জবাবদিহিমূলক সংসদ চাই। সে জন্য সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে দেওয়ার বিষয়ে আমাদের একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা ছিল। আমরা তাদের কাছে সেই সুপারিশও করেছি। সরকারি দলও এতে সম্মত হয়েছিল। আমরা তো ২৬ শতাংশের বাইরে যাইনি। কিন্তু উনারা উনাদের ইচ্ছামতো বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে সদস্য দিয়ে দিয়েছেন। এখানেই আমাদের আপত্তি।’
সভাপতির পদ বণ্টন নিয়েও আপত্তি জানিয়ে নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, ‘উনারা (সরকারি দল) যেভাবে বলছেন সভাপতির পদ বণ্টন ঘটছে, এটা তো সিরিয়াসলি অবজেকশনেবল। কমিটিতে একজন মন্ত্রীকে সভাপতি করা হয়েছে। চিফ হুইপ একটা সরকারি প্রতিষ্ঠান-সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটিতে আছেন। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে আরেকজন হুইপকে রাখা হয়েছে। তাহলে উনারা সংসদের পক্ষ থেকে কী জবাবদিহি করবেন?’
তিনি আরও বলেন, ‘জুলাই সনদে পরিষ্কার বলা হয়েছিল। উনাদের নির্বাচনি ম্যানিফেস্টোতেও বলা হয়েছে। জুলাই সনদ বাদই দিলাম, উনাদের নির্বাচনি ম্যানিফেস্টোতে যে চারটার কথা বলা হয়েছে, সেগুলো তো আমাদের দেয়নি। শুধু একটা দিয়েছেন; সভাপতির পদ। এই গোটা ব্যবস্থাটাই এখন পুরোপুরি অকার্যকর অবস্থায় চলে গেছে।’
স্থায়ী কমিটির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘বৈঠক যেহেতু সরকারদলীয় সভাপতিরা ডাকেন, নামকাওয়াস্তে বৈঠক হয়। যে বিল পাস করার জন্য যেভাবে সময় বেঁধে দেওয়া হয় কমিটিকে, কমিটি তো আসলে ফাংশনিং হচ্ছে না। এখানেই আমাদের আপত্তি।’
বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তার প্রসঙ্গে জামায়াতের এই নেতা বলেন, ‘যদি বিরোধী দলের অংশগ্রহণটা সক্রিয় হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ কমিটিগুলোতে নেতৃত্বে যদি সভাপতির পদ বেশি থাকে, তাহলে একটা জবাবদিহি তৈরি হয়। আর জবাবদিহি তৈরি হলেই সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে এবং জনগণের অটোমেটিক কল্যাণ প্রতিষ্ঠা হবে।’
তিনি বলেন, ‘সংসদের গুরুত্বপূর্ণ পার্ট তিনটা। একটা হলো লেজিসলেটিভ, সেটা সংসদের, আরেকটা হলো এক্সিকিউটিভ, সেটা সরকারের এবং তৃতীয়টা হচ্ছে বিচার বিভাগ। সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল জিনিসটাই কিন্তু জবাবদিহি নিশ্চিত করা। বিশেষ করে এক্সিকিউটিভের জবাবদিহি থাকবে সংসদের কাছে। এই জন্যই সংসদীয় কমিটিগুলো করা হয়।’
নাজিবুর রহমান মোমেন আরও বলেন, ‘এখানে যদি শুধু সংসদ সদস্যদের মধ্যে সরকারদলীয় সদস্য না, একেবারে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের বেশি রাখা হয়, কমিটিগুলোর সভাপতি করা হয়, চিফ হুইপকে সভাপতি করা হয়, হুইপদের করা হয়; তাহলে তো সেই জবাবদিহি তৈরি হবে না। বিগত সময়েও তো এই নজির ছিল না। তারা সদস্য হতো।’
তিনি বলেন, ‘আমরা তো পরিবর্তন চেয়েছিলাম। ২০০৮ সালের পরের আওয়ামী লীগ সরকারও বিএনপিকে চারটা কমিটির নেতৃত্ব দিয়েছিল। আশরাফ উদ্দিন নিজানও কিন্তু একটা কমিটির সভাপতি ছিলেন। এবার তো সেটাও দেওয়া হচ্ছে না। অথচ নির্বাচনি ম্যানিফেস্টোতে চারটা দেওয়ার কথা আছে। জুলাই সনদ অনুযায়ী ১০টা, আমরা ১২টা পাই; সেই হিসাবে।’
নাহিদের অভিযোগ, তালিকায় পরিবর্তন
স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে আপত্তির বিষয়টি ১০ সেপ্টেম্বর তৃতীয় অধিবেশনের শেষ দিনেও সামনে আসে। অধিবেশন শেষে রাতে জাতীয় সংসদের এলডি হলে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম কমিটি গঠনে বিরোধী দলের দেওয়া তালিকা পরিবর্তন এবং কয়েকটি কমিটিতে সদস্যসংখ্যা ও সদস্য পরিবর্তনের অভিযোগ তোলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা যেভাবে তালিকাটা দিয়েছিলাম যে এই মন্ত্রণালয়ে বিরোধী দলের তিন জন, এই মন্ত্রণালয়ে দুই জন, সেখানে ডিস্টরশন করা হয়েছে। কয়েকটা মন্ত্রণালয়ে নামগুলো সেভাবে আসেনি। অনেকগুলো জায়গায় ভুল এসেছে। শুধু পার্বত্য চট্টগ্রাম নয়, মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতেও সদস্য পরিবর্তন হয়েছে। কোথাও দুই জন, কোথাও তিন জন এবং একটি কমিটিতে বিরোধী দলের চার জন সদস্য রাখা হয়েছে।’
নাহিদের অভিযোগ, চলতি অধিবেশনের মধ্যেই সব সংসদীয় কমিটি গঠন শেষ করার তাড়াহুড়ার কারণে এমন ভুল হয়ে থাকতে পারে। পরবর্তী অধিবেশনে এসব কমিটি সংশোধনের দাবি জানান তিনি।
স্থায়ী কমিটির গুরুত্ব তুলে ধরে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, ‘স্থায়ী কমিটিগুলোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাই স্থায়ী কমিটিগুলো কার্যকর হোক। বিরোধী দলের সংসদ সদস্য হিসেবে আমরা জবাবদিহি নিশ্চিত করতে চাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্থায়ী কমিটিগুলো তাদের ইচ্ছামতো গঠিত হলে আমাদের পক্ষে সেটার অংশীদার হওয়া সম্ভব।’
কমিটিগুলো গঠনে বিরোধী দলের দেওয়া তালিকা ও প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি তুলে ধরেন তিনি।
জুলাই সনদ ও বিরোধী সভাপতির প্রশ্ন
গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদে বিরোধী দলের সদস্য রাখার বিষয়টি জুলাই জাতীয় সনদের সঙ্গেও যুক্ত বলে মনে করেন বদিউল আলম মজুমদার।
তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সভাপতি বিরোধী দল থেকে করার বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্য হয়েছে। জনগণও জুলাই জাতীয় সনদ অনুমোদন করেছে। ফলে এটি বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকারের বাধ্যতামূলক অঙ্গীকার রয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার এখন বলছে, এসব করার কোনও রেওয়াজ নেই। কিন্তু পুরোনো রেওয়াজের কথা বলে এখন আর বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এত মানুষের প্রাণহানি ও দীর্ঘ আলোচনা-পর্যালোচনার পর বিভিন্ন বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে এবং জনগণ তাতে সম্মতি দিয়েছে। জনগণ যখন অনুমোদন করেছে, সেটিই শেষ কথা।
তিনি আরও বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে একটি সমঝোতা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টরা সবাই এতে স্বাক্ষর করেছেন। এখন সংস্কার বাস্তবায়ন না করার জন্য রেওয়াজ বা পুরোনো পদ্ধতির কথা বলা মূলত অজুহাত। বিষয়টি দুঃখজনক।
জবাবদিহি কতটা নিশ্চিত হবে
বিরোধী জোটের সংসদ সদস্যরা বলছেন, সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্য থাকা এবং সভাপতি হওয়ার মূল তাৎপর্য হলো, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম সংসদের ভেতরে পরীক্ষা ও প্রশ্ন করার সুযোগ তৈরি হওয়া। বিশেষ করে সরকারি ব্যয়, প্রকল্প বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, অনিয়ম এবং মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়ে কমিটির বৈঠকে প্রশ্ন তোলা ও সংশ্লিষ্টদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়ার সুযোগ থাকে।
আর সভাপতি পদে বিরোধী দলের সদস্য থাকলে কমিটির বৈঠক পরিচালনা ও সংসদীয় পর্যালোচনায় বিরোধী দলের নেতৃত্বের সুযোগ তৈরি হয়। ফলে এটি শুধু বিরোধী দলের একটি পদ পাওয়ার বিষয় নয়, সংসদে সরকারের ওপর কার্যকর নজরদারি কতটা শক্তিশালী হবে, সেটিও এর সঙ্গে সম্পর্কিত।
সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির ভূমিকার সাম্প্রতিক উদাহরণও রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) এই কমিটি সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করে জবাবদিহি ও দুর্নীতি দমনে গুরুত্বপূর্ণ ১০টি মন্ত্রণালয়ের অডিট আপত্তি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তবে বর্তমান সংসদের ক্ষেত্রে বিষয়টি পরিষ্কার, ৩৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্যপদে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব থাকলেও এসব কমিটির কোনওটির সভাপতি পদ বিরোধী দলের হাতে নেই। বিরোধী দলের সভাপতিত্ব রয়েছে সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে, যা ৫০টি সংসদীয় কমিটির মধ্যে একটি।
বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের এর আগে জানিয়েছিলেন, সংসদে তাদের সদস্য সংখ্যার অনুপাতে তারা ২৬ শতাংশ কমিটি সদস্যপদ পাচ্ছেন এবং একই অনুপাতে কমিটির সভাপতির পদও প্রত্যাশা করেছিলেন। তাদের পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটিতে বিরোধী দলের কাউকে সভাপতি করার দাবিও তোলা হয়েছে।
বিরোধী জোটের সংসদ সদস্যরা বলছেন, সংসদকে কার্যকর ও জবাবদিহি করা গেলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পাবে। আর গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেলে জনগণ তার সুফল ভোগ করবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু বিরোধী দল কতটি পদ পেলো বা কতজন সদস্য পেলো, সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, সরকারের কাজের ওপর সংসদীয় নজরদারি কতটা কার্যকর হবে এবং সেই নজরদারির সুফল জনগণ কতটা পাবে?