মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার থেকে পদ্মা সেতুর দিকে যাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের নিচে বিক্রমপুর প্লাজাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে জুরাইন বাজার। ওপর দিয়ে বিশাল এক্সপ্রেসওয়ে, নিচে ব্যস্ত জনপদ। রাজধানী ও সিটি করপোরেশনের অংশ হওয়ায় এখানকার নাগরিক সুবিধাও হয়তো অন্য এলাকার মতোই; দেখলে এমনটাই মনে হতে পারে। কিন্তু জুরাইন রেলগেট থেকে একটু পশ্চিমে গেলেই বদলে যায় সেই চিত্র। নানা নাগরিক সমস্যায় জর্জরিত এলাকাটির রাজধানীর বদলে অন্য কোনও সুবিধাবঞ্চিত মফস্বল এলাকার মতোই।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষায়, জুরাইন এখন রাজধানীর এক অবহেলিত ‘যন্ত্রণার দ্বীপ’। বছরের পর বছর তারা জলাবদ্ধতা, ভাঙাচোরা রাস্তা, সুপেয় পানির সংকট, গ্যাস ও বিদ্যুতের সমস্যার মধ্যে বসবাস করছেন।
রাজধানীর দক্ষিণাংশের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই এলাকা প্রশাসনিকভাবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অন্তর্ভুক্ত। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বাস্তবে নাগরিক সেবার কোনও ছোঁয়াই পৌঁছায়নি এখানে। গত ১০ থেকে ১২ বছর ধরে ড্রেনেজ ব্যবস্থার চরম বিপর্যয়, সামান্য বৃষ্টিতেই দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা, সুপেয় পানির সংকট, তিতাস গ্যাসের অভাব এবং খানাখন্দে ভরা অনাকাড়ে সড়ক; সব মিলিয়ে দুর্ভোগে রয়েছেন বাসিন্দারা।
বছরের পর বছর চলাচলের অনুপযোগী রাস্তা
সরেজমিনে জুরাইন মোড় থেকে পূর্ব দিকে মিষ্টির মোড়ের পথে গিয়ে দেখা যায়, জুরাইনের বিক্রমপুর কমপ্লেক্সের উত্তর ও দক্ষিণ—দুই দিক দিয়েই পূর্ব দিকে মিষ্টির মোড়ে যাওয়া যায়। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে দক্ষিণ দিকের রাস্তাটি বছরের পর বছর ধরে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে আছে। বৃষ্টি হলে এই সড়কের জলাবদ্ধতা পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
মিষ্টির মোড়ের ওই রাস্তার পাশে চায়ের দোকানি শাহআলম বলেন, প্রায় সাত থেকে আট বছর ধরে তিনি একই অবস্থা দেখছেন।
তিনি বলেন, ‘কিছুদিন আগে স্থানীয় লোকজন নিজেদের উদ্যোগে রাস্তাটি সংস্কার করতে গেলে সিটি করপোরেশনের লোকজন এসে বলে তারা করে দিচ্ছে। কিন্তু যেই কথা সেই কাজ। কোনও কাজই আর করেনি। কারও সঙ্গে যোগাযোগও করেনি।’
স্থানীয় বাসিন্দা বুলবুল আহমেদ বলেন, বৃষ্টি বা বর্ষার মৌসুমে এখানে পানি জমে যায়। পানি বের হওয়ার কোনও পথ না থাকায় তা চারদিকে ছড়িয়ে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করে।
তিনি বলেন, ‘পানি জমে পুরো এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি করে। পানি বাসাবাড়িতেও ঢুকে পড়ে। তখন মনে হয় আমরা রাজধানীর বাসিন্দা হয়েও এক নরকে বসবাস করছি। আমাদের দেখার যেন কেউ নেই।’
এলাকার বাসিন্দা ফারহানা ইসলাম বলেন, ‘আমরা কি রাজধানীর বাসিন্দা? এই যে সরু রাস্তা, পানি বের হওয়ার পথও সরু। কোনোভাবে মানুষ এই এলাকায় টিকে আছে। শুধু জলাবদ্ধতা, গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই, মশা; সব মিলিয়ে মনে হয় যেন আমরা জুরাইনের লোকজন অন্য কোনও গ্রহের বাসিন্দা। অথচ নির্বাচন আসলে কথার ফুলঝুড়ি নিয়ে আসেন নেতারা। কিন্তু নির্বাচনের পর আর কেউ ঘুরেও তাকায় না।’
বৃষ্টির পানি আটকে থাকে সপ্তাহের পর সপ্তাহ
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বারবার স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সিটি করপোরেশনকে জানিয়েও প্রতিকার না পাওয়ায় চরম ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী।
তাদের অভিযোগ, বৃষ্টি নামলেই জুরাইন রেলগেট, বিক্রমপুর প্লাজা সংলগ্ন এলাকা, কমিশনার রোড এবং আশপাশের অলিগলি হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে তলিয়ে যায়। মূল সড়কের নালাগুলো দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করায় পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
বৃষ্টির পানি কয়েক সপ্তাহ ধরে আটকে থেকে পচে দুর্গন্ধ ছড়ায়। নিচতলার ফ্ল্যাট ও দোকানপাটে ময়লা পানি ঢুকে পড়ে, যা দৈনন্দিন জীবনযাত্রা অচল করে দেয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, অপরিকল্পিত স্যুয়ারেজ ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাট তলিয়ে যায়। এমনকি বছরের অধিকাংশ সময় মাদ্রাসা রোড ও মেডিক্যাল রোডের মতো কিছু রাস্তা কুচকুচে কালো ও দুর্গন্ধময় নোংরা পানির নিচে থাকে। এ থেকে নানা রোগবালাইও ছড়ায়।
জলাবদ্ধতার পানি মানুষের বাসাবাড়ি ও দোকানেও ঢুকে পড়ে বলে অভিযোগ তাদের।
পানিতে দুর্গন্ধ, রাস্তায় গর্ত
সরেজমিনে দেখা যায়, জুরাইনের ভেতরের বেশিরভাগ রাস্তার ইট ও ঢালাই উঠে গিয়ে তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। জমা পানির নিচে এসব গর্ত দেখা যায় না বলে প্রতিনিয়ত রিকশা ও অটো উল্টে যাচ্ছে।
পানির সংকটও রয়েছে এলাকায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি মিললেও তা দুর্গন্ধযুক্ত ও ময়লা। পাইপলাইনের লিকেজ দিয়ে ড্রেনের ময়লা পানি মিশে যাওয়ায় ফুটানো ছাড়া ব্যবহারের কোনও উপায় নেই।
তাদের দাবি, জুরাইনের অনেক এলাকায় ওয়াসার সরবরাহ করা পানি পানের অযোগ্য এবং তীব্র গন্ধযুক্ত। বিশুদ্ধ পানির দাবিতে বিভিন্ন সময়ে জুরাইনবাসী মানববন্ধন করতে বাধ্য হয়েছেন। এমনকি ওয়াসার সামনেও মানববন্ধন করা হয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতির কোনও উন্নতি হয়নি বলে অভিযোগ তাদের।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের তীব্র সংকট। সকালে গ্যাস গেলে তা মেলে গভীর রাতে। রান্নাবান্নার জন্য বাধ্য হয়ে অনেকেই এলপিজি সিলিন্ডার কিংবা কেরোসিনের চুলার ওপর নির্ভর করছেন।
এলাকার বাসিন্দা মাহদি বলেন, জুরাইনে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র গ্যাস সংকট চলছে। রান্নার জন্য পর্যাপ্ত গ্যাস না পেলেও মাসের পর মাস নিয়মিত গ্যাস বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে বাসিন্দাদের।
তিনি বলেন, ‘নো গ্যাস, নো বিল’ স্লোগানে গত ৪ সেপ্টেম্বর ‘শ্যামপুর-কদমতলীর বিক্ষুব্ধ জনতা’ ব্যানারে রেলগেট এলাকায় প্রতিবাদ সমাবেশ ও মশাল মিছিল করেছি। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট দ্রুত সমাধানের দাবিতে আমরা আরও বড়সড় আন্দোলন করতে যাচ্ছি। আমরা এভাবে আর বঞ্চনার শিকার হতে চাই না।’
মশার উপদ্রব, ডেঙ্গুর ‘চরম ঝুঁকিতে’ ওয়ার্ড
স্থায়ী জলাবদ্ধতা ও বর্জ্য অব্যবস্থাপনার কারণে এলাকায় মশার উপদ্রবও অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এতে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগব্যাধির ঝুঁকি বাড়ছে।
বর্ষাপূর্ব এডিস মশার লার্ভা জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। এর মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গুর জন্য ‘চরম ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিতেই নির্ধারিত সূচকের চেয়ে অতিরিক্ত এডিস মশার ঘনত্ব পাওয়া গেছে। ‘চরম ঝুঁকিপূর্ণ’ ওয়ার্ডগুলোর মধ্যে জুরাইন এলাকার ৫৩ নম্বর ওয়ার্ডও একটি।
এসব ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডের মশক নিধন সম্পর্কে জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকার ডেঙ্গু প্রতিরোধে সর্বোচ্চটুকু চেষ্টা করছে। ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে দুই সিটি করপোরেশনের বিপুল সংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, পুরো জাতি এ লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ। আশাকরি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় তিন মাসের যে অভিযান কর্মসূচি শুরু হয়েছে তার মাধ্যমে দেশের প্রতিটি ওয়ার্ডকে এডিসমুক্ত করার পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে মানুষের মধ্যে নতুন করে সচেতনতা তৈরি হবে।’
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সিটি করপোরেশন কিংবা সরকার যতই উদ্যোগ নিক, প্রথমে নিজ বাসা থেকে লড়াই শুরু করতে হবে বলে মনে করেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম।
তার মতে, ‘জনগণের সম্পৃক্ততা ছাড়া কোনোভাবেই ডেঙ্গু প্রতিরোধ সম্ভব নয়। এ কার্যক্রমে জনগণের সহযোগিতা ছাড়া কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন সম্ভব হবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘ডেঙ্গু থেকে সন্তানদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই বিশেষ মশক নিধন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতিমধ্যেই ডেঙ্গু প্রতিরোধে তিন মাসের বিশেষ অভিযানের উদ্বোধন করেছেন। আশাকরি এর মধ্যে দিয়ে ভাল ফলাফল আসবে।’
এ সময় সিটি করপোরেশনের কার্যক্রমে রাজধানীর বাসিন্দাদের ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতার আহ্বান জানান ডিএনসিসি প্রশাসক।
‘আমাদের মানুষই মনে করে না কর্মকর্তারা’
মেডিক্যাল রোডসহ জুরাইনের সড়কগুলোর অবস্থা অত্যন্ত নাজুক বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। দীর্ঘদিন ধরে রাস্তা সংস্কারের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে কার্যকর কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তাদের। তারা বলছেন, শুষ্ক মৌসুমে চরম ধুলাবালি আর বর্ষায় কর্দমাক্ত রাস্তার কারণে যাতায়াত করা এখানে নরকযন্ত্রণার শামিল।
এলাকার সমস্যা নিয়ে দীর্ঘদিন আন্দোলন করা মিজানুর রহমান বলেন, ‘এই এলাকার যে আমরা বাসিন্দা, আমাদের মানুষই মনে করে না কর্মকর্তারা। তাদের কাছে বারবার বলা, অনুরোধ করা কিন্তু তারা কেউ আমাদের কথা শোনে না। আমরা এলাকার সমস্যা নিয়ে স্যার স্যার করতে আমাদের জুতার তলা ক্ষয় হয়ে গেছে। তারপরও তারা কেউ এগিয়ে আসেনি।’
তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের নাগরিক সমস্যা নিয়ে কথা বলতে কোথায় যাইনি, সব জায়গায় গিয়েছি। কেউ আমাদের সমস্যার সমাধান করেনি। প্রায় এক দশক আমরা এভাবেই আছি। অথচ রাজধানীর অন্যান্য এলাকা দেখেন, এত সমস্যা নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি আন্দোলন করেই আমাদের সমস্যার সমাধান করতে হবে। আমরা উঠান বৈঠকের মতো একটি প্রোগ্রাম করেছি, মশাল মিছিল করেছি। এবার আরও বড়সড় আন্দোলনের দিকে যাচ্ছি। যখন বড় আন্দোলন হবে, কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে, তখন তারা ছুটে আমাদের কাছে আসবে। তখন আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাবো।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা নরকযন্ত্রণার ভেতরে বসবাস করতে করতে ক্লান্ত। এবার তার অবসানে যা করতে হয় তাই করবো।’
স্থানীয় এক বাসিন্দা আশরাফ হোসেনও আন্দোলনের প্রস্তুতির কথা জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা সিটি করপোরেশনকে নিয়মিত কর দিচ্ছি, অথচ ঢাকার সর্বনিম্ন নাগরিক সুবিধাও আমরা পাচ্ছি না। ১০ বছরের ওপর আমরা এভাবেই চলে আসছি। এবার আমরা বাধ্য হয়ে রাজপথে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছি। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মাসখানেকের মধ্যে আমরা বড় আন্দোলন করবো। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা সেই আন্দোলন চালিয়ে যাবো।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর কাউন্সিলর ও মেয়রদের শুধু প্রতিশ্রুতিই শুনেছেন তারা, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ভোটের সময় জনপ্রতিনিধিরা নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও পরবর্তীতে আর কেউ খোঁজ নেন না।
তাদের দাবি, যথাযথ কর্তৃপক্ষের সমন্বয়হীনতা ও নজরদারির অভাবেই ঢাকার এই প্রাচীন জনপদটি আধুনিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে আছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম শনিবার বিকালে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এসব অভিযোগ নিয়ে কেউ আমাদের কাছে আসেনি। আসলে হয়তো বলতে পারতাম।’
জুরাইন এলাকার ড্রেনেজ সিস্টেমের বেহাল দশা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শুধু জুরাইন নয়; ঢাকার অনেক এলাকারই ড্রেনেজ সিস্টেমের অবস্থা খারাপ। এগুলো সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তবে সময় লাগবে।’