সংসার সামলানো, সন্তানের দেখভাল, অফিসের কাজ কিংবা পরিবারের নানা প্রয়োজন সব মিলিয়ে বাবা-মায়ের দিন কাটে ব্যস্ততায়। নিজের জন্য একটু সময় বের করাও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। তাঁদের এই নিরন্তর পরিশ্রম ও দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দিতে পালিত হয় ‘ন্যাশনাল পেরেন্টস ডে অফ’ বা জাতীয় অভিভাবক ছুটির দিন।
দিনটির মূল ভাবনা খুব সাধারণ, যারা সারা বছর পরিবারের সবার প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেন, তাদেরও যেন কিছুটা সময় নিজের জন্য দেওয়া হয়। সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া, খাবার তৈরি, পড়াশোনায় সাহায্য করা থেকে শুরু করে অসুস্থতায় পাশে থাকা অভিভাবকের দায়িত্বের শেষ নেই। অনেক কাজের কোনও আলাদা স্বীকৃতিও মেলে না। তাই অন্তত একটি দিন তাঁদের দায়িত্বের চাপ কিছুটা কমিয়ে স্বস্তিতে কাটানোর সুযোগ করে দেওয়াই এই দিবসের উদ্দেশ্য।
বাবা-মাকে ছুটি দেওয়ার অর্থ শুধু তাঁদের বিশ্রামের সুযোগ করে দেওয়া নয়। পরিবারের অন্য সদস্যরা যদি সেদিন রান্না, বাজার, ঘর গোছানো বা সন্তানের দেখাশোনার মতো কাজ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন, তাহলেই তাঁদের ওপর থেকে অনেকটা চাপ কমতে পারে। এক ঘণ্টার অবসর কিংবা একটি পুরো বিকালটা যতটুকুই হোক, নিজের মতো করে কাটানোর সুযোগ একজন ব্যস্ত অভিভাবকের জন্য যথেষ্ট মূল্যবান হতে পারে।
দিনটি উদ্যাপনে বড় বাজেটের প্রয়োজন নেই। বাড়ির ছাদে বা কাছের কোনও পার্কে পরিবারের সবাই মিলে ছোট্ট পিকনিক করা যেতে পারে। বাবা-মায়ের পছন্দের খাবার তৈরি করে একসঙ্গে খাওয়া, গল্প করা কিংবা হালকা খেলাধুলার আয়োজনও হতে পারে আনন্দের কারণ। বাইরে যেতে না চাইলে বাড়িতেই তাঁদের পছন্দের সিনেমা চালিয়ে একটি আরামদায়ক সন্ধ্যা কাটানো যায়।
বাবা-মায়ের জন্য আলাদা করে সময় রাখাও হতে পারে চমৎকার একটি উদ্যোগ। তাঁদের দু’জনকে একসঙ্গে রাতের খাবারে নিয়ে যাওয়া, কোনও প্রিয় জায়গায় ঘুরতে পাঠানো কিংবা সন্তানদের দায়িত্ব অন্য কেউ সামলে দিলে তাঁরা নিজেদের মতো করে কিছুটা সময় কাটাতে পারবেন। প্রতিদিনের ব্যস্ততার বাইরে এমন একটি বিরতি তাঁদের সম্পর্কেও নতুন আনন্দ যোগ করতে পারে।
স্মৃতিকে উপহার হিসেবেও বেছে নেওয়া যায়। পুরোনো ছবি, পারিবারিক ভ্রমণের মুহূর্ত, বিশেষ দিনের ছবি এবং পরিবারের সদস্যদের লেখা ছোট ছোট বার্তা দিয়ে একটি অ্যালবাম তৈরি করা যেতে পারে। বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা স্মৃতিগুলো একসঙ্গে ফিরে পাওয়ার অনুভূতি বাবা-মায়ের জন্য দারুণ আবেগঘন হতে পারে।
চাইলে দিনটিকে শুধু নিজের পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সামাজিকভাবেও উদ্যাপন করা যায়। পরিবারের সবাই মিলে স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে অংশ নেওয়া, এলাকার পরিচ্ছন্নতা অভিযানে যোগ দেওয়া কিংবা কোনও দাতব্য উদ্যোগে সহযোগিতা করা যেতে পারে। এতে শিশুদের মধ্যেও সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে ওঠে।
পাড়া বা পরিচিত কয়েকটি পরিবারকে নিয়ে ছোট পরিসরে খাবার ভাগাভাগির আয়োজনও করা যেতে পারে। সবাই নিজের পছন্দের খাবার নিয়ে এসে একসঙ্গে খেতে পারেন। আড্ডার ফাঁকে বাবা-মায়েরা সন্তান বড় করার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে পারেন। এতে একে অপরের সমস্যাগুলো বোঝার পাশাপাশি পারস্পরিক সহযোগিতার সুযোগও তৈরি হয়।
জাতীয় অভিভাবক ছুটির দিনের ভাবনাটি এসেছে শিশুদের ডিজিটাল বই পড়ার প্ল্যাটফর্ম ‘এপিক’-এর কাছ থেকে। ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠানটি দিবসটির উদ্যোগ নেয়। বাবা-মা ও অভিভাবকেরা প্রতিদিন যে সময়, শ্রম ও যত্ন পরিবারের জন্য ব্যয় করেন, তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাই ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য। পরিবার, স্কুল ও সমাজ যেন সম্মিলিতভাবে তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে পারে, সেই ভাবনাও এর সঙ্গে যুক্ত ছিল।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে প্রথমবার দিবসটি পালিত হয়। এরপর ধীরে ধীরে এর প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকে। এই দিবসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো, বাবা-মা শুধু পরিবারের যত্ন নেওয়ার মানুষ নন, তাঁদেরও বিশ্রাম, আনন্দ ও নিজের জন্য সময় প্রয়োজন।
তাই বাবা-মায়ের ছুটির দিনটি বিশেষ করে তুলতে দামি উপহার বা বড় আয়োজনের দরকার নেই। তাঁদের কিছু দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া, পছন্দের কাজ করার সুযোগ দেওয়া কিংবা শুধু বলা, ‘আজ আপনি বিশ্রাম নিন, বাকিটা আমরা দেখছি।’ হয়তো সেটিই হতে পারে সবচেয়ে সুন্দর উপহার।