শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি উপন্যাস ”পথের দাবী” (আগস্ট, ১৯২৬)। এ বছর এ-উপন্যাস প্রকাশের শতবর্ষ এবং একইসঙ্গে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সার্ধশতবর্ষ জন্মবার্ষিকী। সকলেই অবগত যে, ”পথের দাবী” একাডেমিক পরিসর থেকে সাধারণ পাঠক পর্যন্ত বহুলপঠিত উপন্যাস। তার সকল উপন্যাস পাঠ সমানতালে না হলেও কয়েকটি উপন্যাস ও গল্পের জন্য শরৎচন্দ্রের জনপ্রিয়তা ঈর্ষণীয়। ”পথের দাবী” উপন্যাস ভিন্ন কারণে জনপ্রিয়; এটি আমাদের আলোচ্য। এ-উপন্যাসের প্রতি ভিন্নভাবে আগ্রহ থাকার কারণ হলো, ভারতবর্ষে উপনিবেশবিরোধী, স্বাধীনতা সংগ্রামী বা পরবর্তী যত বাঙালি বিপ্লবী, সমাজতন্ত্রী আছেন তাদের জীবনস্মৃতি ও সাক্ষাৎকারে এ উপন্যাসের কথা বারবার উচ্চারিত হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। এখনও অনেক বামপন্থার দল ও ব্যক্তি আছেন যারা কর্মী সংগ্রহ এবং তাদের কমরেড হিসেবে তৈরি করতে এ উপন্যাস পাঠের সুপারিশ করেন। অনেকেই আছেন পাঠচক্রে কোর্সভুক্ত করেছেন।
স্মরণীয় বিশ্বসাহিত্যে বিপ্লব, স্বাধীনতা সংগ্রামে জনগণকে প্রণোদিত করেছে এমন উপন্যাসের সংখ্যা নগণ্য। যদিও জনপ্রিয়তার বিচারে অনেক কথাসাহিত্য ও কাব্য রয়েছে। কিন্তু সরাসরি সংগ্রামে, বিশেষত সশস্ত্র বিপ্লবে সহায়ক কথাসাহিত্য বিরল। তাহলে ”পথের দাবী”-র সূত্রে উপন্যাস কী মেনিফেস্টো হতে পারে। সকলেরই জানা যে, একমাত্র কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো প্রচারিত হয় ১৮৪৮ সালে। এর সূত্রে দেশে দেশে কৃষক-শ্রমিক বা কমিউনিস্ট আন্দোলনে উপর্যুক্ত মেনিফেস্টো সমন্বিতভাবে গৃহীত। এমন প্রশ্ন রাখতেই পারি, কমিউনিস্ট পার্টিগুলো অন্য কোনো উপন্যাসের উচ্চারণ না করলেও কী কারণে এ-উপন্যাসকে তারা কোর্স হিসেবে পাঠ করেন। প্রসঙ্গত বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্স, মুক্তিসংঘ, শ্রীসংঘ, রেডবেঙ্গল, প্রবর্তক সংঘ, অনুশীলন ও যুগান্তর দলের কথা জানি। যাদের কর্মতৎপরতা, অনুকরণে বাঙালির পাড়া, গ্রাম, নগরে যেসব সংঘ সমিতি গড়ে উঠেছিল, সেসব সংগঠনে অবশ্য পাঠ্য ছিল ”পথের দাবী”। এ প্রেক্ষিতে আমাদের প্রশ্ন ”পথের দাবী” কি তাহলে মেনিফেস্টোর মতোই ক্রিয়া করেছে। আমরা সেই বিপ্লবীদের জীবন থেকে জানি, যারা সহকর্মী কমরেডদের প্রেরণা ও শোধনে সুপারিশ করেছেন এ উপন্যাস।
”পথের দাবী” বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়; এবং ভারতবর্ষসহ বিভিন্ন স্থানে এর সারাংশ ছড়িয়ে পড়ে। এ উদাহরণে আমরা বিপ্লবী ভগৎ সিং-এর কথা স্মরণ করতে পারি। নিঃসন্দেহে ‘পথের দাবী’ ব্রিটিশ উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামে এদেশের তরুণ বিপ্লবীদের উদ্বুদ্ধ করেছে। ফলত নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, মাস্টারদা সূর্যসেন, হেমচন্দ্র ঘোষ, শরৎচন্দ্রের বন্ধু শচীন্দ্রনাথ সান্যালসহ আন্দামান-কালাপানিতে যে সকল তরুণ নির্বাসিত বা বন্দি ছিলেন, তাদের মধ্যে অনেকের কথা ও লেখায় ‘পথের দাবী’র উল্লেখ রয়েছে। তা পরবর্তী প্রজন্মেও ক্রিয়াশীল। সরদার ফজলুল করিমের সাক্ষ্য (আমি সরদার বলছি, ২০১৬) ‘‘মোজাম্মেল একদিন আমাকে একটি বই দিয়ে বলল, ‘এই বইটি তুমি নেবে। এটি এক রাতের মধ্যে পড়ে শেষ করতে হবে। কেউ যেন না দেখে।’… বইটি হচ্ছে কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী’। সাংঘাতিক বই। কবিগুরু নাকি বলেছিলেন, ‘এটা কি একটা উপন্যাস হলো? শরৎচন্দ্র জবাব দিয়েছিলেন, ‘যা হয়েছে তাতো হয়েছে।’ কিছুদিন আগে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বাংলাদেশে এসে বলেছিলেন, ‘আমি রাজনীতিতে এসেছি ‘পথের দাবী’ পড়ে।’ এক্ষেত্রে ‘পথের দাবী’ উপন্যাসের ভূমিকা অস্বীকৃত নয়। পরিপ্রেক্ষিত হিসেবে শচীনন্দন চট্টোপাধ্যায় শরৎচন্দ্রের রাজনৈতিক জীবন (১৩৬১)-এ বলেছেন, ‘তিনি আপন কল্পনার দ্বারা সব্যসাচীর মধ্যে বাংলার বিপ্লবীদের একটি টাইপ সৃষ্টি করেছিলেন। তবে কয়েকজন বিপ্লবী নেতার জীবনের ছায়া বিশেষ করে সব্যসাচী চরিত্রে পড়েছে। …দুই হাতে অব্যর্থ লক্ষ্যে রিভলভার ছোঁড়ার দক্ষতার মধ্যে চক্রবর্তী এবং আরও কয়েকজনের ছাপ আছে। তিল তিল করে সৌন্দর্য আহরণ করে যেমন তিলোত্তমার সৃষ্টি হয় তেমনি সব্যসাচীর চরিত্রের মধ্যে বহু বিপ্লবীর জীবনের ছাপ আছে, নিছক কল্পনা দিয়ে তিনি সব্যসাচীর চরিত্রের একটি আঁচড়ও টানেননি।’ মানলাম তার যুক্তি, কিন্তু প্রতিবেদনের ভাষায় সেই সক্রিয়তা দেখিনি।
এ-উপন্যাস রচনার পটভূমি, উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনের মাত্রা, গতি পরিবেশ ইত্যাদি বিবেচনায় নিলে বোঝা যায় এ ধরনের উপন্যাস লেখা ছিল সময়ের আকাঙ্ক্ষা। এর আগে সংঘটিত কয়েকটি ঘটনাও উল্লেখ করতে হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের বলশেভিক বিপ্লব, যুদ্ধ, কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা, বিভিন্ন দেশের মুক্তি আন্দোলন, এদেশে স্বদেশি-অহিংস আন্দোলন, ঔপনিবেশিক স্থাপনা ও ব্যক্তির ওপর বিপ্লবী সংগঠনগুলোর গোপন অভিযান, বামপন্থি সংগঠনসমূহের বিকাশ ইত্যাদি সেভাবেই পরিস্থিতি নির্মাণ করেছে। ওই সময়ে কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রভাবসৃষ্টিকারী কবিতা ও গান প্রকাশিত হয়; এবং তিনি কৃষক-প্রজার মুক্তি কামনায় দল গঠন ও পত্রিকা প্রকাশ করেন। স্বাধীনতা সংগ্রামে এক উত্তাল সময়; সচেতন কোনো তরুণ সে সময় রাজনীতির বাইরে ছিল না। ফলে তখন স্বাধীনতার পক্ষে যারাই ছিলেন তাদের পক্ষে এমন লেখা ও সৃষ্টি ছিল অনিবার্য। যাতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। উপন্যাসের শুরুতেই পরাধীনতার শৃঙ্খলের উপলব্ধি প্রকাশ করেছে অপূর্ব্ব। ‘অপূর্ব্ব কহিল, আমরা পরাধীন জাতি,…স্টেশনের একটা বেঞ্চে বসবার আমাদের অধিকার নেই, অপমানিত হয়ে নালিশ করবার পথ নেই,— বলিতে বলিতে সেদিনের সমস্ত লাঞ্ছনা,—ফিরিঙ্গি ছোঁড়াদের বুটের আঘাত হইতে স্টেশন মাস্টারের বাহির করিয়া দেওয়া অবধি সকল অপমান কষ্ট অনুভব করিয়া তাহার দই চক্ষু প্রদীপ্ত হইয়া উঠিল, কহিল,—আমরা যেন মানুষ নই! আমাদের যেন মানুষের প্রাণ, মানুষের রক্ত-মাংস গায়ে নেই! এই যদি আমাদের সাধনা হয়, আছি আমি আপনাদের দলে।’
২.
শরৎচন্দ্রের জীবনী রচয়িতা বিষ্ণু প্রভাকর (ছন্নছাড়া মহাপ্রাণ, ১৯৮৭) ‘পথের দাবী’ উপন্যাস প্রকাশনা ও নিষিদ্ধ হওয়ার প্রাসঙ্গিক তথ্য দিয়েছেন। এ উপন্যাস ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশিত হয়। তবে এ উপন্যাস প্রকাশের পর সরকার থেকে প্রতিক্রিয়া হতে পারে এমন সন্দেহ লেখক নিজেও ব্যক্ত করেছিলেন প্রকাশক রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের কাছে। এর আগে অন্য প্রকাশক সুধীরচন্দ্র সরকার পাণ্ডুলিপি পাঠ করে স্পর্শকাতর ভাষা সংশোধনের কথা বলেছিলেন, কিন্তু শরৎচন্দ্র জানিয়ে দেন, ‘আমি একটি শব্দও বদলাব না, একটি কথা পর্যন্ত নয়। ইচ্ছে হলে ছাপো, নইলে দরকার নেই।’ বঙ্গবাণীতে যখন ধারাবাহিক প্রকাশিত হয়, তখন বিপ্লবীসহ সাধারণ পাঠকদের কাছে এ উপন্যাস জনপ্রিয়তা লাভ করে। শরৎচন্দ্রের সন্দেহ বাস্তবেও প্রমাণিত হলো প্রকাশের পর। উল্লেখযোগ্য যে, কলকাতার তৎকালীন ব্রিটিশ পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্টের ডায়রি, প্রতিবেদন এবং তার স্বীকারোক্তিতে এ-সম্পর্কে তথ্য রয়েছে। এ ছাড়াও শরৎচন্দ্রকে তিনি বলেছিলেন, ‘‘জানেন শরৎবাবু ‘’পথের দাবী’ লিখে আপনি আমাদের কত বড়ো ক্ষতি করেছেন? যেখানেই আমরা বিপ্লবীদের ধরতে যাই দেখি তাদের কাছে অন্তত দুটি বই আছে। একটি ‘গীতা’ অপারটি ‘’পথের দাবী’’; বিপ্লবীদের খেপিয়ে তুলেছে।’’ ১৯২৬ সালের ‘পথের দাবী’ প্রকাশিত হওয়ার পর উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন আরও বেগবান হয়েছিল। টেগার্টের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১৯২৭ সালে ব্রিটিশ সরকার বইটি বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে। এরপর ভারতবর্ষে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের ওপর চার্লস টেগার্ট ১৯৩২ সালে ‘ভারতে ‘সন্ত্রাসবাদ’ শিরোনামে বক্তৃতা দিয়েছেন। যে বক্তৃতায় তিনি সন্ত্রাসবাদ ও তা দমনে স্বাধীনতাকামী বিপ্লবীদের যে হত্যা করা হয়েছে, তা পরোক্ষে স্বীকার করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘পথের দাবী’-এর পক্ষে প্রেরণা জোগাতে শরৎচন্দ্রকে চিঠি লিখেছিলেন। তবে চিঠির ভাষা ও বক্তব্যে শরৎচন্দ্র খুশি হতে পারেননি।
অনেকেই আলোচনা করেছেন বা জানতে চেয়েছেন সব্যসাচী ও ভারতীর মতো চরিত্র নির্মাণে তিনি কি কোনও বিপ্লবীর ছায়ারূপ কল্পনায় নিয়েছেন। অনেক গল্পই তো সেভাবে তৈরি হয়েছে। মূলত তিনি বিপ্লববাদের চরিত্র মনে রেখেই নির্মাণ করেছেন উপন্যাস। তখন তার বন্ধুত্বও ছিল বিপ্লবীদের সঙ্গে। তবে এটি উপন্যাস, রাজনৈতিক বা এমন কর্মসূচির কোনও বই নয়। মেনিফেস্টো তো নয়ই। কিন্তু রাজনৈতিক শিক্ষা, হাতেখড়ির জন্য সকল বামপন্থি অবশ্য পাঠ্য হিসেবে বিবেচনায় নিয়েছেন। ফলত বলা হয়েছে, এ উপন্যাস হলো ‘পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক আগ্নেয় রূপরেখা।’
লেখক মিয়ানমারসহ বিভিন্ন ভূগোলে এর ক্যানভাস বিস্তৃত করেছেন। পরিসর ছড়িয়ে গিয়েছে চীন জাপানসহ পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জুড়ে। তাতে তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় স্পষ্ট। তার অন্য উপন্যাসে প্রেম, সামাজিক ও পারিবারিক সমস্যা-সংকট উদ্ভূত দ্বন্দ্ব রয়েছে। এ উপন্যাসে গুরুত্ব পেয়েছে, বিপ্লব-স্বাধীনতা-মুক্তি। বস্তুত, ‘পথের দাবী’ উপন্যাসে পথের কোনো দিশা বা ইঙ্গিত নেই। তবে বিপ্লবী বাসনার সংলাপ রয়েছে। তাহলে কী আছে তার কথাসাহিত্যে। যদিও ওই সময়ের কথাসাহিত্য বা সমাজেতিহাসের বিশ্লেষণে মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান ও জীবন প্রতিফলনের কথা বলেছেন অনেকে। আমাদের বিবেচনা নয়, ঐতিহাসিক বাস্তবতা সাক্ষ্য দেয় যে, তার সমকালে বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরিই হয়নি। বিদেশাগত শাসকদের সামন্তনীতি, উপনিবেশিত এবং বর্ণবিভাজিত সমাজে বর্গাচাষি, রায়ত-কৃষক, আধা-কৃষকই লক্ষণীয়। উৎপাদনকর্ম ছিল কৃষিকেন্দ্রিক। ফলে মধ্যশ্রেণি তৈরি হওয়ার সুযোগ কোথায়। বস্তুত ওই সমাজের পারিবারিক, গ্রামীণ গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজ ও মানুষের বঞ্চনা, শোষণ, বর্ণবৈষম্য, সংস্কার এবং ব্যক্তির সংকটকে শরৎচন্দ্র রূপায়ণ করেছেন সাহিত্যে। ‘পথের দাবী’ উপন্যাসে বিষয়বস্তু সেভাবে পারিবারিক নয়। এ আখ্যানে সামাজিক স্পৃশ্য-অস্পৃশ্যতা, ব্রাহ্মণ বনাম সাধারণ মানুষের অধিকারের বিতর্ক রয়েছে। এর মধ্যে স্বাধীনতার অকৃত্রিম আকাঙ্ক্ষাও ব্যক্ত হয়েছে। যেমন সব্যসাচী-ভারতীর কথোপকথনে আমরা পেয়ে থাকি। ‘…না ভারতী,… এমন করে এদের ভালো করা যায় না,—এদের ভাল-করা যায় শুধু বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে। এবং সেই বিপ্লবের পথে চালনা করার জন্যেই আমার ‘পথের দাবী’র সৃষ্টি। বিপ্লব শান্তি নয়। হিংসার মধ্যে দিয়েই তাকে চিরদিন পা ফেলে আসতে হয়,—এই তার বর, এই তার অভিশাপ।’
এমন দ্বন্দ্বের প্রেক্ষিতে বিষয়টি উত্থাপন করেছেন ইভা লেকারেভা (শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী’ ‘অন্য’-এর ধারণা ও প্রতিবিম্ব নিয়ে কিছু কথা, ২০২৪)। তার ভাষ্য: ‘‘হিংসা/অহিংসা’ উপন্যাসটির বিষয়বস্তুতে প্রধান শব্দার্থগত জোড়াগত বৈপরীত্যের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য বললে অত্যুক্তি হবে না। আভিধানিক স্তরে (Lexical level) এটি ‘বিপ্লব/শান্তি’, ‘হিংসা/অহিংসা’, ‘নিষ্ঠুরতা/মানবতা(‘মনুষ্যত্ব’, ‘রক্ত/স্বাধীনতা’ এ রকম শব্দের বৈপরীত্যের মাধ্যমে অভিব্যক্ত করা হয়। এই অর্থে ‘পথের দাবী’-র সব্যসাচীর নিম্নলিখিত বাক্যাংশটি লক্ষণীয়: ‘শান্তি! শান্তি! শান্তি! শুনে শুনে কান একেবারে ঝালাপালা হয়ে গেছে।’’ এ অমীমাংসিত তর্কই উপন্যাসের প্রশ্ন হিসেবে উত্থাপিত। যা হয়তো বাস্তবে কোনো বিপ্লবী চিন্তা করেননি। ফলে সংলাপের বিশুদ্ধতা বা বাঙালির অভিজ্ঞতায় নেই এমন ভাষার আলোকে এটাকে বৈপ্লবিক উপন্যাস বলা সংগত নয়। উপন্যাসের শুরু হয়েছে প্রচলিত বাঙালির পারিবারিক আবহে। শিক্ষা, তারপর চাকরি আর সংসার চিন্তা নিয়ে। কিন্তু দেশমাতার চলমান আবহ কাহিনির সমস্ত কিছু নিয়ন্ত্রণ করেছে। উপন্যাসের প্রতিবেদন শুরু হয়েছে মিয়ানমার রেঙ্গুনে অপূর্ব্ব-র চাকরিসূত্রে। সেখানে অনেক মানুষের সাথে তার পরিচয়। সহায়ক ছিল তেওয়ারী ও ভারতী। ভারতীর তেজোদীপ্ত প্রকাশভঙ্গি, জৈবনিক আবেদন, আন্দোলনে যোগদান, সংবেদনশীল কথা পাঠককে মুগ্ধ করে। কিন্তু শরৎচন্দ্রীয় আবহে তার পূর্বাপর বক্তব্য লক্ষণীয়।
এরপর একে একে উপস্থিত হয় ডাক্তাররূপী সব্যসাচী ও সুমিত্রাসহ অনেকে। এখানে অহিংসার বিপরীতে বিপ্লবাত্মক কর্মকাণ্ডের তৎপরতা থাকলেও লেখক কী তার বাঙালি চরিত্রের মৌল বৈশিষ্ট্য ত্যাগ করতে পেরেছেন। যে কারণে ওই বৈপরীত্যের প্রশ্নই তুলেছেন ইভা লেকারোভা। শরৎচন্দ্রের মধ্যে বাঙালির জাতিগত বৈশিষ্ট্য প্রায় অবিকল লক্ষ্য করা যায়। অর্থাৎ বাঙালির মধ্যে যে দ্বিধা, তা সংরক্ষণে রেখেইে প্রচলিত সংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি সাহিত্য রচনা করেছেন। এখানেই দ্বন্দ্ব; আর সে কারণেই আমাদের প্রশ্ন—কোথায় সে বিপ্লব আর বিপ্লবের দর্শন। এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে হুমায়ুন কবির রচিত শরৎসাহিত্যের মূলতত্ত্ব (১৩৬৪) গ্রন্থে। ‘বিপ্লবাত্মক প্রেরণা ও রক্ষণশীল অনুক্রমণ শরৎচন্দ্রের সকল চরিত্রে ও রচনায় অচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। তার সমগ্র রচনায় এই দ্বন্দ্বই প্রধান এবং তার জন্যেই তার রচনা আমাদের এত প্রিয়। কারণ, …ওগুলি আমাদের সত্তার সঙ্গে এমনভাবে বিজড়িত হয়ে আছে যে, ওদের উচ্ছেদসাধন করতে গিয়ে আমরা যেন আমাদের ব্যক্তিত্বকেই খণ্ডিত করে ফেলি। আমাদের প্রয়োজনের তাগিদে আমরা নতুনতর পরীক্ষায় রত হই, কিন্তু সেই পরীক্ষাগুলির মধ্যেই সংস্কারের স্পর্শ থাকে।’ এ চিরায়ত দ্বন্দ্বের কারণেই এ উপন্যাসেও কোনো মীমাংসা দিতে পারেননি শরৎচন্দ্র। ফলত হুমায়ুন কবিরের যুক্তিতে তিনি খণ্ডিত হয়েছেন।
সে কালে বিপ্লবী ও সমাজতন্ত্রীদের কাছে জনপ্রিয় ছিল এ উপন্যাস। ঠিক সে কারণে শিল্পরেখায় উত্তরিত হয়নি। উপন্যাস পাঠ করে ওই জনশ্রুতি অর্জনের সেই বৈশিষ্ট্য অংশত পাওয়া যায় না। ব্রিটিশ উপনিবেশের বিপক্ষে বিপ্লব আন্দোলনের কথা বলা এবং বাজেয়াপ্ত হওয়া যদি কারণ হয় তাহলে ঠিক আছে। কিন্তু উপন্যাসের সমগ্রতা তা সমর্থন করে না। উপন্যাস পাঠের শুরুতেই আমরা যেসব বিষয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি, তা হলো এ দেশের সংস্কার ও সমাজনীতি। একদিকে রয়েছে অপূর্ব্ব-ভারতী-সুমিত্রা-সব্যসাচীর কথোপকথনে প্রচলিত সামাজিক আচার-ঐতিহ্যের বিতর্ক, অন্যদিকে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রচেষ্টা। সশস্ত্র বিপ্লবের অঙ্গীকার। তবে সব্যসাচী নিজের পরিচয় গোপন রেখে সকলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার প্রচেষ্টা চালিয়ে গিয়েছে। পাঠক মাঝে মাঝে হোঁচট খেতেই পারেন। তবে চরিত্র নির্মাণের চমৎকারিত্বে গোপন থাকলে দেশমুক্তির আকাঙ্ক্ষায় জীবনকে উৎসর্গ করেছে বিপ্লবীরা। এ জন্য মাঝে মাঝে ইঙ্গিতে বিপ্লবের বুদ্বুদ লক্ষণীয়। সব্যসাচীর কথা ও আলোচনায় সে দৃঢ়তাও লক্ষণীয়। “আর্ত্তের সেবা, নর-নারীর পুণ্যসঞ্চয়ে প্রবৃত্তি দান করা, লোকের জ্বর ও পেটের অসুখে ঔষধ জোগানো, জল-প্লাবনে সাহায্য ও সান্ত্বনা দেওয়া— তারাই তোমাকে পথ দেখিয়ে দেবে ভারতী, কিন্তু আমি বিপ্লবী। আমার মায়া নেই, দয়া নেই,—পাপ-পুণ্য আমার কাছে মিথ্যা পরিহাস। ওই-সব ভালো কাজ আমার কাছে ছেলেখেলা। ভারতের স্বাধীনতাই আমরা লক্ষ্য, আমার একটিমাত্র সাধনা। এই আমার ভালো, এই আমার মন্দ,— এ ছাড়া এ জীবনে আর কোথাও কিছু নেই।”
সাধারণ মানুষের লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা ও উপনিবেশ থেকে মুক্তি। এ থেকে উপন্যাসের পাত্র-পাত্রীর কথোপকথনে তা উচ্চকিত; ব্যতিক্রম কিছু নয়। স্বীকৃত যে ওই সমাজে ক্রিয়ারত সংগ্রামীদের প্রতিচ্ছবি উপন্যাসে প্রতিধ্বনিত। সব্যসাচী অসামান্য এক দৃঢ়চেতা স্বাধীনতা সংগ্রামী। তার চলাফেরা জনসাধারণের সঙ্গে সম্পর্কে এক বিপ্লবী চরিত্রের সাক্ষাৎ রয়েছে। কথা ও আলোচনায় এক প্রজ্ঞাবান ব্যক্তির পরিচয় মিলে। এমন বাসনা, কামনা, লক্ষ যে কোনও সাধারণ ব্যক্তির মধ্যেও ছিল। কেন তবে জনপ্রিয় হয়েছিল, এখনও শেখানো বুলিতুল্য কথাগুলো চলমান রয়েছে। জনশ্রুতি অর্জনের পেছনে যে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যা বা যেগুলো অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায় তাও ওই সমাজেরই প্রতিবিম্ব। উল্লেখযোগ্য যে, সে কালে সামাজিক প্রথা ভাঙতে গিয়ে বিপ্লবীদের ব্যক্তিচরিত্র দৃঢ় থাকেনি। তারা ব্যক্তি অধিকার প্রতিষ্ঠায় জড়িয়ে পড়েছিলেন নানা ধরনের অপরাধে। কামনা-বাসনায়, কাম-রিরংসায় অবাধ স্বেচ্ছারিতার পরিচয় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সকলেই নয় কেউ কেউ। এর বিপরীতে ‘পথের দাবী’-র সব্যসাচীর চরিত্রে এসব কালিমা ছিল না। উপর্যুক্ত নেতি থেকে মুক্ত ও প্রাণবন্ত একটি চরিত্র—সব্যসাচী। সমকালীন বাস্তবতার তুলনায় সব্যসাচী স্পষ্ট, সাহসী এবং লক্ষ্যাভিসারী। তার কাছে এ সংগ্রাম ছিল কর্তব্য। ফলে ‘পথের দাবী’ সকলের কাছে সমাদরে গৃহীত ও পঠিত। উপন্যাসের প্রতিবেদনে সব্যসাচী ছাড়া অন্যদের কথায় বরং এ নিয়ে সংশয় ও ঐতিহ্যানুসারী সংশয় রয়েছে। ফলে লেখকের বিবরণ ও সংলাপ থেকে এবং বিপ্লবীদের প্রিয় বা পছন্দের সরল কাঠামোতে কোনো সিদ্ধান্তে ইতি টানা যায় না।
বস্তুত পাঠক ও বিপ্লবীদের যেভাবে ইতিহাসে দেখি, তাতে সব্যসাচীকে আলাদা কিছু মনে হয়নি। অবশেষে সব্যসাচীর বক্তব্যে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের ইঙ্গিত বা নির্দেশনা নেই। যদিও বিপ্লবী হিসেবে পরিচয় দানের উক্তি রয়েছে। এমন ইউটোপীয় স্বপ্ন যে কেউ বুনন করতে পারে। বিপ্লবের লক্ষ্যে অস্ত্র ব্যবহারের বিবরণ ছাড়া কোনো নির্দেশনামূলক রূপরেখাও নেই; যাতে বিপ্লবীদের মনে উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। উলটো ব্রিটিশ কর্মচারীর উদ্দেশ্যমূলক প্রতিবেদন সরকারের মধ্যে অতিরিক্ত উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা তৈরি করতে সহায়তা করেছে। যা আমরা টেগার্টের ভাষ্যে (১৯৩২) লক্ষ্য করেছি। তাহলে অবশ্য পাঠ্য এবং আদর্শায়নে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে কেন; এ প্রশ্ন থেকেই যায়। নিষিদ্ধ হলে যে কোনো লেখা জনশ্রুতি অর্জন করে, তা সকলেই জানে। আমরা স্বীকার করি এমন প্লটে সেকালে এমন উপন্যাস ছিল না। বস্তুত পাঠক মনও শরৎচন্দ্রীয় ‘না প্রেমিক না বিপ্লবী’-র সীমারেখা অতিক্রম করতে পারেনি। মূলত এ উপন্যাসে ব্রিটিশ উপনিবেশের শাসন থেকে দেশকে মুক্ত হওয়ার স্বপ্ন উচ্চারিত হয়েছে সততা ও নিষ্ঠায়। এ কথাও স্পষ্ট, কোনও ব্যক্তিগত স্বার্থ বা চাওয়া-পাওয়া যেন দেশের স্বাধীনতার পথে বাধা না হয়। নিঃস্বার্থ এ-আত্মত্যাগের দীক্ষা তরুণ বিপ্লবীদের মানসিকভাবে শক্তিশালী করেছে, এখনও করে। উপন্যাসটির মূল সুরই ছিল দেশের স্বাধীনতা ও উপনিবেশ থেকে মুক্তি। ফলত সামগ্রিক বিবেচনায় ‘পথের দাবী’ বিপ্লবীদের অবশ্য পাঠ্য উপন্যাস হিসেবে গ্রহণ অতিরেক বয়ান বলেই মনে হয়েছে। বরং প্রেরণাদীপ্ত একটি আখ্যান মাত্র।