দেশে প্রতিবছর লাখো তরুণ পড়াশোনা শেষ করে চাকরির বাজারে প্রবেশ করছেন। তাদের প্রত্যাশা, শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী একটি ভালো চাকরি পাবেন, নিজের পায়ে দাঁড়াবেন এবং পরিবারের দায়িত্ব নেবেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। একদিকে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে আসছে। সরকারি চাকরিতে কয়েকশ পদের বিপরীতে আবেদন করছেন লাখো প্রার্থী। বেসরকারি খাতেও বিনিয়োগ ও নিয়োগে ধীরগতি। শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ায় কাজ হারাচ্ছেন শ্রমিকেরা। এমন পরিস্থিতিতে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—বেকারদের জন্য চাকরির দরজা খুলবে কবে?
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ দেশে বেকারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬ লাখ ২০ হাজার। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ২৪ লাখ ৬০ হাজার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বেকার বেড়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র শিক্ষিত তরুণদের ক্ষেত্রে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, বেকারদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা মানুষের হার ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ। উচ্চমাধ্যমিক পাস করা বেকারের হার ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ। বিপরীতে, আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেই এমন মানুষের মধ্যে বেকারত্বের হার ১ দশমিক ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ, উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যেই বেকারত্বের চাপ তুলনামূলক বেশি।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি ১০০ জন শিক্ষিত তরুণের মধ্যে ৩৬ জন বেকার। অন্যদিকে, বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী বেকার তরুণদের একটি বড় অংশই স্নাতক ডিগ্রিধারী। এই পরিসংখ্যান উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে তৈরি হওয়া ব্যবধানের চিত্র তুলে ধরে।
সরকারি চাকরিতে হাহাকার, বেসরকারি খাতেও সংকট
সরকারি চাকরির প্রতি তরুণদের আগ্রহ এবং চাকরির বাজারের সংকটের একটি বড় উদাহরণ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষা। ২৪২টি পদের বিপরীতে আবেদন করেন তিন লাখের বেশি প্রার্থী। অর্থাৎ প্রতিটি পদের জন্য গড়ে এক হাজার ২০০ জনের বেশি প্রার্থী প্রতিযোগিতায় নামেন। নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে প্রার্থীদের ভোগান্তিও তৈরি হয়।
এটি শুধু একটি নিয়োগ পরীক্ষার চিত্র নয়; বরং সীমিত চাকরির বিপরীতে বিপুলসংখ্যক চাকরিপ্রার্থীর প্রতিযোগিতার বাস্তবতা তুলে ধরে। সরকারি চাকরিতে স্থিতিশীলতা, নিয়মিত বেতন ও সামাজিক নিরাপত্তার প্রত্যাশা থাকায় এ খাতের প্রতি আগ্রহ বেশি। কিন্তু সরকারি পদ সীমিত হওয়ায় অধিকাংশ প্রার্থীকে বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভর করতে হয়।
সেখানেও আশাব্যঞ্জক পরিস্থিতি নেই। দেশের বৃহত্তম অনলাইন চাকরির পোর্টাল বিডিজবসের তথ্য অনুযায়ী, তাদের তথ্যভান্ডারে প্রায় ৭০ লাখ চাকরিপ্রার্থীর জীবনবৃত্তান্ত রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে দুই লাখ অনলাইন চাকরির আবেদন জমা পড়ে। একই ব্যক্তি একাধিক চাকরিতে এবং একাধিক পোর্টালে আবেদন করতে পারেন। ফলে এই সংখ্যা দেশের মোট বেকারের সংখ্যা নির্দেশ না করলেও চাকরি খোঁজা মানুষের বিপুল চাপের ইঙ্গিত দেয়।
১০ বছরে কাজ পেয়েছেন ৮৭ লাখ তরুণ
বাংলাদেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে বিশ্বব্যাংকও। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে দেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছেন প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ। বিপরীতে, এ সময়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে ৮৭ লাখ। অর্থাৎ শ্রমবাজারে প্রবেশ করা তরুণদের তুলনায় কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে অনেক কম।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেসমে বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, বেসরকারি খাতে ব্যাপক পরিসরে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথে বিদ্যমান বাধাগুলো দূর করতে সংস্থাটি আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরের সহযোগিতার কাঠামো তৈরি করছে।
কর্মসংস্থান বাড়াতে দক্ষতা উন্নয়ন, অবকাঠামো সম্প্রসারণ, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক বাধা কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অর্জিত দক্ষতার সঙ্গে নিয়োগদাতাদের চাহিদার সামঞ্জস্য বাড়ানো এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির জন্য শুধু শিক্ষিত তরুণের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না; তাঁদের জন্য উপযুক্ত কাজও সৃষ্টি করতে হবে। একই সঙ্গে নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়াতে বাধাগুলো দূর করা জরুরি। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশের নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ছিল ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা কমে ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসে।
বিনিয়োগ কমছে, বন্ধ হচ্ছে শিল্পকারখানা
নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম প্রধান শর্ত বিনিয়োগ। কিন্তু দেশে বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং ব্যবসায়িক আস্থার সংকট নতুন শিল্প স্থাপন ও বিদ্যমান ব্যবসা সম্প্রসারণকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বাংলাদেশবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শ্রমবাজারের পরিস্থিতি আগের অর্থবছরের তুলনায় দুর্বল হয়েছে। শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়া, কর্মী ছাঁটাই এবং কর্মঘণ্টা কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থানে। শিল্প উৎপাদন কমে যাওয়ায় এর নেতিবাচক প্রভাব সেবা ও কৃষি খাতেও ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আর্থিক সংকট ও প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্বলতার কারণে সরকারি বিনিয়োগও চাপে রয়েছে। বিনিয়োগের এই পরিস্থিতিতে নতুন শিল্প স্থাপন, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কর্মী নিয়োগের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।
শিল্প পুলিশের হিসাবে, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দুই বছরে ৪৫৭টি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে বস্ত্র ও তৈরি পোশাক কারখানা ১৭০টি। তবে ছোট কারখানার অনেকগুলো বন্ধ হওয়ার তথ্য সরকারি হিসাবে অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে শ্রমিক নেতাদের দাবি।
কারখানা বন্ধ হওয়ার অর্থ শুধু মালিকের ব্যবসা সংকুচিত হওয়া নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শ্রমিকের আয়, পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানের শিক্ষা এবং চিকিৎসার ব্যয়। নতুন চাকরি না পেলে চাকরি হারানো শ্রমিকদের একটি অংশ অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত হতে বাধ্য হন। সেখানে আয় ও কাজের নিশ্চয়তা তুলনামূলক কম।
প্রবৃদ্ধি কমলে চাকরির সুযোগও কমবে
কর্মসংস্থান পরিস্থিতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতি। আইএমএফের ২০২৬ সালের অক্টোবরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
প্রবৃদ্ধি কমে গেলে সাধারণত শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের গতি কমে যায়। এতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগও সংকুচিত হয়। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি বাড়লে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। ফলে একদিকে কাজ পাওয়া কঠিন হয়, অন্যদিকে কাজ থাকলেও সেই আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।
এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বিনিয়োগ, ব্যাংকিং খাতের চাপ ও জ্বালানি সংকটের কারণে এমনিতেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে প্রবৃদ্ধির গতি আরও কমে যাওয়ার পূর্বাভাস পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক করে তুলেছে।”
তিনি বলেন, “প্রবৃদ্ধি ধীর হলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানুষের আয় বাড়ানোর সুযোগ কমে যায়। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ ও কর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে পারে। এতে তরুণ ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকেরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”
ফাহমিদা খাতুনের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগের বাধা দূর করা, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ব্যবসার ক্ষেত্রে নীতিগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখা জরুরি। পাশাপাশি শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়ন এবং দরিদ্র ও ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বাড়াতে হবে।
সনদ আছে, চাকরির উপযোগী দক্ষতা কতটা?
শিক্ষিত বেকারত্বের পেছনে চাকরির সুযোগের ঘাটতির পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে অসামঞ্জস্যও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জন করলেও অনেক তরুণ নিয়োগদাতাদের প্রত্যাশিত ব্যবহারিক দক্ষতা, যোগাযোগের সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান কিংবা বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন না।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোন বিষয়ে কতসংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছেন, সেই তুলনায় সংশ্লিষ্ট খাতে কত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে—এ বিষয়ে কার্যকর পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী পাঠ্যক্রম হালনাগাদ, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি, কারিগরি শিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রভিত্তিক প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে হবে।
তবে দক্ষতার ঘাটতিকেই বেকারত্বের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অর্থনীতিতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও নতুন কাজের সুযোগ তৈরি না হলে দক্ষ তরুণেরাও কর্মহীন থাকবেন। তাই শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সংস্কারের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির উপযোগী অর্থনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারও শ্রমবাজারে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। আইএমএফের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এআই উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারে। তবে কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির তুলনায় এ প্রযুক্তি ব্যবহারের গতি বেশি হলে কিছু পেশায় কর্মসংস্থানের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন কাজের জন্য তরুণদের প্রস্তুত করা প্রয়োজন।
অনানুষ্ঠানিক কাজে আটকে শ্রমশক্তির বড় অংশ
দেশে কর্মসংস্থান থাকলেও তার বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে। বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, কর্মরত মানুষের প্রায় ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। গ্রামে এই হার ৮৭ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং শহরে ৭৩ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
এ ধরনের কাজে অনেক ক্ষেত্রেই নিয়মিত বেতন, চাকরির নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা এবং শ্রম আইনের সুবিধা নিশ্চিত থাকে না। ফলে কর্মসংস্থানের সংখ্যা বাড়লেও কাজের মান ও আয়ের নিশ্চয়তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
কর্মসংস্থান নীতিতে তাই শুধু কতজন চাকরি পেলেন, সেই হিসাব যথেষ্ট নয়। কী ধরনের কাজ পেলেন, আয় দিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে পারছেন কি না এবং চাকরিতে নিরাপত্তা আছে কি না—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।
এক কোটি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি, বাস্তবায়ন কবে?
সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে পাঁচ বছরে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। সেই হিসাবে বছরে গড়ে ২০ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। কিন্তু বেসরকারি বিনিয়োগে ধীরগতি, শিল্প উৎপাদনের দুর্বলতা এবং জ্বালানি সংকটের মধ্যে এই লক্ষ্য কীভাবে অর্জিত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসেও কর্মসংস্থান পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই। সংস্থাটির হিসাবে, চলতি অর্থবছরে নিট নতুন কর্মসংস্থান হতে পারে ৬ লাখ ৩০ হাজার, যার ২০ শতাংশ আসবে শিল্প খাত থেকে। এই পূর্বাভাস সরকারের ঘোষিত কর্মসংস্থান লক্ষ্যের তুলনায় বড় ব্যবধানের ইঙ্গিত দেয়।
কর্মসংস্থান বাড়াতে প্রথমেই বিনিয়োগের বাধা দূর করতে হবে। ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে এনে উৎপাদনশীল খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়ানো, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, ব্যবসা শুরুর জটিলতা কমানো এবং বন্ধ শিল্পকারখানা চালুর পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সহজ করতে হবে। কারণ, বড় শিল্পের পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানও বিপুলসংখ্যক মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কর্মসংস্থানের চাহিদা এবং দক্ষতার ঘাটতি নিয়মিতভাবে পর্যালোচনা করে প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা কার্যক্রম সাজানোও জরুরি। নারীদের কাজের সুযোগ বাড়াতে নিরাপদ কর্মপরিবেশ, শিশুযত্নের সুবিধা এবং কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
চাকরির অপেক্ষায় তরুণেরা, সমাধান কোথায়?
দীর্ঘদিন বেকার থাকা একজন তরুণের জন্য শুধু আর্থিক সংকট নয়, মানসিক চাপও তৈরি করে। পরিবারের প্রত্যাশা, নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং বারবার আবেদন করেও চাকরি না পাওয়ার হতাশা তাদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিতে পারে। অনেকেই শেষ পর্যন্ত যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন কাজে যোগ দেন, কেউ কেউ বিদেশে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করেন।
অথচ তরুণ জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের বড় সম্পদ হতে পারে, যদি তাঁদের শিক্ষা, দক্ষতা ও শ্রমকে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করা যায়। সেই সুযোগ তৈরি না হলে জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানোর সম্ভাবনাও দুর্বল হয়ে পড়বে।
বেকারত্ব কমানোর জন্য তাই শুধু চাকরির বিজ্ঞপ্তি বাড়ানো কিংবা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করলেই হবে না। প্রয়োজন বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে কার্যকর সংযোগ। একই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে তার অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করা জরুরি, যাতে প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান বোঝা যায়।
প্রতিবছর লাখো তরুণ কর্মজীবনে প্রবেশ করছেন। তাদের সবার জন্য সরকারি চাকরি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কিন্তু উৎপাদনশীল বেসরকারি খাত, নতুন শিল্প, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায় কাজের সুযোগ বাড়ানো সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক নীতি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং বাস্তবায়নের দৃশ্যমান অগ্রগতি।
শিক্ষা শেষ করে চাকরির অপেক্ষায় থাকা তরুণদের প্রশ্ন একটাই—কবে তাদের জন্য কর্মসংস্থানের দরজা খুলবে? এর উত্তর নির্ভর করছে অর্থনীতির গতি ফেরানো, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থানকে উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখার ওপর। প্রতিশ্রুতি নয়, নতুন কাজের সুযোগই হবে সেই প্রশ্নের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য উত্তর।