বাজার থেকে টাটকা ফল ও সবজি কিনে এনে ভালো করে ধুয়ে খাওয়াই স্বাস্থ্যকর অভ্যাস। কিন্তু শুধু ধুলেই কি সব ধরনের রাসায়নিক দূর হয়? বিশেষজ্ঞদের মতে, ফল ও সবজিতে ব্যবহৃত কিছু কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ ধোয়ার পরেও থেকে যেতে পারে। আবার মাটি, পানি কিংবা চাষের উপকরণ থেকে কিছু ভারী ধাতুও খাবারের মধ্যে প্রবেশ করতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে এসব ক্ষতিকর উপাদানের সংস্পর্শে থাকলে স্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি হয়।
আপেল, আঙুর, শসা, পালংশাক থেকে শুরু করে টমেটোসহ নিত্যদিনের খাদ্যতালিকায় থাকা বেশ কিছু খাবারেই রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ থাকার আশঙ্কা থাকে। তবে সব ফল বা সবজিতে যে ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকবেই, এমন নয়। চাষের পদ্ধতি, কীটনাশকের ব্যবহার, সংরক্ষণ এবং প্রক্রিয়াকরণের ধরন অনুযায়ী এর পরিমাণ বদলে যায়।
আপেল দীর্ঘদিন সতেজ ও আকর্ষণীয় রাখতে অনেক সময় এর গায়ে খাদ্যোপযোগী মোমের প্রলেপ দেওয়া হয়। এই প্রলেপ নিজে সব সময় ক্ষতিকর নয়। তবে ফলের গায়ে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ থাকলে শুধু পানি দিয়ে ধুলে তা পুরোপুরি দূর নাও হতে পারে। তাই আপেল খাওয়ার আগে পরিষ্কার পানির নিচে ঘষে ধুয়ে নেওয়া জরুরি। খোসা ছাড়িয়ে খেলে কিছু অবশিষ্টাংশ কমতে পারে, যদিও তাতে ফলের আঁশেরও কিছু অংশ বাদ যায়।
শসা, লাউয়ের মতো সবজি চাষের সময় পোকামাকড় দমনে কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। নিয়ম না মেনে বা অতিরিক্ত মাত্রায় কীটনাশক প্রয়োগ করলে তার অবশিষ্টাংশ সবজির গায়ে কিংবা ভেতরে থেকে যেতে পারে। তাই বাজার থেকে কিনে আনার পর পরিষ্কার পানিতে ভালো করে ধুয়ে নেওয়া উচিত।
আঙুর ও বেরি জাতীয় ফলের ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা প্রয়োজন। ফলের গায়ে প্রাকৃতিক মোমের মতো আবরণ থাকতে পারে। পাশাপাশি চাষ ও সংরক্ষণের সময় ব্যবহৃত কীটনাশক বা ছত্রাকনাশকের অবশিষ্টাংশও থেকে যেতে পারে। তাই খাওয়ার আগে ফলগুলো পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে নেওয়া ভালো। ধোয়ার জন্য সাবান, ডিটারজেন্ট বা জীবাণুনাশক ব্যবহার করা উচিত নয়।
পালংশাকসহ পাতাযুক্ত শাকসবজিতে মাটি, ধুলোবালি এবং কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ লেগে থাকতে পারে। চাষের জমিতে ব্যবহৃত সার থেকেও কিছু রাসায়নিক উপাদান শাকের মধ্যে প্রবেশ করতে পারে। তাই শাক রান্নার আগে পাতা আলাদা করে কয়েকবার পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে নেওয়া দরকার। শুধু গরম পানি বা নুন মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রাখলেই সব ধরনের রাসায়নিক দূর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
টমেটো, বেগুন ও ক্যাপসিকামের মতো সবজিতেও কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ থাকতে পারে। আবার দূষিত মাটি বা সেচের পানির মাধ্যমে সিসা, ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতু খাদ্যশস্য ও সবজিতে প্রবেশ করতে পারে। এসব ধাতু শরীরে জমতে থাকলে স্নায়ুতন্ত্র, কিডনি ও অন্যান্য অঙ্গের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সাধারণভাবে ধুয়ে ফেললে মাটির ধুলো বা বাইরের কিছু দূষণ কমতে পারে, কিন্তু সব ভারী ধাতু দূর করা সম্ভব নয়।
শুধু কাঁচা ফল ও সবজি নয়, প্যাকেটজাত খাবারেও সংরক্ষকসহ বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করা হয়। নির্দিষ্ট মাত্রায় অনুমোদিত সংরক্ষক ব্যবহার করা হলে তা খাদ্য সংরক্ষণে সাহায্য করে। তবে নিয়মের বাইরে কোনও রাসায়নিক ব্যবহার করা হলে বা অতিরিক্ত মাত্রায় থাকলে তা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে। তাই প্যাকেটজাত খাবার কেনার আগে উপাদানের তালিকা, উৎপাদনের তারিখ ও মেয়াদ দেখে নেওয়া জরুরি।
খাবার থেকে রাসায়নিকের ঝুঁকি কমাতে পরিচিত ও নির্ভরযোগ্য বিক্রেতার কাছ থেকে ফল-সবজি কেনা, পচা বা ক্ষতিগ্রস্ত অংশ বাদ দেওয়া এবং রান্নার আগে ভালো করে ধুয়ে নেওয়া উচিত। সম্ভব হলে ফল ও সবজির খোসা ছাড়িয়ে খাওয়া যেতে পারে, তবে এতে পুষ্টি ও আঁশের কিছু অংশ কমে যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, শুধু চকচকে বা টাটকা দেখেই খাবারকে নিরাপদ ভাবা ঠিক নয়। সচেতনভাবে কেনাকাটা ও সঠিকভাবে খাবার প্রস্তুত করাই ঝুঁকি কমানোর অন্যতম উপায়।