ঢাকাThursday , 5 November 2026
  1. অন্যান্য
  2. আবহাওয়া
  3. খেলা
  4. চাকরি
  5. জীবনযাপন
  6. তথ্যপ্রযুক্তি
  7. প্রেস রিলিজ
  8. বাণিজ্য
  9. বাংলাদেশ
  10. বিনোদন
  11. বিশ্ব
  12. ভিডিও
  13. মতামত
  14. রাজনীতি
  15. শিক্ষা
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ইতিহাস কোনো বয়ানের দাস নয়: এম আবদুল আলীম

UttorbongoBD
November 5, 2026 6:10 pm
Link Copied!


[এম আবদুল আলীম ইতিহাস-ঐতিহ্য-সন্ধানী গবেষক। জন্ম ১৯৭৬ সালের ১ ডিসেম্বর, জন্মস্থান পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার গৌরীগ্রাম। পিএইচডি করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। অধ্যাপনা করেছেন ঢাকা কলেজসহ ঐতিহ্যবাহী সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। বর্তমানে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। বিভাগীয় চেয়ারম্যান এবং অনুষদের ডিনের দায়িত্ব পালন করেছেন। গবেষক হিসেবে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছেন দেশ-বিদেশে। এ পর্যন্ত প্রকাশিত গ্রন্থ বিয়াল্লিশটি। যার মধ্যে ভাষা আন্দোলন বিষয়ক গ্রন্থ আঠারোটি। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো: ‘ভাষা-আন্দোলন-কোষ’ (২ খণ্ড), রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন: জেলাভিত্তিক ইতিহাস’, ‘ভাষা আন্দোলনের জানা-অজানা ইতিহাস’, ‘ভাষা আন্দোলনে মওলানা ভাসানী’, ‘বঙ্গবন্ধু ও ভাষা আন্দোলন’, ‘ভাষাসংগ্রামী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্’, ‘ভাষা আন্দোলনে তাজউদ্দীন আহমদ’, ‘ভাষা আন্দোলনে কংগ্রেস’, ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে ছাত্রলীগের ভূমিকা’, ‘ভাষাসংগ্রামী এম এ ওয়াদুদ’, ‘ভাষা আন্দোলনে নিম্নবর্গ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’, ‘পাবনায় ভাষা আন্দোলন’, ‘সিরাজগঞ্জে ভাষা আন্দোলন’, ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে রফিকুল ইসলাম’, ‘আওয়ামী লীগ ও ভাষা আন্দোলন’, ‘ভাষা আন্দোলনে আবদুল গাফফার চৌধুরী’ প্রভৃতি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক হিসেবে ‘ভাষা আন্দোলনে রাজনৈতিক দল, ছাত্র-যুব ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের ভূমিকা’ শিরোনামে গবেষণা সম্পন্ন করেছেন। ‘পাবনায় ভাষা আন্দোলন’ গ্রন্থের জন্য ২০১৪ সালে লাভ করেছেন ‘কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার।’ নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘ভাষা আন্দোলন গবেষণাকেন্দ্র ও সংগ্রহশালা’। এ বছর ১ ডিসেম্বর তিনি পঞ্চাশে পদার্পণ করছেন।]


আপনি সৃজনশীল সাহিত্যের পরিবর্তে ইতিহাসচর্চায় আগ্রহী হলেন কীভাবে?

এম আবদুল আলীম: ইতিহাস তো সাহিত্য থেকে বিচ্ছিন্ন নয়; ইতিহাসের কঙ্কালের উপর কল্পনার মেদ-মজ্জা, নান্দনিকতা ও বোধ-বিবেচনা মিশিয়ে সাহিত্যিক তার নবজন্ম দান করেন। সকল সাহিত্যের মধ্যেই সংগোপনে লুকায়িত থাকে ইতিহাস। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে বঙ্কিম রচনাবলি কিনেছিলাম। তাঁর উপন্যাস অপেক্ষা প্রবন্ধই আমার বেশি ভালো লেগেছিল। বিশেষ করে, ইতিহাস-বিষয়ক প্রবন্ধ। যদিও তাঁর সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি আমাকে আকৃষ্ট করেনি। তিনি লিখেছিলেন, সাহেবেরা যদি পাখি মারতে যায় তারও ইতিহাস লিখিত হয়। কিন্তু বাঙালির ইতিহাস নেই। বাঙালির ইতিহাস চাই, নইলে বাঙালি কখনোই মানুষ হবে না! এ কথাটি আমার মনে ধরেছিল। তারপর ধীরে ধীরে ইতিহাসচর্চার দিকে ঝুঁকে পড়ি।

আপনার ইতিহাসচর্চার দর্শন ও পদ্ধতি কী?

এম আবদুল আলীম: আমি ইতিহাসকে কেবল অতীতের ঘটনা বা দিনক্ষণের ফর্দ মনে করি না। ইতিহাস আমার কাছে শাশ্বত-জীবনের অভিব্যক্তি। এক কালের ঘটনা; মানুষের জীবনাচার, বিশ্বাস, ধর্ম, দর্শন পরবর্তীকালের মানুষের জন্য প্রেরণা ও শক্তির উৎস। গ্রিক, রোমান, পারসিক, ভারতীয়, চৈনিক সকল সভ্যতার মানুষের ধর্ম, দর্শন, বিশ্বাস, জীবনাচার পরিবর্তিত বাস্তবতায় পরবর্তী সভ্যতার মানুষে লালন ও গ্রহণ করে। ইতিহাসকে তাই আমি চিরকালীন সত্তা হিসেবে দেখি। আমি ইতিহাসের সত্যকে অনুসন্ধান করি ইতিহাস-গবেষণার নানা পদ্ধতির আলোকে। তত্ত্ব, বাদ-মতবাদ, দলিল-দস্তাবেজ এবং পাথুরে প্রমাণ, তুলনামূলক-ঐতিহাসিক-পাঠবিশ্লেষণ, ক্ষেত্রসমীক্ষা—সর্বোপরি গুণগত গবেষণায় যেসব পদ্ধতি প্রযোজ্য, সেগুলোর সবই প্রয়োগ করি। তবে ইতিহাসের তত্ত্বগত ও দার্শনিক প্রয়োগ অপেক্ষা আর্কাইভাল ভ্যালুকে আমি প্রাধান্য দিই। যা পরবর্তীকালের গবেষকদের তাত্ত্বিক-দার্শনিক দৃষ্টির ভিত্তিতে পরিপূর্ণতা পাবে। সবকিছুর উপরে আমার ইতিহাসচর্চার মূল লক্ষ্য সত্যানুসন্ধান।

বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চায় রাজনৈতিক পক্ষপাত, দলীয় আনুগত্য কিংবা পূর্বনির্ধারিত ধারণা কতটা প্রভাব বিস্তার করে? তা থেকে আপনি কীভাবে নিজেকে মুক্ত রাখেন?

এম আবদুল আলীম: আপনার এ প্রশ্নের সত্যতা অনেকের ক্ষেত্রে লক্ষণীয় তবে সবার ক্ষেত্রে নয়। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে এদেশে অনেকেই ইতিহাসচর্চা করেছেন, এখনও করছেন। সময় সময় রাজনৈতিক দলের নেতার মতোই স্বীয় মতের ইশতেহার হিসেবে ইতিহাসের বই লিখেছেন। যেমন: উদাহরণ হিসেবে বলতে পারেন একালের মহিউদ্দিন আহমদের কথা। তাঁর প্রায় সবগুলো গ্রন্থেই ইতিহাসের সত্য ধামাচাপা পড়েছে তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শের কচকচানিতে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক ও অ্যাকাডেমিক পরিসরে যাঁরা ইতিহাসচর্চা করেন, তাঁরা রাজনীতি কিংবা বাদ-মতবাদের দ্বারা আচ্ছন্ন নন, অন্ধ আনুগত্যেও বিশ্বাসী নন; তাঁরা ইতিহাসের সত্য খুঁজতে একপেশে বয়ান হাজির করেন না; প্রামাণ্য দলিলপত্রের উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্তে পৌঁছান। আমি দ্বিতীয় পন্থায় ইতিহাসচর্চা করি। আমি যেহেতু কখনোই কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের সক্রিয় কর্মী ছিলাম না, ফলে আনুগত্যের প্রশ্ন আমার কাছে গৌণ। আমি সত্যাভিসারী। রাজনৈতিক পক্ষপাত, দলীয় আনুগত্য কিংবা পূর্বনির্ধারিত ধারণা আমার ইতিহাসচর্চাকে গ্রাস করে না। কোনো বিষয়ে গবেষণা করতে গিয়ে আমি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তথ্যসংগ্রহ করে সেগুলো যতদূর সম্ভব নির্মোহ দৃষ্টিতে অ্যাকাডেমিক পদ্ধতি ও ধ্যান-ধারণায় পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্তে উপনীত হই।

ইতিহাস কি চিরদিন অমিমাংসিত থাকে? ইতিহাসবিদের দৃষ্টিভঙ্গিই কি ইতিহাস?

এম আবদুল আলীম: না, ইতিহাস চিরদিন অমিমাংসিত থাকে না। ইতিহাসবিদের দৃষ্টিভঙ্গিই ইতিহাস নয়। যেমন ধরুন, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় লেখা নবাব সিরাজ উদ্দৌলার ‘অন্ধকূপ হত্যাকাণ্ড’ পরবর্তীকালের ইতিহাসবিদদের কাছে ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে। ইতিহাস বহুক্ষেত্র জয়ী শক্তি ও শাসকের দ্বারা প্রভাবিত হলেও, কালের কষ্টিপাথরে তা যাচাইকৃত হয়ে সত্যরূপে দেখা দেয়। ইতিহাসচর্চায় ইতিহাসবিদের দৃষ্টিভঙ্গি সময় সময় প্রভাব ফেললেও, তা ইতিহাস নয়। ইতিহাস অকাট্য দলিল-প্রমাণ আর সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত।

ভাষা আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ ইতিহাস রচনার সমস্যা কোথায়?

এম আবদুল আলীম: ভাষা আন্দোলন পূর্ববাংলার আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে এক তাৎপর্যপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা। এ আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ ইতিহাস রচনার সমস্যা অনেক। প্রথমত: যাঁরা সরাসরি এ আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের লেখা ইতিহাসে নিজের অবদান এবং তাদের সংগঠন বা আদর্শকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। যেমন: প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম তমদ্দুন মজলিস এবং তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের অবদান বড়ো করে দেখেছেন। অলি আহাদ গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছেন নিজের এবং পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের নেতা-কর্মীদের অবদানকে। আবদুল মতিন, আমির হোসেন, হাসান হাফিজুর রহমান প্রমুখ কমিউনিস্ট ঘরানার তথা বামপন্থিদের অবদানকে তুলনামূলক প্রাধান্য দিয়েছেন। আবদুল গাফফার চৌধুরী, এম আর আকতার মুকুল, গাজীউল হকের পক্ষপাতিত্ব পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী মুসলিম লীগের নেতা-কর্মীদের প্রতি। পরবর্তীকালে যাঁরা ভাষা আন্দোলন নিয়ে গবেষণা করেছেন, তাঁদের অনেকে প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে যুক্ত থাকায় তাঁর দল ও আদর্শের প্রতি প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ পক্ষপাত গোপন রাখেননি। যেমন: বদরুদ্দীন উমর কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকায় কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের অবদান তিনি মুখ্য করে তুলেছেন। অন্যদিকে তমদ্দুন মজলিস, ছাত্রলীগ, ও আওয়ামী লীগ নেতাদের অবদানকে তিনি খাটো করে দেখেছেন। বশীর আল্-হেলাল ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। বদরুদ্দীন উমরের মতো অত অন্ধ আনুগত্য না থাকলেও সময় সময় বামপন্থিদের দিকে হেলে গেছেন। কিন্তু অ্যাকাডেমিক জায়গা থেকে যাঁরা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসচর্চা করেছেন, তাঁরা কোনো দল বা কিংবা সংগঠনের প্রতি পক্ষপাত দেখাননি। ঐতিহাসিক ও গবেষকের সত্যনিষ্ঠা দ্বারা তাঁরা ভাষা আন্দোলনকে মূল্যায়ন করেছেন। এঁদের মধ্যে সফর আলী আকন্দ, সালাহউদ্দিন আহমদ, রতন লাল চক্রবর্তী, আবুল কাশেম, আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, সুকুমার বিশ্বাস, হুমায়ুন কবীর, জামালুল আকবর চৌধুরী প্রমুখের নাম উল্লেখ করা যায়। একাডেমিশিয়ানরা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসচর্চার যে ধারা নির্মাণ করেছেন, এখন আর এ আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ ইতিহাস রচনায় সমস্যা নেই।

আপনি বদরুদ্দীন উমরের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসচর্চার সমালোচনা করেছেন, এই প্রসঙ্গ নিয়ে কি তাঁর সঙ্গে আপনার আলাপ হয়েছিল?

এম আবদুল আলীম: আমি বদরুদ্দীন উমরের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসচর্চার সমালোচনা করিনি। তাঁর জীবদ্দশায় (৯০তম জন্মদিনে) ‘বাংলা ট্রিবিউন’-এ দীর্ঘ একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম—’বদরুদ্দীন উমরের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস-চর্চা: একটি নির্মোহ বিশ্লেষণ’—এই শিরোনামে। বলতে পারেন এই প্রবন্ধে আমিই প্রথম সামগ্রিক দৃষ্টিতে তাঁর ভাষা আন্দোলন গবেষণার মূল্যায়ন করেছি এবং আমার ‘ভাষা-আন্দোলনের জানা-অজানা ইতিহাস’ এবং ‘ভাষা-আন্দোলন-কোষ’ দ্বিতীয় খণ্ড গ্রন্থে তা স্থান দিয়েছি। তাঁর অনুসারী ও শিষ্যদের মতো অন্ধ ভক্তির জায়গা থেকে তাঁর অবদান মূল্যায়ন করিনি। তাছাড়া আমি পরপর চারবার বাসভবনে গিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। দীর্ঘ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে তাঁর বক্তব্য আমার বিভিন্ন গ্রন্থে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করেছি। এটা সত্য যে ভাষা আন্দোলন নিয়ে তিনিই প্রথম বৃহৎ পরিসরে কাজ করেছেন। তাঁর ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ (৩ খণ্ড), ‘ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গ: কতিপয় দলিল (২ খণ্ড), ‘ভাষা আন্দোলন ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’, ‘আমাদের ভাষার লড়াই’ প্রভৃতি গ্রন্থে এ আন্দোলনের বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। কিন্তু সমস্যা হলো, তিনি যখন ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস লিখেছেন, তখন গবেষক অপেক্ষা রাজনৈতিক নেতা/তাত্ত্বিক হিসেবে সত্তাটাকে ফোকাস করেছেন বেশি। ফলে তাঁর আদর্শের কমিউনিস্ট তথা বাম ঘরানার নেতা-কর্মী ও ও সংগঠনকে যতটা প্রাধান্য দিয়েছেন, ততটাই উপেক্ষা করেছে অন্য রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠন ও তাঁদের নেতা-কর্মীদের অবদানের কথা। যেমন: আবুল হাশিম, অলি আহাদ, আবদুল মতিন এঁদের অবদান; কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ফেডারেশন কর্মীদের অংশগ্রহণকে যতটা প্রাধান্য দিয়েছেন; ঠিক ততটাই উপেক্ষা করেছেন মওলানা ভাসানী, শামসুল হক, আতাউর রহমান খান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, কাজী গোলাম মাহবুব, খালেক নেওয়াজ খান, এম এ ওয়াদুদ, প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম প্রমুখসহ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ, পূর্ব পাকিন্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, তমদ্দুন মজলিস প্রভৃতি সংগঠনের নেতা-কর্মীদের ভূমিকাকে। আমি গত এক যুগের অনুসন্ধানে প্রাপ্ত প্রামাণ্য দলিলপত্রের ভিত্তিতে তাঁর ইতিহাসচর্চার এই একপেশে বয়ান অন্তঃসারশূন্য বলে প্রমাণ করেছি। এটা তাঁর সমালোচনা নয়, বরং তাঁর গবেষণার অসম্পূর্ণাকে পূর্ণতা দানের প্রচেষ্টা মাত্র।

বাংলাদেশের ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে আর্কাইভ, সরকারি নথি, সংবাদপত্র, ব্যক্তিগত দলিল, স্মৃতিকথা ও মৌখিক ইতিহাস সংরক্ষণ ও প্রাপ্তির বাস্তবতা কী?

এম আবদুল আলীম: আমরা বিস্মৃতিপ্রবণ জাতি। পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য ও কীর্তি সংরক্ষণে প্রচণ্ডরকম উদাসীন। জাতীয়ভাবেও একই চিত্র পরিদৃষ্ট হয়। ফলে ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে আর্কাইভ, সরকারি নথি, সংবাদপত্র, ব্যক্তিগত দলিল, স্মৃতিকথা ও মৌখিক ইতিহাস সংরক্ষণ ও প্রাপ্তির ইতিহাস হতাশাব্যঞ্জক। সংরক্ষণে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রযুক্তির অভাব তো আছেই, অনীহা প্রকট। তাছাড়া বন্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বৈরী প্রকৃতি, উই-ইঁদুর-আরশোলাসহ অন্যান্য কীটের উপদ্রব, রাষ্ট্রীয় বিপর্যয়, দুর্ঘটনা; এসব কারণে সংরক্ষিত বহু দলিল, নথিপত্র বিনষ্ট হয়ে গেছে। ফলে গবেষণার প্রয়োজনীয় উপকরণ হাতের নাগালে পাওয়া যায় না সহজে। তবে কিছু কিছু উদ্যোগ শুরু হয়েছে। অনলাইন ও তথ্য-প্রযুক্তির সর্বাধুনিক পদ্ধতি প্রয়োগ করে কিছু কিছু দলিল সংরক্ষণ করা হয়েছে। বাংলা একাডেমি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ন্যাশনাল আর্কাইভস কর্তৃপক্ষ এ কাজ শুরু করেছে, যা গবেষকদের মনে আশার সঞ্চার করেছে।

যখন ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা নিয়ে জাতীয় ঐকমত্যের বয়ান তৈরি হয়, তখন আপনি সে বিষয়ে কাজ করতে গিয়ে কী কী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন?

এম আবদুল আলীম: আমি শুরুতেই বলেছি, ইতিহাস সত্যের বশ, কোনো বয়ানের দাস নয়। বয়ান যদি সত্যনিষ্ঠ ও প্রামাণ্য না হয় তবে সময়ের বাস্তবতায় সে বয়ান টিকবে না, তা নিয়ে যতই তৈরি হোক জাতীয় ঐকমত্যের বয়ান। আমি সবসময় দলিল আর অকাট্য তথ্যপ্রমাণের উপর নির্ভর করে ইতিহাসচর্চা করি। বিশেষ করে, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস। আগ্রহ থাকলে পড়ে দেখতে পারেন আমার ‘ভাষা-আন্দোলন-কোষ’ (২ খণ্ড, কথাপ্রকাশ), ‘রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন: জেলাভিত্তিক ইতিহাস’ (আগামী প্রকাশনী)—এসব বই।

ইতিহাসবিদের রাজনৈতিক বা সামাজিক বিশ্বাস তার ইতিহাসচর্চাকে কতটা প্রভাবিত করতে পারে? আপনি নিজেকে কতটা প্রভাবমুক্ত রাখতে পেরেছেন?

এম আবদুল আলীম: ইতিহাসবিদদের রাজনৈতিক বা সামাজিক বিশ্বাস অবশ্যই তার ইতিহাসচর্চাকে প্রভাবিত করতে পারে। মার্কসীয় ইতিহাসবিদগণ সবকিছুকে মার্কসীয় বয়ানে হাজির করার চেষ্টা করেছেন। তাতে অনেক সময় সত্য আড়াল যে পড়েনি, তা বলা যাবে না। ঔপনিবেশিক প্রভাবিত ইতিহাসবিদগণ, এমনকি আমাদের দেশে ক্ষমতার পালাবদলে গজিয়ে ওঠা ইতিহাসবিদদের ইতিহাসচর্চায় এর প্রমাণ মেলে। আমি শতভাগ রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবমুক্ত, এ দাবি করব না। যে সমাজ, যে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে আমার বাস, তাতে শতভাগ নিরপেক্ষ থাকা কঠিন বইকি! তবে আমি সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা করি নির্মোহ দৃষ্টিতে প্রামাণ্য দলিলপত্রের ভিত্তিতে ইতিহাসের সত্যকে তুলে ধরতে। আগে থেকেই ধারণা তৈরি করে, তা প্রতিষ্ঠা করা আমার কাজ নয়। আমার কাজ তথ্য সংগ্রহ করে, তা গবেষকের সত্যানুসন্ধানী দৃষ্টিতে যাচাই করে, তার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ।

আপনি যদি বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চায় আগামী ২৫ বছরের দিকে তাকান, কোন কোন বিষয় নিয়ে নতুন প্রজন্মের গবেষণা করা সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করেন?

এম আবদুল আলীম: আগামী পঁচিশ বছর ইতিহাসচর্চার প্রধান কাজ হবে জাতির গৌরবময় অধ্যায় ও অর্জনগুলো নির্মোহ মূল্যায়ন। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ প্রভৃতির প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরা। প্রপাগান্ডা এবং ইতিহাস-বিকৃতির মোচ্ছবে গা ভাসানো নয়, প্রামাণ্য দলিলপত্র এবং তথ্যের ভিত্তিতে ইতিহাস গবেষণার পদ্ধতিগুলোর যথাযথ প্রয়োগ দ্বারা নতুন প্রজন্মের ইতিহাসচর্চা করা উচিত। আমি মনে করি, নির্মোহ দৃষ্টিতে প্রামাণ্য দলিলপত্রের আলোকে সত্যোদ্ঘাটনই ইতিহাসচর্চার ভিত্তি হওয়া উচিত। নিজের সাধ্যের সবটুকু দিয়ে আমি সে কাজটিই করে চলেছি।

আপনার পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে আগাম শুভেচ্ছা।

এম আবদুল আলীম: ধন্যবাদ।





Source link

×
📺

LIVE TV

Live Tv দেখতে নিচের বাটনে ক্লিক করুন।

📺 লাইভ দেখুন
error: Content is protected !!
🔴 LIVE html