ভাস্কর চৌধুরী (১৯৫২–২০২৬) স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, সাহিত্যসমালোচক, অনুবাদক এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তবে তিনি সবচেয়ে বেশি খ্যাত তার ‘আমার বন্ধু নিরঞ্জন’ কবিতার জন্য। এই একটি কবিতাই কবিতাপ্রেমী ও সমালোচক—উভয়ের হৃদয়ে তার স্থান চিরস্থায়ী করে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ সাউথ ক্যারোলাইনা, কলম্বিয়ার ইংরেজি বিভাগের গবেষক ও স্বাধীন চলচ্চিত্রনির্মাতা অরুণাভ দাস ২০২২ সালে এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন।
ভাস্কর দা, কেমন আছেন? এখন কেমন কাটছে আপনার জীবন, লেখালেখি?
ভালো আছি, বিলে (অরুণাভ দাসের ডাক নাম বিলে, ভাস্কর চৌধুরী বিলে নামেই তাকে ডাকতেন) শেষ কিছুদিন আমি গ্রামে ছিলাম, খুব আনন্দে ছিলাম। চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমার গ্রামে আমাকে একটি সাহিত্য-সংবর্ধনা দেওয়া হলো। অনেক মানুষ এসেছিল আমাকে অভিনন্দন জানাতে আর আমার কবিতা আবৃত্তি করতে। গ্রামের নির্মল পরিবেশ আর সহজ, সরল মানুষদের সাথে আমার ভালো লাগে, যদি আমার শৈশবে ফিরে যেতে পারতাম তাহলে খুব ভালো হতো। সে তো আর হবার নয়, ঢাকায় আমার দম বন্ধ লাগে, তবুও ঢাকায় ফিরি।
জেনে আনন্দিত হলাম, অভিনন্দন আপনাকে! আপনি বাংলা সাহিত্যের জীবন্ত কিংবদন্তিদের একজন। আপনার সাহচর্য ও স্নেহ পাওয়া আমার জন্য সৌভাগ্যের। আমি আশা করি আগামী বছরগুলোতে আরও অনেক কালজয়ী সৃষ্টি পাব।
শোনো বিলে, আমার সময় ধীরে ধীরে শেষের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমি যা জানি তা লিখে রাখতে হবে, যাতে তথ্য ও ইতিহাস কাগজে ধরে রাখতে পারি। সেই জন্যই আমি “ধনসা মাতি ও তার জীবনবৃক্ষ” লিখেছি।
আপনি যখন একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখেন, তখন ইতিহাস ও কল্পনার মধ্যে রেখাটি কীভাবে দেখেন, সেটা জানতে চাই।
একজন ঔপন্যাসিক প্রায় যেকোনো বিষয় নিয়ে লিখতে পারেন, যতক্ষণ তা যে জগৎকে তুলে ধরছে তার প্রতি সৎ থাকে। সাঁওতাল সম্প্রদায়কে নিয়ে লেখা আমার উপন্যাস “ধনসা মাতি ও তার জীবনবৃক্ষ”-এর কথাই ধরো। আমি সাঁওতাল আদিবাসী সংস্কৃতিকে অবলম্বন করেছি, আমি ওদের সাথে থেকেছি, খেয়েছি, ঘুমিয়েছি, ওদের মতো করে কথা বলার চেষ্টা করেছি, সর্বোপরি ওদের একজন হয়ে উঠতে চেয়েছি। অথচ আমার উপন্যাসের চরিত্র ও স্থান সবই কল্পিত, এমনকি ধনসা নিজেও। তবে পড়ার সময় তুমি একটুও কল্পনার আভাস পাবে না। ধনসা, গোষ্ঠীপ্রধান, একজন বাস্তব মানুষ, যিনি তার গোষ্ঠীর জন্য লড়েছেন ও প্রাণ দিয়েছেন।
হ্যাঁ, আমি পড়েছি। আপনার অঙ্কিত ধনসা চরিত্রটি আমাকে চিনুয়া আচেবের ‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’-এর মহিমান্বিত নায়ক ওকঙ্কোর কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল। আমার মনে হয় ওকঙ্কো ও ধনশার পরিণতি একই সূত্রে গাঁথা; স্থান, কালভেদে ঔপনিবেশিক বাস্তবতার দুষ্টচক্রে আবর্তিত।
তা জানি না। আমি শুধু তাই লিখি যা আমি নিজে দেখেছি, আর চরিত্রের মধ্য দিয়ে যা তুলে ধরতে চেয়েছি তা কল্পনা করেছি। ধনসা নিছক একটি কাল্পনিক সৃষ্টি, কিন্তু উপন্যাসে সে হয়ে ওঠে তার প্রজন্মের সাঁওতালদের নেতা। আমি বারবার সাঁওতাল এলাকায় গিয়েছি, আমি তাদের মতো হয়ে উঠতে চেয়েছি, তাদের জীবন, যাপন, সংস্কৃতি, আচার, রীতি, কানুন বুঝতে চেয়েছি। আমি পর্যবেক্ষণ করেছি, আর লিখেছি। সেই দেখা আর কল্পনা থেকেই চরিত্রগুলো জন্ম নিয়েছে, এবং তা কাজ করেছে উপন্যাসের পাতায় পাতায়।
আচেবের মতো আপনিও একটি আদিবাসী সম্প্রদায়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জগৎকে ভেতর থেকে ফুটিয়ে তোলেন, পার্থক্য হলো আচেবে সেই ট্রাইবেরই সদস্য আর আপনি আত্মীকরণ ও অনুসরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আপনার সৃষ্টিকে পূর্ণতা দিয়েছেন। ওকঙ্কোর মতো ধনসাও একজন অ্যারিস্টটলীয় ট্র্যাজিক হিরোর ভার বহন করে। আপনি কি চান বিশ্ব সাহিত্যের পাঠকদের জন্য উপন্যাসটি ইংরেজিতে অনূদিত হোক?
হ্যাঁ, সেটা আমি চাই। কিন্তু অনুবাদের জন্য কাউকে এখনও দায়িত্ব দেইনি, তাই জানি না কবে তা হবে। তবে তুমি চাইলে এই দায়িত্ব নিতে পারো।
সেটা আমার জন্য পরম সৌভাগ্যের হবে। আমি অবশ্যই সেটা করতে আগ্রহী হবো এবং করতে চাইব, কিন্তু সে জন্য কিছুটা সময় আমার জন্য জরুরি। আবার আলোচনায় ফিরে আসি, আপনার লেখায় ইতিহাস বিভিন্নভাবে ফিরে আসে, ফিকশনের রূপধরে আপনি অবলীলায় বিভিন্ন ঐতিহাসিক সত্যকে বা ঘটনাকে আপনার উপন্যাসের প্লট হিসাবে উপস্থাপন করেন। তো, দক্ষিণ এশীয় সাহিত্যে ঐতিহাসিক উপন্যাসের পরম্পরায় ইতিহাস ও কল্পনার সম্পর্কটি আপনি কীভাবে দেখেন?
কল্পনা ও ইতিহাস ভিন্ন প্রভুর দাস। কল্পনার মধ্যেই একজন লেখক লেখক হয়ে ওঠেন; ইতিহাস তথ্যের সঙ্গে বাঁধা। ঐতিহাসিক কথাসাহিত্যে এই দুটিকে একসাথে টিকে থাকতে শিখতে হয়, মেলবন্ধন করতে হয়। তবেই সেটা সৃষ্টিশীল এবং কালজয়ী কিছু একটা হয়ে ওঠার অনুষঙ্গ পায়। দেখো বিলে, সবকিছুই তো ইতিহাস, কিন্তু কথা হলো কোন ইতিহাসের আশ্রয় তুমি নিচ্ছো, কাকে তুমি কীভাবে উপজীব্য করছো। দেশভাগ, সাতচল্লিশ, একাত্তর নাকি ব্রিটিশ উপনিবেশের সময়। তবে সময় যেটাই হোক না কেন তোমার ফিকশনের মধ্য দিয়ে ইতিহাস সত্যের মতো জীবন্ত হয়ে উঠবে।
দক্ষিণ এশীয় ঐতিহাসিক কথাসাহিত্যের কোন বই বা লেখকের নাম সুপারিশ করবেন?
চাইলে আমি আমার নিজের বইগুলোর কথাই বলতে পারি। তবে আগে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কয়েকটি কথা বলি। আমি যদি সেই ইতিহাসকে কল্পকাহিনির রূপ দিতে যাই, রাষ্ট্র আমাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিতে পারে, বা নিষিদ্ধ করতে পারে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমি লিখছি, তবে সেটা ফিকশন নয়, একদম টাটকা ইতিহাস কিন্তু সেটা পড়লে ফিকশনের মতো শোনাবে।
দাদা আপনি একটি অসাধারণ ব্যাপার আপনার আলোচনায় তুললেন, ফিকশন পড়ে সত্য ইতিহাসের মতো শুনানো, আর ইতিহাস পড়ে ফিকশনের মতো শোনানো। যার দুটোই আপনার দুইটি আলাদা উপন্যাসের ধরণ। আপনার নতুন উপন্যাস নিয়ে কিছু বলুন।
আপাতত এতটুকুই বলব, বইটা প্রকাশিত হবে শীঘ্রই। বাকিটা পরে পাঠক বুঝে নেবে, তারাই বিচার করবে। লেখক হিসাবে আমার কাজ লেখা, সত্য তুলে ধরা, আমি সেটাই করেছি। আমৃত্যু সেটা করে যাব কোনো চাওয়া-পাওয়া ছাড়া।
দাদা, স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সাহিত্য নিয়ে কিছু বলবেন? আপনার মতে কার লেখা আরও ব্যাপকভাবে অনূদিত হওয়া প্রয়োজন, যাতে তারা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি পান?
আগের প্রজন্মের অনেক লেখকেরই বিশ্বপাঠকের কাছে পৌঁছানোর সামর্থ্য ছিল, কিন্তু তা হয়নি, কারণ তাদের কখনো অনুবাদ বা প্রচার করা হয়নি। জীবনানন্দ দাশ কিংবা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথাই ধরো। রবীন্দ্রনাথ নিজের কবিতা নিজে অনুবাদ করে নোবেল পেয়েছিলেন। দাশ ও মানিক তা করেননি, আর কোনো অনুবাদকও তাদের জন্য সে কাজে এগিয়ে আসেননি। সমস্যাটা আমাদের ব্যবস্থারই। নিজেকেই উদ্যোগী হতে হবে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী সাহিত্যের কোন লেখকদের অনূদিত হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
সৈয়দ শামসুল হক, হাসান আজিজুল হক ও আল মাহমুদ প্রত্যেকেরই বিশ্বপাঠকের কাছে পৌঁছানোর সামর্থ্য আছে।
আবুল হাসান, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বা নির্মলেন্দু গুণ-এর কথা কী বলবেন?
আমি তা মনে করি না। এই কবিরা কেবল বাংলাদেশের। বাংলাদেশের সাহিত্যের জন্য তারা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তাদের বিস্তার সেখানেই শেষ।
দক্ষিণ এশীয় ডায়াস্পোরা সাহিত্য নিয়ে আপনার ভাবনা কী?
‘ডায়াস্পোরা’ শব্দটি আমার পছন্দ নয়। এটি অস্পষ্ট, আর এর মধ্যে লেগে আছে সেই বাণিজ্য ও বিকিকিনির ছাপ, যেখান থেকে শব্দটির জন্ম। একজন লেখক তো চলাচলের পণ্য নন।
আর দক্ষিণ এশীয় ট্রান্সন্যাশনাল বা ট্রান্সলিঙ্গুয়াল সাহিত্যধারা সম্পর্কে?
আমি লেখকদের উপর এসব পরিভাষা চাপিয়ে দিতে চাই না। আমি বিশ্বাস করি, প্রত্যেকেরই তার পছন্দমতো যেকোনো ভাষায় সাহিত্য সৃষ্টির অধিকার ও সাহস আছে। মূল লক্ষ্য হলো লেখা, ভাষা বা স্থান যাই হোক না কেন।
তাহলে কি আমরা কায়সার হক কিংবা অমিতাভ ঘোষকে ট্রান্সলিঙ্গুয়াল লেখক, আর ঝুম্পা লাহিড়ি বা অন্যান্য যারা আছেন তাদের ট্রান্সন্যাশনাল লেখক বলে ধরে নিতে পারি?
না, আমি তা মনে করি না। আগেই বলেছি, এটি আসল বিষয় নয়। এসব পরিভাষা সাম্প্রতিক একটি সাহিত্যিক ঘটনামাত্র, কিন্তু এগুলোকে সাহিত্যের মর্ম নির্ধারণ করতে হবে না। আমাদের লিখতে হবে, লিখতে হবে, আর লিখতে হবে। একজন লেখক যখন পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে যেকোনো ভাষায় সৃষ্টি করতে পারেন, তখন এসব লেভেল নিয়ে তারা এক মুহূর্তও ভাবেন না।
চাকমা, মারমা, গারো, সাঁওতাল, ত্রিপুরাসহ অন্যান্য ভাষায় রচিত দক্ষিণ এশীয় আদিবাসী সাহিত্য নিয়ে আপনার ভাবনা কী?
আদিবাসী সম্প্রদায়ের অনেকেরই আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, তাই তাদের মধ্যে এখনও একটি সুদৃঢ় সাহিত্যরীতি গড়ে ওঠেনি। লেখার জন্য বিপুল পড়াশোনা প্রয়োজন। তবে পরিস্থিতি বদলাচ্ছে, এখন অনেক লেখক বের হচ্ছে। তবে ওদের মার্তৃভাষায় লেখার চর্চা করতে হবে তা না হলে ভাষাগুলো হারিয়ে যাবে।
আদিবাসী সাহিত্যকে কি মূলধারার সঙ্গে যুক্ত করা উচিত? ভারত ও বাংলাদেশে অসংখ্য আদিবাসী সম্প্রদায় আছে, অথচ তাদের সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান এখনও সীমিত। আর ওদের ভাষায় সাহিত্য রচনা হলে তো বৃহত্তর বাংলাভাষীরা ওদের বই পড়তে পারবে না, তখন তো প্রকাশকরা ব্যবসায়িক ক্ষতির দিকে যাবে যেটা “মুদ্রণ পুঁজিবাদ” ও ভাষার এককেন্দ্রিকরণের বিতর্ক উসকে দেয়।
তাদের এগিয়ে নেওয়া উচিত, তবে আগে একটি বিস্তৃত সামাজিক-রাজনৈতিক আলোচনা প্রয়োজন। বাংলাদেশে এই সম্প্রদায়গুলোর ওপর দীর্ঘ দমনের ইতিহাস আছে। আদিবাসীদের ইতিহাস সংরক্ষণ করতে হবে; নতুবা তা হারিয়ে যাবে। বাস্তবতা হলো, আদিবাসী সম্প্রদায়ের অধিকাংশ মানুষ সাহিত্য সৃষ্টিতে মনোনিবেশ করেন না। নিজেদের অর্থনৈতিক দুর্বল অবস্থানের কারণে তারা অর্থনৈতিক এবং সামাজিকভাবে টিকে থাকা নিয়েই ব্যস্ত; তাদের মনোযোগ পড়াশোনা আর চাকরির সম্ভাবনার দিকে। কিন্তু তুমি যেটা বলেছো সেটা অবশ্যই ভাবনার বিষয়, সে জন্য সরকার এবনং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা অনুষদগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পরিকল্পনামাফিক কাজ না করলে এর উন্নতি হবে না, এরজন্য বাংলা একাডেমিকেও এগিয়ে আসতে হবে, ভাষা সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। আমি আশাকরি একদিন সকাল হবে।
দাদা, আপনার মতে ভারতের বাইরে দক্ষিণ এশীয় সাহিত্যের বিশেষ করে বাংলাদেশের লেখকেরা এখনও বিশ্বমঞ্চে যেতে সুযোগ পাচ্ছে না, তাদের কোনো ইমপ্যাক্ট নেই তেমন, নিজের দেশেও কালজয়ী হবার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। আপনি এটাকে কীভাবে দেখেন?
ভারতের বাইরের দক্ষিণ এশীয় সাহিত্য বিশেষ পরিচিত নয়। ভারতীয় লেখকরা বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত, কিন্তু নেপালি, ভুটানি ও শ্রীলঙ্কান লেখকরা সেই বিস্তার খুব কমই পান। বাংলাদেশি লেখকরাও প্রান্তেই রয়ে যান। এখানকার অধিকাংশ লেখক সাহিত্যের সেবার জন্য নয়, বরং ক্ষণস্থায়ী খ্যাতির জন্য লেখেন। এটাই আসল সমস্যা। খ্যাতির পিছনে না ছুটে স্রষ্টা হতে হবে।