টিকটকে নতুন ট্রেন্ডে পরিণত হওয়ার অনেক আগেই বিশ্বের বিভিন্ন খাদ্য সংস্কৃতিতে বিনস (শিম বা ডালজাতীয় খাবার) ভিজিয়ে ও রান্না করে খাওয়ার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। সঠিকভাবে প্রস্তুত করলে এর কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
গত কয়েক মাস ধরে টিকটকের ঘরোয়া রান্নার ভিডিও নির্মাতারা ক্যানেলিনি, বোরলোটি ও ব্ল্যাক বিনস ভিজিয়ে ও সিদ্ধ করে এর পুষ্টিগুণ নিয়ে আলোচনা করছেন। ‘#beantok’ হ্যাশট্যাগে ইতোমধ্যে ১৩ হাজারেরও বেশি ভিডিও রয়েছে। অনেকেই দাবি করছেন, এই সাধারণ ডালজাতীয় খাবার তাদের উদ্বেগ, প্রি-মেনোপজ এবং প্রদাহ কমাতে সহায়তা করেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘ফাইবারম্যাক্সিং’ ট্রেন্ড, যার ফলে বিনস এখন আর রান্নাঘরের এক কোণে পড়ে থাকা সাধারণ উপাদান নয়— বরং স্বাস্থ্য সচেতনতার নতুন ‘মেইন ক্যারেক্টার’ হয়ে উঠেছে।
বিনের ইতিহাস ও বৈশ্বিক ব্যবহার
তবে এই আলোচনায় অনেক রাঁধুনি ও শেফের কাছে বিষয়টি নতুন নয়। আজ আমরা যে বহু ধরনের বিনস খাই, সেগুলোর অনেকগুলোই আমেরিকা মহাদেশের স্থানীয় ফসল, যা ষোড়শ শতাব্দীতে ইউরোপে পৌঁছায়। এরপর দ্রুতই এগুলো ভূমধ্যসাগরীয় রান্নার অংশ হয়ে ওঠে, এতটাই যে এখন সেই খাবারগুলো বিন ছাড়া কল্পনাই করা কঠিন।
ফুড রাইটার এমিকো ডেভিস বলেন, টাসকানদের ‘মাঙ্গিয়াফাজিওলি’ বা ‘বিন ভক্ষক’ নামেও ডাকা হয়। তার মতে, একসময় বিনস ছিল দরিদ্র কৃষক শ্রেণির প্রধান দৈনন্দিন খাবার ও পুষ্টির উৎস।
একই ধরণ শুধু ইতালিতেই সীমাবদ্ধ নয়: দক্ষিণ এশিয়ার রান্না ডালকে কেন্দ্র করে গঠিত, লেভান্ট অঞ্চলের রান্নায় ছোলা ও ফাভা বিন (বড়শিম/ব্রড বিন) বেশি ব্যবহৃত হয়, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকাজুড়ে শিম ও ভাতের যুগলবন্দি খুব সাধারণ, আর পশ্চিম আফ্রিকার অনেক খাবারের ভিত্তি হলো ব্ল্যাক-আইড বিন ও পিন্টো বিন, যেখানে পূর্ব আফ্রিকায় কিডনি বিন ও ব্ল্যাক বিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
‘নীরব নায়ক’ হিসেবে বিন
ফুড রাইটার এবং গার্ডিয়ান অস্ট্রেলিয়ার কলামিস্ট অ্যালিস জাস্লাভস্কি বলেন, বিন হলো খাবারকে ভরাট বা পরিপূর্ণ করার ক্ষেত্রে এক ধরনের নীরব নায়ক। তিনি আরও বলেন, প্রোটিন, ফাইবার বা পেট ভরার অনুভূতি– সব দিক থেকেই এর চেয়ে সাশ্রয়ী ও উপকারী আর কিছু নেই।
সুপারমার্কেটে একটি ক্যান সাদা বা কিডনি বিনের দাম প্রায় ২ ডলার।
বিভিন্ন সংস্কৃতিতে বিন
সিডনির ‘থ্রি টমেটোজ’ ক্যাফের শেফ এবং ‘আলমন্ড বার: ১০০ সিরিয়ান রেসিপি’ বইয়ের লেখক শ্যারন সাল্লুম বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের খাবার সম্পর্কে একটি ভুল ধারণা আছে, আমাদের ঐতিহ্যবাহী রান্নায় প্রচুর নিরামিষ খাবার রয়েছে।
মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ার প্রতিযোগী ওলাওলো ওলোরুনিমবে, যিনি নাইজেরিয়া ও ইংল্যান্ডে বড় হয়েছেন, তিনি মনে করেন দুই দেশের রান্নায় একই ধরনের নীতিমালা কাজ করে। তিনি বলেন, এওয়া আগানইন ও আগেজে রুটি, আর বেকড বিনস অন টোস্ট– আসলে এগুলো মূলত একই ধরনের খাবারের ভিন্ন রূপ।
বিন কেন আপনার জন্য ভালো
অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়ের মানব পুষ্টি কর্মসূচির পরিচালক সহযোগী অধ্যাপক ইভাঞ্জেলিন মান্টজিওরিস বলেন, বিন একটি অনন্য খাবার, কারণ এতে একসঙ্গে প্রোটিন ও ফাইবার দুটোই থাকে। তিনি উল্লেখ করেন, অস্ট্রেলিয়ার খাদ্য নির্দেশিকা অনুযায়ী এগুলোকে একদিকে প্রোটিনের শ্রেণিতে, আবার অন্যদিকে শাকসবজির শ্রেণিতেও রাখা হয়। এছাড়া এতে লৌহ, জিঙ্ক এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টও থাকে।
ফাইবারসমৃদ্ধ খাদ্য অন্ত্রের ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। মান্টজিওরিস বলেন, প্রাপ্তবয়স্কদের দিনে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ গ্রাম ফাইবার গ্রহণ করা উচিত। রান্না করা এক কাপ বিন, বিনের ধরন অনুযায়ী, দৈনিক ফাইবারের প্রয়োজনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পূরণ করতে পারে।
শুকনো নাকি টিনজাত বিন ব্যবহার করা উচিত
শ্যারন সাল্লুম বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের রান্নায় আমরা শুধু শুকনো বিন ব্যবহার করি। তার মতে, ফালাফেলের ক্ষেত্রে টিনজাত ছোলা ব্যবহার করলে টেক্সচার ঠিক থাকে না।
এমিকো ডেভিস একই যুক্তি আরও সাধারণভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শুকনো বিন সালাদের জন্য ভালো কারণ এটি আকৃতি ধরে রাখে। অন্যদিকে টিনজাত বিন স্যুপ, স্ট্যু বা পাস্তার জন্য উপযুক্ত, যেখানে নরম হওয়া সমস্যা নয়।
সাধারণভাবে, শুকনো বিন রান্নার আগে ভিজিয়ে রাখতে হয় এবং রান্নার সময়ও বেশি লাগে; আর পানি ঝরানো টিনজাত বিন সরাসরি পাত্রে ঢেলে দেওয়া যায়।
মান্টজিওরিসের মতে, পুষ্টিগত দিক থেকে দুটির মধ্যে বড় কোনও পার্থক্য নেই। টিনজাত বিন আগে থেকেই রান্না করা থাকে, তাই কিছু পুষ্টি উপাদানে সামান্য হ্রাস হয়। কিন্তু একই জিনিস শুকনো বিন বাড়িতে রান্না করার সময়ও ঘটে। তাই শেষ পর্যন্ত তেমন কোনও বড় পার্থক্য নেই।
রঙ ও স্বাদের পার্থক্য
সঠিক বিন বাছাইয়ের ক্ষেত্রে জাস্লাভস্কি রঙের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, রঙ যত গাঢ়, স্বাদ তত বেশি আকর্ষণীয় এবং তীব্র হয়।
তিনি আরও বলেন, পাতলা খোসাযুক্ত সাদা বিনের স্বাদ এবং টেক্সচার লাল কিডনি বিন বা ব্ল্যাক বিনের তুলনায় অনেক বেশি সূক্ষ্ম ও নরম।
লবণ দিলে কী নষ্ট হয়ে যায়
রান্না-সংক্রান্ত একটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো, শুরুতেই বিনে লবণ দিলে নাকি তার খোসা শক্ত হয়ে যায় এবং সেটা আর ঠিকভাবে রান্না যায় না। কিন্তু ওলোরুনিমবে এই ধারণার সঙ্গে একমত নন। তিনি শুরু থেকেই লবণ দেওয়ার পক্ষেই। তিনি বলেন, যে পানিতে বিন রান্না করা হচ্ছে, সেই পানিতে সবসময় লবণ দিন। এতে বিনের এমন স্বাদ বেরিয়ে আসে, যা আপনি আগে টেরও পাননি।
বৈজ্ঞানিক প্রমাণও তার এই পদ্ধতিকে সমর্থন করে এবং রান্নাবিদ জে. কেনজি লোপেজ-অল্টের পরীক্ষাও একই কথা বলে। তার মতে, ভিজানোর পানি এবং রান্নার পানিতে লবণ দিলে বিনের গঠন আরও ভালো হয়, স্বাদ বাড়ে এবং রান্নার সময়ও কমে যায়।
বিন কি গ্যাস তৈরি করে
বিন খাওয়ার ফলে যে গ্যাস হয়, সেই কারণে অনেকেই এগুলো এড়িয়ে চলেন। কিন্তু মান্টজিওরিস বিষয়টিকে অন্যভাবে দেখার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, এটা আসলে ভালো লক্ষণ– এটা বোঝায় যে আপনার অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম ফাইবার হজম করছে এবং ভালো ব্যাকটেরিয়া বেঁচে থাকতে সাহায্য করছে।
বৈজ্ঞানিক গবেষণা অনুযায়ী, ভিজানো বা রান্নার পানির পিএইচ মাত্রা (অর্থাৎ তা বেশি ক্ষারীয় বা বেশি অম্লীয় করা) পরিবর্তন করলে গ্যাস তৈরি করে এমন কিছু উপাদান বের করে দেওয়া সম্ভব।
জাস্লাভস্কি গ্যাস কমানোর জন্য কিছু কৌশল ব্যবহার করেন, যাকে তিনি মজার ছলে ‘মিউজিক্যালিটি’ বলেন। এর মধ্যে আছে কম্বু (এক ধরনের সি-উইড) ব্যবহার করা, যা ক্ষারীয় প্রভাব দেয়, এবং লেবুর রস বা ভিনেগার যোগ করা, যা অম্লীয় প্রভাব তৈরি করে। এই কারণেই অনেক রান্নায়, যেকোনো সংস্কৃতিতেই, টমেটো বা সাইট্রাস জাতীয় উপাদানের সঙ্গে বিন দেখা যায়। তিনি আরও বেকিং সোডা ব্যবহার করার পক্ষেও মত দেন।
সহজে বিন রান্না
দ্রুত রান্না করা যায় এমন বিন-ভিত্তিক খাবারের ক্ষেত্রে সাল্লুমের প্রিয় পদ্ধতি হলো, ভাজা সবুজ শাক, রসুন ও লেবুর সঙ্গে রান্নার শেষ পর্যায়ে একটি ক্যান ক্যানেলিনি বা কিডনি বিন যোগ করা।
ডেভিসের পদ্ধতি আরও সহজ: সেজ পাতা ও রসুন দিয়ে ক্যানেলিনি বিন সেদ্ধ করা, তারপর অলিভ অয়েল ও কালো মরিচ দিয়ে মিশিয়ে নেওয়া– এটাই তার ‘ফাজিওলি আল’ওলিও’ রেসিপি। এটি গরম অবস্থায় রোস্ট করা মাংসের সঙ্গে খাওয়া যায়, অথবা ঠান্ডা করে ক্যান টুনা ও লাল পেঁয়াজের সঙ্গে সালাদ হিসেবেও পরিবেশন করা যায়।
তার একটি কঠোর নিয়ম হলো, রান্নার পানি কখনোই ফেলে দেওয়া যাবে না; বরং সেটি স্যুপ বা পাস্তার জন্য ব্যবহার করতে হবে। তিনি বলেন, এটাই সবচেয়ে সুস্বাদু স্টক যা আপনি কখনো স্বাদ নিয়েছেন।
বিন আর শুধু সাইড ডিশ নয়, এটি এখন পুষ্টি, সংস্কৃতি ও স্বাদের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় উপাদান। সস্তা, পুষ্টিকর এবং বহুমাত্রিক এই খাবার ধীরে ধীরে বিশ্বজুড়ে ‘নীরব নায়ক’ হিসেবে জায়গা করে নিচ্ছে।
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, স্বাস্থ্য ও পুষ্টিগুণ বিষয়ক বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি গবেষণা ও মেডিকেল সোর্স, Healthline– বিভিন্ন বিনের পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা, ন্যাশনাল জিওগ্রাফি– বিনসের বৈজ্ঞানিক পুষ্টি বিশ্লেষণ।