প্রতীচ্যের কবি দান্তে আলিগিয়েরি (জন্ম: ১২৬৫, ফ্লোরেন্স, ইতালি) তার ‘কোম্মেদিয়া’ বা ‘দ্য ডিভাইন কমেডি’ কাব্যের জন্য বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনে অর্জন করেছেন অমরত্ব; কোম্মেদিয়া কাব্যটি তিনি লিখেছেন তিনটি খণ্ডে: ইনফার্নো, পুরগাতেরিও এবং প্যারাদিসো। দান্তে আলিগিয়েরির কোম্মেদিয়া কাব্যটি ইনফার্নো বা নরক থেকে শুরু করলেও এটি সমাপ্ত হয়েছে স্বর্গের মিলনান্তক দৃশ্যপট রচনার মধ্য দিয়ে। দান্তের অকাল প্রয়াত প্রেমিকা বিয়াত্রিসের সঙ্গে স্বর্গোদ্যানে সাক্ষাতের পরম মুহূর্তে এই কাব্যটি তার নামকরণের সার্থকতা খুঁজে পায়, পরবর্তী সময়ে দান্তের অনুরাগী পাঠকগণ এই কাব্যের মহত্ত্বকে উপলব্ধি করে এর সঙ্গে ‘ডিভাইন’ শব্দটি জুড়ে দিয়েছেন।
দান্তে আলিগিয়েরি জীবনের নিগূঢ় সত্যকে তত্ত্বদর্শনের পরাকাষ্ঠা রচনা করে নয়, উপলব্ধির অধিকারে করেছেন উত্থাপন। দান্তে বলেছেন, “আমাদের এই জীবনব্রজের মাঝপথে চরণিক, / আমি নিজবোধ ফিরে পাই এক আঁধারবিলীন বনে,/ সরল সরণি হারিয়ে গিয়েছে যেখানে বাস্তবিক।” কিন্তু এই জীবনব্রজের আখ্যান শোনাতে গিয়ে যে ধর্মীয় বাতাবরণ তিনি সৃষ্টি করেছেন, তাতে; দান্তে আলিগিয়েরির কাব্যপাঠ করলে প্রথমেই কেউ যেটি উপলব্ধি করতে পারবেন, তিনি একজন আদর্শ কবি নন, বরং আদর্শ খ্রিষ্টান। কিন্তু প্রকৃতঅর্থেই শুধু এতটুকু কথা বললে এই মহাকবির উপর অন্যায় সাধন হয়; এইকারণে যে তিনি ছিলেন যীশুর প্রতি পূর্ণ সমর্পিত মানুষ, তার বিশ্বাস ও ঐশ্বরিক বাতাবরণে লুকিয়ে ছিল প্রেমের এক মোহনীয় রূপ! ধর্ম তার বহিরঙ্গ, অন্তরঙ্গ প্রেম।
প্রথম যৌবনের প্রেমিকা বিয়াত্রিসের প্রেমে যিনি পাড়ি জমিয়েছেন অনধিগম্য অভিযানে; যেই দুঃসাহসিক যাত্রার সঙ্গী ছিলেন ইনিড মহাকাব্যের কবি ভার্জিল। ভার্জিল তার কাব্যগুরু কিন্তু এই সংসার-সমুদ্রের ঘূর্ণি-বাত্যায় যেই গুরু মৎস্য হয়ে টেনে নিয়ে যাবেন নায়ের নোঙর, তেমন গুরু তিনি নন। দান্তে দেখিয়েছেন অখ্রিষ্টান হওয়ার কারণে নরকের ‘লিম্বো অব ইনফ্যান্টস’ (কাফেরদের লিম্বো) বৃত্তে ভার্জিলের শাস্তি হয়েছে, অনন্ত হতাশার মধ্যে দিনাতিপাতের শাস্তি। যদিও নরকের শাস্তির মধ্যে লঘুতম; কিন্তু তা শাস্তিই বটে। ভারতীয় নাথমার্গের ইতিহাসে গোরক্ষনাথ যেমন তার গুরুর ত্রাণকর্তা হয়েছিলেন; বৈষ্ণব-ভক্তিমার্গে বালসন্ন্যাসী আড়াইয়া তার গুরুকে ঈশ্বরদর্শন করিয়েছিলেন, দান্তে নিজে খ্রিষ্টান হলেও এত শক্তি তার নেই, তপোগুণে তার কাব্যগুরুকে নরক থেকে উদ্ধার করবেন। বরং তিনি তার শাস্তি বহাল রেখে ঈশ্বরতুষ্টির ছলে লোকতুষ্টিকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এইজন্যে প্রেমের শোণিতধারা, তার বিশ্বাসের চামড়াকে ভেদ করে দেখা দিতে পারেনি বললে অত্যুক্তি হয় না। কিংবা সেই শোণিতধারা প্রেমের তুল্যানুরাগে, কপোলের পাশে ফুলে ওঠা রক্তিম আভার মতো একেকবার দেখা দিয়েই মিলিয়ে গিয়েছে, এই দ্বন্দ্ব নিয়েই রসিকগণ তার কবিতা পড়ে, মুগ্ধ হয়, আবার আক্ষেপও করে। কিন্তু কোথাও যেন বোধের এক অনাদি সংগীত ধ্বনিত হয় তার কাব্যের ছত্রে, ছন্দে ও মাত্রায়; গভীর থেকে গভীরতর সেই বোধ। জীবনের উপলব্ধির একেকটা স্তর যেন খুলে যায় দান্তের ভ্রমণরত একেকটা বৃত্তে; এইখানেই তার কাব্যের মহত্ত্ব। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, “তোমার সৃষ্টির চেয়ে তুমি যে মহৎ”, দান্তের ক্ষেত্রে কি অবলীলায় এই কথা আমরা বলতে পারি? হয়তো পারি না; তবে এইকথা বিনাবাক্যেই মেনে নিতে হয়, যে, কাব্যখানি শুধু মহৎ-ই নয়, জগতের পাঁচখানার মধ্যে একখানা।
দান্তে আলিগিয়েরি তার ডিভাইন কমেডি কাব্যে ইনফার্নো, পুরগাতেরিও, প্যারাদিসো অর্থাৎ নরক, শুদ্ধিলোক ও স্বর্গ ভ্রমণের এই পরিকল্পনাটি ঠিক কোন সাহিত্যকর্ম থেকে আত্মস্থ করেছেন এটি অনুসন্ধানযোগ্য। হোমার বিরচিত গ্রিক মহাকাব্য ওডেসিতে অন্ধ ভবিষ্যদ্বক্তা টেরিসিয়াসের সহায়তায় ওডিসাসের পাতাললোক পরিভ্রমণ সুপ্রসিদ্ধ। ইউরিডাইসের প্রেমে বিভোর হয়ে অর্ফিয়াসের মৃত্যুলোকে ভ্রমণের কাহিনিও গ্রিক পুরাণে বিখ্যাত। কিন্তু ইথাকার রাজা ওডিসাস ছিলেন লায়ের্তেস ও অ্যান্টিক্লিয়ার পুত্র; লায়ের্তেসের পিতা আরিসিয়াস দেবরাজ জিউসের বংশজ; আর মাতা অ্যান্টিক্লিয়ার পিতা অটোলিকাস ছিলেন মৃত-আত্মার পথপ্রদর্শক দেবতা হার্মিসের পুত্র; পিতা-মাতা দুই দিক থেকেই দেব-রক্তের উত্তরাধিকার পেয়েছেন বীর ওডিসাস। একইভাবে অর্ফিয়াস ছিলেন গ্রিক দেবতা অ্যাপোলো ও মিউস ক্যালিওপের পুত্র। তারা নরদেহ ধারণ করে স্বর্গ-নরক ভ্রমণ করেছেন ঠিকই কিন্তু তারা ছিলেন দেবপুত্র কিংবা দেব-দৌহিত্র; রক্তমাংসের মানুষের এমন পরিভ্রমণ প্রাচীন পুরাণ-সাহিত্যেও দুর্লভ। ভারতীয় মহাকাব্য মহাভারতে যুধিষ্ঠির সশরীরে স্বর্গে গিয়েছেন, যুধিষ্ঠিরও ছিলো যমপুত্র। এমনই আরো বহু উপকরণ খুঁজলে সাহিত্যের পাতায় পাতায় দৃষ্টান্ত মিলবে, কিন্তু এর অধিকাংশই দেব-দেবীর কাহিনিতে পূর্ণ; পুরাণের নায়কেরা হয় ডেমি-গড (অর্ধ-ঈশ্বর) কিংবা দেববংশ; একেবারেই রক্তমাংসের মানুষ সশরীরে পৌঁছে গেছেন স্বর্গে এমন ইতিহাস দুর্লভই নয় দুষ্প্রাপ্যও বটে। দেবতাকে ছেড়ে দিয়ে মানুষের মধ্যে যখন ফিরে এলেন আমাদের কবি ও শিল্পীগণ, তখুনি সূত্রপাত হলো রেনেসাঁর। ইতালির রেনেসাঁর পূর্বে আরবে রেনেসাঁ ঘটেছিল বলে বিশদ মত প্রকাশ করে গেছেন ইতিহাসশাস্ত্রের পণ্ডিতেরা। সেকথা সর্বাঙ্গে সত্য হোক না হোক, কিন্তু এরই সূত্র ধরে এগুলো সন্ধান মিলবে দান্তে আলিগিয়েরির কাব্য-উৎসের।
এই-পর্যায়ে এই মহৎ-কাব্য রচনার প্রেরণা খুঁজতে গেলে আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে বিখ্যাত মুসলিম দার্শনিক ইবনে সিনার মেরাজনামা গ্রন্থে। যা মূলত ইসলামি ঐতিহ্যের পয়গম্বর মুহাম্মদ (স)-এর মেরাজ বা ঊর্ধ্বগমনের প্রেক্ষাপটে রচিত একটি আধ্যাত্মিক গ্রন্থ। যেখানে ইবনে সিনা মেরাজের ভ্রমণকে চেতনার বিভিন্ন স্তরের যাত্রারূপে উল্লেখ করেছেন, বুদ্ধি ও চৈতন্যের ঐশ্বরিক স্তরে উন্নীত হওয়ার মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাকেই তিনি প্রকৃত মেরাজ বলতে চেয়েছেন। রূপকের আশ্রয়ে কীভাবে ধর্মশাস্ত্র মানুষের আধ্যাত্মিক ভ্রমণকে এবং ঈশ্বরপ্রাপ্তিকে ব্যাখ্যা করে থাকে, ইবনে সিনা সেইদিকটাতেই আলোকপাত করেছেন; মেরাজের ঘটনায় মুহাম্মদ (স)-এর পথপ্রদর্শক ছিলেন জিব্রিল; দান্তের কাব্যে তিনি এই কাঠামোটিকেই ব্যবহার করেছেন, ভার্জিলকে নিয়েছেন তার পথপ্রদর্শক গুরু হিসেবে। কিন্তু মেরাজনামায় দার্শনিক রূপকের গভীরতর ব্যাখ্যা থাকলেও তা কাব্য নয়; বরং কুরআনে বর্ণিত মেরাজের ঘটনাটির সিনা-সুলভ ব্যাখ্যামাত্র, পক্ষান্তরে দান্তের ডিভাইন কমেডি ষোলো-আনাই কাব্য; এইখানে দার্শনিকতা এসেছে অনুষঙ্গরূপে। ইবনে সিনা তার এই মেরাজনামা গ্রন্থটি রচনা করেছেন তার জীবনের শেষপাদে; যখন তিনি হায় ইবনে ইয়াকজান, রিসালাতুত তয়ুর ইত্যাদি দার্শনিক গ্রন্থ রচনা করছিলেন, মেরাজনামা সেই সময়কারই রচনা; অর্থাৎ সেই সময়কালটি ধরে নিলে তার মৃত্যুর (মৃত্যু-১০৩৭ খ্রিষ্টাব্দ) এর অব্যবহিত পূর্বের দশকটি আন্দাজ করা যায়। যদি ধরে নেওয়া যায় ১০২০ এর পরপরই তিনি এই গ্রন্থ রচনা করেছেন। অপরদিকে সিরীয় কবি আবুল আলা-আল-মা’আরি (৯৭৩-১০৫৭) তার রিসালাতুল গুফরান গ্রন্থটি রচনা করেছেন আনুমানিক ১০৩৩ খ্রিষ্টাব্দে। এই আরবি কাব্যগ্রন্থে মেরাজনামার অনুরূপ স্বর্গ-নরকের ভ্রমণ দেখানো হয়েছে। ইবনে আল-কারিহ নামে একজন জিন্দিক (সংশয়বাদী) কবি (ধারণা করা যায় মা’আরি স্বয়ং) ঈশ্বরের অসীম কৃপায় স্বর্গে পৌঁছে যায়; মানুষের পাপের চেয়ে ঈশ্বরের ক্ষমা বড়ো সেই মহত্ত্বকেই ফুটিয়ে তুলেছেন এই কবি তার কাব্যে। রিসালাতুল গুফরান ষোলোআনাই কাব্য। এদিকে অন্ধ কবি মা’আরিও পৃথিবীর ইতিহাসে বড়ো কবিদের আসন দখল করে বসে আছেন; ফলে তার কাব্যের দার্শনিকতা, কাব্যের অনুগামী; যা মেরাজনামার মতো নয়; যা গঠন-শৈলীতে লাভ করেছে নিজস্ব কাঠামো, বক্তব্য হয়েছে পরিস্ফুট; এবং রচনারীতি মধ্যযুগীয় দীর্ঘকাব্যের রোমান্টিক-ক্লাসিক থেকে অভিন্ন। তৎকালীন গ্রিস-ইতালিতে সুপ্রাপ্য আরব সাহিত্য রিসালাতুল গুফরানই যে দান্তের ডিভাইন কমেডি কাব্যের আকর, এই কথা নির্ভয়ে বলা যায়।
ডিভাইন কমেডিতে দান্তে আলিগিয়েরি কাব্যের প্রতিমাকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন সগৌরবে। কেননা, শুরু থেকে শেষপর্যন্ত নরকের বৃত্তে-উপবৃত্তে যেই পৌরাণিক দেবদেবীদের কাহিনি উল্লেখ করেছেন, এইখানে এসেই জাগরণ ঘটেছে গ্রিক-প্যাগান সংস্কৃতির ঐতিহ্যের। দান্তে আলিগিয়েরি ফ্লোরেন্সের বিখ্যাত ধনাঢ্য পরিবারেই জন্ম নিয়েছিলেন, বিশ্বাসে তিনি ছিলেন খ্রিষ্টান কিন্তু সংস্কৃতিতে তিনি গ্রেকো-রোমান; তাই তার বিশ্বাসের দেবতাকে অতিক্রম না করলেও, তার হাত ধরেছে সংস্কৃতির দেবতা। নরকের প্রথম বৃত্ত লিম্বো থেকে শুরু করে শেষবৃত্ত পর্যন্ত, কখনো অ্যাকেরন নদী, কখনো বা স্টাইক্স নদী পাড়ি দিচ্ছেন গ্রিক চরিত্রের সঙ্গে! নরকের অ্যাকেরন নদীর মাঝি ক্যারন ভীষণ ভয়ংকর হলেও, হয় সে ইতালীয় কবি দান্তের আপনজন; তাই দান্তের নদীপার হতে ক্যারনকে হার্মোনিয়ার নেকলেসটি ঘুষ হিসেবে দিতে হয় না। মেডুসা ইত্যাদি তিন গর্গন-কন্যা তার ঘরেরই মেয়ে। নরকের তিন বিচারক তারা এককালে ইতালি ও গ্রিসের নানান দ্বীপরাষ্ট্রের রাজা ছিলেন; ফলে মাতা ম্যারির সঙ্গে সাক্ষাতের পূর্বে যে গ্রিক পুরাণের সেইসব দেবতাদের সঙ্গে দান্তের সাক্ষাৎ ঘটবে এতে আশ্চর্য কী? ফলত, আরব কবি মা’আরির কাব্য থেকে প্রেরণা ও কাঠামোটি পেলেও, এর অন্তর্গত ভাব গ্রিক-ধ্রুপদী কাব্যের পথ ধরে চলেছে। দান্তে আলিগিয়েরি ঠিক মহাকাব্য রচনা করেননি, তবে রচনা করেছেন মহান কাব্য। জীবনসত্যের উন্মোচন করতে চেয়েছেন তার পুরো জীবনজুড়ে, কাব্য-সাধনা সেই সত্যের পথটিকে প্রসারিত করেছে। প্রেমে ও ঔদাস্যে, বোধে ও প্রজ্ঞায়, বিশ্বাসে ও সমর্পণে কবির সমস্ত জীবন স্নাত ছিল; এরই স্মারক-শিল্প, এরই শাশ্বত-সম্ভাষণ তার ডিভাইন কমেডি কাব্যখানি। তার কাব্যের মহত্ত্ব তাকে করেছে চিরপ্রাসঙ্গিক। এইখানে দাঁড়িয়ে বলতে হয়, দান্তের ব্যক্তি-আদর্শের কারণে সংকুচিত হই, তার কাব্যাদর্শকে গ্রহণ করি। ভারতীর শ্রীচরণে এভাবেই কাব্যের অর্ঘ্য নিতে নিতে, তার প্রসারিত হাতটিকেও গ্রহণ করি। প্রাচীন ধ্রুপদী কাব্যের বেদিতে তিনি সেই শেষফুল, যা নিবেদিত হয়েছে বিশ্ব-প্রাণের মহা অর্চনায়।