একটা মুহূর্ত। আপনি ছবি তুললেন। আলো ঠিক করলেন, সামান্য এডিট করলেন। তারপর পোস্ট। এরপর শুরু হলো অপেক্ষা—লাইক, কমেন্ট, শেয়ার। কেউ লিখল “ভালো লাগছে”, কেউ দিল শুধু একটা ইমোজি। আপনি আবারও ফোনটা খুললেন—নতুন কেউ দেখলো কিনা, লাইক বাড়লো কিনা।
এই ছোট্ট চক্রটা এখন কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। আর এখান থেকেই জন্ম নেয় বড় প্রশ্ন—আমরা কি ধীরে ধীরে ‘নার্সিসিস্ট’ হয়ে যাচ্ছি?
‘নার্সিসিজম মহামারি’র ধারণা কোথা থেকে এলো
গত দুই দশকে একের পর এক গবেষণা ও জনপ্রিয় লেখায় দাবি করা হয়েছে, আধুনিক সমাজে আত্মকেন্দ্রিকতা বা নার্সিসিজম বাড়ছে। বিশেষ করে ১৯৮০ সালের পর জন্ম নেওয়া প্রজন্মকে ঘিরে সমালোচনা সবচেয়ে বেশি—তাদের বলা হয় ‘মি-মি-মি জেনারেশন’। এই ব্যাখ্যার কেন্দ্রে রয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া, সেলফি কালচার, পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং এবং নিজের উপস্থিতি অনলাইনে তুলে ধরার প্রবণতা।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—নিজেকে প্রকাশ করা কি সত্যিই আত্মমুগ্ধতার সমান?
সোশ্যাল মিডিয়া: আয়না নাকি বিকৃত বাস্তবতা
সোশ্যাল মিডিয়াকে অনেকেই নার্সিসিজমের জন্মভূমি হিসেবে দেখেন। কারণ এখানে সবাই নিজের ছবি, অর্জন, জীবনযাপন—সবই তুলে ধরে।
কিন্তু গবেষকদের একাংশ বলছেন, বিষয়টা এতটা সরল নয়।
আধুনিক মনোবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘সেলফ-ফরমেশন’—অর্থাৎ নিজের পরিচয় এখন আর শুধু জন্মসূত্রে নির্ধারিত নয়, বরং তা নির্মাণ করতে হয়। চাকরি, সম্পর্ক, শিক্ষা, এমনকি সামাজিক অবস্থান—সব জায়গাতেই নিজের উপস্থিতি দেখাতে হয়।
এই বাস্তবতায় সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেকে উপস্থাপন অনেক সময় আত্মপ্রচার নয়, বরং সামাজিক টিকে থাকার কৌশল।
নার্সিসিজম বনাম স্বাভাবিক সামাজিক আচরণ
মনোবিজ্ঞানে নার্সিসিজম বলতে বোঝানো হয় এমন এক ব্যক্তিত্ব বৈশিষ্ট্য, যেখানে মানুষ নিজেকে অতিমাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ মনে করে এবং অন্যদের প্রতি সহানুভূতি কম দেখায়।
কিন্তু ছবি পোস্ট করা, সাফল্য শেয়ার করা বা মতামত প্রকাশ করা—সবই কি সেই সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে?
গবেষকদের মতে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই না। বরং আধুনিক সমাজে দৃশ্যমান থাকা অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় দক্ষতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সত্যিই কি আত্মকেন্দ্রিকতা বাড়ছে?
‘নার্সিসিজম এপিডেমিক’ নিয়ে বহু আলোচনা থাকলেও পরবর্তী গবেষণাগুলোতে এর পক্ষে শক্ত প্রমাণ মেলেনি। বরং কিছু পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, মানুষের আত্মবিশ্বাস অনেক ক্ষেত্রে স্থিতিশীল না হয়ে আরও ভঙ্গুর হয়ে উঠছে।
অর্থাৎ বাইরে থেকে আত্মপ্রচারক মনে হলেও ভেতরে অনেকেই অনিশ্চয়তা ও চাপের মধ্যেই থাকেন।
সোশ্যাল মিডিয়ার আরেকটি বড় প্রভাব হলো তুলনা—অন্যের সাজানো জীবনের সঙ্গে নিজের জীবনকে মেলানো। এতে কম সফল মনে হওয়া, চাপ অনুভব করা বা আত্মমূল্যায়ন কমে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়।
‘সেলফ এথিক’—নিজেকে গড়ার নতুন চাপ
গবেষকদের মতে, আমরা এখন এমন এক যুগে আছি যেখানে নিজের জীবন নিজেকেই ডিজাইন করতে হয়। ক্যারিয়ার, সম্পর্ক, ভবিষ্যৎ—সবকিছুর দায় এখন ব্যক্তির ওপর। এই বাস্তবতাকে বলা হচ্ছে ‘সেলফ এথিক’। এই কাঠামোয় নিজের কথা বলা বা নিজেকে তুলে ধরা অনেক সময় আত্মকেন্দ্রিকতা নয়, বরং সামাজিক বাধ্যবাধকতা।
তাহলে সোশ্যাল মিডিয়া কি নির্দোষ?
না, পুরোপুরি নয়। সোশ্যাল মিডিয়া যেমন সুযোগ তৈরি করে, তেমনি তৈরি করে চাপও—সবসময় ভালো দেখানোর চাপ, নিজেকে ‘পারফেক্ট’ প্রমাণ করার চাপ, আর অন্যদের সঙ্গে অবিরাম তুলনার চাপ।
তাই এটিকে সরাসরি “নার্সিসিজম তৈরির মেশিন” বলা অনেকটাই অতিসরলীকরণ।
শেষ কথা
সোশ্যাল মিডিয়া কি মানুষকে নার্সিসিস্ট বানাচ্ছে? এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। তবে গবেষণা বলছে—এখানে শুধু আত্মমুগ্ধতার গল্প নয়, বরং নিজের পরিচয় নির্মাণের এক জটিল সামাজিক বাস্তবতা কাজ করছে। আমরা কি নিজেকে বেশি দেখাচ্ছি? হয়তো। কিন্তু সেটা কি আত্মমুগ্ধতা—নাকি নতুন সময়ের বেঁচে থাকার ভাষা? উত্তরটা এখনও পুরোপুরি লেখা হয়নি।