হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার মাত্র দুই দিনের মাথায় সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত সুবেল আলীর হাতে খুন হন তার বাংলাদেশি দাদি সমতেরা বিবি। এ ঘটনায় পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ার দায় স্বীকার করেছে যুক্তরাজ্যের ইস্ট লন্ডন এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট (ইএলএফটি)। একই সঙ্গে এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে জন্য ট্রাস্টের জবাবদিহি নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন স্থানীয় করোনার (অস্বাভাবিক মৃত্যুর তদন্তকারী বিচারিক কর্মকর্তা)।
অভিযোগ উঠেছে, সুবেল আলীর (৩৪) বিরুদ্ধে অতীতে ছুরিকাঘাতসহ একাধিক সহিংস আচরণ ও হত্যার হুমকির অভিযোগ ছিল। তা সত্ত্বেও প্রায় দুই বছর একটি সুরক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্য ইউনিটে থাকার পর তাকে সমাজে ফিরিয়ে দেওয়ার সময় পরিবারের নিরাপত্তায় কোনো বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। করোনার এ ঘটনাকে এনএইচএসের পদ্ধতিগত নিরাপত্তা ব্যর্থতার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
৮০ বছর বয়সী সমতেরা বিবিও ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন। তিনি নিজ বাড়িতেই নাতির হাতে নির্মমভাবে নিহত হন। এ ঘটনা মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার একের পর এক অবহেলা ও ব্যর্থতার চিত্র সামনে এনেছে। ২০২২ সালের ২ এপ্রিল, সুরক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্য ইউনিট থেকে ছাড়া পাওয়ার মাত্র দুই দিন পর সুবেল আলী তার দাদিকে ২০টির বেশি ছুরিকাঘাত করেন। লন্ডনের ওল্ড বেইলি আদালতের জুরি রায়ে বলা হয়, প্যারানয়েড সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত অবস্থায় তিনি হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছিলেন। তবে গুরুতর মানসিক অসুস্থতার কারণে তাকে বিচারের মুখোমুখি হওয়ার অনুপযুক্ত ঘোষণা করা হয়। এরপর ২০২৩ সালের মার্চ থেকে তিনি অনির্দিষ্টকালের জন্য একটি সুরক্ষিত হাসপাতালে রয়েছেন।
পদ্ধতিগত ব্যর্থতার অভিযোগ
স্থানীয় করোনার নাদিয়া পারসাউড ‘প্রিভেনশন অব ফিউচার ডেথস’ (ভবিষ্যতে মৃত্যু প্রতিরোধ) শীর্ষক প্রতিবেদনে ইস্ট লন্ডন এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তদন্তে দেখা যায়, পরিবারের সদস্যদের হত্যা করার হুমকিসহ সুবেল আলীর দীর্ঘদিনের সহিংস আচরণ, পারিবারিক নির্যাতন এবং যৌন নির্যাতনের ইতিহাস থাকলেও ঝুঁকিতে থাকা পরিবারের সদস্যদের সুরক্ষায় কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি তাদের সতর্কও করা হয়নি।
মেট্রোপলিটন পুলিশের সঙ্গে জরুরি যোগাযোগের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ব্যর্থতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য নিরাপত্তা পরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ নিলেও এনএইচএস ট্রাস্ট তাতে সাড়া দেয়নি। পরে এ ঘটনার পর পুলিশের সঙ্গে জরুরি যোগাযোগের বিষয়ে ট্রাস্টকে নতুন নির্দেশনা জারি করতে হয়েছে।
‘শাহীন জাহান’ নামে কাল্পনিক চরিত্রের প্রভাব
আদালতে জানানো হয়, ২০২২ সালের ৩১ মার্চ হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর সুবেল আলী ‘শাহীন জাহান’ নামের একটি কাল্পনিক চরিত্র নিয়ে বিভ্রমে (ডিলিউশন) ভুগতে শুরু করেন। তার দাবি ছিল, ওই চরিত্র তাকে দাদিকে হত্যা করার নির্দেশ দিচ্ছিল।
হত্যার দিন সকালে আলীর মা একটি ভয়াবহ চিৎকার শুনে বসার ঘরে গিয়ে সমতেরা বিবির রক্তাক্ত মরদেহ দেখতে পান। ঘটনার প্রায় ১০ মিনিট পর কাছের একটি বাসস্টপ থেকে সাদা পোশাক পরা ও রক্তমাখা অবস্থায় সুবেল আলীকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
ম্যানর পার্কের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে এ ঘটনা গভীর শোকের সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ পরিবারের কাছে সম্ভাব্য ঝুঁকির তথ্য না দিলে যৌথ পরিবার কতটা অসুরক্ষিত হয়ে পড়তে পারে, সে বিষয়টিও সামনে আসে।
আরেক কেলেঙ্কারিতে সমালোচনায় ট্রাস্ট
এ ঘটনাটি সামনে এসেছে এমন সময়, যখন ইস্ট লন্ডন এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট রোগীদের পর্যবেক্ষণসংক্রান্ত রেকর্ড জালিয়াতির পৃথক এক কেলেঙ্কারির কারণে সমালোচনার মুখে রয়েছে।
আরেকটি করোনার তদন্তে উঠে এসেছে, ট্রাস্টের তত্ত্বাবধানে থাকা অবস্থায় মারা যাওয়া অন্তত ১২ জন রোগীর চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথিতে জালিয়াতি বা বানোয়াট তথ্য থাকতে পারে।
মাহমুদ আলী (এই ঘটনার সঙ্গে যার কোনো সম্পৃক্ততা নেই) নামে এক রোগীর মৃত্যুর তদন্তে দেখা যায়, একজন নার্স এমন পর্যবেক্ষণের তথ্য নথিভুক্ত করেছিলেন, যা তিনি বাস্তবে করেননি।
ট্রাস্টও রেকর্ড জালিয়াতির প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছে। করোনারের মতে, এটি পদ্ধতিগত ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয় এবং ভবিষ্যতে আরও মানুষের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। তবে এসব মৃত্যুর ঘটনায় ট্রাস্টের অভ্যন্তরীণভাবে কার্যকর কোনো তদন্তের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ‘রমফোর্ড রেকর্ডার’-কে ট্রাস্ট জানিয়েছে, এ বিষয়ে তাদের কাছে কোনো অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদন নেই।
যেসব পরিবর্তনের নির্দেশ
ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে ইস্ট লন্ডন এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্টকে কয়েকটি পদক্ষেপ বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন করোনার।
এর মধ্যে রয়েছে—সব কর্মীর জন্য বাধ্যতামূলক সুরক্ষা প্রশিক্ষণ চালু করা, যাতে তারা পরিবারের সদস্যদের তাৎক্ষণিক ঝুঁকি শনাক্ত ও প্রতিরোধ করতে পারেন। রোগীকে হাসপাতাল থেকে ছাড়ার আগে আরও বিস্তারিত ঝুঁকি মূল্যায়নের জন্য ফরেনসিক সাইকিয়াট্রি দলের সঙ্গে সরাসরি সমন্বয়ের ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি বাড়িতে গিয়ে ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনে ধারালো অস্ত্রসহ তাৎক্ষণিক বিপদের উৎস সাময়িকভাবে সরিয়ে রাখার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।
ট্রাস্ট সমতেরা বিবির পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে একের পর এক এমন ব্যর্থতার পর কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ ও আইন বিশেষজ্ঞরা এনএইচএস ট্রাস্টের কার্যক্রম নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন গণতদন্তের দাবি জানিয়েছেন।