নোবেলজয়ী পেরুভিয়ান ঔপন্যাসিক মারিও ভার্গাস ইয়োসাকে নিয়ে জেরাল্ড মার্টিন-এর লেখা ‘মারিও ভার্গাস ইয়োসা: আ লাইফ’ একটি জীবনীর চেয়েও একজন লেখকের সাহিত্য, প্রেম, রাজনীতি এবং ক্ষমতার সঙ্গে তার সম্পর্কেরও বিশদ ইতিহাস।
মার্টিন দেখিয়েছেন, লাতিন আমেরিকায় যখন গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস-এর মতো লেখকেরা জাদুবাস্তবতার মাধ্যমে সাহিত্যকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন ভার্গাস ইয়োসা বেছে নিয়েছিলেন বাস্তববাদী উপন্যাস। তার বিশ্বাস ছিল, একটি দেশের ইতিহাস, রাজনীতি ও ক্ষমতার কাঠামোকে বাস্তবতার মধ্য দিয়েই সবচেয়ে শক্তিশালীভাবে তুলে ধরা যায়। ‘কনভারসেশন ইন দ্য ক্যাথেড্রাল’ উপন্যাসের প্রথম প্রশ্ন— “ঠিক কোন মুহূর্তে পেরু নিজের সর্বনাশ করল?”—এই দৃষ্টিভঙ্গিরই পরিচয়।
বইটির অন্যতম বড়ো দাবি হলো, ভার্গাস ইয়োসার রাজনৈতিক পরিবর্তন যতটা নাটকীয় মনে হয়, বাস্তবে ততটা নয়। সাধারণভাবে মনে করা হয় তিনি বামপন্থা ছেড়ে ডানপন্থায় চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু মার্টিনের মতে, তিনি কখনোই প্রকৃত অর্থে সমাজতন্ত্রী ছিলেন না। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রী লেয়া বারবার-এর প্রতি ব্যক্তিগত আকর্ষণের কারণেই তিনি কিছুদিন বামপন্থী রাজনীতির কাছাকাছি ছিলেন। তার ভেতরে বরং শুরু থেকেই অভিজাত মানসিকতার একটি প্রবণতা কাজ করত।
জ্যঁ-পল সার্ত্র-এর প্রভাব তার সাহিত্যজীবনের প্রথম দিকের বড়ো শক্তি ছিল। কিন্তু ১৯৭১ সালের ‘পাদিয়া ঘটনা’ তার রাজনৈতিক অবস্থান বদলে দেয়। কিউবার কবি হেবের্তো পাদিয়াকে গ্রেপ্তার করে প্রকাশ্যে আত্মসমালোচনা করতে বাধ্য করার পর ভার্গাস ইয়োসা ফিদেল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রতিবাদে নেতৃত্ব দেন। তবে মার্টিন মনে করেন, কাস্ত্রোকে স্টালিনের সঙ্গে তুলনা করা ছিল অতিরঞ্জিত এবং সেই প্রচারণা লাতিন আমেরিকার বাম রাজনীতিকে দুর্বল করেছিল।
জীবনীটি ভার্গাস ইয়োসার ব্যক্তিগত জীবনও কঠোর সমালোচনার সঙ্গে তুলে ধরেছে। মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি জুলিয়া উরকিদিকে বিয়ে করেন। সেই সম্পর্ক থেকেই জন্ম নেয় জনপ্রিয় উপন্যাস ‘আন্ট জুলিয়া অ্যান্ড দ্য স্ক্রিপ্টরাইটার’ । কিন্তু মার্টিন মনে করিয়ে দেন, বাস্তব জীবন উপন্যাসের মতো সুখকর ছিল না। জুলিয়ার আত্মজীবনী ‘হোয়াট ভার্গুইতাস ডিডন্ট সে’ সেই সম্পর্কের ভাঙন, অবহেলা ও বিশ্বাসঘাতকতার অন্য চিত্র তুলে ধরে।

পরে ভার্গাস ইয়োসা তার প্যাট্রিসিয়া ইয়োসাকে বিয়ে করেন। তাদের তিন সন্তান হয়। বইটিতে প্যাট্রিসিয়াকে এমন একজন নারী হিসেবে দেখানো হয়েছে, যিনি দীর্ঘদিন স্বামীর সাহিত্যজীবনের জন্য নিজের জীবন ও স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছেন। কিন্তু বহুবছর পর তাকেও ছেড়ে স্প্যানিশ সমাজসেবী ইসাবেল প্রেইসলার-এর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান ভার্গাস ইয়োসা।
ইংল্যান্ডে তার বসবাসও বইটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। লন্ডনের ক্রিকলউড এলাকায় থাকার সময় তিনি ব্রিটিশ রক্ষণশীল রাজনীতির প্রতি আরও আকৃষ্ট হন। ইতিহাসবিদ হিউ থমাস-এর মাধ্যমে তার পরিচয় হয় মার্গারেট থ্যাচার-এর সঙ্গে। থ্যাচারের সঙ্গে সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা তিনি গভীর প্রশংসার সঙ্গে লিখেছিলেন, যা তার রাজনৈতিক ঝোঁকের পরিবর্তন আরও স্পষ্ট করে।
১৯৯০ সালে পেরুর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আলবের্তো ফুজিমোরির কাছে পরাজিত হওয়ার পর তার রাজনৈতিক অবস্থান আরও ডানদিকে সরে যায়। পরবর্তী সময়ে তিনি পেরুর প্রেসিডেন্ট দিনা বোলুয়ার্তে এবং চিলির ডানপন্থি নেতা হোসে আন্তোনিও কাস্ত-এর মতো রাজনীতিকদের সমর্থন করেন। একই সঙ্গে তিনি নারীবাদকে সাহিত্যজগতের ‘সবচেয়ে বড়ো শত্রু’ বলেও মন্তব্য করেছিলেন। তার পরবর্তী রচনাগুলোতেও বামপন্থী আদর্শকে তিনি ক্রমশ সন্দেহ ও সমালোচনার চোখে দেখতে শুরু করেন।
বইটিতে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস-এর সঙ্গে ভার্গাস ইয়োসার সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণভাবে এসেছে। দুই নোবেলজয়ী লেখকের বন্ধুত্ব, পরে মতাদর্শগত দূরত্ব এবং ১৯৭৬ সালে ভার্গাস ইয়োসার সেই বিখ্যাত ঘুষির ঘটনাকে মার্টিন শুধু ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে দেখেন না; তার মতে, সেটি ছিল দুই ভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্বাসেরও প্রতীকী বিচ্ছেদ।
সব মিলিয়ে, ‘মারিও ভার্গাস ইয়োসা: আ লাইফ’ ইয়োসার সাহিত্যিক কৃতিত্বের পাশাপাশি রাজনৈতিক অবস্থান, ব্যক্তিগত জীবন এবং ক্ষমতার প্রতি তার আকর্ষণ—সবকিছুকেই সমান নিষ্ঠুরতা ও বিশ্লেষণের সঙ্গে বিচার করেছে। তাই ভার্গাস ইয়োসাকে নতুনভাবে বুঝতে এই জীবনী গুরুত্বপূর্ণ।