বাংলা সাহিত্য ও বাঙালির জাতীয় জীবনে কাজী নজরুল ইসলামের অবস্থান এমন এক উচ্চতায়, যেখানে তার প্রতিটি পদচিহ্নই ইতিহাসের অংশ। তিনি শুধু বিদ্রোহের কবি নন; তিনি ছিলেন এক নিরন্তর যাত্রী, যার সাহিত্য, রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। তার জীবনের গতিপথ অনুসরণ করলে দেখা যায়, ভ্রমণ তার কাছে নিছক স্থানান্তর ছিল না; বরং ছিল মানুষের কাছে পৌঁছানোর, সমাজকে জানার এবং রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক চেতনা জাগিয়ে তোলার একটি কার্যকর মাধ্যম। তাই নজরুলের সফর-ইতিহাস কেবল তার ব্যক্তিগত জীবনকাহিনির অংশ নয়; তা একই সঙ্গে উপমহাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও মূল্যবান উপাদান।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নজরুলের সফর নিয়ে ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য গবেষণা হয়েছে। ঢাকা, কুমিল্লা, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, চট্টগ্রাম, সিলেট কিংবা ময়মনসিংহে তার অবস্থান ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নানা প্রামাণ্য দলিল আবিষ্কৃত হয়েছে। কিন্তু উত্তরবঙ্গের দিনাজপুর দীর্ঘদিন এই আলোচনার বাইরে ছিল। ফলে সাধারণ ধারণা ছিল, নজরুলের সঙ্গে দিনাজপুরের সম্পর্ক খুবই সামান্য। সাম্প্রতিক সময়ে প্রাপ্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল এবং পূর্বপ্রকাশিত গবেষণাগ্রন্থ একত্রে বিশ্লেষণ করলে সেই ধারণা আর টিকে থাকে না। বরং প্রতীয়মান হয়, ১৯২৬ সালেই নজরুল অন্তত দুইবার দিনাজপুর সফর করেছিলেন এবং এই দুই সফরের উদ্দেশ্য, প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক তাৎপর্য ভিন্ন হলেও পরস্পর সম্পর্কযুক্ত।
এই পুনর্মূল্যায়নের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ গবেষণা গ্রন্থ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নজরুল ইনস্টিটিউট প্রকাশিত ড. আবু হেনা আবদুল আউয়ালের বাংলাদেশে নজরুল সফর ও সংবর্ধনা গ্রন্থে প্রথমবারের মতো দলিলের ভিত্তিতে দেখানো হয়েছে যে, কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২৬ সালের ৬ মার্চ কৃষ্ণনগর থেকে দিনাজপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। এই তথ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো আনওয়ার হোসেনকে লেখা নজরুলের ১ মার্চ ১৯২৬ তারিখের একটি চিঠি। সেখানে তিনি লিখেছেন—
“এতদিন সুস্থ হয়তো হয়ে উঠতাম, কিন্তু অবসর বা বিশ্রাম পাচ্ছিনে জীবনে কিছুতেই। এই শরীর নিয়েই আবার বেরুব ৬ই মার্চ দিনাজপুরে। সেখানে ডিস্ট্রিক্ট কনফারেন্স…।”
এই সংক্ষিপ্ত চিঠিটি ইতিহাসচর্চার দৃষ্টিতে অসাধারণ মূল্যবান। কারণ এটি কেবল দিনাজপুরে যাওয়ার পরিকল্পনার উল্লেখ নয়; বরং সেই সফরের সময়, উদ্দেশ্য এবং কবির শারীরিক অবস্থারও প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য বহন করে।
রাজনৈতিক কর্মব্যস্ততায় অসুস্থ হয়ে পড়লেও তিনি নির্ধারিত কর্মসূচি বাতিল করেননি। বিশ্রামের পরিবর্তে তিনি জনগণের মধ্যে যাওয়াকেই বেছে নিয়েছিলেন। এই একটি চিঠিই প্রমাণ করে, ১৯২৬ সালের মার্চ মাসে তার দিনাজপুর সফর কোনো অনুমান নয়; এটি প্রত্যক্ষ দলিলসমর্থিত ঐতিহাসিক ঘটনা।
এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল দিনাজপুর জেলা প্রজা কনফারেন্সে যোগদান। ৯ মার্চ চেরাডাঙ্গিতে অনুষ্ঠিত ওই সম্মেলনে জননেতা আনোয়ারীর সভাপতিত্বে অধিবেশন বসে। সভার কার্যক্রম পরিচালনা করেন শ্রীযোগীন্দ্রচন্দ্র চক্রবর্তী, এম.সি., মো. কাদের বখশ, এম.এল.সি. এবং জেলা কংগ্রেস সভাপতি শ্রী নিশীথনাথ কুণ্ডু। সে সময়কার দিনাজপুরের রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বের প্রতিনিধিত্বকারী এই ব্যক্তিদের উপস্থিতি সম্মেলনের গুরুত্ব স্পষ্ট করে। সেখানে কাজী নজরুল ইসলাম উদ্বোধনী সংগীত পরিবেশন করেন। পরদিনও অধিবেশন সমান উৎসাহে চলতে থাকে। ১০ মার্চ তিনি দিনাজপুর ত্যাগ করে নিখিল বঙ্গীয় ও আসাম প্রদেশীয় মৎস্যজীবী সম্মিলনীর তৃতীয় অধিবেশনে যোগদানের উদ্দেশ্যে মাদারীপুরের পথে রওনা হন।
এই ঘটনাপ্রবাহ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়। ১৯২৬ সালের মার্চ মাসে নজরুলের দিনাজপুর সফর ছিল একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক সফর। তিনি কোনো সাহিত্যসভায় অতিথি হিসেবে যাননি; বরং কৃষক-প্রজাদের রাজনৈতিক সংগঠনের সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। সেই সময়ে তার রাজনৈতিক অবস্থানও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছিল। ‘ধূমকেতু’-পর্বের বিপ্লবী জাতীয়তাবাদ অতিক্রম করে তিনি শ্রমিক-কৃষকভিত্তিক রাজনীতির দিকে আরও দৃঢ়ভাবে অগ্রসর হচ্ছিলেন। লেবার স্বরাজ পার্টির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা, ‘লাঙল’ পত্রিকার সম্পাদনা এবং সাম্যবাদী চিন্তার প্রসারে তার ভূমিকা—সব মিলিয়ে দিনাজপুরের এই সফরকে তার রাজনৈতিক জীবনের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা হিসেবেই দেখা যায়।
কিন্তু এখানেই গবেষণার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি সামনে আসে। দীর্ঘদিন ধরে ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের অনেকেই দিনাজপুরে নজরুলের আগমনের প্রসঙ্গ বলতে ১৯২৬ সালের জুন মাসের একটি ঘটনাকেই একমাত্র ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেছেন। কারণ, ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘দিনাজপুর পত্রিকা’-র জুলাই ১৯২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত একটি সংবাদে জানানো হয় যে, গত ৩ আষাঢ় (১৭ জুন ১৯২৬) বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং দেশসেবক হেমন্ত কুমার সরকার দিনাজপুরে আগমন করেন। সন্ধ্যায় ড্রামেটিক ক্লাব-সংলগ্ন মাঠে নজরুল তার উদ্দীপনামূলক গান পরিবেশন করেন এবং হেমন্ত কুমার সরকার শ্রমিক সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন।
এই সংবাদ নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি একটি সমসাময়িক আঞ্চলিক সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রত্যক্ষ তথ্য। কিন্তু ড. আবু হেনা আবদুল আউয়ালের গবেষণায় উদ্ধৃত ১ মার্চের চিঠি এবং মার্চ মাসের জেলা প্রজা কনফারেন্সের বিবরণ সামনে আসার পর বিষয়টি নতুন আলোয় দেখা সম্ভব হচ্ছে। এখন পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়, মার্চ ও জুন—দুই সময়ের ঘটনাই সত্য; একটিকে অন্যটির বিকল্প হিসেবে দেখার কোনো কারণ নেই।
বরং দলিলগুলোর পারস্পরিক বিশ্লেষণ থেকে একটি নতুন ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়—১৯২৬ সালে কাজী নজরুল ইসলাম অন্তত দুইবার দিনাজপুর সফর করেছিলেন। প্রথমবার ৬ থেকে ১০ মার্চের মধ্যে জেলা প্রজা কনফারেন্স উপলক্ষ্যে এবং দ্বিতীয়বার জুন মাসে হেমন্ত কুমার সরকারের সঙ্গে শ্রমিক-কৃষক সংগঠন ও সাম্যবাদী রাজনৈতিক প্রচারের উদ্দেশ্যে। এই দুই সফরের উদ্দেশ্য পৃথক হলেও উভয়ই তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিল।
এখানে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উত্থাপিত হয়। যদি মার্চ মাসের সফর এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে, তবে ‘দিনাজপুর পত্রিকা’-য় তার সংবাদ কেন এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি? এর উত্তর সহজ নয়। আমাদের হাতে বর্তমানে পত্রিকার সব সংখ্যাই সংরক্ষিত নেই। মার্চ সংখ্যাটি অনুপস্থিত থাকতে পারে, কিংবা অন্য কোনো সমসাময়িক পত্রিকায় সংবাদটি প্রকাশিত হয়ে থাকতে পারে, যা এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। আবার জেলা প্রশাসনের নথি, ব্যক্তিগত চিঠিপত্র কিংবা সমসাময়িক রাজনৈতিক সংগঠনের দলিলেও এ বিষয়ে আরও তথ্য লুকিয়ে থাকতে পারে। ইতিহাসচর্চায় এ ধরনের শূন্যস্থান অস্বাভাবিক নয়। বরং নতুন দলিল আবিষ্কারের মধ্য দিয়েই ইতিহাস ক্রমাগত পরিমার্জিত হয়।
২.
মার্চ মাসের সফরকে দলিলসমর্থিতভাবে প্রতিষ্ঠিত করার পর জুন মাসের ঘটনাটিও নতুনভাবে মূল্যায়নের দাবি রাখে। ১৯২৬ সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত ‘দিনাজপুর পত্রিকা’-র সংবাদে বলা হয়, গত ৩ আষাঢ় (১৭ জুন ১৯২৬) বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং দেশসেবক হেমন্ত কুমার সরকার দিনাজপুরে আগমন করেন। সেদিন সন্ধ্যায় ড্রামেটিক ক্লাব-সংলগ্ন সুবিস্তৃত মাঠে নজরুল তার উদ্দীপনামূলক গান পরিবেশন করেন এবং হেমন্ত কুমার সরকার শ্রমিক সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন। সংবাদটি সংক্ষিপ্ত হলেও এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ এটি শুধু নজরুলের উপস্থিতির সংবাদ নয়; বরং তার রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রকৃতি সম্পর্কেও একটি প্রত্যক্ষ ধারণা দেয়।
এই সফরের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯২৬ সালের মধ্যভাগে নজরুল বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে শ্রমিক-কৃষক সংগঠনের পক্ষে গণসচেতনতা তৈরির কাজে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছিলেন। লেবার স্বরাজ পার্টির কার্যক্রম, লাঙল পত্রিকার মাধ্যমে সাম্যবাদী চেতনার প্রচার এবং হেমন্ত কুমার সরকারের মতো রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে যৌথ সফর—সব মিলিয়ে জুন মাসের দিনাজপুর সফরকে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রচারাভিযানের অংশ বলেই প্রতীয়মান হয়। অর্থাৎ মার্চের জেলা প্রজা কনফারেন্স এবং জুনের শ্রমিক-সংগঠনভিত্তিক জনসভা—দুটি ভিন্ন কর্মসূচি হলেও উভয়ের লক্ষ্য ছিল জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টি এবং সংগঠিত গণ-আন্দোলনের ভিত্তি শক্তিশালী করা।
এখানেই এই গবেষণার একটি মৌলিক অবদান নিহিত রয়েছে। এতদিন দিনাজপুরে নজরুলের আগমনের যে ইতিহাস প্রচলিত ছিল, তা মূলত জুন মাসের সংবাদটিকেই কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। কিন্তু ড. আবু হেনা আবদুল আউয়ালের গবেষণায় উদ্ধৃত ১ মার্চের চিঠি এবং জেলা প্রজা কনফারেন্সের বিবরণ যুক্ত হওয়ার ফলে বিষয়টি নতুনভাবে বিন্যস্ত করা সম্ভব হয়েছে। এখন উপলব্ধ দলিলসমূহ পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে বিচার করলে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, ১৯২৬ সালে নজরুলের দিনাজপুর সফর একবারের নয়, বরং অন্তত দুইবারের। প্রথম সফর ছিল ৬ থেকে ১০ মার্চের মধ্যে জেলা প্রজা কনফারেন্স উপলক্ষ্যে এবং দ্বিতীয় সফর জুন মাসে শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের প্রচারকর্মসূচির অংশ হিসেবে।
এই সিদ্ধান্তের আরেকটি তাৎপর্য রয়েছে। এটি নজরুলের রাজনৈতিক জীবনকে নতুনভাবে বুঝতে সাহায্য করে। কারণ মার্চের সফরে তিনি কৃষক ও প্রজাদের সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন, আর জুনে শ্রমিক সংগঠনের সভায় গান গাইছেন। দুটি ঘটনাই দেখায় যে, বিশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তার রাজনৈতিক কর্মধারা ক্রমশ শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের প্রশ্নে কেন্দ্রীভূত হয়ে উঠছিল। তার সাহিত্যে যে সাম্যবাদ, মানবমুক্তি ও শোষণবিরোধী চেতনার প্রকাশ আমরা দেখি, দিনাজপুরের এই দুই সফর সেই আদর্শের বাস্তব রাজনৈতিক প্রয়োগেরও সাক্ষ্য বহন করে।
তবে দিনাজপুরকে ঘিরে আরেকটি প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়ভাবে আলোচিত হয়েছে—কাজী নজরুল ইসলাম কি কখনও দিনাজপুর কারাগারে বন্দি ছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করতে গিয়ে ইতিহাসচর্চার একটি মৌলিক নীতি স্মরণে রাখা জরুরি। প্রত্যেক ঐতিহাসিক দাবির প্রমাণের শক্তি এক নয়। কোনো তথ্য প্রত্যক্ষ দলিল দ্বারা প্রতিষ্ঠিত, কোনোটি সমসাময়িক সংবাদপত্রে সংরক্ষিত, আবার কোনোটি স্মৃতিকথা বা জনশ্রুতির ওপর নির্ভরশীল। ইতিহাসবিদের কাজ হলো এই স্তরগুলোর পার্থক্য স্পষ্ট রাখা।
দিনাজপুর জেল-সংক্রান্ত আলোচনার প্রধান সূত্র সাহিত্যিক অজিত কুমার গুহের আত্মস্মৃতিমূলক রচনা ‘বুলু’। সেখানে তিনি দিনাজপুর জেলে অবস্থানের স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে একটি পরিচ্ছন্ন বাংলো, তার সামনে একটি বাতাবি লেবুর গাছ এবং সেই গাছকে ঘিরে প্রচলিত একটি কথার উল্লেখ করেন। তিনি লিখেছেন, শুনেছিলেন—বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম নাকি একসময় এই জেলে বন্দি ছিলেন এবং ওই গাছের নিচে বসে কবিতা লিখতেন।
এই বিবরণটি গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়লে দেখা যায়, লেখক কোথাও নিজেকে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে উপস্থাপন করেননি। বরং তিনি সচেতনভাবে লিখেছেন—“শুনেছিলাম” এবং “নাকি”। এই দুটি শব্দ ইতিহাসচর্চার দৃষ্টিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এগুলো স্পষ্ট করে যে তিনি একটি স্থানীয় জনশ্রুতি লিপিবদ্ধ করছেন; কোনো প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য ঘোষণা করছেন না। একজন দায়িত্বশীল স্মৃতিকথাকার হিসেবে তিনি শোনা কথাকে শোনা কথা হিসেবেই সংরক্ষণ করেছেন। এই সততাই তার লেখার বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি করে।
অন্যদিকে নজরুলের কারাবাসের ইতিহাস সম্পর্কে যে তথ্যগুলো আজ প্রতিষ্ঠিত, সেগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। হুগলি জেলে তার অনশন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের টেলিগ্রাম, রাজবন্দীর জবানবন্দী, বহরমপুর, আলিপুর ও প্রেসিডেন্সি কারাগারের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা—এসবই সরকারি নথি, সমসাময়িক সংবাদপত্র, চিঠিপত্র এবং নির্ভরযোগ্য গবেষণার মাধ্যমে সুপ্রতিষ্ঠিত। কিন্তু দিনাজপুর কারাগারের ক্ষেত্রে আজ পর্যন্ত এমন কোনো প্রত্যক্ষ দলিল আবিষ্কৃত হয়নি, যা তার বন্দিত্ব নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে।
এখানে ইতিহাসচর্চার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। কোনো ঘটনার পক্ষে এখনো দলিল না পাওয়া এবং ঘটনাটি কখনও ঘটেনি—এই দুটি বিষয় এক নয়। ঔপনিবেশিক আমলের বহু প্রশাসনিক নথি নষ্ট হয়েছে, অনেক জেলা পর্যায়ের রেকর্ড হারিয়ে গেছে এবং অসংখ্য আঞ্চলিক সংবাদপত্র সংরক্ষিত নেই। ফলে ভবিষ্যতে নতুন দলিল আবিষ্কৃত হওয়ার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু সেই সম্ভাবনার ভিত্তিতে কোনো দাবিকে প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস হিসেবেও গ্রহণ করা যায় না। ইতিহাসের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আমাদের এই সংযমই শেখায়।
এই কারণেই দিনাজপুর কারাগার-সংক্রান্ত জনশ্রুতিকে একদিকে যেমন অবহেলা করা উচিত নয়, তেমনি দলিলের অনুপস্থিতিতে তাকে নিশ্চিত ইতিহাস বলাও সমীচীন নয়। বরং এটি একটি সম্ভাবনাময় গবেষণার ক্ষেত্র, যার সত্যতা অনুসন্ধানের জন্য জেলা কারাগারের পুরোনো রেজিস্টার, ব্রিটিশ সরকারের কারা-বিভাগের নথি, জেলা প্রশাসনের সংরক্ষিত দলিল, সমসাময়িক সংবাদপত্র এবং ব্যক্তিগত চিঠিপত্র নিয়ে আরও বিস্তৃত অনুসন্ধান প্রয়োজন। ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার এভাবেই জনশ্রুতি থেকে শুরু হয়ে পরে দলিলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; আবার অনেক জনশ্রুতি গবেষণায় অসত্যও প্রমাণিত হয়েছে। তাই এই প্রশ্নে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে আরও অনুসন্ধান অপরিহার্য।
৩.
দিনাজপুরে কাজী নজরুল ইসলামের উপস্থিতি নিয়ে আজ যে নতুন করে আলোচনা সম্ভব হচ্ছে, তার মূল কারণ সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন সূত্রকে সমন্বিতভাবে পাঠ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ইতিহাসচর্চা কখনোই স্থির নয়; নতুন দলিল আবিষ্কার, পুরোনো নথির পুনঃপাঠ এবং বিভিন্ন সূত্রের আন্তঃসম্পর্ক বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের নতুন ব্যাখ্যা নির্মিত হয়। দিনাজপুরে নজরুলের সফর-ইতিহাসও তার ব্যতিক্রম নয়। একসময় যে ঘটনাকে একটি বিচ্ছিন্ন সফর বলে মনে করা হতো, আজ উপলব্ধ দলিলসমূহ বিশ্লেষণ করলে তা একটি ধারাবাহিক রাজনৈতিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রতীয়মান হয়।
এই প্রেক্ষাপটে ড. আবু হেনা আবদুল আউয়ালের বাংলাদেশে নজরুল সফর ও সংবর্ধনা গ্রন্থ বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। কারণ এই গ্রন্থে সংরক্ষিত নজরুলের ১ মার্চ ১৯২৬ তারিখে আনওয়ার হোসেনকে লেখা চিঠি দিনাজপুর সফরের এমন একটি প্রত্যক্ষ দলিল, যা গবেষণাকে নতুন ভিত্তি প্রদান করেছে। অন্যদিকে, ১৯২৬ সালের জুলাই মাসের দিনাজপুর পত্রিকা জুন মাসের সফরের সমসাময়িক সংবাদ বহন করে। এই দুটি সূত্র একত্রে বিচার করলে যুক্তিসঙ্গতভাবেই বলা যায় যে, ১৯২৬ সালে কাজী নজরুল ইসলাম অন্তত দুইবার দিনাজপুরে এসেছিলেন—প্রথমবার জেলা প্রজা কনফারেন্সে অংশগ্রহণের জন্য এবং দ্বিতীয়বার শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রচারাভিযানের অংশ হিসেবে। বর্তমান পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্তই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও ইতিহাসসম্মত।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, মার্চ মাসের জেলা প্রজা কনফারেন্সে যাদের উপস্থিতির কথা জানা যায়—শ্রীযোগীন্দ্র চন্দ্র চক্রবর্তী, মো. কাদের বখশ, শ্রী নিশীথনাথ কুণ্ডু এবং জননেতা আনোয়ারী—তারা সে সময়ের দিনাজপুরের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব। তাদের উপস্থিতি সম্মেলনের গুরুত্বকে আরও সুস্পষ্ট করে। ফলে এই সম্মেলনকে স্থানীয় পর্যায়ের একটি সাধারণ অনুষ্ঠান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ছিল তৎকালীন কৃষক-প্রজা রাজনীতির একটি উল্লেখযোগ্য আঞ্চলিক সমাবেশ, যেখানে নজরুলের অংশগ্রহণ তার রাজনৈতিক অবস্থান ও জনসম্পৃক্ততারই বহিঃপ্রকাশ।
একইভাবে জুন মাসের সফরও তার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচির ধারাবাহিক অংশ। ড্রামেটিক ক্লাব-সংলগ্ন মাঠে তার উদ্বুদ্ধকারী গান পরিবেশন এবং হেমন্ত কুমার সরকারের শ্রমিক সংগঠনবিষয়ক বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়, সাহিত্য ও সংগীতকে তিনি কেবল নান্দনিক চর্চার বিষয় হিসেবে দেখেননি; বরং জনজাগরণের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দিনাজপুর তার রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ভ্রমণপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, যার যথাযথ মূল্যায়ন এতদিন পর্যাপ্তভাবে হয়নি।
অন্যদিকে দিনাজপুর কারাগারে নজরুলের বন্দিত্বের প্রশ্ন আমাদের ইতিহাসচর্চার আরেকটি মৌলিক শিক্ষা দেয়। ইতিহাসে কোনো জনশ্রুতিকে অবজ্ঞা করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি দলিলের অভাবে তাকে প্রতিষ্ঠিত সত্য বলাও গ্রহণযোগ্য নয়। অজিত কুমার গুহের স্মৃতিকথা একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সূত্র, কারণ তা স্থানীয় স্মৃতিকে সংরক্ষণ করেছে। কিন্তু বর্তমান পর্যন্ত সরকারি নথি, বিচার-রেকর্ড, কারা-বিভাগের দলিল কিংবা সমসাময়িক সংবাদপত্রে সেই দাবির প্রত্যক্ষ সমর্থন পাওয়া যায়নি। তাই এই বিষয়টিকে ‘গবেষণাধীন ঐতিহাসিক সম্ভাবনা’ হিসেবে বিবেচনা করাই ইতিহাসচর্চার সততা ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই গবেষণার আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো সময়ের প্রেক্ষাপট। ২০২৬ সাল দিনাজপুরে কাজী নজরুল ইসলামের আগমনের একশত বছর পূর্তির বছর। শতবর্ষ কেবল একটি স্মারক উদ্যাপনের উপলক্ষ্য নয়; এটি ইতিহাসকে নতুন করে যাচাই, পুনঃপাঠ এবং পুনর্লিখনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। যদি ১৯২৬ সালের মার্চ ও জুন—উভয় সফরকে দলিলের আলোকে যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়, তবে দিনাজপুরের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে একটি দীর্ঘদিনের শূন্যতা পূরণ হবে। একই সঙ্গে জাতীয় কবির কর্মজীবনের একটি অবহেলিত অধ্যায়ও নতুন মর্যাদা লাভ করবে।
এই শতবর্ষকে সামনে রেখে কয়েকটি উদ্যোগ বিশেষভাবে গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রথমত, ১৯২৬ সালের দিনাজপুর পত্রিকা-র সব উপলব্ধ সংখ্যা পুনরুদ্ধার ও ডিজিটাল সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। দ্বিতীয়ত, জেলা প্রশাসনের রেকর্ড রুম, জেলা কারাগারের পুরোনো নথি, ভূমি ও রাজস্ব বিভাগের দলিল, তৎকালীন রাজনৈতিক সংগঠনের কাগজপত্র এবং ব্রিটিশ ভারতের প্রশাসনিক নথি পুনরায় অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, সমসাময়িক জাতীয় ও আঞ্চলিক সংবাদপত্র—বিশেষত মার্চ থেকে জুন ১৯২৬ সময়কালের—পদ্ধতিগত অনুসন্ধান নতুন তথ্যের সন্ধান দিতে পারে। চতুর্থত, দিনাজপুর অঞ্চলের প্রাচীন পরিবারগুলোর ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা চিঠিপত্র, ডায়েরি, আলোকচিত্র কিংবা স্মারকও মূল্যবান ঐতিহাসিক উপাদান হয়ে উঠতে পারে। ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এভাবেই ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে জনসমক্ষে এসেছে।
একই সঙ্গে দিনাজপুরে নজরুল-স্মৃতি সংরক্ষণের বিষয়টিও নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে। তিনি যে স্থানগুলোতে সভা করেছেন, গান গেয়েছেন বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন, সেগুলো চিহ্নিত করে স্মারক ফলক স্থাপন, গবেষণা সেমিনার আয়োজন, দলিল-প্রদর্শনী এবং শতবর্ষ স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের মতো উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। এসব পদক্ষেপ শুধু একজন কবির স্মৃতিকে সম্মান জানানো হবে না; বরং উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
সবশেষে বলা যায়, বর্তমান পর্যন্ত প্রাপ্ত দলিলের আলোকে তিনটি বিষয় যথেষ্ট স্পষ্ট। প্রথমত, কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২৬ সালের মার্চ মাসে জেলা প্রজা কনফারেন্সে অংশগ্রহণের জন্য দিনাজপুরে এসেছিলেন—এর প্রত্যক্ষ ভিত্তি তার নিজের লেখা চিঠি এবং ড. আবু হেনা আবদুল আউয়ালের গবেষণা। দ্বিতীয়ত, তিনি একই বছরের জুন মাসে হেমন্ত কুমার সরকারের সঙ্গে পুনরায় দিনাজপুরে এসে শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের পক্ষে গণসচেতনতামূলক কর্মসূচিতে অংশ নেন—এর সমসাময়িক সাক্ষ্য দিনাজপুর পত্রিকা। তৃতীয়ত, দিনাজপুর কারাগারে তার বন্দিত্বের বিষয়টি এখনো নিশ্চিত ঐতিহাসিক সত্য নয়; বরং এটি আরও অনুসন্ধানসাপেক্ষ একটি গবেষণার ক্ষেত্র।
ইতিহাসের প্রতি দায়িত্বশীলতার অর্থ কেবল নতুন তথ্য আবিষ্কার নয়; বরং তথ্যের শক্তি অনুযায়ী তার মূল্য নির্ধারণ করাও। যেখানে প্রত্যক্ষ দলিল রয়েছে, সেখানে দৃঢ়ভাবে কথা বলতে হবে; আর যেখানে কেবল সম্ভাবনার ইঙ্গিত রয়েছে, সেখানে সংযমই ইতিহাসচর্চার প্রধান শর্ত। এই দৃষ্টিকোণ থেকেই বলা যায়, ১৯২৬ সালে দিনাজপুরে কাজী নজরুল ইসলামের দুই দফা সফর আজ আর কেবল একটি স্থানীয় স্মৃতি নয়; তা ক্রমশ দলিলসমর্থিত ইতিহাসে পরিণত হচ্ছে। সেই ইতিহাসের যথাযথ পুনর্মূল্যায়ন এবং সংরক্ষণই হতে পারে দিনাজপুরে নজরুল আগমনের শতবর্ষ উদ্যাপনের সর্বাধিক অর্থবহ শ্রদ্ধার্ঘ্য।
গ্রন্থপঞ্জি:
১. শ্রীমাধবচন্দ্র শীকদার(সম্পাদক), ‘দিনাজপুর পত্রিকা’, দিনাজপুর, জুলাই, ১৯২৬
২. অরুণকুমার বসু, ‘নজরুল-জীবনী’, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, কলকাতা, জানুয়ারি ২০০০
৩. আবদুল কাদির,’কবি নজরুল’, হরফ প্রকাশনী, কলকাতা, জানুয়ারি ১৯৭০
৪. কাজি আবদুল ওদুদ, ‘নজরুল প্রতিভা’, বর্মন পাবলিশিং হাউস, কলকাতা, জানুয়ারি ১৯৪১
৫. রফিকুল ইসলাম, ‘কাজী নজরুল ইসলাম, জীবন ও সৃষ্টি’, কে.পি. বাগচী, কলকাতা, জানুয়ারি ১৯৯১, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, জানুয়ারি, ২০০০
৬. গোলাম মুরশিদ, ‘বিদ্রোহী রণক্লান্ত: নজরুল-জীবনী’, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা, চতুর্থ সংস্করণ, ফেব্রুয়ারি ২০২৩
৭. ড. আবু হেনা আবদুল আউয়াল, ‘বাংলাদেশে নজরুল সফর ও সংবর্ধনা’, নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা, ডিসেম্বর ১৯৯৯