‘সকালে শ্যামলীতে গিয়ে দেখি ট্রাফিক পুলিশ লাঠি হাতে পাম্পের সামনে দাঁড়িয়ে। ডাবল লাইন করতে দিচ্ছে না। পাম্পে গ্যাস আছে, কিন্তু চাপ নেই। এক ঘণ্টায় তিনটি গাড়ি গ্যাস নিচ্ছে। এক চালক হর্ন বাজিয়ে বলছে—ভাই, প্রেশার বাড়ান। ভেতর থেকে উত্তর আসে, প্রেশার আমরা বানাই না।’
রাজধানীর উবারচালক ইব্রাহিম শনিবার (১ আগস্ট) দিনের শুরুটার বর্ণনা করেন এভাবেই।
তিনি বলেন, ‘আমার পেছনে এক ব্যক্তি অসুস্থ সন্তানকে গাড়িতে বসিয়ে রেখেছিলেন। তিনি ফোনে বারবার বলছিলেন—মা, একটু দেরি হবে, গ্যাস পাচ্ছি না। আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করে বুঝলাম এখানে হবে না। পরে হোয়াটসঅ্যাপে খবর পেলাম, মহাখালীতে গ্যাস দিচ্ছে।’
ইব্রাহিম বলেন, ‘মহাখালীতে ছুটলাম। রাস্তায় জ্যাম। মিটারে তাকিয়ে দেখি লাল বাতি জ্বলছে। মনে হচ্ছিল, মাঝপথে বন্ধ হয়ে গেলে ঠেলা দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না। আল্লাহর নাম নিয়ে চালিয়ে মহাখালী পাম্পে গিয়ে দেখি গেট বন্ধ। সাইনবোর্ডে লেখা—গ্যাস সরবরাহ বন্ধ। গেটের সামনে ২০-২৫ জন চালক বসে বা গাড়িতে শুয়ে আছেন। সবাই মোবাইলে কোথায় গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, সেই খবর খুঁজছেন।’
শনিবার বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর হাতিরঝিল-সংলগ্ন মেরুল বাড্ডার জামান ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, ‘লাইনে গ্যাস নেই, পাম্প বন্ধ’ লেখা নোটিশ ঝুলছে। চলমান গ্যাস সংকটের মধ্যে গত রাত থেকে স্টেশনটিতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
মূল সড়কের পাশে হওয়ায় সংকটের সময় ট্রাফিক পুলিশ সেখানে সিএনজি ও প্রাইভেটকারের সারি করতে দিচ্ছে না। এ কারণে চালকেরা হাতিরঝিলের ভেতরে গাড়ি রেখে অপেক্ষা করতেন। তবে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় শনিবার সেখানে কোনো গাড়ির সারি ছিল না। কিছু গাড়ি এলেও পাম্প বন্ধের নোটিশ দেখে ফিরে যেতে দেখা যায়।
সিএনজি চালক মোবারক হোসেন বলেন, পাম্প বন্ধের খবর তিনি জানতেন না। গ্যাস নিতে এসে বন্ধ দেখতে পেয়ে এখন অন্য পাম্পে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘গ্যাস সংকটে জীবন দুর্বিষহ হয়ে যাচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে চালকেরা অসহায় হয়ে পড়ছেন।’
তার ভাষ্য, পুরো রাজধানীতে গ্যাসচালিত যানবাহন কমে গেছে। ঠিকমতো গাড়ি চালাতে না পারায় তাদের পরিবারও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে।
আরেক সিএনজি চালক মোতাহার হোসেন বলেন, মালিবাগে দীর্ঘ লাইন দেখে তিনি এখানে এসেছিলেন। এসে দেখেন পাম্পই বন্ধ।
তিনি বলেন, ‘গ্যাসের কারণে এখন দুঃখ-দুর্দশার সীমা নেই। সবকিছু অচল হয়ে গেছে। গাড়ি চালাতে পারছি না। জমা আছে, পরিবার আছে। সব মিলিয়ে ধারদেনা করতে হচ্ছে।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর অনেক সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় কর্তৃপক্ষ এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিশেষ করে গ্যাসের চাপ কম থাকায় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িগুলোকে সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অনেক সময় গ্যাস দিতে দিতেই সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এতে চালকদের ক্ষোভের মুখে পড়তে হচ্ছে স্টেশন কর্তৃপক্ষকে। এ অবস্থায় অনেক পাম্প বন্ধ রাখা ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই।
জামান ফিলিং স্টেশনের কর্মী রাকিব ইসলাম বলেন, ‘আমাদের বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। এই অবস্থায় আমরা কী করবো? যেহেতু গ্যাস পাচ্ছি না, তাই কর্তৃপক্ষ বন্ধ করে দিয়েছে।’
জানা গেছে, গ্যাস না পাওয়ার কারণে মালিবাগ, বিমানবন্দর এলাকা, খিলক্ষেতসহ রাজধানীর আরও অনেক সিএনজি পাম্প বন্ধ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কবে গ্যাস পরিস্থিতির উন্নতি হবে, তা কেউ বলতে পারছেন না। সামনে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। গ্যাস না পেলে গ্যাসচালিত যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে। রাজধানীতে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ হাজার সিএনজি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এসব যানবাহন বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে এসব সিএনজিনির্ভর পরিবারের জীবিকাও সংকটে পড়বে।
চালকেরা বলেন, ‘কিছুদিন আগে তেল নিয়ে লঙ্কাকাণ্ড দেখেছি। এরপর শুরু হলো গ্যাস সংকট। এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও যে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, তা দিয়ে দু-একটি ট্রিপের বেশি দেওয়া যায় না। আবার পাম্পে দৌড়াতে হয়।’
তাদের ভাষ্য, ‘এভাবে জীবন চলে না। তার চেয়ে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকলে সেটি স্পষ্ট করে জানানো হোক। যেদিন পরিস্থিতি ঠিক হবে, সেদিন থেকে আবার দেওয়া হোক। এভাবে মানুষ কষ্ট করবে, কিন্তু গ্যাস পাবে না—এটা হতে পারে না।’
গ্যাস পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে বা হতে কতদিন লাগবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন চালকেরা।