ফুটবলে কিছু নাম কখনও শুধু একজন খেলোয়াড়ের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। তারা হয়ে ওঠেন আদর্শ, একটি যুগের প্রতীক। ফ্রাঙ্কো বারেসি ছিলেন তেমনই একজন। এসি মিলান ও ইতালির কিংবদন্তি এই ডিফেন্ডার রেখে গেছেন অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনটি বিশ্বকাপে তার তিনটি ভিন্ন ভূমিকা আজও ফুটবল ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
৬৬ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন ইতালির কিংবদন্তি ডিফেন্ডার ফ্রাঙ্কো বারেসি। মাঠে যেমন ছিলেন অনুকরণীয় ফুটবলার, তেমনি মাঠের বাইরেও ছিলেন আদর্শ ব্যক্তিত্ব। ক্লাব ক্যারিয়ারের পুরোটা সময় এসি মিলানের জার্সিতে কাটানো বারেসি ইতালির জাতীয় দলেরও অন্যতম আইকনিক ফুটবলার ছিলেন।
বিশ্বকাপে তার অর্জনের ঝুলিতে রয়েছে একটি সোনা, একটি রুপা ও একটি ব্রোঞ্জ পদক। চলুন ফিরে দেখা যাক তার তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপের গল্প।
স্পেন ১৯৮২
মাত্র ২২ বছর বয়সে কোচ এনজো বেয়ারজটের ডাকে ইতালির বিশ্বকাপ দলে জায়গা পান বারেসি।
অভিজ্ঞ ডিফেন্ডারদের উপস্থিতির কারণে পুরো টুর্নামেন্টে মাঠে নামার সুযোগ হয়নি তার। তবে বেঞ্চে বসেই শিখেছিলেন অনেক কিছু। সেই অভিজ্ঞতাই পরবর্তী সময়ে তাকে বিশ্বসেরাদের একজন হয়ে উঠতে সাহায্য করে।
সেই বিশ্বকাপেই ইতালি জিতে নেয় তাদের তৃতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা, আর বারেসিও হয়ে যান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য।
ইতালি ১৯৯০
১৯৮৬ বিশ্বকাপে কোচ বেয়ারজটের সঙ্গে মতপার্থক্যের কারণে দলে জায়গা হয়নি বারেসির।
কিন্তু ১৯৯০ সালে ঘরের মাঠে আয়োজিত বিশ্বকাপে তিনি ছিলেন ইতালির রক্ষণভাগের প্রাণভোমরা।
টুর্নামেন্টের সাতটি ম্যাচেই খেলেছেন বারেসি। তার নেতৃত্বে ইতালি পুরো আসরে মাত্র দুই গোল হজম করে। যদিও সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে টাইব্রেকারে হেরে শিরোপার স্বপ্ন ভেস্তে যায়। পরে তৃতীয় স্থান অর্জন করে আজ্জুরিরা।
বারেসির দুর্দান্ত পারফরম্যান্স তাকে শুধু সেই বিশ্বকাপের নয়, বরং পুরো যুগের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯৪
১৯৯৪ বিশ্বকাপ ছিল বারেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায়। গ্রুপ পর্বে নরওয়ের বিপক্ষে হাঁটুতে গুরুতর চোট পান তিনি। ধারণা করা হয়েছিল, পুরো টুর্নামেন্ট থেকেই ছিটকে গেছেন।
কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর অবিশ্বাস্যভাবে দ্রুত সেরে উঠে ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে পুরো ১২০ মিনিট খেলেন ইতালির অধিনায়ক। রক্ষণভাগে অসাধারণ পারফরম্যান্সে দলকে লড়াইয়ে রাখলেও শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে হেরে যায় ইতালি।
টাইব্রেকারে নিজের প্রথম শটটি মিস করেছিলেন বারেসি। তবু চোট কাটিয়ে ফাইনালে ফিরে এসে যে লড়াই তিনি উপহার দিয়েছিলেন, সেটিই হয়ে আছে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম অনুপ্রেরণার অধ্যায়।
কয়েক বছর আগে সেই স্মৃতি মনে করে বারেসি বলেছিলেন, ‘নরওয়ের বিপক্ষে চোট পাওয়ার পর মনে হয়েছিল আমার পৃথিবী ভেঙে পড়েছে। অস্ত্রোপচারের পর কোচ আমার কক্ষে এসে দলের সঙ্গে থেকে যাওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। আমি কখনও ভাবিনি আবার এই বিশ্বকাপে খেলতে পারবো। চিকিৎসা ও অনুশীলন চালিয়ে গেছি, আর সতীর্থদের লড়াই দেখেছি। প্রতিটি ম্যাচই ছিল বাঁচা-মরার লড়াই। দলটি অসাধারণ একটি বিশ্বকাপ খেলেছিল।’
নিজের নেতৃত্ব আর অদম্য মানসিকতায় ইতালি এবং বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে অমলিন ছাপ রেখে গেছেন বারেসি।