গাইবান্ধার পলাশবাড়ী পৌর শহরের ছোট শিমুলতলা পানের হাটের দখল ও নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ভাঙচুর ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় কয়েকজনকে দেশীয় অস্ত্র হাতে মহড়া দিতে এবং বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায় বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) সকালে পৌর শহরের ছোট শিমুলতলা এলাকার পানের হাটে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর এলাকায় চরম উত্তেজনা ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শিমুলতলার পানের হাট দীর্ঘদিন ধরে এলাকার অন্যতম বৃহৎ ও জমজমাট পানের বাজার হিসেবে পরিচিত। সরকারি ইজারাভুক্ত বা নির্ধারিত কোনও স্থানে না হলেও ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে গত ৮ থেকে ১০ বছর ধরে শিমুলতলার পান চাষি সমবায় সমিতি প্রতিদিন সকালে এ হাট পরিচালনা করে আসছিল। এখানে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার পান কেনাবেচা হয়।
তবে গত বছরের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর স্থানীয় জামায়াতপন্থি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, তারা ‘পানচাষি কল্যাণ সমিতি’ নামে একটি সাইনবোর্ড স্থাপন করে হাট পরিচালনা ও টোল আদায়সহ পুরো বাজারের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন।
এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে পান চাষি সমবায় সমিতি উপজেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেয়। অভিযোগের পর প্রশাসনের তদন্তে হাটের কার্যক্রম সাময়িক স্থগিত করা হয় এবং হাটের জন্য নির্মিত টিনশেড ও অন্যান্য অবকাঠামো অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি জমির মালিকও তার জমিতে হাট বসানোর বিষয়ে আপত্তি জানান বলে জানা গেছে।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের নির্দেশনা উপেক্ষা করে একটি পক্ষ হাটের কার্যক্রম চালিয়ে যায় এবং নিয়মিত হাসিল বা টোল আদায় অব্যাহত রাখে। এতে উভয় পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ ও উত্তেজনা চলছিল।
স্থানীয় সূত্র জানায়, হাটের দখল ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পলাশবাড়ী পৌর জামায়াতের আমির খায়রুল ইসলাম চাঁনের সমর্থক এবং উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুস সামাদের অনুসারী হিসেবে পরিচিত স্থানীয় কয়েকজনের মধ্যে বিরোধ প্রকট আকার ধারণ করে।
পান চাষি সমবায় সমিতির সদস্যদের দাবি, তারাই দীর্ঘদিন ধরে বৈধভাবে হাট পরিচালনা করে আসছেন। কিন্তু প্রভাব খাটিয়ে তাদের কাছ থেকে হাটের নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সমিতির সদস্য ও পানচাষিদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশাসনের পূর্বঘোষিত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার সকালে হাটের টিনশেড অপসারণ করতে গেলে বর্তমানে হাট নিয়ন্ত্রণকারী পক্ষের লোকজন বাধা দেয়। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। এ সময় দেশীয় অস্ত্রের মহড়া এবং বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে বলে তারা দাবি করেন।
এ ঘটনায় হাট এলাকার কয়েকটি টিনশেড, বেড়া, টেবিল ও বেঞ্চ ভাঙচুর করাসহ গাছের ডাল কেটে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পানের হাটকে ঘিরে দখল, নিয়ন্ত্রণ ও ইজারা আদায়ের বিষয়টি কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী দুটি পক্ষ সক্রিয় রয়েছে। এর জের ধরে গত এক মাস ধরে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, উত্তেজনা এবং সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। প্রায় দুই সপ্তাহ আগেও এ হাটকে কেন্দ্র করে মারামারির ঘটনা ঘটে।
তবে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চেষ্টা করা হলেও পৌর জামায়াতের আমির খায়রুল ইসলাম চান এবং উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুস সামাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে পলাশবাড়ী থানার ওসি সরোয়ারের আলম খান বলেন, হাটে ভাঙচুরের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এ ঘটনায় কোনও হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। ঘটনাস্থলে ককটেল বিস্ফোরণ হয়েছে নাকি ফটকার শব্দ ছিল, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া বিকালে উপজেলা প্রশাসন সংশ্লিষ্ট উভয় পক্ষকে আলোচনার জন্য ডেকেছে। সেখানে গৃহীত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, হাটের এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও সমাধানের লক্ষ্যে এর আগে কয়েক দফা বৈঠক করেছে পুলিশ ও প্রশাসন। সর্বশেষ গত ২০ মে হাট প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত এক সভায় প্রশাসনের কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানান গাইবান্ধা-৩ (সাদুল্লাপুর–পলাশবাড়ী আসন) আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম লেবু।