ঢাকাSaturday , 12 September 2026
  1. অন্যান্য
  2. আবহাওয়া
  3. খেলা
  4. চাকরি
  5. জীবনযাপন
  6. তথ্যপ্রযুক্তি
  7. প্রেস রিলিজ
  8. বাণিজ্য
  9. বাংলাদেশ
  10. বিনোদন
  11. বিশ্ব
  12. ভিডিও
  13. মতামত
  14. রাজনীতি
  15. শিক্ষা
আজকের সর্বশেষ সবখবর

অপ্রিয় হওয়ার সাহসিকতা ।। ইচিরো কিশিমি এবং ফুমিটাকি কোগা

UttorbongoBD
September 12, 2026 12:15 am
Link Copied!


হীনমন্যতার অনুভূতি ব্যক্তিগত ধারণামাত্র

দার্শনিক: ঠিক আছে। এবার আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্ককে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পর্যালোচনা করা যাক। ‘হীনমন্যতা বোধ’ (feeling of inferiority) সম্পর্কে তোমার ধারণা আছে কি?

যুবক: কী বিরক্তিকর প্রশ্ন! এ যাবৎ আমাদের আলোচনা থেকে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন যে, আমি হীনমন্যতার আস্ত এক ডিব্বা।

দার্শনিক: এই অনুভূতিটি আসলে কেমন, পরিষ্কার করে বলতে পার?

যুবক: এই যেমন ধরুন…বলা যেতে পারে—সংবাদপত্রে সমবয়সী কারও সাফল্যের গল্প দেখলেই আমার এই ধরনের অনুভূতি হয়। আমার সমবয়সী একজন…যে কি-না পৃথিবীর বুকে আমার সমপরিমাণ আলো-বাতাস উপভোগ করেছে…সে যদি এমন সফল হতে পারে, আমি তাহলে কী করছি? অথবা, কোনো বন্ধুকে সুখী দেখলে, তাঁদের সঙ্গে উদ্‌যাপনের পরিবর্তে আমার মন হিংসা ও হতাশায় ভরে ওঠে। অবশ্যই শুধু এই গুটিতে ঢাকা মুখাবয়বই নয়, আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং পেশার কথা আসলেও হীনমন্যতার তীব্র অনুভূতি পেয়ে বসে। তারপর রয়েছে আমার উপার্জন ও সামাজিক অবস্থান। আন্দাজ করছি, আমি হীনমন্যতা বোধের চরম গোলকধাঁধার মধ্যে খাবি খাচ্ছি।

দার্শনিক: আচ্ছা! কাকতালীয়ভাবে, ইদানিংকালের প্রেক্ষাপটে আলোচিত ‘হীনমন্যতা বোধ’ শব্দগুলো অ্যাডলারই প্রথম ব্যবহার করেন বলে ধরে নেওয়া হয়।

যুবক: ওহ্‌…! বিষয়টি জানতাম না।

দার্শনিক: অ্যাডলারের স্থানীয় জার্মান ভাষায় শব্দটি হলো ‘মিন্ডারভেয়ার্টিজকাইট্‌সগেফুল’ (minderwertigkeitsgefühl)- যার অর্থ হলো কম (minder) উপযোগিতার (wert) এক ধরনের অনুভূতি (gefühl)। অর্থাৎ ‘হীনমন্যতা বোধ’ বলতে নিজের মূল্যবোধের মূল্যায়নকে বোঝায়।

যুবক: মূল্যবোধের মূল্যায়ন?

দার্শনিক: হ্যাঁ, এটি হলো ‘একজনের কোনো মূল্য নেই অথবা একজনের মূল্য খুব বেশি’ ধরনের অনুভূতি।

যুবক: আমি এই অনুভূতির সঙ্গে খুবই পরিচিত। সোজা কথায় আমি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। অন্তর্জ্বালায় জ্বলে পুড়ে মরা ব্যতীত একটা মুহূর্তও পার করতে পারছি না—বেঁচে থাকার কোনো অর্থই খুঁজে পাই না।

দার্শনিক: আচ্ছা, তাহলে হীনমন্যতা বোধ সম্পর্কে আমার নিজস্ব ভাবনাগুলোর ওপর আলোকপাত করা যাক। তুমি যখন প্রথমবার আমাকে দেখলে তোমার ধারণা কেমন হয়েছিল? হ্যাঁ, বিশেষ করে- শারীরিক বৈশিষ্ট্যগত?

যুবক: হুম্‌ম! আচ্ছা….

দার্শনিক: লজ্জা বা লুকোছাপার কিছু নেই…সরাসরি বলো।

যুবক: ঠিক আছে, যা অনুমান করেছিলাম তার থেকে আপনাকে খর্বকায় মনে হয়েছে।

দার্শনিক: ধন্যবাদ। আমার উচ্চতা ১৫৫ সেন্টিমিটার। অ্যাডলারের উচ্চতাও মোটামুটি এমনই ছিল। একটা সময় ছিল—যখন ঠিক তোমার বয়সী ছিলাম—তখন উচ্চতা নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন ছিলাম। মনে হতো, আমার উচ্চতা যদি একজন গড়পড়তা মানুষের মতো হতো…আর ২০ সেন্টিমিটার, নিদেনপক্ষে ১০ সেন্টিমিটার বেশি হলে জীবনটাই পাল্টে যেত। মনে হতো যেন, আমার জন্য অধিকতর উপভোগ্য একটি জীবন অপেক্ষা করছে। এ রকম অনুভূতি নিয়ে একদিন এক বন্ধুর সঙ্গে আলাপ করতে গেলে সে এগুলোকে ‘একদম বাজে কথা’ বলে উড়িয়ে দিল।

যুবক: ভয়ঙ্কর! কোনো বন্ধু…!

দার্শনিক: তারপর সে জানতে চাইল, ‍‘তুমি আরেকটু লম্বা হলে কী করতে? আর তুমি কি জান—মানুষকে প্রশান্তি দেওয়ার মতো একটি অসাধারণ গুণ তোমার রয়েছে’? এ কথা সত্যি, একজন লম্বা-চওড়া শক্তিশালী মানুষ কেবল তাঁর শারীরিক আকারের কারণে কাউকে ভয় পাইয়ে দিতে পারে। অপরদিকে, আমার মতো খর্বাকৃতির একজন, মানুষের ক্লান্তি ও সন্দেহ দূর করে দিতে পারে। তখনই অনুধাবন করলাম যে, আমার এই ছোটখাট শারীরিক কাঠামো আমার চারপাশের অনেকের এবং আমার নিকটও খুবই কাম্য। অন্য কথায় বলতে হয়, আমার মূল্যবোধের রূপান্তর ঘটেছিল; উচ্চতা নিয়ে তাই আর কখনও হা-হুতাশ করিনি।

যুবক: আচ্ছা! কিন্তু তাহলে….

দার্শনিক: ধৈর্য ধর, আগে শেষ করি…। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমার উচ্চতা ১৫৫ সেন্টিমিটার কোনো হীনমন্যতার বিষয় ছিল না।

যুবক: হীনমন্যতার বিষয় ছিল না?

দার্শনিক: সত্যিকার অর্থে এতে কোনো ঘাটতি বা কারও থেকে কম বলে কিছু ছিল না। অবশ্যই ১৫৫ সেন্টিমিটার গড়পড়তা উচ্চতা থেকে কম এবং দালিলিকভাবে পরিমাপকৃত একটি সংখ্যামাত্র। প্রথম দর্শনে একে নিকৃষ্ট মনে হলেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমার এই উচ্চতায় কী ধরনের অর্থ (meaning) এবং মূল্যবোধ সংযোজন করতে পেরেছি।

যুবক: এর অর্থ কী?

দার্শনিক: উচ্চতা নিয়ে আমার অনুভূতি ছিল সম্পূর্ণরূপে হীনমন্যতার একটি কল্পিত ধারণা; অন্যের সঙ্গে তুলনা থেকে যার উদ্ভব। অর্থাৎ বলতে হয়, আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্ক থেকেই আমার এই হীনমন্যতা বোধ। কারণ নিজেকে তুলনা করার মতো যদি অন্য কেউ না থাকত, তবে আমার এই খর্বাকৃতি নিয়ে চিন্তা করার কোনো অবকাশ থাকত না। এই মুহূর্তে আমি, এমনকি তুমিও, হীনমন্যতার বিভিন্ন অনুভূতিতে ভুগছি। তবে বুঝতে চেষ্টা কর, তুমি যে হীনমন্যতায় ভূগছ তা বস্তুনিষ্ঠ কোনোকিছু নয় বরং একেবারেই কল্পিত একটি অনুভূতিমাত্র। এমনকি উচ্চতার মতো সংখ্যাতাত্ত্বিক বিষয়ও কেবল ধারণাগত একটি বিষয়ে পরিগণিত হয়েছে।

যুবক: অন্য কথায় বলতে হয়, আমরা যে হীনমন্যতায় ভুগছি তা মোটেই বস্তুনিষ্ঠ কিছু নয় বরং কল্পিত উপলব্ধি, তাই কি?

দার্শনিক: একদম ঠিক। আমার বন্ধুর দৃষ্টিকোণ থেকে বর্ণিত—আমি মানুষের উদ্বেগ দূর করে প্রশান্তি দিতে পারি অথবা তাঁদের ভয় পাইয়ে দেই না—এগুলো খুবই জোরালো যুক্তি হতে পারে। অবশ্যই এটি একটি নিজস্ব ব্যাখ্যা অথবা এটিকে তুমি ইচ্ছাকৃত অনুমানও বলতে পার। এই নিজস্ব ব্যাখ্যার একটি ভালো দিক হলো এটি তোমার নিজের পছন্দ বেছে নেওয়ার সুযোগ করে দেয়। অর্থাৎ স্পষ্টভাবে বলতে হয়, শারীরিক উচ্চতাকে আমি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করব না-কি অসুবিধা হিসেবে বিবেচনা করব তা পুরোপুরি আমার নিজের ওপর নির্ভর করে।

যুবক: এই যুক্তিতে আপনি নতুন জীবন ধারা বেছে নিতে পারেন?

দার্শনিক: ঠিকই বলেছ। আমরা বস্তুগত বিষয় পরিবর্তন করতে পারি না কিন্তু নিজস্ব কল্পিত জগতকে ইচ্ছেমতো পরিবর্তন করতে পারি। অর্থাৎ আমরা একটি ধারণাগত বা কল্পিত পৃথিবীতে বাস করছি—বিষয়টি নিয়ে আমরা শুরুতেই আলোচনা করেছি; তাই নয় কি?

যুবক: হ্যাঁ! নলকূপের পানি… ১৮ ডিগ্রি তাপমাত্রা…হাহ্‌..হা!

দার্শনিক: এবার হীনমন্যতা বোধের সেই জার্মান প্রতিশব্দটির (মিন্ডারভেয়ার্টিজকাইট্‌সগেফুল) কথা মনে কর। কিছুক্ষণ আগেই বলেছিলাম, ‘হীনমন্যতা বোধ’ হলো একজন ব্যক্তির নিজের মূল্যবোধের স্ব-মূল্যায়ন। এখন প্রশ্ন হলো, সেই মূল্যবোধটা আসলে কী? উদাহরণস্বরূপ হীরা-জহরতের কথা ভাবা যেতে পারে—যেগুলো উচ্চ মূল্যে ক্রয়-বিক্রয় হয়; অথবা মুদ্রা। এই জিনিসগুলোর একটি নির্দিষ্ট মূল্য পাওয়া যেতে পারে অথবা প্রতি ক্যারাট হিসেবে এর মূল্য নির্ধারণ করা যেতে পারে। কিন্তু যদি তোমার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন কর এবং ভাব, হীরা হলো সামান্য এক খণ্ড পাথর বৈ অন্য কিছু নয়, তাহলে?

যুবক: আসলে তা-ই, এভাবেও ভাবা যেতে পারে।

দার্শনিক: অন্য ভাবে বলতে গেলে, আসলে সামাজিক প্রেক্ষাপটের ওপর নির্ভর করে কোনোকিছুর মূল্য নির্ধারিত হয়। এক ডলারের একটি বিলের যে মূল্য দেওয়া হয় তা আসলে বস্তুগতভাবে আরোপিত কোনো মূল্য নয়; তবে, সাধারণ জ্ঞান ভিত্তিক একটি পদ্ধতি হতে পারে। কিন্তু কেউ যদি একে কোনো বস্তুর প্রকৃত ছাপা-খরচের সঙ্গে তুলনা করে; তবে, এর মূল্য কোনভাবেই এক ডলারের কাছাকাছি কিছু হবে না। পৃথিবীতে যদি কেবল আমিই থাকতাম এবং অন্য কারও কোনো অস্তিত্ব না থাকত; তাহলে সম্ভবত এই বিলটিকে শীতকালে ফায়ারপ্লেস-এ পুড়িয়ে আগুন জ্বালাতাম। হতে পারে এটি দিয়ে আঘাত করে আমি নিজের নাক উড়িয়ে দিতাম। ঠিক এই যুক্তি অনুসরণ করেই আমি বলতে পারি, আমার উচ্চতা নিয়ে উদ্বেগের কোনো হেতু নেই।

যুবক: পৃথিবীতে যদি কেবল আপনিই থাকতেন এবং অন্য কারও কোনো অস্তিত্ব না থাকত?

দার্শনিক: হ্যাঁ! শেষে মূল্য বা মূল্যবোধের এই সমস্যা আমাদের ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে পুনরায় আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের দিকেই নিয়ে আসে।

যুবক: এটি আবার আপনার সেই বক্তব্য ‘সকল সমস্যাই আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের সমস্যা’-এর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে, তাই কি?

দার্শনিক: হ্যাঁ! একদম ঠিক।

হীনমন্যতা-জটিলতা একটি অজুহাতমাত্র

যুবক: আপনি কি নিশ্চিতভাবে বলতে পারেন যে, হীনমন্যতার অনুভূতি (feeling of inferiority) প্রকৃতপক্ষেই একটি আন্তঃব্যক্তিক সমস্যা? এমনকি সামাজিকভাবে যাদের সফল হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে, আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যাদের নিজেদের দুর্বল বা হেয় প্রতিপন্ন করার কোনো প্রয়োজন হয় না, তাঁদেরও কিছুটা হীনমন্যতার অনুভূতি থাকে। বিশাল বিত্ত-বৈভবের মালিক ব্যবসায়ী, সকলের ঈর্ষণীয় অতুলনীয় সৌন্দর্যের অধিকারী রূপসী কিংবা অলিম্পিক গোল্ড মেডালিস্ট—সকলেরই কোনো না কোনো সময় হীনমন্যতার অনুভূতি হয়ে থাকতে পারে—আমার নিকট অন্ততঃ এমনটাই মনে হয়। এ বিষয়ে তাহলে কীভাবে চিন্তা করা উচিত?

দার্শনিক: সকলেরই হীনমন্যতার অনুভূতি থাকার বিষয়টি অ্যাডলারও স্বীকার করেন। তা ছাড়া, হীনমন্যতার অনুভূতি থাকা খারাপ কিছুও নয়।

যুবক: তাহলে মানুষ এগুলোকে প্রথমেই রাখে কেন?

দার্শনিক: সম্ভবত এজন্য যে, একটি নির্দিষ্ট ধারাবাহিকতায় বিষয়টি বোঝা প্রয়োজন। প্রথমত, মানুষ খুবই অসহায় অবস্থায় এই পৃথিবীতে আসে। সেই অসহায়ত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সে তাঁর সর্বশক্তি নিয়োগ করে। এই প্রচেষ্টাকে সর্বজনীন আকাঙ্ক্ষাও বলা যেতে পারে। এই তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে অ্যাডলার ‘শ্রেষ্ঠত্বের সাধনা’ (pursuit of superiority) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

যুবক: শ্রেষ্ঠত্বের সাধনা?

দার্শনিক: এটি এমন কিছু যাকে খুব সাধারণভাবে ‘ক্রমোন্নতির প্রত্যাশা’ অথবা ‘একটি আদর্শ অবস্থার অনুসন্ধান’ বলা যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে একটি বাচ্চার কথা বলা যেতে পারে—যে মাত্রই দু’পায়ে ভর দিয়ে থিতু হয়ে দাঁড়াতে শিখেছে। তাঁর ভিতরে ভাষা শেখার এবং এর উন্নয়ন ঘটানোর সর্বজনীন আকাঙ্ক্ষা কাজ করে। আর জেনে রাখ, মানব ইতিহাসের শুরু থেকে বিজ্ঞানের আজকের এই অগ্রযাত্রা সম্ভব হয়েছে কেবল এই ‘শ্রেষ্ঠত্বের সাধনা’ থেকেই।

যুবক: আচ্ছা, তারপর?

দার্শনিক: এর বিপরীত অবস্থানই হলো হীনমন্যতার অনুভূতি। প্রত্যেকেই এই ‘উন্নতি করার চাহিদা’, অন্য কথায় ‘শ্রেষ্ঠত্বের সাধনা’র অবস্থায় রয়েছে। একজন মানুষের বিভিন্ন আদর্শ বা লক্ষ্য থাকে এবং সেদিকে ধাবিত হয়; যদিও লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারার ব্যর্থতায় কখনও কখনও নিজেকে ছোট মনে হয়। পাচকদের কথাই ধরো। তাঁরা যতই অনুপ্রাণিত ও নিখুঁত হয় হীনমন্যতার অনুভূতি ততই তীব্রভাবে তাঁদের দহন করতে থাকে। এই আকাঙ্ক্ষা তাঁদের ভাবতে বাধ্য করে ‘আমি এখনও যথেষ্ট ভালো নই’ অথবা ‘আমার রান্নাকে আরও উন্নততর স্তরে নিয়ে যেতে হবে’ এবং এ ধরনের আরও কত কিছু!

যুবক: একথা ঠিক।

দার্শনিক: অ্যাডলার বলেছেন শ্রেষ্ঠত্বের সাধনা এবং হীনমন্যতার অনুভূতি কোনো অসুস্থতা বা রোগ নয়। বরং সুস্থ ও স্বাভাবিক প্রচেষ্টা এবং পূর্ণাঙ্গতার দিকে ধেয়ে চলার উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে। খারাপ পথে ব্যবহার করা না হলে হীনমন্যতার অনুভূতি বেঁচে থাকা এবং উন্নয়নের অনুঘটক হিসেবেও কাজ করতে পারে।

যুবক: হীনমন্যতার অনুভূতি তাহলে ইতিবাচক শুরুর প্রস্তুতি মঞ্চ (launch pad) হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে?

দার্শনিক: ঠিক বলেছ। একজন হীনমন্যতার অনুভূতি থেকে মুক্তি পেয়ে সম্মুখে এগিয়ে যেতে চায়। কেউ একজন কখনই তাঁর বিদ্যমান অবস্থা নিয়ে সন্তুষ্ট নয়—সেও উন্নতি করতে চায়। আবার আরেক জন সুখী হতে চায়। কোনো ক্ষেত্রেই হীনমন্যতার অনুভূতি নিয়ে হা-হুতাশ করার কিছু নেই; বরং তা কেবল একটি পদক্ষেপমাত্র।  তবে, এমন অনেক মানুষ রয়েছে যারা সামনের দিকে একটি পদক্ষেপ নিতেও ভয় পায়। আর এটিও মানতে নারাজ যে, বাস্তবমুখী কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে জীবনের বিদ্যমান অবস্থার পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব। আবার অনেক মানুষ আছে যারা কোনো রকম চেষ্টা না করেই হাল ছেড়ে দেয়। তাঁরা এমন কথা বলে যে, ‘আমি কোনভাবেই উন্নতি করার মতো যথেষ্ট ভালো নই’ অথবা ‘যদিও আমি চেষ্টা করি, সফল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই’।

যুবক: হ্যাঁ তা ঠিক! এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই—হীনমন্যতার অনুভূতি তীব্র হলে অধিকাংশ মানুষ হতাশ হয়ে পড়ে এবং বলে ‘আমি কোনভাবেই যথেষ্ট পরিমাণ ভালো নই’। কারণ এটাই হলো হীনমন্যতার অনুভূতি।

দার্শনিক: না, এটা হীনমন্যতার অনুভূতি নয় বরং এটা হলো হীনমন্যতা-জটিলতা (inferiority complex)।

যুবক: হীনমন্যতা-জটিলতা? হীনমন্যতার অনুভূতি ও হীনমন্যতা-জটিলতা তো একই বিষয়, তাই নয় কি?

দার্শনিক: সাবধান! ‘জটিলতা’ শব্দটি আমাদের দেশে ইদানিং ‘হীনমন্যতার অনুভূতি’র একই অর্থে ব্যবহৃত হয়। তুমি নিশ্চয়ই লোকজনকে বলতে শুনেছ ‘চোখের পাতা নিয়ে জটিলতায় আছি’ অথবা ‘তাঁর শিক্ষা নিয়ে জটিলতায় আছে’- এমন আরও অনেক কিছু। এটি শব্দটির নির্লজ্জ অপব্যবহার। মূলত ‘জটিলতা’ বলতে যৌগিক শ্রেণির আবেগ ও ধারণার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক অস্বাভাবিক মানসিক অবস্থাকে বোঝায়, যার সঙ্গে হীনমন্যতার অনুভূতির কোনো যোগসূত্র নেই। যেমন বলা যেতে পারে ফ্রয়েডের ‘ঈডিপাস-জটিলতা’ (Oedipus Complex); যা বিপরীত লিঙ্গের পিতা বা মাতার প্রতি সন্তানের অস্বাভাবিক আকর্ষণকে ব্যাখ্যা করার জন্য ব্যবহার করা হয়।

যুবক: হ্যাঁ। মা-জটিলতা (mother complex) বা বাবা-জটিলতা (father complex) বিষয়ক আলোচনায় এই অস্বাভাবিকতার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পার্থক্যগুলো সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়।

দার্শনিক: এ কারণেই ‘হীনমন্যতার অনুভূতি’ ও ‘হীনমন্যতা-জটিলতা’কে একত্রে গুলিয়ে না ফেলে সম্পূর্ণ পৃথকভাবে চিন্তা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

যুবক: তাহলে এ দুইয়ের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য কী?

দার্শনিক: হীনমন্যতার অনুভূতি থাকার মধ্যে আসলে বিশেষ খারাপ কিছু নেই। এটা তো বুঝতে পেরেছ, তাই না? যেমনটা অ্যাডলার বলেন- হীনমন্যতার অনুভূতি কঠোর প্রচেষ্টা ও পূর্ণাঙ্গ বিকাশের অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ মনে কর—একজনের তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে হীনমন্যতার অনুভূতি রয়েছে। সে মনে করে সে যথেষ্ট শিক্ষিত নয় এবং এজন্য অন্য সবার চেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হবে—তাহলে এটাতো একটি প্রত্যাশিত নির্দেশক। অন্যদিকে, হীনমন্যতা-জটিলতা হলো এমন এক অবস্থা যেখানে কেউ তাঁর হীনমন্যতার অনুভূতিকে এক ধরনের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। কেউ নিজে নিজে ভাবতে পারে- ‘আমি ভালো শিক্ষিত নই, তাই আমি সফল হতে পারব না’ অথবা ‘আমি দেখতে সুন্দর নই, এজন্য বিয়ে করতে পারব না’। যখন কেউ প্রাত্যহিক জীবনে ‘A হলো পরিস্থিতি, তাই B করা সম্ভব নয়’-এর মতো যুক্তির ওপর অধিক জোর দেয়, তখন এটি আর সাধারণ ‘হীনমন্যতার অনুভূতি’ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হয় না। তখন এটি হয়ে যায় একটি ‘হীনমন্যতা-জটিলতা’।

যুবক: না, এটি একটি বৈধ কার্য-কারণগত সম্পর্ক। দুর্বল শিক্ষাগত যোগ্যতা একটি ভালো চাকরি পাওয়া কিংবা জীবনে সফল হওয়ার সম্ভাবনাকে কমিয়ে দেয়। সামাজিক যোগ্যতার মানদণ্ডে আপনাকে নিচু স্তরের বলে গণ্য করা হয়, এবং আপনি সফল হতে পারেন না। এটি আদৌ কোনো অজুহাত নয়; এটি কেবল একটি রূঢ় বাস্তব সত্য, তাই না?

দার্শনিক: না, তুমি ভুল বলছ।

যুবক: কীভাবে? কোথায় ভুল করছি?

দার্শনিক: তুমি যাকে ‘কার্য-কারণগত সম্পর্ক’ বলছো অ্যাডলার তাকে ‘দৃশ্যমান কারণ ও ফলাফল’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ তুমি যেখানে গভীর কার্য-কারণগত সম্পর্ক রয়েছে বলে আশ্বস্ত হও, সেখানে আসলে কিছুই নেই। কেউ একজন একদা আমার কাছে তাঁর বিয়ে না হওয়ার কারণ হিসেবে ‘তাঁর ছোটবেলাতেই তাঁর মা-বাবার বিচ্ছেদ হওয়া’-কে উল্লেখ করেছিল। ফ্রয়েডের ঈটিওলজি’র (কারণ নির্ধারণ) দৃষ্টিকোণ থেকে মা-বাবার বিবাহ-বিচ্ছেদ ছিল একটি গভীর ক্ষত যা বিয়ে সম্পর্কে একজনের মতাদর্শের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে কার্য-কারণগত সম্পর্ক স্থাপন করে। তবে, অ্যাডলার তাঁর টেলিওলজি (উদ্দেশ্য নির্ধারণ) দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে এমন ‘দৃশ্যমান কারণ ও ফলাফল’ যুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করেন।

যুবক: তারপরও বাস্তবতা হলো, ভালো শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ সমাজে সফল হওয়ার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দেয়। আমি ভেবেছিলাম পৃথিবীর বাস্তবতা সম্পর্কে আপনি যথেষ্ট অভিজ্ঞ।

দার্শনিক: মূল বিষয় হলো, এই বাস্তবতাকে একজন কীভাবে মোকাবিলা করে। তুমি যা ভাবছ তা যদি হয়- ‘আমি ভালো শিক্ষিত নই, তাই আমি সফল হতে পারি না’; তাহলে ‘আমি সফল হতে পারি না’-এর পরিবর্তে তোমার বলা উচিত ‘আমি সফল হতে চাই না’।

যুবক: আমি সফল হতে চাই না? এটা কী ধরনের যুক্তি?

দার্শনিক: সোজাসুজি বলতে গেলে, সামনের দিকে এক পা এগিয়ে যাওয়াকেও ভীতিকর মনে হয়। তা ছাড়া, তুমি বাস্তবধর্মী প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে চাও না। তুমি এতটাও পরিবর্তন হতে চাও না যে, বর্তমানের আনন্দময় মুহূর্তগুলো—যেমন, খেলা বা শখের কাজে ব্যস্ত থাকার সময়—বিসর্জন দিতে হয়। অন্যভাবে বলতে হয়, তুমি তোমার জীবনধারা পরিবর্তনের সাহসিকতায় সমৃদ্ধ নও। এমনকি কিছু অভিযোগ বা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও বিদ্যমান অবস্থাকেই সহজতর মনে হয়।





Source link

×
📺

LIVE TV

Live Tv দেখতে নিচের বাটনে ক্লিক করুন।

📺 লাইভ দেখুন
error: Content is protected !!
🔴 LIVE html