ধানমন্ডির মতো অভিজাত এলাকায় একটি ক্লাবের জন্ম। স্বাধীনতার আগে নাম ছিল ইকবাল স্পোর্টিং। স্বাধীনতার পর নতুন নাম হলো আবাহনী ক্রীড়া চক্র। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বড় ছেলে শেখ কামালের হাত ধরে দেশের প্রথম আধুনিক চিন্তাধারার ক্লাব হিসেবে আবাহনীর যাত্রা। শুরু থেকেই দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের খেলায় অংশ নিয়ে ধীরে ধীরে তৈরি করে আলাদা সমর্থকগোষ্ঠী। ফুটবল, ক্রিকেট, হকিসহ বিভিন্ন খেলায় সাফল্য পেয়ে আকাশি-নীল জার্সির দলটি জায়গা করে নেয় মানুষের হৃদয়ে। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও সেই ভালোবাসায় ভাটা পড়েনি।
তখন কে ভেবেছিল ঐতিহ্যবাহী মোহামেডান, ওয়ান্ডারার্সসহ পুরোনো ক্লাবগুলোর পাশে নবীন আবাহনীও একদিন দেশের মানুষের আবেগের অংশ হয়ে উঠবে! ঢাকার ক্লাবপাড়া বলতে তখন মূলত মতিঝিল ও পুরান ঢাকাকেই বোঝানো হতো। সেই সময়ে ধানমন্ডিতে আবাহনীর যাত্রা ছিল ভিন্ন এক বার্তা। ধীরে ধীরে দেশের প্রথম আধুনিক ক্লাব হিসেবে নিজেদের আলাদা পরিচয় তৈরি করে আকাশি-নীলরা। মাঠের সাফল্য আর আধুনিক চিন্তাধারায় একসময় দেশের ক্রীড়াঙ্গনও যেন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একদিকে ঐতিহ্যবাহী মোহামেডান স্পোর্টিং, অন্যদিকে আবাহনী ক্রীড়া চক্র। কলকাতায় যেমন ইস্ট বেঙ্গল-মোহনবাগান, স্পেনে রিয়াল মাদ্রিদ-বার্সেলোনা; বাংলাদেশেও তৈরি হয় তেমনই এক তীব্র ক্রীড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
নিজেদের এলাকার একটি দল এত দ্রুত দেশের বড় একটি অংশের মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেবে, তা হয়তো অনেকেই ভাবেননি। কিন্তু একদল স্বপ্নবাজ মানুষের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, কঠোর পরিশ্রম ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তে একসময় অসম্ভবও সম্ভব হয়ে ওঠে। আর সেই পথচলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানা হয়ে ওঠে ধানমন্ডির আবাহনী মাঠ।
ধানমন্ডির আবাহনী মাঠের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় চারপাশের কোলাহল পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে চেনা এক দৃশ্য। মাঠের কোথাও ঘাস, কোথাও অনুশীলনের চাপে মাটি বেরিয়ে এসেছে। কোচের নির্দেশে বলের পেছনে ছুটছেন একদল তরুণ ফুটবলার। শুধু ফুটবল নয়, এই মাঠে হয়েছে ক্রিকেট, পাশে চলেছে বাস্কেটবলের অনুশীলন। স্থানীয়রাও সুযোগ পেলে খেলেছেন। সময়ের সঙ্গে কমপ্লেক্স নির্মাণে মাঠের পরিসর কিছুটা সংকুচিত হয়েছে। তবু ফুটবল দল প্রায় সারা বছরই এখানে অনুশীলন করে।
একসময় দেশের ফুটবলের জনপ্রিয়তা যখন তুঙ্গে, তখন এই মাঠে ম্যাচ মানেই ছিল অন্যরকম উত্তেজনা। দর্শকের ভিড়, প্রিয় দলের জার্সি গায়ে সমর্থকদের উচ্ছ্বাস, গোলের পর গর্জন- সব মিলিয়ে আবাহনী মাঠ হয়ে উঠেছিল ঢাকার ফুটবলের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। তবে আবাহনী মাঠের গল্প শুধু ম্যাচের দিনের নয়। এই গল্পের বড় একটি অংশজুড়ে আছে অনুশীলনের দিনগুলোও।
ভোরের আলো ফুটতেই কখনও দেখা যায় খেলোয়াড়েরা মাঠে ঢুকছেন। কারও মুখে ক্লান্তি, কারও চোখে স্বপ্ন। একজন তরুণ হয়তো ভাবছেন একদিন জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপাবেন। আরেকজন লড়ছেন দলে নিজের জায়গাটা ধরে রাখার জন্য। কোচের বাঁশি বাজে। শুরু হয় দৌড়, পাসিং, শুটিং আর কৌশলের অনুশীলন। ঘাম ঝরে। তৈরি হয় ফুটবলার। প্রিয় দলের অনুশীলন দেখতেও অনেক আগে থেকেই দর্শকেরা মাঠে এসে জড়ো হতেন। হাততালি দিয়ে উৎসাহ দিতেন প্রিয় খেলোয়াড়দের। এভাবেই একদিন একজন ফুটবলার তৈরি হয়েছেন। আর সেই তৈরির পুরো প্রক্রিয়ার নীরব সাক্ষী হয়ে থেকেছে আবাহনী মাঠ।
আবাহনী বাংলাদেশের ফুটবলের অন্যতম স্বনামধন্য নাম। কী জেতেনি ক্লাবটি! দেশের ফুটবলে প্রথম বিদেশি কোচ এনে চমক দেখিয়েছে দলটি। মাঠে আধুনিক ফুটবলের ছাপ রেখে জয় করেছে দর্শকের মন। ঘরোয়া ফুটবলের প্রায় সব বড় আসরের ট্রফিই উঠেছে ক্লাবটির শোকেসে। দেশের বাইরেও ভারতের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় সাফল্য পেয়েছে দলটি। এএফসি কাপের জোনাল সেমিফাইনালে উঠে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেখিয়েছে নিজেদের সামর্থ্য।
শুধু ফুটবল নয়, ক্রিকেট, হকিসহ অন্য খেলাতেও আবাহনী রেখেছে সাফল্যের ছাপ। দেশের বহু নামি-দামি খেলোয়াড়ের পদচারণা হয়েছে এই ক্লাবে। কেউ এখানে এসে তারকা হয়েছেন, কেউ রেখে গেছেন নিজের স্বাক্ষর। ফলে আবাহনী মাঠের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শুধু একটি ক্লাবের ইতিহাস নয়; জড়িয়ে আছে বহু প্রজন্মের খেলোয়াড়, কোচ ও সমর্থকের স্মৃতি।
সময় বদলেছে। দল বদলেছে, খেলোয়াড় বদলেছেন, বদলেছে ফুটবলের ধরনও। কিন্তু আবাহনী মাঠের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটা খুব বেশি বদলায়নি। এই মাঠে দাঁড়িয়ে পুরোনো সমর্থকেরা এখনও গল্পের ঝাঁপি খুলে বসেন। মনে পড়ে কোনও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের কথা। মনে পড়ে প্রিয় খেলোয়াড়ের গোল, শেষ মুহূর্তের জয় কিংবা এমন কোনও ম্যাচ, যেটি হেরে গেলেও বছরের পর বছর স্মৃতিতে থেকে গেছে।
ফুটবলের সৌন্দর্য বোধহয় এখানেই, একটি ম্যাচ শেষ হয়ে যায়, কিন্তু তার গল্প শেষ হয় না। আবাহনী মাঠে এখনও অনেকে এলে গল্পের ঝাঁপি খুলে বসেন। কেউ হয়তো বছরের পর বছর নিয়মিত এখানে এসেছেন। তাঁর কাছে মাঠটি শুধু খেলা দেখার জায়গা নয়; জীবনেরই একটি অংশ। ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে মাঠে এসেছেন। পরে নিজেই বন্ধুদের নিয়ে এসেছেন। সময়ের সঙ্গে চুলে পাক ধরেছে, জীবনে এসেছে নানা পরিবর্তন। কিন্তু আবাহনীর প্রতি টানটা রয়ে গেছে আগের মতোই।
আবার মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণদের গল্পও আলাদা। তাদের অনেকেই হয়তো এখনও বড় কোনও ম্যাচ খেলেননি। কিন্তু চোখে থাকে বড় স্বপ্ন, একদিন পেশাদার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের শুরু কখনো কখনো এমন একটি মাঠ থেকেই হয়।
আবাহনী মাঠের সৌন্দর্য হয়তো এখানেই, পুরোনো আর নতুনকে একসঙ্গে ধারণ করে আছে এটি। একদিকে অতীতের গৌরব, অন্যদিকে ভবিষ্যতের স্বপ্ন। একদিকে কিংবদন্তিদের স্মৃতি, অন্যদিকে নতুনদের পায়ের শব্দ। অনেক চড়াই উতরাই পেরিয়ে আবাহনী এগিয়ে গেছে। অনেক সময় অনেক বাধা এলেও সমর্থকদের মন জয় করে চলেছে। এই মাঠ তার বড় সাক্ষী।
তবে সময়ের সঙ্গে এবার বদলে যাচ্ছে এই মাঠের নামও। আর ‘আবাহনী মাঠ’ নামে পরিচিত থাকবে না এটি। নতুন নাম হয়েছে ধানমন্ডি ক্রিকেট মাঠ। নাম বদলাবে, সাইনবোর্ড বদলাবে, হয়তো ব্যবস্থাপনাও বদলাবে। কিন্তু সমর্থকদের হৃদয়ে ‘আবাহনী মাঠ’ নামটি কি আর মুছে ফেলা যায়?
যে মাঠে তৈরি হয়েছে কত ফুটবলারের গল্প, যে মাঠে জন্ম নিয়েছে কত স্মরণীয় মুহূর্ত, যে মাঠের গ্যালারিতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে উঠেছে উল্লাসের ঢেউ, সেই মাঠ তো কেবল একটি জায়গার নাম নয়। এটি আবাহনীর ইতিহাসের অংশ, ঢাকার ক্রীড়া সংস্কৃতির অংশ, আর অসংখ্য মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতিরও অংশ।