মিরপুর-১ নম্বর এলাকার সড়ক ও ফুটপাত থেকে অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ করায় স্বস্তি ফিরেছে পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে। আগে যেখানে হাঁটাচলাই কঠিন ছিল, এখন সেখানে নির্বিঘ্নে চলাচল করা যাচ্ছে। তবে উচ্ছেদের পর অটোরিকশা ও লেগুনার দখলে সড়কে যানজটের সমস্যা রয়ে গেছে। পাশাপাশি ফলের দোকান ও কাঁচাবাজার না থাকায় প্রয়োজনীয় পণ্য কেনাকাটায় ভোগান্তিতে পড়ছেন স্থানীয়রা। অন্যদিকে, উচ্ছেদে ব্যবসা হারিয়ে জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকালে ও সন্ধ্যায় দুই দফায় মিরপুর ১ নম্বর এলাকায় ফুটপাত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। এর মাঝে দুপুরে ডিএনসিসি’র এই অঞ্চলের পরিদর্শকও অভিযান চালায়। এরপর থেকে এই এলাকার রাস্তা ও ফুটপাত দখলমুক্ত হয়।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) এই এলাকায় সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ফুটপাত ও রাস্তায় অবৈধ কোনও দোকানপাট নেই। যেসব জায়গায় অবৈধ দোকান ছিল সেসব জায়গায় অস্থায়ীভাবে টবে বিভিন্ন গাছ রাখা হয়েছে। তবে রাস্তার যানজট কমাতে ও সৌন্দর্যবর্ধনে যে অভিযান পরিচালনা হয়েছিল, তা অনেকটাই ম্লান হয়েছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও লেগুনার কারণে। মাজারের সামনে থেকে ১ নম্বর গোলচত্বরের দিকে পর্যন্ত দেখা যায় অটোরিকশা ও লেগুনা কোথাও দুই সারি কোথাও তিন সারি করে দাঁড়িয়ে আছে।

এই রাস্তায় নিয়মিত চলাচলকারী মো. রাজীব বলেন, ফুটপাত আর রাস্তায় বসা দোকান ক্লিয়ার করে খুব ভালো একটা কাজ হয়েছে। কিন্তু অটোরিকশার কারণে জ্যাম এখনও লেগেই আছে। এদের সেন্স কম আছে, এরা রাস্তার মাঝখানে পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকে। যাত্রী থাকুক বা না থাকুক। আমার মনে হয় এখন এদের নিয়ন্ত্রণ করার সময় এসেছে। এই অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে রাস্তায় জ্যাম অনেক কমে যাবে।
রাস্তা দখল করে থাকা ফলের বাজার উঠিয়ে দেওয়া প্রসঙ্গে শিহাব উদ্দিন বলেন, উচ্ছেদের ফলে একদিকে যেমন কিছু অসুবিধা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে চলাচলের ক্ষেত্রে সুবিধাও হয়েছে। তাই বিষয়টি নিয়ে আমার প্রতিক্রিয়া আসলে মিশ্র।
তিনি বলেন, আগে এখানে ফলের দোকান ছিল। বিভিন্ন ফল সহজেই পাওয়া যেত। এখন সেসব দোকান না থাকায় প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র হাতের কাছে পাওয়া কিছুটা মুশকিল হয়ে গেছে। তবে আগে এখানে হাঁটাচলা করাই কঠিন ছিল, এখন সেখানে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করা যাচ্ছে। রাস্তা ফাঁকা হয়েছে, যানজট নেই এবং চলাচলেও সুবিধা হয়েছে।
মনিরুল ইসলাম বলেন, ফুটপাত ও রাস্তা দখলমুক্ত হওয়ায় মানুষের চলাচলে সুবিধা হয়েছে। আগে ফুটপাত ও রাস্তাগুলো বেশ সরু হয়ে গিয়েছিল। তবে এর পাশাপাশি কিছুটা সমস্যাও হচ্ছে। আশপাশের ছোট ছোট বাজার ও দোকানপাটের সঙ্গে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। এসব বাজার এখন না থাকায় প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। তবে এতে সাময়িক কিছু অসুবিধা হলেও চলাচলের ক্ষেত্রে অনেক সুবিধা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, রাস্তা দখলমুক্ত রাখার এই ব্যবস্থা স্থায়ী হওয়া উচিত। কারণ, রাস্তা সরু হয়ে গেলে যাতায়াতে সমস্যা হয়। তবে মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার সুবিধার জন্য আশপাশের জায়গায় নির্দিষ্ট স্থানে বাজার বসানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। রাস্তা দখল করে দোকানপাট না বসিয়ে নির্ধারিত জায়গায় বাজারের ব্যবস্থা করলে ভালো হবে।

এসময় নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে পথচারী মনির বলেন, আগে এই রাস্তাটুকু পার হতে প্রায় ১৫ মিনিট সময় লাগতো। এখন দুই মিনিটেই পার হওয়া যাচ্ছে। এটা অনেক বড় সুবিধা।
মিরপুর ১ নম্বরের বাজারে দীর্ঘদিন ধরে চালের ব্যবসা করেন মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম। রাস্তা ও ফুটপাতে অবৈধ দোকানপাটের উচ্ছেদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মূল সড়ক দখলমুক্ত করা হয়েছে, এটি ঠিক হয়েছে। এমন উদ্যোগের প্রয়োজন ছিল। তবে বাজারের ভেতরে যেসব জায়গা থেকে দোকানপাট সরানো হয়েছে, সেখানে কিছু প্রয়োজনীয় পণ্যের দোকান থাকা দরকার ছিল। বিশেষ করে ফলপট্টি ও কাঁচাবাজার—এই দুটি বাজার এলাকার মানুষের জন্য জরুরি। মিরপুর-১ নম্বরে আলাদা কোনও ফলপট্টি নেই। একইভাবে স্থানীয় সবজি বাজারেরও অভাব রয়েছে। এই দুটি বাজারের ব্যবস্থা করে দিলে বাকি সবকিছু ঠিক আছে।
ফলপট্টির বিষয়ে তিনি বলেন, আশির দশকে প্রথম ওভারব্রিজের নিচে কিছু ফলের দোকান বসতো। পরে সেখান থেকে ব্যবসায়ীরা সরে এসে এই মাথায় দোকান নিয়ে বসেন। একসময় তারা চাইলে দোকান ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করতে পারতেন, কিন্তু ফুটপাতে ব্যবসা করে সুবিধা পাওয়ায় আর দোকান নেননি। এখন তো সেগুলো উচ্ছেদ করা হয়েছে। বর্তমানে মিরপুর-১ নম্বরে ফলের আর কোনও দোকান নেই।
বাজারের বাইরের রাস্তায় সবজি ব্যবসায়ীদেরও উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে সরিয়ে দেয় ডিএনসিসি। সে প্রসঙ্গে নূরুল ইসলাম বলেন, কাঁচাবাজারের সবজির বাজারটি এক জায়গা থেকে সরিয়ে ওই সড়কে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এখন সেটিও সরিয়ে দেওয়া হলে সবজি বাজার থাকবে না। ভেতরে দু-একটি সবজির দোকান থাকলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে বেশি পরিমাণে সবজি কিনতে গেলে বাজারের প্রয়োজন হয়। আবার ভেতর থেকে কিনতে গেলে অত্যধিক দাম রাখে। আর এখন যেহেতু বাইরের সব দোকান উঠিয়ে দিয়েছে তাই দাম আরও বেড়ে যাবে।
এসময় নূরুল ইসলাম বলেন, ফলপট্টি ও কাঁচাবাজারের ব্যবস্থা ছাড়া বাকি যেসব দোকান রাস্তা দখল করে বসেছিল, সেগুলো সরিয়ে দেওয়া দরকার। তবে এই দুটি বাজার আবার রাস্তার ওপর না বসিয়ে সিটি করপোরেশনের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নির্দিষ্ট স্থানে গড়ে তোলা উচিত। এগুলো জনসাধারণের হাতে বা সমিতির অধীনে না দিয়ে সিটি করপোরেশন নিজেই পরিচালনা করলে ভালো হবে।

এদিকে প্রতিদিনের মতো আজকেও বাজারে এসেছেন সবজি বিক্রেতা মো. শাহ আলম। কিন্তু আজকে তার নিজের দোকান নেই। দুদিন আগে উচ্ছেদ অভিযানে তার সবজির দোকানও তুলে দেয়। তাই আজকে ঘুরে ঘুরে অন্যান্য দোকানে গিয়ে বসে সময় পার করছেন। এ সময় কথা হয় তার সাথে।
শাহ আলম বলেন, আগে এই জায়গায়ই ব্যবসা করতাম। সেদিনের উচ্ছেদের পর এখন আর ব্যবসা করতে পারছি না। দুদিন ধরে কাজ নেই। এটা নিয়ে তো অনেক টেনশনে আছি। আমার ইনকামে পরিবার চলে। এখন যদি আমার ইনকাম না হয়, তাহলে ফ্যামিলি চালাতে অনেক সমস্যায় পড়ে যাবো।
তিনি বলেন, শাহ আলী সিটি মার্কেটের নিচে আন্ডারগ্রাউন্ডে জায়গায় আমাদের ব্যবস্থা করে দিলে আমরা সেখানে দোকানপাট ও গোডাউন করে ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারতাম। ওটা সিটি করপোরেশনেরই মার্কেট। এটা হলে আমিসহ আমার মতো সবার অনেক উপকার হতো। আবার আমাদের রাস্তায়ও বসতে হতো না।
এর আগে গত বুধবার (২৮ অক্টোবর) সন্ধ্যায় দ্বিতীয় দফার উচ্ছেদ অভিযান শেষে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন বলেন, আমরা আগেও ঘোষণা দিয়েছি, আজও আপনাদের মাধ্যমে আবার বলছি—আমরা মিরপুর ১ নম্বরকে মিরপুর ১০ নম্বরের মতো বানাতে চাই। সে জন্য যদি আরও দুই-চার দিন কষ্ট করতে হয়, আমি সেই কাজ করার জন্য প্রস্তুত আছি। আগামীকাল থেকে যদি কেউ আবার এ ধরনের ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করে, পুলিশের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় নেতারা বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করবেন এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন।
তিনি আরও বলেন, মিরপুর ১ নম্বরে যে অভিযান শুরু করেছি, তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমরা এখানে থাকবো। এখানকার পরিবেশ ক্লিন করবো, গ্রিন করবো। আপনারাও আসুন, আমাদের সঙ্গে থাকুন। সবাই মিলে ঢাকাকে ক্লিন ও গ্রিন করার যে প্রত্যয় আমাদের রয়েছে, সেটি বাস্তবায়ন করি।
ছবি: আসাদ আবেদীন জয়