ঢাকাSunday , 1 November 2026
  1. অন্যান্য
  2. আবহাওয়া
  3. খেলা
  4. চাকরি
  5. জীবনযাপন
  6. তথ্যপ্রযুক্তি
  7. প্রেস রিলিজ
  8. বাণিজ্য
  9. বাংলাদেশ
  10. বিনোদন
  11. বিশ্ব
  12. ভিডিও
  13. মতামত
  14. রাজনীতি
  15. শিক্ষা
আজকের সর্বশেষ সবখবর

যে সংসারে ভালোবাসার কোনো হিসাব ছিল না

UttorbongoBD
November 1, 2026 4:55 pm
Link Copied!


নুহা তখন ক্লাস নাইনে পড়ে। নিবির অনার্স তৃতীয় বর্ষে। বয়সের ব্যবধানটা কম ছিল না। সম্পর্কের শুরুটাও কোনো গল্পের মতো সহজ ছিল না।

নিবির ছিল নুহার বড়ো বোনের বন্ধু। সেই সুবাদে নুহাকে আগে থেকেই চিনত। বোনের সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাওয়া-আসার সময় নিবিরের চোখে পড়ত নুহাকে। চঞ্চল, সাহসী ও হাসি-খুশি। সব সময় যেন চারপাশটাকে নিজের আনন্দ দিয়ে ভরিয়ে রাখে।

কখনো স্কুলের কোনো অনুষ্ঠানে নিবির কবিতা আবৃত্তি করত। কখনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অভিনয় করত। নিবির ছিল সংস্কৃতিমনা। নুহা দূরে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে শুনত তার কবিতা। কবিতা পড়ার সময় নিবিরের কণ্ঠটা যেন অন্যরকম হয়ে যেত। নুহা বুঝত না, কেন এত ভালো লাগে তাকে। শুধু জানত, নিবির যখন কবিতা পড়ে; তখন তার চোখ আটকে থাকে নিবিরের মুখে।

এভাবেই পরিচয় থেকে ভালো লাগা। ভালো লাগা থেকে ভালোবাসা। নিবির একসময় নিজের মনের কথা জানাল। নুহা প্রথমে রাজি হয়নি। কিন্তু ভালোবাসা তো সবসময় অনুমতি নিয়ে আসে না। ধীরে ধীরে নুহাও নিবিরকে ভালোবেসে ফেলে।

তারপর শুরু হলো আসল যুদ্ধ। পরিবার জানতে পারল। নুহার ওপর নজরদারি শুরু হলো। স্কুলে নিয়ে যাওয়া, নিয়ে আসা। একা কোথাও যেতে দেওয়া হয় না। পরিবারের বাইরে কারও সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয় না। কারও ফোন ব্যবহার করে নিবিরের সঙ্গে যেন যোগাযোগ করতে না পারে; সেদিকেও নজর রাখা হলো।

নুহা ছিল জেদি। লুকিয়ে বোনের ফোন নিয়ে নিবিরকে কল করত। কখনো বাবার ফোন থেকেও কল করত। একদিন ধরা পড়ে গেল। কল লিস্ট মুছে ফেললেই সব মুছে যায়—এমনটাই ভেবেছিল সে। কিন্তু বুঝতে পারেনি, ফোনের আরেক জায়গাতেও কল হিস্ট্রি থেকে যায়। বোনের কাছে ধরা পড়ে সেদিন অনেক মার খেল।

তারপর পরিবার থেকে একটি শর্ত দেওয়া হয়—মাধ্যমিকে ভালো রেজাল্ট করতে পারলে বিষয়টি ভেবে দেখা হবে।’ নুহা শর্তটি মেনে নিলো। নিবিরকে বলল, ‘এক বছর আমরা একটু কম কথা বলি। তুমি আমাকে বুঝতে চেষ্টা করো। আমাদের ভবিষ্যৎ আমার রেজাল্টের ওপর।’

নিবির রাজি হলো। দুজনের জন্য সময়টা সহজ ছিল না। কখনো কথা বলতে ইচ্ছে করেছে। কখনো অভিমান হয়েছে। কখনো মনে হয়েছে, এত দূরত্বের মধ্যে ভালোবাসাটা হয়তো টিকবে না। তবু দুজনই টিকে গেল। নুহা ভালো রেজাল্ট করল। তারপর ধীরে ধীরে পরিবারও নরম হলো। নুহা বোনকে বোঝাল। বোন অনেক ভেবে দেখলো। এর মধ্যে বোনের বিয়ে হয়ে গেল। বোনের ফোনটা নুহাকে দিয়ে গেল।

ততদিনে নিবিরের অনার্স শেষ। নুহা তখন বোনের ফোন দিয়েই নিবিরের সঙ্গে কথা বলত। নুহা ইন্টারমিডিয়েট শেষ করল। নিবির মাস্টার্স শেষ করে চাকরির জন্য ঢাকায় চলে গেল। বেতন খুব বেশি ছিল না। তবু সে চাকরি শুরু করল। শেষ পর্যন্ত দুই পরিবারের সম্মতিতে তাদের বিয়ে হলো। নুহা যে বিয়ের স্বপ্ন দেখেছিল, তার থেকেও বেশি আয়োজন হয়েছিল সেই বিয়েতে।

বিয়ের পর তারা ছোট্ট একটা বাসা নিলো। প্রথম দিকে নুহা কখনো জানতে চায়নি নিবির কত টাকা বেতন পায়। নিবিরও বলেনি। নুহার মনে হয়েছিল সংসার তো দুজনের। মানুষটা পাশে আছে, এটাই তো বড়ো কথা। কিন্তু একরাতে নিবির আর নিজেকে সামলাতে পারল না। বাসাভাড়া, বাজার, সংসারের নতুন নতুন প্রয়োজন, নুহার ছোটোখাটো শখ—সব মিলিয়ে মাস শেষ হওয়ার আগেই পকেট খালি হয়ে যাচ্ছিল।

সেই রাতে নিবির কেঁদে ফেলল। নুহা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। বলল, ‘কাঁদছো কেন?’ নিবির সব খুলে বলল। বেতন কত। কোথায় কত খরচ হয়। মাসের শেষে কেন হাতে কিছু থাকে না।

নুহা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘এই বাসা ছেড়ে দিই।’

নিবির অবাক হয়, ‘কোথায় যাব?’

‘গ্রামের একটু সাইডে। কম ভাড়ায় ভালো বাসা পাব। তোমার যাতায়াতে কষ্ট হবে, কিন্তু আমরা একসাথে তো থাকব।’

‘তোমার আর কিছু লাগবে না?’

নুহা হেসে বলল, ‘আমার এখন কিছুই লাগবে না। সংসারটা ঠিক থাকলেই হবে।’

তারপর সত্যিই তারা বাসা বদলাল। নতুন বাসায় ভাড়া কম কিন্তু গ্যাসের সমস্যা ছিল ভয়াবহ। রাত তিনটায় গ্যাস আসত। নুহা ঘুম থেকে উঠে রান্না করত। সারাদিনের রান্না করে রাখত। তাদের ফ্রিজ ছিল না। কখনো গরমে খাবার নষ্ট হয়ে যেত। তবু দুজন মিলে সেই খাবারই খেত। কখনো নুহা ভাত বসিয়ে ঘুমিয়ে পড়ত। নিবির উঠে ভাতের দিকে তাকাত। ভাতের মাড় ফেলে দিত। রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে কাজ করত। সংসারটা তখন কারও একার ছিল না। তাদের দুজনের ছিল।

পাঁচ মাস পর নিবিরের বেতন বাড়ল। তার যাতায়াতের কষ্টের কথা ভেবে তারা আবার বাসা বদলাল। অফিসের কাছাকাছি বাসা নিলো। তারপর সংসারটা একটু একটু করে সুন্দর হতে লাগল। নিবির অফিস করত। নুহা ঘর সামলাত। রান্না করত। ঘর গুছিয়ে রাখত। আর সন্ধ্যার পর দরজার দিকে তাকিয়ে থাকত।

নিবির ফিরলে মনে হতো, দিনটা সম্পূর্ণ হলো। মাস শেষে নিবির বেতন এনে নুহার হাতে দিত। নুহা সেই টাকা ভাগ করত। বাসাভাড়া। বাজার। সংসারের খরচ। নিবিরের পরিবারের জন্য সামান্য কিছু। তার নিজের পড়াশোনার খরচ। সবকিছুর পরও যতটুকু থাকত, ভবিষ্যতের জন্য জমিয়ে রাখত।

নিবিরের বেতন ধীরে ধীরে বাড়তে থাকল। নুহা চাকরি করার কথা ভাবত মাঝে মাঝে। তার যোগ্যতা ছিল। কিন্তু বাইরের জগতে একা চলাফেরা করার অভ্যাস ছিল না। পরিবার তাকে কখনো একা বাইরে ছাড়েনি। বাইরে থেকে সবাই যে নুহাকে সাহসী ভাবত, বাস্তবে পরিবারের গণ্ডির বাইরে নুহা ছিল ভীষণ অস্বস্তিতে থাকা একটা মেয়ে।

সে সংসার ভালোবাসত। রান্না করতে ভালোবাসত। ঘর সাজাতে ভালোবাসত। নিবিরের জন্য অপেক্ষা করতে ভালোবাসত। আর নিবিরও বলত, ‘তোমাকে কিছু করতে হবে না। আমার বেতন বাড়বে। তুমি সংসার সামলাবে, আমি বাইরেরটা সামলাব।’

নুহা মনে মনে ভাবত—‘এটাই তো আমার সাফল্য। আমার মানুষটা ভালো আছে, আমাদের সংসার ভালো আছে।’

এরপর তারা সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। প্রথমদিকে দুজনই ভয় পেয়েছিল। কী হবে? কীভাবে সামলাবে? তারপর একদিন দুজনই সিদ্ধান্ত নিলো—আসুক আমাদের সন্তান।

মাস যায়। দিন যায়। বছর যায়। সন্তান আসে না। ডাক্তারের কাছে যাওয়া হলো। পরীক্ষা হলো। দুজনের রিপোর্টই স্বাভাবিক। ডাক্তার বললেন, ‘কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা থাকলে তো ওষুধ দিতাম। এখন তো বলার মতো কোনো সমস্যা নেই। বাকিটা উপরওয়ালার ইচ্ছা।’

তারা খুশি হলো। অন্তত তাদের কারও কোনো সমস্যা নেই। তবু মাঝে মাঝে নুহা ভেঙে পড়ত। তখন নিবির তার হাত ধরে বলত, ‘তুমি আছো, আমি আছি। আমাদের আর কী দরকার?’

কখনো চিকিৎসার খরচে এমনও হয়েছে, মাসের পনেরো দিন বাকি অথচ নিবিরের হাতে মাত্র দুইশ টাকা। নুহা তখন বলেছে, ‘চিন্তা করো না। এই টাকা দিয়েই চলবে। আল্লাহ আছেন।’

মাছ-মাংস বন্ধ হয়েছে। কয়েকদিন ডাল-ভাত আর সবজি দিয়ে চলেছে। কিন্তু অভিযোগ আসেনি। কারও মুখ থেকে ‘কেন এমন হলো’ বের হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে নিবিরের বেতন আরও বাড়ল। তারা ঘুরতে গেল। কিছু টাকা জমাল। ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করল।

বাড়িওয়ালির রূঢ় আচরণে আবার বাসা বদলাতে হলো। পরে একসময় জানতে পারল, আগের বাসাটা বাড়িওয়ালা ডেভেলপারের কাছে দিয়ে দিয়েছে। ভাড়াটিয়াদের ঠিকমতো নোটিশও দেওয়া হয়নি। নুহা আর নিবির দুজনই হাসল। ‘ভালোই হয়েছে, আমরা নিজেরাই আগে চলে এসেছিলাম।’ তারা নিজেদের ভাগ্য নিয়ে শুকরিয়া আদায় করল।

এখন নিবিরের বেতন অর্ধলাখেরও বেশি। তবু একটা জিনিস বদলায়নি। মাস শেষে টাকা নুহার হাতেই আসে। শুধু আগের মতো সব টাকার খুঁটিনাটি ভাগ করে রাখা হয় না। কিছু টাকা খরচ হয়। কিছু টাকা জমে। কিছু ভবিষ্যতের জন্য থাকে।

নুহা সব সময় জানতে চাইত—‘আর কত টাকা আছে? অ্যাকাউন্টে কত? এই মাসে কত জমেছে?’

আগে নিবির সব বলত। এখন বলে না। একদিন নুহা আবার জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার অ্যাকাউন্টে এখন কত টাকা আছে?’

নিবির বিরক্ত হয়ে বলল, ‘জেনে কী করবে?’

নুহা চুপ। নিবির আবার বলল, ‘সবকিছু তোমাকে জানতে হবে কেন? তুমি জেনে কী করবে? নিজে কিছু করতে পারো না, শুধু হিসাব রাখতে পারো।’

কথাগুলো খুব সাধারণ ছিল। কিন্তু নুহার কাছে সেদিন সেগুলো খুব ভারী হয়ে গেল। সে আর কিছু বলল না। শুধু চুপ করে বসে রইল। মনে হলো—এই মানুষটাকে সে চেনে না। যে মানুষটা একদিন নিজের বেতনের হিসাব দিতে দিতে কেঁদে ফেলেছিল। যে মানুষটা বলেছিল, ‘তোমাকে কিছু করতে হবে না।’ যে মানুষটা একসময় নিজের পকেটে দুইশ টাকা থাকলেও নুহাকে সব বলত। আজ সেই মানুষটাই কেন তার কাছ থেকে হিসাব লুকাচ্ছে?

সেই রাতে নুহা অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারল না। নিবির ঘুমিয়ে গেছে। নুহা অন্ধকারে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, সে টাকার হিসাব চায়নি। সে আসলে মানুষটার মনের হিসাবটা জানতে চেয়েছিল। কিছু কি বদলে গেছে? নাকি কোনো কারণে নিবিরের মেজাজ খারাপ হয়ে আছে?

পরদিন সকালেও নুহা কিছু বলল না। আগের মতো নাশতা বানাল। কিন্তু তার হাসিটা ছিল না। নিবির অফিসে চলে গেল। দিনভর নুহা নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করল। সে ভাবল—‘আমি কি সত্যিই শুধু হিসাব রাখতে পারি? আমি কি কিছুই করতে পারি না?’

প্রথমবারের মতো নিজের সার্টিফিকেটগুলো বের করল। সে জানত, চাকরি করলে হয়তো বড়ো কিছু করতে পারবে। কিন্তু তার কাছে সবচেয়ে বড়ো স্বপ্ন ছিল সংসারটা। তবু সংসার মানে নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলা নয়।

সন্ধ্যায় নিবির বাসায় ফিরল। দরজা খুলে নুহা তাকে ভেতরে ঢুকতে দিলো। নিবির বুঝতে পারল, নুহা চুপ।

‘কী হয়েছে?’

‘কিছু না।’

‘তুমি আমার সঙ্গে কথা বলছো না কেন?’

নুহা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, ‘তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করো না?’

নিবির থমকে গেল, ‘এ কথা কেন বলছো?’

‘তুমি আগে তোমার সবকিছু আমাকে বলতে। এখন বলো না। আমি শুধু টাকার কথা জানতে চাই না। তুমি কত টাকা আয় করো, কত টাকা জমিয়েছো—এসব আমার কাছে বড়ো ছিল না কখনো।’

নিবির চুপ। নুহা ধীরে বলল, ‘আমি শুধু জানতে চাই, তোমার জীবনে আমি আগের মতোই আছি কি না।’

নিবিরের মুখটা বদলে গেল।

নুহা আবার বলল, ‘তুমি সেদিন বলেছিলে, নিজে কিছু করতে পারো না, শুধু হিসাব রাখতে পারো। চাকরি করিনি। নিজের ক্যারিয়ার বানাইনি। কিন্তু তোমার প্রতিটা দিনের ক্লান্তি আমি দেখেছি। তুমি যখন দুইশ টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরেছো, তখনো তোমাকে কখনো ছোট হতে দিইনি। তোমার পরিবারকে তুমি যতটুকু দিতে চেয়েছো, আমি হিসাব করে সেটুকু আলাদা করে রেখেছি। তোমার স্বপ্নকে নিজের স্বপ্ন ভেবেছি।’

নিবির মাথা নিচু করে বসে রইল।

নুহা বলল, ‘আমি তোমার টাকা চাই না, নিবির। আমি তোমার পাশে থাকার জায়গাটা চাই। সেটা যদি বদলে যায়, তাহলে অর্ধলাখ টাকা, এক লাখ টাকা—কোনোটারই মূল্য নেই।’

নিবির অনেকক্ষণ কোনো কথা বলল না। তারপর ধীরে ধীরে নুহার কাছে এসে বসে তার হাতটা ধরল, ‘তুমি জানো আমি কেন হিসাব বলা বন্ধ করেছি?’

নুহা মাথা নাড়ল।

‘আমি ভেবেছিলাম, তোমাকে আর চিন্তা করতে হবে না। আগে প্রতিটা টাকার হিসাব তোমাকে দিতে হতো, কারণ তখন আমাদের প্রতিটা টাকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এখন একটু স্বস্তি এসেছে। আমি চেয়েছিলাম তোমাকে টাকা নিয়ে ভাবতে না দিতে।’

নুহা চুপ করে শুনছিল।

নিবির বলল, ‘আমি বুঝিনি, আমার এই না-বলা তোমার কাছে গোপন করা মনে হবে।’

নিবিরের চোখে পানি।

‘সেদিন আমি যে কথাটা বলেছি; সেটা বলা উচিত হয়নি।’

নুহা মুখ ফিরিয়ে নিলো। নিবির তার হাতটা আরও শক্ত করে ধরল, ‘তুমি কিছু করতে পারো না—কথাটা আমি রাগের মাথায় বলেছি। সত্যিটা হলো, তুমি না থাকলে আমি এতদূর আসতেই পারতাম না।’

নুহার চোখ থেকেও পানি গড়িয়ে পড়ল।

নিবির বলল, ‘তুমি আমার টাকার হিসাব রাখো না। তুমি আমার জীবনটা গুছিয়ে রাখো।’

নুহা এবার তার দিকে তাকাল।

‘তাহলে এখন থেকে?’

নিবির হেসে বলল, ‘এখন থেকে আবার সব হিসাব তোমাকে দেব।’

নুহা মৃদু হেসে বলল, ‘না।’

নিবির অবাক, ‘না?’

‘সব হিসাব আমাকে দিতে হবে না।’

‘তাহলে?’

নিবিরের হাতটা নিজের দুই হাতের মধ্যে নিয়ে নুহা বলল, ‘শুধু এতটুকু মনে রেখো—আমাদের সংসারে কোনো ‘তোমার টাকা’ আর ‘আমার টাকা’ নেই। সব আমাদের।’

নিবির কিছু বলল না। শুধু নুহাকে জড়িয়ে ধরল।

অনেকক্ষণ পর নুহা বলল, ‘আর একটা কথা।’

‘কী?’

‘আমি হয়তো চাকরি করব না। কিন্তু যদি কোনোদিন মনে হয় আমার কিছু করা দরকার, তখন আমাকে থামাবে না।’

নিবির হেসে বলল, ‘তুমি যা করতে চাও করবে। তবে একটা শর্ত আছে।’

‘কী শর্ত?’

‘আমাকে সঙ্গে নিয়ে।’

নুহা হেসে ফেলল, ‘তুমি কি সব সময় আমার সঙ্গে থাকবে?’

নিবির বলল, ‘যেদিন তোমার হাতে আমার জীবনের প্রথম হিসাব দিয়েছিলাম, সেদিন থেকেই তো আছি।’

নুহা মাথাটা নিবিরের কাঁধে রেখে চোখ বন্ধ করল। বাইরে তখন সন্ধ্যা নেমেছে। ছোট্ট সংসারটা আগের মতোই। একই ঘর। একই রান্নাঘর। একই মানুষ—তারা দুজন। শুধু একটা জিনিস আবার ঠিক হয়ে গেছে—তাদের মাঝখানে কোনো অদৃশ্য দেওয়াল নেই।

রাতে নুহা আবার মাসের হিসাব লিখতে বসেছিল। নিবির পাশ থেকে বলল, ‘কী লিখছো?’

নুহা খাতাটা বন্ধ করে হেসে বলল, ‘কিছু না।’

‘কেন?’

‘আজ আর টাকার হিসাব করছি না।’

‘তাহলে?’

নুহা তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আজ হিসাব করছি—কত বছর ধরে তোমাকে ভালোবাসি।’

নিবির হেসে ফেলল, ‘সেটার হিসাব মেলাতে পারবে?’

নুহা মাথা নাড়ল, ‘না।’

‘কেন?’

নুহা মৃদু হেসে বলল, ‘কারণ ভালোবাসার হিসাব কখনো মেলে না। শুধু দিন শেষে মনে হয়—আরেকটা দিন তোমার সঙ্গে পার হয়ে গেল, আলহামদুলিল্লাহ।’

নুহার হাতটা ধরে নিবির বলল, ‘তাহলে এই হিসাবটাই চলুক সারাজীবন।’

নুহা মাথা রাখল নিবিরের কাঁধে। তাদের জীবনে হয়তো সবকিছু সব সময় নিখুঁত হবে না। কখনো টাকার টান আসবে। কখনো অভিমান হবে। কখনো ভুল কথা মুখ থেকে বের হবে। কখনো দুজন দুজনকে ভুল বুঝবে। কিন্তু তারা একটা জিনিস শিখে গেছে—সংসার মানে শুধু একই ছাদের নিচে থাকা নয়। সংসার মানে, একজনের বদলে যাওয়া আচরণের ভেতরেও অন্যজনকে হারিয়ে না ফেলা। আর ভালোবাসা মানে শুধু হাত ধরে পথ চলা নয়। ভালোবাসা মানে—কখনো একজন ক্লান্ত হয়ে পড়লে অন্যজন তার হাতটা শক্ত করে ধরে বলা, ‘চিন্তা করো না। আমরা আছি। একসাথে আছি।’

নুহা আর নিবিরের সবচেয়ে বড়ো সম্পদ তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ছিল না। ছিল তাদের দুজনের মাঝে। একটা বিশ্বাসে। একটা সংসারে। আর একটা ছোট্ট শব্দে—‘আমরা’।





Source link

×
📺

LIVE TV

Live Tv দেখতে নিচের বাটনে ক্লিক করুন।

📺 লাইভ দেখুন
error: Content is protected !!
🔴 LIVE html