ঢাকাMonday , 2 November 2026
  1. অন্যান্য
  2. আবহাওয়া
  3. খেলা
  4. চাকরি
  5. জীবনযাপন
  6. তথ্যপ্রযুক্তি
  7. প্রেস রিলিজ
  8. বাণিজ্য
  9. বাংলাদেশ
  10. বিনোদন
  11. বিশ্ব
  12. ভিডিও
  13. মতামত
  14. রাজনীতি
  15. শিক্ষা
আজকের সর্বশেষ সবখবর

আলো-আঁধার ঘরে হিরণ্ময় লেখক

UttorbongoBD
November 2, 2026 3:00 pm
Link Copied!


প্রায়ান্ধকার ঘরে কতরকম গল্প শুনি মাঝেমধ্যে। সামনে অন্তত পঞ্চাশ বছরের পুরোনো শালকাঠের টেবিল। টেবিলের ওপর নানা চরিত্রের সাম্রাজ্য! এ রাজ্যের সম্রাটের নাম টেবিল ল্যাম্প। তারই মৃদু আলো আবছা মতো ছড়িয়ে পড়েছে সারাঘরে। কিছু ওষুধের শিশি, জর্দা দেওয়া চুইংগামের প্যাকেটগুচ্ছ। আরেকদিকে নাহুমের বিস্কুটের কৌটো। কাগজ, বইপত্রের ভিড়ে হিরণ্ময় দুটো ট্যাব। এই ট্যাব দুটিই তো সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কাগজ-কলম। কখনও সেই ঘরে ঢুকে এক আশ্চর্য দৃশ্য দেখি, তিনি ঘাড় গুঁজে লিখছেন। কী লিখছেন তিনি? অদ্ভুতুড়ে সিরিজের নতুন কিছু? কৌতূহল বাড়ে।

—কী খবর? এতদিন পর এসেছ? ছিলে কোথায়?

—শিলচরে। আপনি কিছু লিখছিলেন। পরে আসব?

—না না, বসো বসো…

—আজ হাঁটতে বেরবেন না?

—ভেবেছিলাম বেরব, তুমি এসেছ যখন, একদিন না-বেরোলেও হয়…

মোটামুটি এরকম দু-একটা কথাবার্তা দিয়ে আলাপ পর্ব শুরু… তিন-চার ঘণ্টার সেশন, কখনও জোরে পৌঁছাতে ঘড়ির কাঁটা ছুঁয়ে ফেলে রাত এগারোটার ঘর। আমি মুখোমুখি বসে তাঁর কথা শুনি। তারপর তাঁকে জানাই, সদ্য প্রকাশিত ‘চক্কি’ গল্পের পাঠপ্রতিক্রিয়া। গল্পটি কীভাবে এসেছিল সেই অভিজ্ঞতার কথা কখনও তিনি শোনান আমাকে। অণুগল্প হলেও তা লিখতে সময় লেগেছে ঢের। এবং এই মন্তব্য তাঁর মুখে উঠে আসে যে, ‘ওইটুকু একটা গল্প লিখতে গিয়ে এখনও বুঝে উঠতে পারি না কীভাবে শুরু করব আর শেষ হবে কোথায় গিয়ে’! আর তখনই এক অসহায়তার তুলির টান দাগ রেখে যায় তাঁর মুখাবয়বে। এই মুহূর্তে উল্টোদিকে বসে থাকা এই নবীন আমি পড়ে যাই মহাবিপাকে! ভাবি যে, ১২ খণ্ড উপন্যাস সমগ্র লেখার পর একটা ৫০০ শব্দের অণুগল্প লেখার অভিজ্ঞতা এমন হতে পারে বুঝি! ভেবে ঘাবড়ে যাই বেশ!

এই টেবিলেই কবছর আগে সৃষ্টি হতে দেখেছি ‘টুপি’ উপন্যাসটি। ধীরে ধীরে লেখা হয়েছে উপন্যাস, পুরো পর্বটাই কাছ থেকে দেখা! গনা চরিত্রটি মজা মেশানো বিষাদের। গৃহস্থ বাড়িতে চুরি করতে গিয়ে জানলা দিয়ে হাত গলাতেই ধরা পড়ে গেল মালিকের হাতে! তারপর তো যাচ্ছেতাই কাণ্ড। আরও কবছর আগে বড়োদের জন্য লেখা ‘জাদুনল’ উপন্যাসে কিছু কিছু দৃশ্য চলার পথে মাথার মধ্যে পাক খায়। এক বৃদ্ধ-বৃদ্ধার মধ্যে মিঠে-প্রেম। বহুতল থেকে নামার সময় খানিকটা এক্সারসাইজ হবে বলে লিফট ব্যবহার করেন না বৃদ্ধটি। আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা এইসব চরিত্রগুলিকে দেখতে পাই তাঁর সঙ্গে সন্ধ্যাভ্রমণে বেরিয়ে। মানুষকে অনুসন্ধান করা দেখি। হাঁটার ফাঁকে গাছতলার বেদিতে বসে মহানগরের রাজপথে কিলবিল করে হেঁটে চলা কত মানুষকে নিবিড়ভাবে লক্ষ্য করেন তিনি। শীতকালে বাজারে কেন কাঁচা আম উঠেছে, তক্ষুনি দোকানদারের কাছ থেকে জেনে নেওয়া চাই। এই অন্বেষণই তো ঢুকে পড়ে তাঁর লেখায়।

এইসব জীবন-অভিজ্ঞতাই সবেধন নীলমণি নয়, তাঁর সঙ্গে মিশে থাকে ভাষা ব্যবহারের বৈচিত্র্য। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় প্রায়ই বলেন, “মৎস্য শিকারিরা যেমন ছিপ ফেলে বসে থাকে, কখন একটা মাছ এসে ঠোক্কর দেবে ঠিক সেই রকম ভাবেই, আমিও ছিপ ফেলে বসে থাকতাম একটা শব্দের জন্য। কোন শব্দটা হলে আমার এই বাক্যটা ঠিক ঠিক অভিঘাত সৃষ্টি করবে, সেই জন্য বসে থাকতাম। কোনও শব্দই পছন্দ হত না। সমার্থক নানা শব্দ নিয়ে মাথার মধ্যে নানা খেলা চলত। কোন শব্দটাকে কোন জায়গায় প্রয়োগ করব?” হাঁটতে হাঁটতে শুনে নিই এইসব কথা। আড্ডা প্রবল জমে গেলে হাঁটাহাঁটি শেষে ফের আলো-আঁধার মাখা তাঁর লেখার ঘরে আরেকবার মুখোমুখি বসি। লেখার টেবিল থেকে একটি উপহার উঠে আসে আমার হাতে: ‘ময়নাগড়ের বৃত্তান্ত’! শুরুর ‘বৃত্তান্ত কথায়’ গ্রন্থকার বলেছেন, এই উপন্যাস ভিন্ন নামে বেশ কয়েক বছর আগে আনন্দমেলা পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। পরে মনে হয়েছিল, বেশ কিছু পরিবর্তন করা দরকার। আবার তিনি বলছেন, ‘এখন দেখছি, সংস্কার করতে গেলে পুরো উপন্যাসটিই নতুন করে লিখতে হয়।’ এমনটা নানা সময় হয়েছে তাঁর লেখার ক্ষেত্রে। উপন্যাস সমগ্রের দ্বাদশ খণ্ডের ভূমিকা পড়ে জেনেছি, ‘পোকা’ নামের ছোটোগল্পটি নিয়ে যখন বিশাল ভরদ্বাজ ছবি করতে চাইলেন, তখন পরিচালকের আবদারে ওই গল্প থেকেই নিঃসৃত হলো গোটা একটা উপন্যাস: ‘বনদেবী ও পাঁচটি পায়রা’। প্রসঙ্গত মনে পড়ে সাম্প্রতিককালে একটি গল্প লেখা হয়ে গেলে পত্রিকায় চলেও গিয়েছে প্রকাশের জন্য। কিন্তু তখনও শেষ লাইনটি কিছুতেই মনঃপূত হচ্ছে না শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের। তিনি তখনও ভাবছেন যে শেষটা আরেক রকম হতে পারে।

২০২৫-এর বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গল্পসমগ্রের চতুর্থ খণ্ড। মেলার ভিড়ে কিনতে গিয়ে দেখি দে’জ-এর স্টলে প্রকাণ্ড লাইন। বইটি আর কেনা হলো না মেলা থেকে। তাঁকে জানালামও সে কথা। কিছুদিন করে বইটি উপহার দিয়েছিলেন তিনি। প্রথম গল্পের নাম ‘ঝুমকোলতার স্নানের দৃশ্য ও লম্বোদরের ঘাটখরচ’। তাঁর লেখায় যেমন পাই, বেশ সরল, কিছুটা বোকাসোকা চরিত্র। মাঝেমধ্যে তাদের একটু চালাক হতেও ইচ্ছে করে। ঝুমকো আর ভূষণের বিয়ে হয়েছে সদ্যই। সাতসকালে স্নানের জন্য কুয়োতলায় বালতি বালতি জল তুলছে ঝুমকো। বালতি কেড়ে নিয়ে জল তুলে দিতে ইচ্ছে করে ভূষণের। কিন্তু বাড়ি ভরতি আত্মীয়-পরিজন, গুরুজনেরা আছেন। তাঁদের সতর্ক চোখ সারাক্ষণ নতুন বউয়ের দিকে। লেখক লিখেছেন, ‘তবু তার মধ্যেই ভূষণ নানা কায়দা কৌশল করে লুকিয়ে-চুরিয়ে ঝুমকোলতাকে একটু আধটু দেখে নেয়। এই যে এখন উত্তর দিককার ঘরে ভূষণের কোনও কাজ নেই, তবু সে এসে ঢুকে পড়েছে।’


শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে অরুণাভ রাহারায়

বড়োদের লেখাগুলির মতোই এইসব সহজ মানুষের দেখা পাই শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কিশোর সাহিত্যেও। এ কথা তিনি অনেক জায়গায় বলেছেন যে, এই ধরনের লেখা লিখতে তাঁকে প্রথম উদ্বুদ্ধ করেছিলেন নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। যে গল্পটির কথা মনে পড়ছে ‘ডবল পশুপতি’। ভুলো মনের পশুপতিবাবু রোজ সকালে ব্যায়াম করেন— ‘সকালে উঠে ডন বৈঠক দেন, কল ওঠা ভেজা ছোলা আর আদা খান, নিজেই রান্না করেন’। তাঁদের দো-মহলা বাড়িতে যে ভাড়াটিয়া থাকেন তিনি পশুপতিকে গোবেচারা পেয়ে মাঝেমধ্যে শাসিয়ে যান। কিন্তু কোনও প্রতিবাদ করেন না পশুপতিবাবু। কখনও ভাড়াটের বউ এসে চোখ রাঙিয়ে বলে যান— ‘ঘরদোর সব পরিষ্কার আছে তো? আর জল তুলে রেখেছেন তো কলঘরে’? এর মধ্যে শুরু হলো তাস খেলার উপদ্রব। চ্যাঁচামেচি হট্টগোল। ভাড়াটেদের পরিবার জ্বালাতন করলেও নীরব থাকেন পশুপতিবাবু। কিন্তু অদৃশ্যে আরেক পশুপতির খেলা চলে, যে মোটেও গোবেচারা নয়। আর সেই অদৃশ্য পশুপতির দাপটেই বাড়ি খালি করে দেয় নিতাই ভাড়াটের পরিবার। এমন বিচিত্র সব চরিত্রের আনাগোনা প্রায়ই তাঁর লেখায় দেখি।

মনে পড়ে তাঁর বড়োদের লেখা ‘উত্তরের ব্যাকলনি’ গল্পটি এবং এ গল্প নাকি ১০৩ জ্বরের মধ্যে লেখা! তুষার-কল্যাণী আর অরুণের ত্রিকোণ প্রেমের সম্পর্ক ঘিরে মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েন। কল্যাণীকে ভালোবাসত অরুণ। কিন্তু তার বিয়ে হয়েছে চাকরিজীবী তুষারের সঙ্গে। এই শোকে পাগল হয়ে যায় অরুণ। সে আশ্রয় নেয় এক গাছতলায়। তুষার-কল্যাণীর ফ্ল্যাটের উত্তরের ব্যালকনিতে দাঁড়ালেই দেখা যায় পাগলটাকে। সর্বস্বান্ত। এ বাড়ি থেকে অরুণকে দুবেলা খাবার দিয়ে আসে ঝি। একদিকে অরুণের করুণ পরিণতি, সমান্তরালভাবে এগোতে থাকে তুষার-কল্যাণীর দাম্পত্যের টানাপড়েনের কাহিনি। এভাবে বছর ঘুরে যায়। ঋতু বদলায়: ‘বকুলের গাছ থেকে পাতা খসে পড়ে, কখনও ফুল, বৃষ্টি আসে, ঝড় বয়ে যায়, আবার দেখা দেয় রোদ।’ নদীও বয়ে যায়। পাগলটা বসে থাকে।





Source link

×
📺

LIVE TV

Live Tv দেখতে নিচের বাটনে ক্লিক করুন।

📺 লাইভ দেখুন
error: Content is protected !!
🔴 LIVE html