পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমনের নতুন সিনেমা ‘রইদ’-এর মেকিং ভিডিওর তৃতীয় খণ্ড (বিটিএস) সম্প্রতি প্রকাশ পেয়েছে। আর সেখানেই চেনা গ্ল্যামার আর রূপালী পর্দার সৌন্দর্যকে একপাশে সরিয়ে রেখে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অবতারে ধরা দিলেন অভিনেত্রী নাজিফা তুষি। ছবিতে তাঁর চরিত্রের নাম ‘সাধুর বউ’—যা মূলত এক মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন গ্রামীণ নারীর চরিত্র।
একটি ক্যারেক্টারকে পর্দায় জীবন্ত করতে একজন অভিনয়শিল্পী কতটা শ্রম ও সাধনা দিতে পারেন, এই বিহাইন্ড দ্য সিন ভিডিওটি তারই এক অনন্য দলিল।
স্ক্রিপ্ট শুনেই চোখের জল
নাজিফা তুষি জানান, সিনেমার গল্পটি যখন তিনি প্রথম শোনেন, তখনই এর প্রতি এক অদ্ভুত টান অনুভব করেন। বিশেষ করে চিত্রনাট্যের শেষ অংশটি যখন পরিচালক সুমন তাঁকে পড়ে শোনান, তুষি নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। গল্প শুনতে শুনতেই তিনি কেঁদে ফেলেছিলেন এবং তখনই মনে মনে সিদ্ধান্ত নেন—এই চরিত্রের জন্য নিজের সর্বোচ্চটা উজাড় করে দেবেন।
কসমেটিকস ও শ্যাম্পু বর্জন
‘সাধুর বউ’ চরিত্রটি এমন এক নারীর, যে নিজের যত্ন নিতে সম্পূর্ণ অক্ষম। এই লুকটি পর্দায় নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতে শুটিংয়ের দীর্ঘ সময়ে সব ধরনের প্রসাধনী এবং শ্যাম্পুর ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছিলেন তুষি। চুলে জট পাকানো এবং ত্বককে মলিন ও ময়লা দেখানোর জন্য এক দীর্ঘ ‘হেয়ার অ্যান্ড স্কিন ড্যামেজ’ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে, যেখানে সাধারণ গ্ল্যামারের কোনো স্থান ছিল না। তুষির ভাষায়, “এই ক্যারেক্টারের জন্য তো গ্ল্যামার, বিউটি বা আমি যে তুষি, এটা থাকলে হবে না।”
মানসিক হাসপাতাল থেকে বাস্তব চরিত্র খোঁজা
চরিত্রের মাঝে একাত্মতা আনতে তুষি বেশ কয়েক মাস শ্যামলীর একটি মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতালে যাতায়াত করেন এবং সেখানকার রোগীদের আচরণ খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেন। দীর্ঘ চেষ্টার পর হাসপাতালের পারমিশন পেয়ে তিনি লক্ষ্য করেন—কেউ অতিরিক্ত চঞ্চল, কেউ সারাক্ষণ হাসে-কাঁদে, আবার কেউবা একদম নিস্তেজ ও অসাড় হয়ে পড়ে থাকে। এই মানসিক অবস্থার সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো তিনি নিজের অভিনয়ে ধারণ করার চেষ্টা করেছেন।
গ্রামের নারীদের সাথে ‘লুক টেস্ট’ ও গাছে চড়ার চ্যালেঞ্জ
শুটিং শুরুর আগে স্থানীয় গ্রামীণ নারীদের সাথে তুষির একটি ‘লুক টেস্ট’ করা হয়। পরিচালকের নির্দেশনা ছিল, গ্রামের নারীদের মাঝে দাঁড় করালে তুষিকে যেন আলাদা করে শহরের কোনো মেয়ে মনে না হয়, বরং তিনি যেন ভিড়ের মাঝে একদম মিশে যেতে পারেন। চরিত্রের প্রয়োজনে তুষি গ্রামীণ জীবনধারা পুরোপুরি রপ্ত করেন, যার মধ্যে ছিল গরু-মহিষ সামলানো কিংবা গাছে চড়ার মতো কঠিন কাজ।
তুষি হেসে বলেন, “গাছ উঠতে গিয়েই হয়েছি… এই সময়ে এসে বডিতে তো আর আগের মতো ফ্লেক্সিবল বিষয় নাই!” এছাড়া চরিত্রে আরেকটি সূক্ষ্ম দিক ছিল—সাধুর বউ নুন-ঝালের মাপ না বুঝলেও মিষ্টি খাবার খুব ভালো রাঁধতে পারত।
‘কুলসুম’ এবং গ্রামের শিশুদের মধুর অত্যাচার
সিনেমার অন্যতম মজাদার ও চ্যালেঞ্জিং অংশ ছিল অবোলা প্রাণীদের সাথে চরিত্রের রসায়ন। সেটে ‘কুলসুম’ নামের একটি কালো ছাগলকে পোষ মানানো ছিল তুষির জন্য বড় পরীক্ষা। সেটে কথা প্রচলিত ছিল—ছাগল যার কথা শুনবে এবং যাকে অনুসরণ করবে, সে-ই হবে আসল ক্যারেক্টার!
পাশাপাশি, তাঁর এই পাগলীরূপ দেখে গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা তুষিকে সারাক্ষণ ঘিরে রাখত। তারা তুষিকে লক্ষ্য করে পাথর মারা, পিঁড়ি টান দিয়ে সরিয়ে নেওয়া, চুল ধরে টানা আর “এই পাগলী” বলে খেপানোর মধ্য দিয়েই তুষিকে চরিত্রের গভীরে যেতে সাহায্য করেছিল। শুটিংয়ের বিরতিতেও এই মধুর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে তুষি মাঝে মাঝে বলতেন, “এখন তো রিহার্সাল হচ্ছে না, তোরা এখন কেন আমাকে জ্বালাইতেছিস?” তুষি অকপটে স্বীকার করেন, এই চরিত্রের আসল শিক্ষাটাই তিনি পেয়েছেন সেই গ্রামের সহজ-সরল মানুষদের কাছ থেকে।
‘সিনেমার বাইরের জার্নিটাই আসল সিনেমা’
কাদামাটি মাখা শুটিংয়ের নানা দৃশ্য ও চরিত্রের মারামারির কথা স্মরণ করে তুষি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “যদি মনে কষ্ট নিতাম, তাহলে তো আর বুকের সাথে জড়ায় থাকতাম না।”
সিনেমার পথে হেঁটে চলা তুষির এক গভীর উপলব্ধিও পাওয়া গেল এই বিহাইন্ড দ্য সিনের বর্ণনায়—“আমার কাছে তো মনে হয়, আমরা সিনেমায় যা করেছি, সিনেমার বাইরের যে জার্নি—এটাই আসলে দ্য রিয়েল সিনেমা।”