২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন এখনো বাঁচিয়ে রেখেছে আর্জেন্টিনা। তবে শেষ ষোলোর ম্যাচে মিসরের বিপক্ষে ৩-২ গোলের নাটকীয় জয়ের পরও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়ে গেছে রেফারিং ও ভিএআর বিতর্ক। আটলান্টা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও শেষ ১৩ মিনিটে তিন গোল করে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেয় বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা।
ম্যাচের শেষ দিকে মিসরের একটি গোল বাতিল, একাধিক হলুদ কার্ড, সম্ভাব্য পেনাল্টি না পাওয়া এবং শেষ বাঁশির পর দুই অধিনায়কের বিপরীত আবেগ—সব মিলিয়ে ম্যাচটি বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
শেষ ১৩ মিনিটে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন
ম্যাচের প্রায় ৭০ মিনিট পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিদায়ের শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। একটি গোল বাতিল হলেও ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল মিসর। এমন অবস্থায় ৭৯তম মিনিটে ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর হেডে ব্যবধান কমায় আর্জেন্টিনা।
এর চার মিনিট পর লিওনেল মেসি টুর্নামেন্টে নিজের অষ্টম গোল করে ম্যাচে ২-২ সমতা ফেরান। এরপর যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে লাউতারো মার্তিনেসের ক্রস থেকে এনজো ফার্নান্দেজের দুর্দান্ত হেডে ৩-২ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনা। মাত্র ১৩ মিনিটে তিন গোল করে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্প লেখে তারা।
ভিএআরে বাতিল জিকোর গোল
ম্যাচের সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম দেয় মিসরের বাতিল হওয়া গোলটি। তখন ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল মিসর। দারুণ এক আক্রমণে মোহাম্মদ সালাহ বল বাড়িয়ে দেন মোস্তাফা জিকোর কাছে। কাছ থেকে বল জালে পাঠিয়ে উচ্ছ্বাসে জার্সি খুলে উদযাপনও শুরু করেছিলেন জিকো।
কিন্তু কয়েক মিনিট পর ভিএআরের হস্তক্ষেপে গোলটি বাতিল হয়ে যায়। রিপ্লেতে গোলের আগে আক্রমণ গড়ার সময় মিসরের এক খেলোয়াড়ের ফাউলের ঘটনা শনাক্ত করা হয়। সেই ফাউলের কারণেই গোলটি বাতিলের সিদ্ধান্ত দেন রেফারি।
ভিএআরের সিদ্ধান্ত কি নিয়ম অনুযায়ী ছিল?
গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে ম্যাচ চলাকালেই ধারাভাষ্যকারদের কেউ কেউ মন্তব্য করেছিলেন, এটি ভিএআরের এখতিয়ারের বাইরে ছিল।
তবে ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড (আইএফএবি)-এর ‘লজ অব দ্য গেম’ অনুযায়ী, গোল হওয়ার আগে আক্রমণ তৈরির পর্যায়ে কোনো ফাউল, হ্যান্ডবল বা অফসাইড থাকলে ভিএআর সেটি পর্যালোচনা করতে পারে।
আইএফএবির ভিএআর প্রোটোকলে বলা হয়েছে, পর্যালোচনাযোগ্য ঘটনার আগে ও পরের খেলার ধাপও প্রয়োজন হলে পরীক্ষা করা যাবে। বিশেষ করে গোল হওয়ার আগে আক্রমণকারী দলের কোনো অপরাধ—যেমন ফাউল, হ্যান্ডবল বা অফসাইড—ঘটলে ভিএআর হস্তক্ষেপ করার সুযোগ রয়েছে। সেই দিক থেকে নিয়ম অনুযায়ী গোলটি বাতিল করা সম্ভব ছিল।
পেনাল্টির দাবি মানেননি রেফারি
আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের আগেও আরেকটি বিতর্ক তৈরি হয়। বক্সের ভেতরে বল পেয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় সালাহ আর্জেন্টিনার এক ডিফেন্ডারের চ্যালেঞ্জে পড়ে যান। মিসরের খেলোয়াড়রা পেনাল্টির জোরালো দাবি তুললেও রেফারি খেলা চালিয়ে যেতে বলেন।
কিছুক্ষণ পর আর্জেন্টিনা পাল্টা আক্রমণে উঠে এনজো ফার্নান্দেজের জয়সূচক গোলটি করে। ভিএআর ঘটনাটি পরীক্ষা করলেও রেফারির সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়নি।
হলুদ কার্ডের বন্যা
আর্জেন্টিনা এগিয়ে যাওয়ার পর ম্যাচের উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। একের পর এক হলুদ কার্ড দেখাতে থাকেন রেফারি।
প্রথমে হলুদ কার্ড দেখেন মিসরের গোলরক্ষক মোস্তাফা শোবেইর। এরপর হামদি ফাতি ও মারওয়ান আতিয়াকেও সতর্ক করা হয়। পেনাল্টির দাবিতে তীব্র প্রতিবাদ জানানোয় মিসরের প্রধান কোচ হোসাম হাসানও হলুদ কার্ড দেখেন। এ সময় পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন অধিনায়ক মোহাম্মদ সালাহ।
শেষ বাঁশির পর দুই অধিনায়কের বিপরীত আবেগ
শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে মিসর শিবিরে নেমে আসে হতাশা। বিশ্বকাপের মঞ্চে ৩৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ সালাহর এটি সম্ভবত শেষ ম্যাচ, আর সেই ম্যাচই শেষ হয় তীব্র বিতর্ক ও হৃদয়ভাঙা পরাজয়ে।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনা শিবিরে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। তার করা সমতাসূচক গোলই আর্জেন্টিনার অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের ভিত্তি গড়ে দেয়। বিশ্বকাপে নিজের ২১তম গোল করে দলকে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।
বিতর্ক থামছে না
ম্যাচ শেষ হলেও বিতর্ক শেষ হয়নি। ভিএআরে বাতিল হওয়া গোল, সালাহর পেনাল্টির দাবি নাকচ করা এবং ম্যাচ পরিচালনায় রেফারির একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ফুটবল অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
যদিও আইএফএবির নিয়ম অনুযায়ী গোল বাতিলের ব্যাখ্যা রয়েছে, তবু মিসর শিবিরের দাবি—এই সিদ্ধান্তগুলোই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে এবং বিশ্বকাপ থেকে তাদের বিদায়ের অন্যতম কারণ হয়েছে।