ফুটবল বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল মানেই তীব্র উত্তেজনা, অসীম চাপ আর কোটি কোটি দর্শকের নজর। এমন এক ম্যাচে খেলোয়াড়দের পাশাপাশি বড় দায়িত্ব থাকে ম্যাচ পরিচালনাকারী রেফারির কাঁধেও। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার বহুল প্রতীক্ষিত লড়াইয়ে সেই দায়িত্ব পালন করবেন মরক্কোতে জন্ম নেওয়া মার্কিন রেফারি ইসমাইল এলফাথ।
৪৪ বছর বয়সী এলফাথের জন্য এটি চলতি বিশ্বকাপে চতুর্থ ম্যাচ। এর আগে তিনি জাপান-নেদারল্যান্ডসের ২-২ ড্র, স্পেনের ১-০ গোলে উরুগুয়েকে হারানো গ্রুপ পর্বের ম্যাচ এবং শেষ ষোলোতে ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারানো নরওয়ের ম্যাচ পরিচালনা করেছেন।
মরক্কো থেকে যুক্তরাষ্ট্র
ইসমাইল এলফাথের জন্ম মরক্কোর কাসাব্লাঙ্কায়। ২০০১ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রের ডাইভারসিটি ভিসা প্রোগ্রামের মাধ্যমে দেশটিতে পাড়ি জমান তিনি। পরে ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি টেক্সাসের অস্টিনে বসবাস করছেন।
খেলোয়াড় থেকে রেফারি
রেফারি হওয়ার গল্পটাও বেশ ব্যতিক্রমী। শুরুতে এলফাথ ছিলেন একজন ফুটবলার। যুক্তরাষ্ট্রের অপেশাদার ক্লাব **অস্টিন লাইটনিংয়ের** হয়ে স্ট্রাইকার হিসেবে খেলতেন তিনি।
মাঠে রেফারিদের সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হয়ে প্রায়ই অভিযোগ করতেন। একদিন লিগ পরিচালনাকারী একজন কর্মকর্তা মজা করেই বলেছিলেন, “এত অভিযোগ করো যখন, তাহলে নিজেই রেফারি হয়ে যাও।”
সেই কথাই বদলে দেয় তার জীবন। একটি রেফারিং প্রশিক্ষণে অংশ নিয়ে তরুণদের ম্যাচ, স্কুল ফুটবল ও সেমি-প্রফেশনাল লিগে ম্যাচ পরিচালনা শুরু করেন। সে সময় একই সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে পূর্ণকালীন চাকরিও করতেন।
এমএলএস থেকে ফিফার তালিকায়
২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ লিগ মেজর লিগ সকারে (এমএলএস) চতুর্থ রেফারি হিসেবে সুযোগ পান এলফাথ। পরের বছরই মূল রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন।
২০১৬ সালে তিনি ফিফার আন্তর্জাতিক রেফারির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন। একই বছর যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল ইতিহাসেও একটি বিশেষ ঘটনার অংশ হন তিনি। নিউইয়র্ক রেড বুলস-২ ও অরল্যান্ডো সিটি বি-এর ম্যাচে বিশ্বের প্রথম অন-ফিল্ড ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) রিভিউয়ের দায়িত্বে ছিলেন এলফাথ।
এমএলএসে দীর্ঘ ক্যারিয়ারে দুইবার (২০২০ ও ২০২২) বর্ষসেরা রেফারির স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি।
অলিম্পিক থেকে বিশ্বকাপ
টোকিও অলিম্পিক (২০২০) ও আফ্রিকা কাপ অব নেশনস (২০২১)-এর মতো বড় টুর্নামেন্টে ম্যাচ পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে এলফাথের। এরপর ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে অভিষেক হয় তার।
সেই বিশ্বকাপে দুটি গ্রুপ পর্বের ম্যাচ ও একটি নকআউট ম্যাচ পরিচালনার পাশাপাশি আর্জেন্টিনা-ফ্রান্সের স্মরণীয় ফাইনালে চতুর্থ রেফারির দায়িত্ব পালন করেন।
তখন নিজের পরিচয় তুলে ধরে তিনি বলেছিলেন, “আমি তিন দিক থেকেই সংখ্যালঘু—আমি একজন অভিবাসী, আফ্রিকান বংশোদ্ভূত এবং মুসলিম। যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে এটি যেমন বড় দায়িত্ব, তেমনি প্রমাণ করে যে অসম্ভব বলে কিছু নেই।”
মানবিকতার জন্যও আলোচিত
কাতার বিশ্বকাপে আরেকটি ঘটনার কারণে প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন এলফাথ। ব্রাজিলের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের জয়সূচক গোল উদযাপনের সময় জার্সি খুলে ফেলায় ক্যামেরুনের ভিনসেন্ট আবুবাকারকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখিয়ে মাঠছাড়া করতে হয় তাকে। কিন্তু কার্ড দেখানোর পর হাসিমুখে আবুবাকারের সঙ্গে করমর্দন করেন এলফাথ। নিয়মের কঠোরতা ও মানবিকতার সেই সমন্বয় ফুটবলপ্রেমীদের প্রশংসা কুড়িয়েছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বকাপে নতুন চ্যালেঞ্জ
২০২৬ বিশ্বকাপ এলফাথের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ। এবার টুর্নামেন্টে রেকর্ড আটজন মার্কিন রেফারির একজন তিনি।
এ পর্যন্ত পরিচালিত তিন ম্যাচে তিনি দেখিয়েছেন সাতটি হলুদ কার্ড ও একটি লাল কার্ড। সেই লাল কার্ডটি দেখেছিলেন উরুগুয়ের আগুস্তিন কানোব্বিও, স্পেনের পাও কুবার্সির ওপর বিপজ্জনক ট্যাকলের জন্য।
ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা সেমিফাইনালে এলফাথকে সহায়তা করবেন যুক্তরাষ্ট্রের কোরি পার্কার ও কাইল অ্যাটকিনস। চতুর্থ রেফারির দায়িত্বে থাকবেন ইতালির মাউরিজিও মারিয়ানি এবং রিজার্ভ সহকারী রেফারি হিসেবে থাকবেন তারই স্বদেশি দানিয়েলে বিনদোনি।
বিশ্বকাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোর একটিতে এবার নজর থাকবে শুধু দুই দলের তারকাদের দিকেই নয়, বাঁশি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ইসমাইল এলফাথের দিকেও। কারণ, এমন উচ্চচাপের ম্যাচে একটি সিদ্ধান্তই কখনও কখনও বদলে দিতে পারে ফুটবল ইতিহাস।