আল্লাহ তায়ালা ‘মুসাব্বিবুল আসবাব’—সমস্ত উপায়-উপকরণের সৃষ্টিকর্তা। আর পৃথিবী হলো ‘দারুল আসবাব’—উপায়-উপকরণের জগৎ। তবে ‘আসবাব’ বলতে শুধু দৃশ্যমান বা বাহ্যিক উপায়-উপকরণকে বোঝায় না; বরং আল্লাহ তায়ালা দুই ধরনের আসবাব সৃষ্টি করেছেন। একটি বাহ্যিক (জাহিরি), অন্যটি অভ্যন্তরীণ বা অদৃশ্য (বাতিনি)। মুসলমানদের বিশ্বাস, আল্লাহর সৃষ্টি করা এই দুই ধরনের আসবাবই সত্য এবং কার্যকর।
আল্লাহ তায়ালা মানুষকে অগণিত নেয়ামতে ধন্য করেছেন। এর কিছু আধ্যাত্মিক, কিছু বস্তুগত। বস্তুগত নেয়ামতগুলোর মধ্যে মানুষের জীবনধারণের জন্য সবচেয়ে অপরিহার্য হলো বায়ু, আর বায়ুর পরেই রয়েছে পানি।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বারবার পানির কথা উল্লেখ করেছেন। এমনকি বলা হয়েছে, ‘…আর আমি সকল প্রাণবান জিনিসকে পানি থেকে সৃষ্টি করলাম। তবুও কি তারা ঈমান আনবে না?’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৩০)
মানুষের জীবন সম্পূর্ণরূপে পানির ওপর নির্ভরশীল। শুধু মানুষ নয়, সব প্রাণীর জীবন ও অস্তিত্বও পানির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যেহেতু সৃষ্টির উপাদানের মধ্যেও পানির উপস্থিতি রয়েছে, তাই কোরআনে মানুষের বীর্যকে ‘মা-ইন দাফিক’ অর্থাৎ ‘সজোরে নির্গত পানি’ বলা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে দ্রুতবেগে নির্গত পানি থেকে।’ (সুরা তারিক, আয়াত: ৬)
অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর আল্লাহ প্রত্যেক জীবকে পানি থেকে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তাদের কোনটি পেটে ভর দিয়ে চলে, কোনটি চলে দু’পায়ের ওপর, আবার কোনটি চার পায়ের ওপর চলে। আল্লাহ যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছুর ওপর সর্বশক্তিমান।’ (সুরা নূর, আয়াত: ৪৫)
পানি একটি দৃশ্যমান ও বাহ্যিক ব্যবস্থা। কিন্তু প্রকৃত শক্তি একমাত্র আল্লাহর। তার ইচ্ছা ও নির্দেশেই মানুষ কোনো নেয়ামত লাভ করে, আবার তাঁরই ফয়সালায় তা থেকে বঞ্চিত হয়।
আমরা দেখি, সমুদ্রের পানির প্রবাহ, সূর্যের তাপ, বাতাসের চলাচল কিংবা আকাশে মেঘের বিচরণ—এসবই নিয়মিত ঘটছে। গ্রীষ্মে শুকিয়ে যাওয়া জমিন ও প্রায় মৃত বৃক্ষও যেন বৃষ্টির অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু কোনো বছর পরিমিত বৃষ্টি হয়, কোনো বছর অতিবৃষ্টি হয়, আবার কোনো বছর খরা ও দুর্ভিক্ষে জমিন এক ফোঁটা পানির জন্য হাহাকার করে। এটাই আল্লাহর ইচ্ছার বিস্ময়কর নিদর্শন। তিনি না চাইলে সব বাহ্যিক উপকরণ উপস্থিত থাকলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না।
গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহ বা অনাবৃষ্টির সময় আমাদের আত্মসমালোচনাও করা উচিত। আমাদের পাপাচার ও অসৎকর্ম কি আল্লাহর শাস্তির কারণ নয়?
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো জাতি জাকাত আদায় করা বন্ধ করে দেয়, তখন তাদের থেকে বৃষ্টি বন্ধ করে দেওয়া হয়।’ বাস্তবতা হলো, আমাদের সমাজে হিসাব অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গভাবে জাকাত আদায়কারীর সংখ্যা খুবই কম। যদি নিসাবপরিমাণ সম্পদের অধিকারী সব মুসলমান যথাযথভাবে জাকাত আদায় করতেন, তাহলে এ দেশে কোনো মানুষকে ক্ষুধার্ত থাকতে হতো না।
হাদিস থেকে আরও জানা যায়, যখন কোনো জাতি বা গোষ্ঠী জুলুম-নির্যাতনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন তাদের ওপর আসমানি পরীক্ষা ও বিপর্যয় নেমে আসে। যেমন মক্কার অধিবাসীদের ওপর দুর্ভিক্ষ নাজিল করা হয়েছিল। আমাদের সমাজে যেভাবে খুনখারাবি, অন্যের অধিকার হরণ ও নানা ধরনের অবিচার ঘটে, তাতে আল্লাহর আজাব নেমে আসার আশঙ্কা নিয়ে আত্মসমালোচনার অবকাশ রয়েছে। এসব এমন মর্মান্তিক ঘটনা যে, আকাশের চোখ থেকেও যদি রক্তের অশ্রু ঝরে, তবুও তাতে বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকবে না।
আত্মসমালোচনার পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়া এবং তার সাহায্য প্রার্থনা করা। আল্লাহ তায়ালা নামাজ ও ধৈর্যকে তার সাহায্য লাভের মাধ্যম হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘হে মুমিনরা, ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাও। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫৩)
রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর এই নির্দেশের বাস্তব প্রয়োগ করেছেন। জীবনের বিভিন্ন প্রয়োজন ও পরিস্থিতিতে তিনি বিভিন্ন ধরনের নামাজের শিক্ষা দিয়েছেন। আনন্দের সময় সালাতুশ শোকর, কোনো মুসলমানের মৃত্যু হলে সালাতুল জানাজা, গুনাহ হলে সালাতুত তাওবা, কোনো বিষয়ে কল্যাণ-অকল্যাণ বুঝতে না পারলে সালাতুল ইস্তিখারা, সূর্যগ্রহণে সালাতুল কুসূফ, চন্দ্রগ্রহণে সালাতুল খুসূফ, বিশেষ প্রয়োজন দেখা দিলে সালাতুল হাজত এবং বৃষ্টি বন্ধ হয়ে গেলে সালাতুল ইস্তিসকা আদায়ের শিক্ষা দিয়েছেন।
তাই বৃষ্টিকে যেমন আল্লাহর মহান নেয়ামত হিসেবে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে গ্রহণ করা উচিত, তেমনি প্রয়োজনের সময় বৃষ্টি না হলে নিজেদের গুনাহ স্মরণ করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে এবং সালাতুল ইস্তিসকার মাধ্যমে তার দরবারে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করতে হবে।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে তার হুকুম অনুযায়ী জীবনযাপনের তাওফিক দান করুন। আমিন।