এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় টানা দুই বছর ধরে পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে। ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশে। এবার আরও কমে হয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। একইভাবে দুই বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯১১ থেকে কমে ৪০ হাজার ৮৪ জনে নেমেছে। অর্থাৎ দুই বছরে জিপিএ-৫ কমেছে ১ লাখ ৫ হাজার ৮২৭টি।
এবার ১১টি শিক্ষা বোর্ডে ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। অকৃতকার্য হয়েছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন। গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ পয়েন্ট। জিপিএ-৫ কমেছে ২৯ হাজার ১৩টি। শুধু সামগ্রিক ফল নয়— বিভাগ, বোর্ড ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলেও অবনতির চিত্র পাওয়া গেছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, এ ফলের পেছনে দীর্ঘদিনের শিখন ঘাটতি, করোনা-পরবর্তী ক্ষতি পূরণে কার্যকর উদ্যোগের অভাব, শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা, পাঠদান ব্যাহত হওয়া, শিক্ষক সংকট এবং মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। তবে ফলের অবনতির কারণ নির্দিষ্ট করতে বিষয়ভিত্তিক ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ জরুরি।
মানবিক বিভাগে সবচেয়ে দুর্বল ফল
বিভাগভিত্তিক ফলে বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিকের মধ্যে বড় ব্যবধান দেখা গেছে। বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ৭৩ দশমিক ১২ শতাংশ। ব্যবসায় শিক্ষায় ৫০ দশমিক ৭৭ শতাংশ। আর মানবিক বিভাগে পাস করেছেন মাত্র ৪২ দশমিক ১৭ শতাংশ পরীক্ষার্থী।
মানবিক বিভাগে ছাত্রদের পাসের হার আরও কম—৩৫ দশমিক ০১ শতাংশ, এর বিপরীতে ছাত্রীদের পাসের হার ৪৭ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ এ বিভাগে ছাত্র ও ছাত্রীর পাসের হারের ব্যবধান ১২ দশমিক ৪৮ শতাংশ পয়েন্ট। অন্যদিকে বিজ্ঞান বিভাগে ছাত্রদের পাসের হার ৭১ দশমিক ৬০ এবং ছাত্রীদের ৭৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ।
এ পরিসংখ্যান বলছে, সামগ্রিক ফলের অবনতির পাশাপাশি মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক বেশি পিছিয়ে রয়েছেন। এ বিভাগের শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক ফল, পাঠদানের পরিবেশ এবং পরীক্ষার প্রস্তুতির সুযোগ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
ছাত্রদের চেয়ে ছাত্রীরা এগিয়ে
লিঙ্গভিত্তিক ফলেও ছাত্রীদের এগিয়ে থাকার প্রবণতা দেখা গেছে। এবার ৬ লাখ ৭ হাজার ৬৪৯ জন ছাত্র পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন ২ লাখ ৯০ হাজার ১৫৭ জন। পাসের হার ৪৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ। অন্যদিকে ৬ লাখ ৩৩ হাজার ১৪৯ জন ছাত্রীর মধ্যে পাস করেছেন ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৫২৮ জন। তাদের পাসের হার ৫৬ দশমিক ৩১ শতাংশ।
ছাত্রীদের পাসের হার ছাত্রদের চেয়ে ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাতেও ছাত্রীরা এগিয়ে। তবে এ ব্যবধানের কারণ শুধু পরীক্ষার ফল দিয়ে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ, উপস্থিতি, পারিবারিক সহায়তা ও বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতির তথ্য বিশ্লেষণ করতে হবে।
বোর্ডভেদে বড় ব্যবধান
সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে পাসের হারে সবচেয়ে এগিয়ে ঢাকা বোর্ড। এ বোর্ডে পাসের হার ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ। সবচেয়ে পিছিয়ে বরিশাল বোর্ড, যেখানে পাসের হার ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এ ছাড়া রাজশাহীতে ৪৫ দশমিক ০৬, কুমিল্লায় ৪৮ দশমিক ০৪, যশোরে ৪৪ দশমিক ৯২, চট্টগ্রামে ৫২ দশমিক ০৭, সিলেটে ৫০ দশমিক ৯০, দিনাজপুরে ৪৫ দশমিক ৯৮ এবং ময়মনসিংহে ৫১ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
সাধারণ নয়টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৫১ দশমিক ৬২ শতাংশ। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ৬১ দশমিক ০৭ শতাংশ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ৪৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ। ফলে কারিগরি শিক্ষার ফল সাধারণ বোর্ডগুলোর গড়ের চেয়েও কম। মাদ্রাসা বোর্ডের ফল তুলনামূলক বেশি হলেও সামগ্রিক ফলের অবনতি থেকে এ ধারাও মুক্ত নয়।
শূন্য পাস প্রতিষ্ঠান বেড়েছে, শতভাগ পাস কমেছে
প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলেও উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালে শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ২০২টি। এবার তা বেড়ে হয়েছে ২৯৩টি। এক বছরের ব্যবধানে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৯১টি। অন্যদিকে গত বছর শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠান ছিল ৩৪৫টি। এবার তা কমে হয়েছে ১৩৯টি। অর্থাৎ শতভাগ পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে ২০৬টি।
এ পরিসংখ্যান প্রতিষ্ঠানগুলোর ফলাফলে সামগ্রিক অবনতির ইঙ্গিত দেয়। তবে কোন প্রতিষ্ঠানে কেন এমন ফল হয়েছে, তা জানতে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরীক্ষার্থী, শিক্ষক, অবকাঠামো, পাঠদান ও আগের বছরের ফলের তথ্য প্রয়োজন। মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্যে এসব প্রতিষ্ঠানের বিস্তারিত পরিচয় ও কারণ পাওয়া যায়নি।
শিখন ঘাটতি ও শিক্ষাঙ্গনের অস্থিরতা
শিক্ষাবিদদের মতে, সাম্প্রতিক ফলের অবনতিকে শুধু পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতির দুর্বলতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের শিখন ঘাটতি এবং শিক্ষাব্যবস্থার নানা কাঠামোগত সমস্যা।
শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী এইচএসসি পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘করোনা-পরবর্তী শিখন ঘাটতি পূরণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের সুফলও প্রত্যাশিতভাবে পাওয়া যায়নি। গত দুই বছরে শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা ছিল। এ ছাড়া শুধু গ্রাম পর্যায়ে নয়, দেশের বেশিরভাগ এলাকায় দক্ষ ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের সংকট রয়েছে। এসব কারণে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতির আরেকটি কারণ হলো গাইড বই ও কোচিং-নির্ভরতা। শ্রেণিকক্ষে প্রয়োজনীয় পাঠদান না হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী গাইড বই ও কোচিংয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কিন্তু গাইড বই পড়ে প্রকৃত শিখন অর্জন সম্ভব নয়। এতে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ভালো ফল করার প্রস্তুতি নিলেও প্রত্যাশিত জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না।’’
রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘‘প্রাকৃতিক দুর্যোগও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা এবার দুর্যোগের কারণে বড় ধরনের সমস্যায় পড়েছিল। এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন ছিল। এর পাশাপাশি শিক্ষাঙ্গনের অস্থিরতা ও নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।’’
এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের এক মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘তবে শুধু পরীক্ষা নেওয়ার সুযোগ দিলেই হবে না। যারা দুইয়ের বেশি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে, তাদের জন্যও বিকল্প ব্যবস্থা রাখতে হবে। এসব শিক্ষার্থীর বয়স কম। তাদের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, বিভিন্ন ধরনের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ এবং ভাষা শেখার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। অনেক তরুণই এসব প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী। কিন্তু তাদের জন্য সেই সুযোগ ও পথ যথেষ্ট খোলা নেই। শিক্ষার্থীদের জন্য বিকল্প শিক্ষার ব্যবস্থা তৈরি করা জরুরি, যাতে তারা পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়লেও দক্ষতা অর্জন করে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারে।’’
এদিকে এইচএসসি পরীক্ষার আগে শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের আলোচনায়ও পাঠদান ব্যাহত হওয়া, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বন্যার প্রভাব উঠে এসেছিল। ২০২৪ সালের আন্দোলন থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কর্মসূচির কারণে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতি ও মনোযোগ ব্যাহত হওয়ার কথা জানিয়েছেন কলেজশিক্ষকেরা। রাজনৈতিক পরিচয় ও নিরাপত্তার কারণে কোনও কোনও প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের অনুপস্থিতির অভিযোগও উঠেছে। চট্টগ্রাম বোর্ডের কয়েকটি জেলার পরীক্ষা বন্যার কারণে স্থগিত ও পুনর্নির্ধারণ করতে হয়েছিল। এসব বিষয় পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা আলাদা করে যাচাই করা প্রয়োজন।
তবে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডর চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান ফল বিপর্যয় না দেখে, দেখছেন ভিন্নভাবে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘যারা লেখাপড়া করেছে, তাদের জন্য এবারের ফলাফল মোটেই বিপর্যয় নয়। যারা লেখাপড়া না করে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে, তাদের জন্য এটি বিপর্যয়।’’
ফল খারাপ হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘‘ইন্টারমিডিয়েট পর্যায়ে শিক্ষকের ঘাটতি খুব বেশি নেই। প্রধান সমস্যা হলো, শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে আসে না। শহরাঞ্চল বাদ দিলে দেশের কোনও প্রতিষ্ঠানে ৫০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসে আসে বলে আমার মনে হয় না। সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ক্লাস করে। যারা ক্লাসে আসে, তাদের পাসের হারও বেশি। আমার মতে, নিয়মিত ক্লাস করা শিক্ষার্থীদের পাসের হার সামগ্রিক পাসের হারের চেয়ে বেশি।’’
শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ‘‘অভিভাবকদেরও এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। শিক্ষার্থীরা যেন নিয়মিত ক্লাস করে এবং শিক্ষকদের পাঠদান ও লেকচার মনোযোগ দিয়ে শোনে, সে বিষয়ে অভিভাবকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।’’
কঠোর মূল্যায়ন কতটা প্রভাব ফেলেছে
এবারের ফল প্রকাশের পর মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, পরীক্ষার্থীরা যে নম্বর পাওয়ার যোগ্য, তাদের ঠিক সেটিই দেওয়া হয়েছে; কৃত্রিমভাবে নম্বর বাড়ানো হয়নি। অন্যদিকে শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক মনে করেন, ফল কমা বা বাড়ার সঙ্গে শিক্ষার মানের সরাসরি সম্পর্ক নেই। শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক জায়গায় পরিবর্তনের পাশাপাশি নম্বর দেওয়ার একটি গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড নির্ধারণ করা জরুরি।
ফলে একদিকে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য নির্ভুল ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন প্রয়োজন, অন্যদিকে মূল্যায়ন পদ্ধতি এমন হতে হবে যাতে শিক্ষার্থীর প্রকৃত শিখন ও দক্ষতা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়। কেবল নম্বর কমে যাওয়াকে শিক্ষার মান বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়ার চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না।
দ্বিতীয় সুযোগ সাময়িক স্বস্তি, সমাধান নয়
এবার এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ জন শিক্ষার্থীকে ফেল করা বিষয়ে আবার পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এক মাসের মধ্যে পরীক্ষা নেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে। এতে এসব শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ ব্যবস্থা ফল বিপর্যয়ের মূল কারণ দূর করবে না।
কারণ, মোট অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩। তাঁদের মধ্যে এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্যদের পাশাপাশি তিন বা তার বেশি বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীও রয়েছেন। তাঁদের জন্য কী ব্যবস্থা থাকবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে ২০২৪ থেকে ২০২৬—এই তিন বছরের ফলের ধারাবাহিকতা শিক্ষাব্যবস্থার শিখন, পাঠদান ও মূল্যায়ন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। শুধু পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন কঠোর করা বা অকৃতকার্যদের পুনঃপরীক্ষার সুযোগ দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতা, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক, নিয়মিত পাঠদান এবং শিখন ঘাটতি পূরণের কার্যকর উদ্যোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ফলের প্রকৃত কারণ জানতে বোর্ড ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ এবং নিরপেক্ষ গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টরা।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘‘যারা লেখাপড়া করেছে, তাদের জন্য এবারের ফলাফল মোটেই বিপর্যয় নয়। যারা লেখাপড়া না করে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে, তাদের জন্য এটি বিপর্যয়।’’
ফল খারাপ হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘‘ইন্টারমিডিয়েট পর্যায়ে শিক্ষকের ঘাটতি খুব বেশি নেই। প্রধান সমস্যা হলো, শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে আসে না। শহরাঞ্চল বাদ দিলে দেশের কোনও প্রতিষ্ঠানে ৫০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসে আসে বলে আমার মনে হয় না। সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ক্লাস করে। যারা ক্লাসে আসে, তাদের পাসের হারও বেশি। আমার মতে, নিয়মিত ক্লাস করা শিক্ষার্থীদের পাসের হার সামগ্রিক পাসের হারের চেয়ে বেশি।’’
শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ‘‘অভিভাবকদেরও এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। শিক্ষার্থীরা যেন নিয়মিত ক্লাস করে এবং শিক্ষকদের পাঠদান ও লেকচার মনোযোগ দিয়ে শোনে, সে বিষয়ে অভিভাবকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।’’
ফল খারাপ হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক বলেন, ‘‘করোনাকালে সপ্তম শ্রেণিতে ওঠা শিক্ষার্থীরা মাধ্যমিক পর্যায়ে বড় ধরনের শিখন ঘাটতি নিয়ে এগিয়েছে। ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন ও পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগের ঘাটতিও ফলের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তার মতে, আগের মূল্যায়ন পদ্ধতিতে নম্বরের অতিমূল্যায়ণ ছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়; তবে সাম্প্রতিক সময়ে খাতা মূল্যায়নে কড়াকড়ি করা হয়েছে।’’
মোহাম্মদপুরের কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও শিশুসাহিত্যিক মো. রহমত উল্লাহ্ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমি মনে করি, শিক্ষাক্ষেত্রে বিগত সময়ে যে অস্থিরতা বিরাজ করছিল, তাতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষামুখী করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানমুখী করা পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। শিক্ষকরা হেনস্থার শিকার হওয়ার ভয়ে শিক্ষার্থীদের শাসন করার সাহস হারিয়ে ফেলেছেন। এমনকি উপদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রেও শব্দচয়নে সতর্কতা অবলম্বন করতে গিয়ে অনেকাংশে চুপসে গেছেন। শিক্ষার্থীরা মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন আসক্তিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে। অনেকেই কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অভিভাবকরাও সন্তানদের শাসন ও নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন, হচ্ছেন।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘এসব কারণের পাশাপাশি পরীক্ষা পদ্ধতি আগের তুলনায় কঠোর করা হয়েছে, যা অনেক আগে থেকেই কাম্য ছিল। এটিকে খারাপ ফল বলা যাবে না; বরং প্রকৃত ফল বলতে হবে। ভবিষ্যতে পরীক্ষা পদ্ধতি আরও উন্নত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের পাঠমুখী করতে বিভিন্ন কর্মসূচি নিতে হবে। শিক্ষকদের বিভিন্ন ধরনের চাপ থেকে মুক্ত রেখে স্বাধীনভাবে ও নির্ভয়ে পাঠদান এবং শাসন-বারণ করার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে অবশ্যই কিছুদিন পর শিক্ষার্থীরা বুঝবে, ভালো ফলের জন্য লেখাপড়ার কোনও বিকল্প নেই। তখন তারা লেখাপড়ায় মনোযোগী হবে এবং প্রকৃত ফল আবার ঊর্ধ্বমুখী হবে—সেটিই আমাদের সবার কাম্য।’’